somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

স্মৃতিতে বশির আহমেদ!

২০ শে এপ্রিল, ২০১৪ দুপুর ২:০৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

দরজা খুলে দিয়ে হাত বাড়ালেন তিনি । বললেন- আসো, ভেতরে। 'তুমি' করে বল্লাম, কিছু মনে করলে না তো। হেসে বল্লাম- 'আপনি' বললেই অস্বস্তি হতো। হাসতে হাসতে বললো- ইয়াংম্যান , পড়া শোনা কি চলছে, না শেষ। বল্লাম চলছে।

আন্তরিক ভঙ্গিতে ঘরে ডেকে নিয়ে বসিয়ে সঙ্গীতের আলাপ জুড়লেন। ডাকলে দুই সন্তান হোমায়রা ও রাজা বশিরকে। তিনি প্রিয় শিল্পী বশির আহমেদ। আমার কাঁচা হাতে লেখনীর প্রথম দিকের ঘটনা। ২০০১ সালের শুরুর দিকে।

মোহাম্মদপুরের বাস স্ট্যান্ড থেকে রিকশায় সরাসরি বশির আহমেদের বাসা। সে সময় বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের সঙ্গীতের আলাপন অনুষ্ঠানে যেতাম। সে কারণে সঙ্গীতের কিছু বেসিক বিষয়ে ধারণা ছিল। তাই আলাপটা জমে উঠছিল।

বশির আহমেদ বললেন, এই যুগেও ঠুমরি, দাদরা নিয়ে কথা- এ শুনে আমার অবাক লাগছে। আজকাল তো সাংবাদিকরা পপুলার শিল্পীদের নিয়ে কথা বলেন, বেশি।

উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের কথা তুললে নাক শিটকায়, সবাই। অথচ এই ভাটি বাংলা কিন্তু সঙ্গীতের অসাধারণ জায়গা। আমাদের অনেক দূর যাবার কথা ছিল। পারিনি। এ জন্য আমরাই দায়ি!

প্রিয়মুখ- বিনোদন পত্রিকাটির রিপোর্টার হিসাবেই আমার তার বাসায় যাওয়া। সে সময় তার সম্পর্কে ব্যাপক ভিত্তিক কোনো ধারণা আমার ছিল না। বাসায় ঢুকলেই এক সঙ্গীতময় পরিবেশ। হারমোনিয়াম, তানপুরা, ঢোল, তবলা, গিটার- অনেক রকমের বাদ্য যন্ত্র।

বাসায় স্ত্রী মিনা বশির ছিলেন না। ছেলে রাজা ও মেয়ে হোমায়রার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। রাজার ব্যস্তা ছিল, কিছুক্ষন আড্ডা দিয়ে চলে গেলেন।

বশির আহমেদ জানালেন- সন্তানদের আসলে তিনি স্বাধীনতা দিয়েছেন। একদিকে প্রথাগত শিক্ষা আরেক দিকে সঙ্গীত। সঙ্গীতই তাদের জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম হবে তা কিন্তু নয়। তারা সঙ্গীত চর্চা করবে-শুদ্ধ সঙ্গীতের ধারা বয়ে বেড়ানোর জন্য।

কলকাতায় বেড়ে ওঠার গল্প শোনালেন। জানালেন ওস্তাদ বড়ে গোলাম আলীর সঙ্গ পাওয়ার কথা। বললেন সঙ্গীত মনের প্রশান্তি আনে। জনপ্রিয়তা অর্জনের চেয়ে শুদ্ধ সঙ্গীতের প্রসারে কাজ করেছেন বড়ে গোলাম আলীরা।

বশীর আহমেদ ও হোমায়রা বশিরের সাথে অনেকক্ষন আড্ডা হলো। বশীর আহমেদের বেড়ে ওঠা, সঙ্গীতের নানা দিক, রাগ ঘরানার সঙ্গীত চর্চা বিষয়ে চলমান সময়ের শিল্পীদের অনীহা, রাতারাতি তারকা হওয়ার ধান্ধা, কম জানা লোকের সঙ্গীত পরিচালনা- এ সব বিষয় জানতে পারলাম।

হোমায়রা নামটা সে সময় আমার প্রথম শোনা। তাই দুবার আমাকে এটি কতার বলতে হয়েছে। নামের অর্থটাও তিনি বলেছিলেন। এখন মনে পড়ছে না। রাজার গল্পও করলেন।

অনেক্ষণ ধরে আলাপ-আপ্যায়ন। বশির আহমেদ সম্পর্কে হোমায়রার কাছে আরো অনেক জানা হলো। বিশেষ করে 'অনেক সাধের ময়না আমার বাঁধন ছিঁড়ে যায়'- গানটি নিয়ে বশীর আহমেদের উচ্ছ্বাস আমাকে মুগ্ধ করলো। একজন শিল্পীই বলতে পারেন তার কোন গানটি আসলেই গান হয়ে উঠে। বশীর আহমদে খুবই আত্ম বিশ্বাসী শিল্পী।

হোমায়রা জানালেন ভারতের খ্যাতিমান শিল্পীরা বশির আহমেদকে প্রচণ্ড শ্রদ্ধা করতেন। ভালোবাসতেন।
পরে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের এক আড্ডায় জেনেছিলাম- 'আয় খুকু আয়' গানটি বাংলা সিনেমার জন্য গেয়েছিলেন হেমন্ত বাবু।

