somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

"হুমায়ূন আহমেদের হাতে কিছু মধ্যাহ্ন"

১৯ শে জুলাই, ২০১৬ রাত ৮:০১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

তখন কেবল ক্লাস সিক্সে পড়ি। ক্লাসের টেক্সট বইয়ের বাইরে অন্যান্য বই পড়তেই বেশী ভালো লাগলেও পড়ার মত বই খুব কমই আসত হাতে । রবীন্দ্রনাথ,শরৎচন্দ্র তখনও ঠিকভাবে বুঝতাম না। তো স্কুলে একদিন টিফিন পিরিয়ডে দেখলাম আমার এক ক্লাসমেট চুপচাপ বসে কী একটা বই পড়ছে। আগ্রহ নিয়েই ক্লাসমেটের কাছে গিয়েছিলাম,

“তোর হাতে ঐটা কী বই রে?”
“উপন্যাস,হুমায়ুন আহমেদের”
“কিরকম বই,ভালো?”
“তুই হুমায়ুন আহমেদের বই কখনও পড়িস নি ?”
“নাহ, দিবি? পড়ে দেখি”
“নে,এইটা পড়ে দেখ,অস্থির”

বইটার নাম ছিলো “বহুব্রীহি”। বাসায় এসে বইটা যখন পড়া শুরু করলাম তখনও বুঝতে পারিনি যে আমার জগৎ ঠিক সেই মুহূর্তে পরিবর্তিত হয়ে গেছে। বইয়ের পাতা যতই উল্টেছি ততই গেঁথে গেছি ভিতরে। “বহুব্রীহি”- বইটি ছিল অল্প কিছু লোকের ভিতরকার সম্পর্ক ও অনুভূতির গল্প নিয়ে যা তাদের নিত্য দিনের কাজ কর্ম ও বিভিন্ন মজার ঘটনার মধ্য দিয়ে সহজ,প্রাঞ্জল,বোধগম্য ভাষায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছিলো। এই একটি বই পড়ার পর পরই আমাকে হুমায়ুন আহমেদে পেয়ে বসল। একে একে জোগাড় করে পড়া শুরু করলাম তার লেখা অন্যান্য বইগুলো। ধীরে ধীরে পরিচিত হলাম আজব মহাপুরুষ হিমু ও মহাপুরুষ বানানোর কারিগর হিমুর বাবার সাথে। হিমু'র পাগল হলাম ভালোভাবেই। ধীরে ধীরে হিমু আর উপন্যাসের ভিতর বাঁধা থাকলো না। হিমু হয়ে গেল একটি অনুভূতির নাম। হিমু পড়ে হিমু হতে চাওয়া লোকদের মধ্যে নিজেকে খুঁজে পেতাম অদ্ভুত ভাবে। সিরিয়াস সব বিষয় নিয়ে হিমুর ভয়ানক সব রসিকতা এবং অদ্ভুত সব কান্ড কারখানা পড়ে উচ্চশব্দে হেসে ওঠে নি অথবা হিমু ও রূপার কথোপকথনে বিরহে পোড়েনি এমন কেউ যদি সত্যিই থেকে থাকে তো তার জন্যে সমবেদনা থাকল।

এরপর মিসির আলি ও তার যৌক্তিক জগতটায়ও জন্ম নিল অন্যরকম আকর্ষণ। স্কিৎজোফ্রেনিয়া রোগীদের রহস্যময় আচরণ আরো রহস্যময় হয়ে উঠত হুমায়ুন আহমেদের কলমাস্পর্শে। মিসির আলি’র যুক্তিগুলোতে তাজ্জব হয়ে যাওয়া মুহূর্তগুলোকে আজও মিস করি। এরপর দেখা পেয়েছিলাম শত ভাগ শুদ্ধ মানুষ শুভ্রের। বইয়ের পোকা,স্বার্থহীন,রাজপুত্রের মত চেহারার যুবকটিকেও ভালোবেসেছিলাম খুব। হুমায়ুন আহমেদের সৃষ্টি বলে কথা।

এছাড়াও তার লেখা ভালোলাগা বইয়ের সংখ্যা অনেক। তবে এই মুহূর্তে মেঘ বলেছে যাব যাব, নির্বাসন, অপেক্ষা, চলে যায় বসন্তের দিন,মাতাল হাওয়া, শঙ্খনীল কারাগার, নন্দিত নরকে, এইসব দিনরাত্রি, আজ চিত্রার বিয়ে, কেউ কোথাও নেই, সবাই গেছে বনে, পারাপার, ইত্যাদি বইয়ের নাম মনে পড়ছে।

