
এক
আমার বয়স যখন বার-তের তখনকার ঘটনা। সন্ধ্যা নদীর তীর ঘেঁষে ইন্দুরহাট বন্দর। বন্দরে সন্ধ্যাবানী নামে একটি সিনেমা হল রয়েছে। ঐ হলে সর্বশেষ শো টা শুরু হত রাত ন’টায় আর শেষ হত রাত বারটায়। সিনেমা হলটি আমাদের বাড়ী থেকে প্রায় দেড় কিলো দুরে। আমাদের পাশের বাড়ীর একটি ছেলে ছিল সাহাবুদ্দিন। ও সেদিন সিনেমা দেখার পর রাত বারটায় একা একা বাসায় ফিরছিল। ঐ পথে সে একাই ছিল। চৈতি দিনের সে রাতটি ছিল বেশ চন্দ্রজ্জ্বোল। দু’একদিন আগে হয়তো পূর্নিমা হয়ে গেছে। তবু চাঁদের আলো যেন চারদিক ঠিকরে পড়ছে। বন্দর থেকে আমাদের বাড়ী আসার রাস্তাটা তখন একটা জায়গায় বেশ ফাঁকা। অর্থাৎ রাস্তার দু’ধারেই বেশ প্রশস্ত মাঠ ছিল। কোন বাড়ীঘরের অস্তিত্ব আশেপাশে ছিল না। তবে হিন্দুদের দু’টা বড়সড় পরিত্যাক্ত মঠ ছিল সেখানটায়। তো চলতে চলতে এখানটায় এসে সাহাবুদ্দিনের গা টা কেমন ছমছম করতে লাগলো। এত নীরিবিলিতে সে এই পথে আর কখনো হাটেনি। হঠাৎ সে দুরে একটা বস্ত দেখতে পেয়ে চমকে ওঠে। পরিত্যাক্ত মঠ দু’টার কাছা কাছি রাস্তার কিনারে সাদা মত কি একটা বস্ত তার চোখে পড়ে। সাহাবুদ্দিন থমকে যায। মনের ভিতর প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি হয়। কি ওটা?
চাঁদের আলোয় স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে সাদামত কি একটা দাঁড়িয়ে। একটা মাত্র হাত তার। সেই একটা হাতই নেড়ে নেড়ে যেন তাঁকে ডাকছে। সাহাবুদ্দিন এক পা আগায় তো দু’পা পেছোয়। আশে পাশে তাকিয়েও কাউকে দেখতে পাচ্ছেনা। অবশেষে দুঃসাহসী হয়ে ওঠে সে। ভাবে, ওখানে যা-ই থাকুক দৌড়ে গিয়ে আগে তাকে ঝাপটে ধরবে। যেই ভাবা সেই কাজ। চোখ বন্ধ করে ভোঁ দৌড়।
অতপরঃ কিছুক্ষন পরে তার পেছনের পথিকেরা তাকে আবিস্কার করলো রাস্তার ধারে একটি মরা শুকনো খেজুর গাছ জড়িয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকা অবস্থায়। আসলে ঘটনাটা কি হয়েছে আপনারা কি কিছু ভেবেছেন। না ভেবে থাকলে অপেক্ষা করুন, গল্পের শেষে বলব। তার আগে দ্বীতিয়টা বলে নেই।
দুই
আমার বিয়াই রফিক ভাই (চাচাত ভাইয়ের শ্যালক)। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স করছে। তখন কোন ইয়ার ছিল এখন মনে নেই। ঈদ-উল-আযহার ছুটিতে বাড়ীতে এসেছে। ঘটনাটা ঈদের দিন রাতের। সন্ধ্যার আগে আগে কোরবানীর গোস্ত নিয়ে সে তার নিকটস্থ বোনের বাড়ীতে গিয়েছিল। এরপরপরই প্রচন্ড ঝড় ওঠে। ঝড়ের পর বাড়ীতে ফিরতে ফিরতে রাত দশটা বেজে যায়। বিপত্তিটা বাজে তার বাড়ীর কাছাকাছি এসে। বাড়ীর কাছের রাস্তাটা ছিল তখন নিকষ কালো অন্ধকারে ঢাকা আর বৃষ্টি ভেজা শ্যাতশ্যাতে অবস্থা। রফিক ভাই দীর্ঘ দিন শহরে থাকে। গ্রামের এমন পরিবেশ তার কাছে তাই অচেনাই লাগছিল। তার মনে একটু ভয়ভয় করছিল। স্থানীয় গোরস্থানের কাছাকাছি এসে সে বেশ জোরে হাটাছিল। বলতে গেলে প্রায় উর্ধ্ব শ্বাসে ছুটছিল। হঠাৎ সে অনুভব করল কবরস্থানের ভিতর থেকে কেউ তার ঘাড়ে বাঁশ দিয়ে আঘাত করেছে। আঘাত সামলাতে না পেরে সে ওখানে চিৎ হয়ে পড়ে যায়। পড়ার মুহুর্তে সে মা বলে একটা চিৎকার করার সুযোগ পেয়েছিল। তার জন্য বাসার সবাই টেনশন করতেছিল। চিৎকারটা কারো কানে গিয়েছিল হয়তো। বাসার লোকজন তাকে রাস্তা থেকে অজ্ঞান অবস্থায় তুলে আনে।
এখানে ঘটনাটা কি ঘটতে পারে ভেবে নিয়েছেন কি? ভাবতে থাকুন। তার আগে আমার নিজের জীবনের একটা ঘটনা শুনাই আপনাদের।
তিন
বিয়ে করেছি ছ’মাস হয়েছে কি হয় নাই। শশুর বাড়ীতে আমার সহধর্মীনির সাথে ঘুমিয়ে ছিলাম। মধ্য রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে যেতে প্রস্রাব করতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে উঠে বসি। স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে চমকে যাই। অন্ধকারে মাঝে ও আমার দিকে তাকিয়ে সবগুলে দাঁত বের করে হেসে রয়েছে। ওর দাঁতগুলো বেশ সুন্দর! হাসিটাও তাই ঝকঝকে সুন্দর! আমি একদিন প্রশ্ন করেছিলাম, “এত সুন্দর দাঁত তুমি কোথায় পেলে?” ও ঝটপট উত্তর দিয়েছিল, “আমার শশুরের কাছে থেকে।” বলাবাহুল্য আমার বাবা ছিলেন একজন পল্লী চিকিৎসক, বিশেষ করে দন্ত চিকিৎসক।
যা হোক, মাঝরাতে আমি ওর এমন হাসির কারন উদ্ঘাটন করতে পারছিলাম না। বললাম, কি ব্যাপার, এমন হেসে রয়েছো যে?”
