ধর্মের নামে এ দেশে কত রকমের ভণ্ডামি চলে- কত কিছু জায়েজ করে নেয়া হয়, তার কোনো ইয়াত্তা নাই। বাস্তব জীবনে ধর্ম পালন করার চেয়ে, 'আমি, ধর্ম পালন করি' সেটা দেখানো লোকের সংখ্যাটাই বেশি বলে, এ যাবৎকালে দেখে এসেছি।
একজন মানুষ কতটা সৎ; সেটি আর্থিক, নৈতিক ও চিন্তার ক্ষেত্রে সেটাই এখানে প্রধান বিবেচ্য হওয়া উচিৎ। এবং ইসলাম ধর্ম সম্ভবত এখানে সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছে। দুর্ভাগ্য হলো আমরা সবাই আংশিক বা সুবিধামত ধর্ম পালন করি। আমি নিজেকেও সেই গোত্রে অন্তর্ভক্ত করে এ কথা বলছি।
ধর্ম নিয়ে আলোচনা করার মত যথেষ্ট জ্ঞান আমার নেই। তবে ধর্মকে পুজি করে মানুষকে তাড়িয়ে বেড়ানোর বিষয়ে আমার বক্তব্য আছে। আমরা আমাদের সুবিধা মত সব কিছু ব্যাখ্যা করলে চলবে না।
আমার এ লেখাটা সে দিকে নজর দেবার জন্য। তসলিমা নাসরিনের নির্লজ্জ 'লজ্জা' বই প্রকাশের পর আমি যখন এর মর্ম বুঝতে পারলাম; এতে খুবই ব্যাথিত হয়েছি। এ ব্যাথা অন্য আরো অনেকের মনে লাগবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।
মুসলমানদের মনে আঘাত লেগেছে, বাংলাদেশীদের মনে আঘাত লেগেছে। নিশ্চিতভাবে আমি বিশ্বাস করি ব্যাক্তি স্বাধীনতা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা মানে একটি বিশাল গোষ্ঠীকে আঘাত করা নয়। তাও যদি অন্যায় ভাবে, কাল্পনিক ভাবে কিম্বা একটা উদাহরণ নিয়ে পুরো জাতি বা গোষ্ঠীকে দোষারোপ করা হয়, তাহলে সেটি আমি মানতে চাইনি কখনো। চাইবোও না।
তসলিমা নাসরিন চিকিৎসক হতে চেয়েছিলেন। হয়েছেনও । সেই সাথে তিনি একজন কবি ও সাহিত্যিক। তিনি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর স্ত্রীও ছিলেন। স্বামীর সাথে তার সম্পর্ক ভালো যায়নি। তাই সুশীল এবং তাদের বিপরীত দু চক্রই তসলিমাকে প্রতিরোধ করতে চায়। সম্ভবত ২০০৩ সালের তসলিমা 'ক' বইটি বের হয়। তাতে অনেক বিখ্যাত 'বাবর' আলীর মুখোশের আড়ালে যৌনাচারীর খবর ফাঁস হয়ে যায়। যারা আমাদের এখানে সুশীল। নিয়মিত আমাদের বিভিন্ন রকমের সবক দেন তারা আসলে যে কী সেটি নারী তসলিমার আয়নায় ধরা পড়েছে।
এটা তসলিমা ফাঁস করার সাহস দেখিয়েছেন, এ রকম আরো অনেক কথা। কিন্তু আমি যে কথা এখানে বলতে চাই ১৯৯৪ সালে দেশ ছাড়ার পর মুক্তমত ও মুক্ত মনের অনেক সরকার ক্ষমতায় এসেছেন, গেছেন এবং এখনো আছেন। এ দেশে আল্লাহ, আল্লাহর নবী সা: নিয়ে কুৃৎসিৎ ব্লগ লেখা হয়েছে; সে সব লোক দ্বিতীয় প্রজন্মের মুক্তিযোদ্ধা হয়েছেন। তা নিয়ে সরকারের কোনো ভূমিকা দেখলাম না। কেবল তসলিমার মত একটা নিরীহ নারী লেখিকাকে বছরের পর বছর বিদেশ রেখে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় গোঁড়া মৌলবাদী চরিত্র তুলে ধরাটা দুঃখজনক।
দ্বিতীয় প্রজন্মের মুক্তিযোদ্ধাদের বিষয়ে সরকারি ঘোষনায় আমার আপত্তি নাই। কিন্তু ওই কুৎসিৎ লেখা নিয়ে যে কুৎসিৎ রাজনীতি হয়েছে সেখানে আমার আপত্তি আছে।
তসলিমা নাসরিনের জন্ম বাংলাদেশে, তার সব লেখাকে খারাপ বলে যারা প্রচারণা চালান আমি তাদের বিপক্ষে। কুড়ি বছর ধরে একজন নারী বিদেশে আছেন, নারী মানেই বিশ্বজুড়েই ভোগ কিম্বা উপভোগ করার বিষয় সামনে চলে আসে। সেটি স্বেচ্ছায় কিম্বা জোর পূর্বক হয়ে থাকে। এটা কম বেশি আমরা সবাই জানি। এও জানি সাহিত্যক, কবিরা সব সময় তাদের করতালে নারী দেহের স্পর্শ চান, আর সেই নারী যদি হন শত পুরুষের মাঝখানে একজন তাহলে কী হতে পারে! সে তো সবারই লোভ্য।
তসলিমা পথে পথে ঘুরছেন, আল্লাহর পৃথিধবীতে তাকে যদি আল্লাহ রিজিক দেন, সুস্বাস্থ্য দেন, লেখার ক্ষমতা দেন; সেটাকে রোধ করার আমরা কে?
তসলিমার লেখার প্রতিবাদ জানানোর অনেক রকমের ভাষা আমাদের আছে। কিন্তু তাকে নির্বাসনে রাখার কোনো যুক্তি আমার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। সরকার নিজেদের বড় মুসলমান প্রমাণ করার জণ্য তাকে রুখতে চায়। আসলে এটা মুসলমানি স্বার্থ নয়; রাজনৈতিক স্বার্থ। এ রাজনৈতিক স্বার্থ ধর্মকে যে রকম 'ইসলামী' দলগুলো ব্যবহার করছে। সে রকম বুর্জোয়া দলগুলোও।
তসলিমার প্রতি বিশেষ দূবর্লতা নেই। কিন্তু রাষ্ট্রের ভণ্ডামির প্রতি আমার ক্ষোভ আছে। মুখােশের আড়ালে লুকিয়ে থাকা চেহারাটা বের করে রাষ্ট্র তার আসল চরিত্র দেখাক- আমি সেটাই চাই।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




