...................................................
................................................................
আমি ছোট্ট এক জাহাজে বসে আছি গভীর সমুদ্রে লোকালয় থেকে দূরে । এরকম মুহূর্তে আকাশে চাঁদ আর জোছনা থাকা মানে জীবনটা আসলেই ভিন্নরকম । অনুভূতিগুলো ফানুস হয়ে উড়েনা , বুকের মধ্যে থাকে। আমি তাকে কিছুই বলেনি , সে আমার পাশে ছিলনা । আমি অপর্ণার কথা বলছি । এরকম দিনে হাত ধরে অপর্ণা ছাদে থাকতে চাইতো আর আমি ঘুমের ঘোরে পৃথিবী দেখতাম কিন্তু ঘুম আসতোনা স্পর্শের মায়াবী আলিঙ্গনের জালে আবদ্ধ থেকে ।
কিশোর দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার মোড়ে , আমি তাকে দেখিনি । হাত বাড়িয়ে ইশারা করলো । এই মুহূর্তে কিশোরের মতন এক মাতালের সাথে কথা বলতে আমার দারুণ ইচ্ছে করছে । ল্যাম্পপোস্টের আলোয় চায়ের কাপে রাতের আলো আঁধারি আলোয় ধোঁয়া উড়ানো চা খেতে এইরকম মাতাল মানুষ চাইবেনা , কিন্তু কিশোর চাইবে । চা এবং মদ দুটোই একসাথে পান করার বিচিত্র অভ্যাস নিয়েই হয়ত তার জন্ম । কিছু মানুষ আলো কখনোই পছন্দ করেনা । অন্ধকার তাদের জন্যে স্বর্গের সমান , এই আরাধ্য জীবনের সঙ্গী হতে তারা সবসময় চায় । কিশোর তাদের মধ্যে একজন ।এলাকার বড় ভাই হিসেবে সম্মান কম পাই না তার থেকে ।
একেকটা মুহূর্তকে জীবনবোধের একটা হু হু হাহাকার সৃষ্টি করে দেয় তার গান । কিশোর ঠাণ্ডা মাথার খুনি , এ কথা অনায়াসে বলা যায় । তার মতন এরকম লোকের প্রয়োজন এখন এই আমি আশফাক মানুষটার । নিজের বউকে খুন করা যায় । বিশ্বাস – অবিশ্বাস নিয়ে দোলা সময়ের ক্ষণে । অপর্ণাকে আমি খুব ভালোবাসি, বিয়ে করে সেই স্বীকৃতি দিতেও আমি ভুলিনি । তার গর্ভের সন্তান যখন হল তখনও আমাদের ভালোবাসা তখন তুঙ্গে আরও । আমি এইরকম মুহূর্তেই তাকে হত্যা করার চিন্তা করছি।
আলো ছুটে আসছে ছোট্ট জাহাজে ,দূরের গন্তব্যের যে সীমারেখা টেনেছেন কিংবা সুরের যে মূর্ছনা টানছে তাতে হারিয়ে যাওয়া এবং কষ্টগুলো ভুলে থাকার যে একটা অন্যরকম প্রয়াস তা আমি ঘড়ির কাটার সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কাটিয়ে উঠতে চাচ্ছি। আরও খুব বেশি করে আঁকড়ে ধরে রাখতে চাচ্ছি অনুভূতি । জাহাজের স্বল্প আলোয় চাঁদের আলোর সাথে যেন রেষারেষি চলছে । শুধুমাত্র অপর্ণাকে হত্যা করার দায় নিয়েই আমাকে হত্যা করার জন্যে জাহাজে কিশোরকে নিয়ে এসেছি । অন্ধকারে চাদরে মোড়ানো আমাকে কিশোর চিনবেনা , তাইতো গভীর সমুদ্রকে বেছে নিয়েছি । কিশোরের দায়িত্ব শুধু আমাকে ধাক্কা দেয়া । আমি বলেই দিয়েছি রাত সাড়ে দশটায় জাহাজের ডেকের পাশে যে লোক থাকবে চাদর পরা , তাকে তুমি ধাক্কা দিয়ে জাহাজ থেকে ফেলে দিবে । কিন্তু কিশোর জানেনা যে সে মানুষটা আমিই থাকবো ।
রাত এখন ১০ টা বেজে ২০ মিনিট , আর মাত্র দশ মিনিটের অপেক্ষা । কে যেন পাশ থেকে বলে উঠলো ভাই দিয়াশলাই আছে আপনার কাছে ? সিগারেটটা নিভে গেছে । অন্যসময় হলে বিরক্ত হতাম কিন্তু এই বাকি দশ মিনিট আমি কারো সাথে ঝগড়া করতে চাইনা । পাশ ফিরে বলতে যাবো দেখি সত্যজিৎ দাঁড়িয়ে । এত বড় পরিচালক এই রাতের গভীরে গভীর সমুদ্রে কেন ? তার মতইতো দেখতে । তিনিতো অনেক আগেই মারা গেছেন , তাহলে কি মৃত্যুর আগে নিজের প্রিয় পরিচালকের কথা ভাবছি !!