ওর কোন সাড়া নেই।
কি ব্যাপার, কথা বলছনা কেন?
তবু ও নিশ্চুপ। অদ্ভুত ভাবে হেসেই রয়েছে।
আমি তখন ওর মুখমন্ডলে হাত দিতে গেলাম। আর তখনি চমকে উঠি। আমি ওর মুখ স্পর্শ করতে চাইলেও আমার হাতটা গিয়ে পড়ে ওর মাথার ওপরে বালিশে। যেখানে ওর চুলগুলো ছড়ানো ছিল।
আর সাথে সাথেই ওর হাসিমাখা মুখটাও মিলিয়ে যায় অন্ধকারে।
এতক্ষনে আমার হুশ হইল। এত ঘুটঘটে অন্ধকারে আমি কারো মুখ বা হাসি, এসব দেখতে পাই কি করে? চমকে উঠে আমি মোবাইলে টর্চ জ্বালাই। দেখি ও গভীর ঘুমে নিমগ্ন। গা টা কেমন ছমছম করছিল। ওকে ডেকে তুলি। বাথরুমের কাজটা সেরে এসে ওকে সব খুল বলি। সব শুনেতো ও নিজেও অবাক।
পরদিন সকালে আমি ঘুম থেকে একটু দেরী করে উঠেছিলাম।
ততক্ষনে আমার শালা-শালি মধ্যরাতের কাহিনীর জন্য হেসে কুটিকুটি।
কিন্তু আমার কাছে ঘটনাটা আজও রহস্য!
উপরে উল্লেখিত ঘটনাগুলোর কারন হয়তো আপনারা ইতিপুর্বে বিভিন্নভাবে ভেবে নিয়েছেন। এবার আমার সাথে মিলিয়ে নিন।
প্রথম ঘটনায় রাস্তার ধারে দীর্ঘ দিনের মরা একটি অতি শুকনো শুষ্ক খেজুর গাছের অংশ দাড়িয়ে ছিল। চৈতি রাতের মৃদু মন্দা বাতাসে খেজুর গাছের অবশিষ্ট একটি পাতার অংশবিশেষ যা একটু একটু নড়ছিল। দিনের বেলা এ্ই বস্তুটা অনেক বার দেখেছে সাহাবুদ্দিন। কিন্তু ঐদিন রাতে ভয়টা তার মনে এতটা দানা বেঁধেছিল যে, খেঁজুর গাছের কথা সে বেমালুম ভুলে যায়। দৌড়ে গিয়ে সে মরা গাছটাকে জড়িয়ে ধরে। দীর্ঘদিনের শুকনো গাছ তার আঘাত সইতে না পেরে সাহাবুদ্দিনকে নিয়েই হুড়মুড়িয়ে পড়ে যায়। আর বেঁচারা সাহবুদ্দিন তো অজ্ঞান। তার জ্ঞান ফেরার পরেই কিন্তু আসল রহস্য উদঘাটিত হয়।
দ্বীতিয় ঘটনায় সন্ধ্যা রাতে ঝড়ের কারনে গোরস্থানের ভিতরের বাঁশ ঝাড় থেকে একটি বাঁশ রাস্তার উপরে কাত হয়ে থাকে। রফিক ভাই যখন বোনের বাড়ীতে গিয়েছিল তখন রাস্তা ছিল পরিস্কার। ফেরার সময় রাস্তা ছিল ভেজা আর অন্ধাকালে ঢাকা। সে বাঁশ দেখতে পায়নি। যেহেতু সে অতি দ্রুত হাটছিল। তাই বাশটা তার গলায় লেগে স্প্রিং করে এবং সে ছিটকে রাস্তায় পড়ে যায়।
তৃতীয় ঘটনাটা আমার কাছে আজো রহস্য। আছে হয়তো বৈজ্ঞানিক কোন ব্যাখ্যা। আমি জানার চেষ্টা করি নাই। আপন বউয়ের হাসি বলে কথা। থাকনা রহস্য হয়েই।
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা মে, ২০১৭ সকাল ১১:৪৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