তার কাছে সিনেমার গানটি গাওয়ার অফার নিয়ে গেলে হেমন্ত বাবু বলেছিলেন, যে দেশে বশির আছে, সে দেশে আমাকে কেনো ডাকছো তোমরা। তবে শেষ পর্যন্ত হেমন্ত বাবু গানটি গেয়েছিলেন।

মূলত ব্যান্ড গানের প্রতি আমার টান ছিল প্রচণ্ড। সে কারণে এ সব গান আমার কানে নতুন মনে হচ্ছিলো। বাসায় ফিরে পুরনো রেকর্ড নিযে বসেছিলাম। শুনছিলাম তার গান।

সম্ভবত তার বাসা থেকে ফেরার পর সঙ্গীতা বা সাউন্ডটেকের পাটুয়াটুলির হেড অফিস থেকে হোমায়রা ও বশির আহমেদের গানের ক্যাসেট পেয়েছিলাম। সেখান থেকে অন্য রকম এক বশির আহমেদকে আবিষ্কার করি।

হোমায়রাকে নিয়ে আমার কয়েকটি রিপোর্ট ছিল- প্রিয়মুখে। একটা ইন্সেটারভিউও ছাপা হয়েছিল। সব রিপোর্ট তার ভালো লেগেছিল তা কিন্তু নয়।
তবে খারাপ লাগেনি বলে তার 'রহমান রহমান হকে' সিএ কোর্সের সহপাঠি শফিক ভাই মারফত জেনেছিলাম। শফিক ভাই তার বিষয়ে আমাকে বিভিন্ন বিষয় জানাতেন।

অনেক আড্ডার পর ফিরে বশির আমহেদের বাসা থেকে বেরিয়ে এলাম। বশির আহমেদ ও মেয়ে হোমায়রা বশির আমাকে গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন। বললেন, শুধু রিপোর্ট না, এমনিতেই সময় পেলে চলে এসা। আড্ডা হবে। তোমরা তরুণরাই কিন্তু আমাদের সাংস্কৃতিক অগ্রযাত্রাকে এগিয়ে নিবে। আমি অন্তত তাই মনে করি। ভালো থেকো।

পরে মাঝে মধ্যেই তাকে বাসার ফোনে কল করতাম।

বছর দেড়েক পরে সংস্কৃতি বিষয়ক রিপোর্ট লেখালেখি বন্ধ করে বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার হিসাবে কাজ শুরু করলে যোগাযোগটা থেমে যায়। কিন্তু বশীর আহমেদ- নামটা আমাকে আচ্ছন্ন করে রাখে।

সবচেয়ে বেশি ভালো লাগতো তিনি সব সময় গান নিয়েই আছেন। সংস্কৃতি কর্মীর নামে রাজনীতির জোয়ারে ভাসতেন না। বলতেন সঙ্গীতই তার জীবনের অভীষ্ট। এটা নিয়েই তার জীবন কাটুক, সেটিই তার প্রত্যাশা।

এর মধ্যে আজ সকালে যখন বশির আহমেদের মৃত্যু সংবাদ পড়লাম-খুব মন খারাপ হলো। খুব। পরকালে আপনি শান্তিতে থাকুন। আপনার সঙ্গীতের সাথে আমাদের বাঁধন থাকবেই।
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে এপ্রিল, ২০১৪ বিকাল ৪:১৯
৭টি মন্তব্য ৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বস্ত্রশিল্পের জন্য আমি সরকারের যথাযথ স্থানে থাকলে কি করতাম !!!

লিখেছেন অপলক , ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:১৬



গত ১০ দিন হল দেশের বস্ত্র শিল্পের উপর আঘাত খুব চিন্তার বিষয়। অনেক আগে বিচ্ছিন্নভাবে বস্ত্রশিল্প নিয়ে কথা বলেছিলাম। আজ সব মিলিয়ে কিছু চিন্তা করলাম। তার কিছু এখানে নোট... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের চরম দারিদ্র্য নির্মূলে পাঁচ বছর মেয়াদি একটি সমন্বিত নগর পরিকল্পনা

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:১৭


প্রস্তাবিত প্রকল্প: স্বাবলম্বী বাংলাদেশ - দারিদ্র্যমুক্তির নতুন নগর

আমি যদি সরকারের দারিদ্র্য নির্মূল বিভাগের প্রধান হতাম, তাহলে আমার প্রথম লক্ষ্য হতো বাংলাদেশের চরম দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করা ১ কোটি ৭০... ...বাকিটুকু পড়ুন

Sajna

লিখেছেন আরমান আরজু, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:৩১



Sajna
Love is sacred;
Commences from the intense mystery of pure souls.
Has a beginning, but no end;
Here, only peace prevails.
So, love—
Solely for the sincere and the disenchanted,
Not for the pharisaic.
...বাকিটুকু পড়ুন

বিপ্লব সংহতি দিবস সফল ও সার্থক হোক.....

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:১১



আজকে নাকি বিপ্লব সংহতি দিবস। দল ক্ষমতায় থাকলে অনেক রকমের দিবস পালিত হয়। আওয়ামী লীগের সময় শেখ জামাল-কামালের বিবাহ দিবস, শিশু শহীদ শেখ রাসেলের সুন্নাতে খৎতা দিবস আরো কতো কি?... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঝাল্লাগে ভাল্লাগে- ২

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৯


"যে-রাঁধুনী জানে তার তরকারিতে স্বাদ হয়নি, সে নিমেষে লঙ্কার কৌটো উপুড় করে দেবে। তারপর অতিথি যখন কান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে হাঁউমাউ করবে, রাঁধুনী তখন মিটিমিটি হেসে বলবে—‘একটু ঝাল বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×