বিরক্ত করলাম আপনাকে যদি দিয়াশলাই থাকে , তবে একটু দিবেন । আসলে পথের প্যাঁচালির অপুকে নিয়ে পড়ছিলাম , নিজেকে সত্যজিতের মতন করে আবৃত করতে ইচ্ছে করল । তাই হয়তো অবাক হচ্ছেন!! আচ্ছা একটা বিষয় খেয়াল করেছেন অপু কি সারাজীবন কষ্ট নিয়েই কাটাবে ?
আমি ঠিক ভাবছি আমিতো মরে গিয়ে বেঁচে যেতে চাচ্ছি , ভালোবেসে আমার গল্পটা কি সত্যজিতের মত ভাবতে পারেনা । সত্যজিৎ কি আবার দেখা দিচ্ছে এই লোকের মাধ্যমে । আমাকে কি কষ্ট বয়ে বেড়াতে বলছে !!! আমি ভাবছি , আবারো ভাবছি । শীতের রাত , কনকনে শীত । কেউ একজন আমাকে ধাক্কা দিয়েছে , তখন আমার কিশোরের কথা মনে পড়ল , কিন্তু আমিতো এখন গভীর সমুদ্রে ডুবে যাচ্ছি । আমিতো কষ্টটা বয়ে বেড়াতে পারবোনা । সত্যজিৎ আমাকে অপু হতে বলেছিল ? কেন বলেছিল ? অপু কি জন্যে কষ্ট পেয়েছিল !!!! আমাকে কি বেঁচে থেকে জীবনের এই পাপবোধ বয়ে বেড়াতে বলছে !!
সমুদ্রের একাকীত্ব , ভালোবাসার মানুষকে আগলে রাখা কিছুইতো হলোনা ! নিজের ভেতরের মানুষটায় একাকীত্ব ঘুরছে , সাথে আমি ডুবছি । যেন প্রতিনিয়ত হারিয়ে যাচ্ছি । চারপাশের অথই জলরাশির জলধ্বনি কিংবা ভোরের স্নিগ্ধ আলো কিংবা রাতের তারার খেলা গভীর সমুদ্রে সব শেষবারের মতন হচ্ছে , জীবনে জীবনবোধকে যে আন্দোলিত করে চলেছে । কিন্তু একটা সন্তানের জন্যে আমিইতো অপর্ণাকে হত্যা করেছি । ডাক্তার আগেই বলেছিল অপর্ণাকে বাঁচানো গেলেও সন্তান বাঁচানো যাবেনা । কিন্তু নিশ্চিত জেনেও আমি অপর্ণাকেই মেরেছি !!
কিন্তু আমি নেই , সেও নেই !! সত্যজিৎ বেশে কে এসেছিল !!
একবার হারিয়ে কি যেতে পারিনা গভীর সমুদ্রে জাহাজে জোছনা দেখতে দেখতে আমি – অপর্ণা । একবার কি জীবন ফিরে আসতে পারেনা । বেছে নেই অন্য মানুষদের কাছ থেকে আলাদা করে । দিন শেষে রাতে একটু জোছনার আলো কিংবা সাগরের গর্জনতো মন্দ নয়।
কিন্তু আমরা কেউই থাকবোনা !!
সত্যজিৎ এর সাথে দেখা হয়েছিল ...........................।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


