
আমি তখন বনানীতে একটি মার্কিন কোম্পানিতে কাজ করি।
২০০৮ সালের কথা। দিন রাত সে অফিস চলে। আমরা কিছু টেকনিক্যাল স্পেসিফিকেশন প্রিপেয়ার করে অনলাইন ডাটাবেজে রাখি। প্রায় ৪৮ জনের একটি টীম দিনরাত কাজ করতাম সেখানে। বেশ মজার চাকুরী ছিলো। নো বস নো নাথিং। কি খেয়ালে একদিন হুট করেই সেই মার্কিন কোম্পানি ছেড়ে সৌদি আরবে চলে যাই। মাত্র ১৫ দিনের নোটিশেই। শখের বশে ইন্টার্ভিউ দিয়েছিলাম এবং এক সপ্তাহের মধ্যে নির্বাচিত হয়ে যাবার পর যখন সেখানে যোগ দিতে বলা হলো- আমি ভাবলাম,
যাই ঘুরে আসি। দেখি না কি হয়!
সেটা ছিলো দীর্ঘ সাড়ে ৩ বছরের প্রবাস জীবনের শুরু। তারপর বহু কাহিনী। একটা সময়ে আমি সেই কোম্পানির সকল সুবিধা সুযোগ পায়ে ঠেলে দেশে ফিরে এসেছিলাম। আমার এহেন আচরণে কোম্পানি কর্তাব্যক্তিরা নাখোশ থাকায় দেশে ফেরার এয়ার টিকেটের টাকাও আমি নিজেই দিয়েছিলাম। বঞ্চিত হয়েছি আরো কিছু সুবিধা হতে। সৌদিতে না থাকার অনেক কারণের একটা ছিল সেখানকার মানুষের আচার আচরণ। দেশটিকে বসবাসের উপযোগী মনে হয়নি আমার। আমি মনে করি সেখানকার মানুষেরা এখনো অসভ্য। জংলী রয়ে গেছে। সেখানে যাবার পর প্রথম কিছু দিন বাংলাদেশীদের মতোই লাগতো আমাকে, ছয় মাস পর হতে আমার চেহারা বেশভূষায় আমাকে মিশরীয় মনে করায় বাংলাদেশী বলে আমাকে আর হেনস্থা অপদস্থ হতে হয়নি কোনোদিন। কিন্তু আমার চোখের সামনে ঘটেছে অনেক ঘটনা যা ভুলে যাওয়া যায় না। আমাদের প্রতি তাদের এমন আচার আচরণে আমি বিস্মিত হয়েছি, ব্যথিত হয়েছি। মাঝে মাঝে রাগে ক্ষোভে দিশেহারাও বোধ করেছি।
নারীদের প্রতি তাদের লোভ লালসা স্পষ্টতই বোঝা যেতো। পাশাপাশি তাদের বন্ধি করে রাখার প্রতিজ্ঞাও ছিল সমান তালে। তারা ধরেই নিয়েছে নারীর স্থান অন্দরমহলে। নারীদের তারা যৌন-দাসীর চেয়ে বেশি কিছু ভাবে বলে আমার মনে হয়নি। ভোগ প্রাচুর্য আর অলস আড্ডা তাদের সবচেয়ে প্রিয়।
বাংলাদেশী পুরুষ শ্রমিকদের যে অবর্ণনীয় দুঃখ দুর্দশা সেখানে পোহাতে হয় সেই জায়গায় একজন নারী শ্রমিকের কি হাল আপনারা যারা সেখানে যাননি, থাকেননি জানেন না তাদের পক্ষে কল্পনা করা সম্ভব নয়। আক্ষরিক অর্থে সৌদিদের বাড়িগুলো একেকটি জেলখানা। প্রাচীর দেয়া ঘেরা ছোট খোপের মতোন এক চিলতে জানালা দেয়া কারাগার। সেখান থেকে আকাশ দেখা যায় না। রোদ পাওয়া যায় না।
তাইতো মধ্যপ্রাচ্য থেকে দিনে দেশে আসছে গড়ে ১১টি কফিন। গত আট মাসে এসেছে ২ হাজার ৬১১টি লাশ। এর মধ্যে নারীদের সংখ্যাও কম না। সাড়ে তিন বছরে শুধু সৌদি আরবেই গেছেন ২ লাখ ৬০ হাজার নারী। এই সাড়ে তিন বছরে নারী শ্রমিকের লাশ এসেছে প্রায় সাড়ে তিন শ।
সৌদিতে আটকে পড়া অনেকের ভিডিও ফেসবুক সহ অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমে দেখা যায়। আহারে কি হৃদয়বিদারক সে আহাজারি। আমি যখন শুনি বা দেখি, আমার ইচ্ছে করে পাখি হয়ে গিয়ে তাদের ফিরিয়ে আনি। নিজ দেশে, নিজ পরিবারের কাছে। আমি নিজে সে দেশে ছিলাম, দেশ থেকে সব প্রিয় মুখ রেখে কি কষ্টে একজন প্রবাসী থাকে এই কষ্ট নিজে প্রবাসী না হলে কেউ বুঝবেন না। গায়ে নির্যাতনের চিহ্ন নিয়ে অঝোর কান্নায় ভেসে যাওয়া সেসব নারীরা একটা কথাই বলে বারবার, আমাকে বাঁচাও, আমাকে ফেরাও!
সে ফিরতে চায়। বাঁচতে চায়।
তারা দেশকে ডাকেন - দেশ শুনে না। সরকারকে ডাকেন - সরকার শোনে না।
তারা তাদের দেশের দূতাবাসকে ডাকেন তারাও শুনে না।
আমরা এমন এক অক্ষম জাতি সেই বোনের কান্না দেখেও শক্ত হয়ে বসে থাকি। যেনো বা আমি তার ভাই নই।
সে যেন আমার কেউ নয়।
কিভাবে আমরা পারছি চুপচাপ বসে থাকতে সে কথাও ভেবে বিষণ্ণ হই। বাংলাদেশ থেকে কি নারী শ্রমিক পাঠাতেই হবে? না পাঠালে কি হয়? আমরা কি কূটনৈতিকভাবে এই সমস্যা নিয়ে সোচ্চার হয়েছি? জাতিগতভাবে আমরা লাঞ্ছিত হচ্ছি। এর শেষ হবে কবে?
নীলসাধু
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই ডিসেম্বর, ২০২২ রাত ৮:৫৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