অবস্থা এমন হয়েছিল যে, অবসর সময়ের কথা তো বাদই দিলাম, পড়ার সময় টেক্সট বইয়ের আড়ালে নিয়ে,রাতে সবাই ঘুমিয়ে গেলে দরজা বন্ধ করে,শীতের সময় লেপের নিচে নিয়ে, স্কুলে ক্লাস চলাকালীন সময়ে স্যারদের দৃষ্টি লুকিয়ে,রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে কতভাবেই না পড়েছি! কাছে হুমায়ুন আহমেদের বই থাকলে না পড়ে থাকতে পারতাম না।
আর শুধু আমিই না। হুমায়ুন আহমেদ এর সহজ-সরল আবেগী লেখার মাঝে আমি পুরো একটি জতিকেই বুদ হয়ে যেতে দেখেছি। দেখেছি কীভাবে একটা মানুষ শুধুমাত্র ঘরে বসে কাগজে কলম ঘষেই, শত শত মানুষকে খালি পায়ে হলুদ পাঞ্জাবী পড়িয়ে পথে পথে হাটিয়েছেন। কীভাবে মানুষ তার নতুন লেখার জন্যে অপেক্ষা করে থাকত তা তো নিজেকে দিয়েই বুঝেছি।

বই বাদেও তার নির্মিত নাটক ও সিনেমাগুলিও ছিলো অন্যধারার। তার ধারা এতটাই আলাদা ছিলো যে তার নির্মিত নাটক বা সিনেমা দেখা শুরু করলেই আলাদা করে চেনা যায় যে এটা হুমায়ুন আহমেদের। “আগুনের পরশমনি”-তে আসাদুজ্জামান নূর যখন গুলি খেয়ে মারা যায় যায়,কেঁদেছিলাম,অনেক। আমার ছোট্ট হৃদয় সেই কষ্ট সহ্য করতে পারে নি। আমার মতে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক সিনেমা নির্মাণে এদেশে হুমায়ুন আহমেদই সেরা। নাটকের মধ্যে “আজ রবিবার”,“কেউ কোথাও নেই”-নাটকদু’টি সবচেয়ে প্রিয়। বিশেষ করে কেউ কোথাও নেই নাটকটির বাকের ভাই চরিত্রটির কথা অন্ততঃ একটি প্রজন্ম ভুলতে পারবে না। একজন মানুষ কতটা সৃষ্টিশীল হলে তার সৃষ্টি করা একটি কাল্পনিক চরিত্রের বেঁচে থাকার দাবিতে মানুষ পথে নেমে মিছিল করে তা আর বলে দিতে হয় না। মূলতঃ হুমায়ুন আহমেদের সার্থকতা ছিল ওখানেই। তিনি তার কলমের খোঁচায় একটি জাতিকে কাঁদিয়েছেন,হাসিয়েছেন,ভাসিয়েছেন। উপহার দিয়েছেন জীবনের অনেক ভালো লাগা,খারাপ লাগার মুহূর্ত।

অনেকে বলে,বাংলাদেশের মানুষকে বই পড়তে শিখিয়েছেন হুমায়ুন। আমি বলব,শুধু বই পড়তেই না,এদেশের মানুষকে ভালোবাসতে শিখিয়েছেন তিনি। শিখিয়েছেন কীভাবে জ্যোছনা দেখতে হয়। হাছন রাজার গানেও বর্তমান জনপ্রিয়তা এনে দেয়ার পিছনে তার হাত আছে। গল্প, গান, কবিতা, প্রকৃতি, স্বপ্ন ও রহস্যপ্রেমী হুমায়ুন আহমেদ তার প্রেমগুলোই শিখিয়েছেন পুরো জাতিকে তার মায়া ধরানো লেখনির মাধ্যমে। কোন এক মধ্যাহ্নে কোন চা এর স্টল অথবা ভাত-মাছের হোটেলে একলা বসে “হাওয়া মে উড়তা যায়ে” গানটিকে মিস করে কতজন মানুষ আমি জানি না। তবে এটা জানি, যারা মিস করে তাদের সেই অনুভূতির আড়ালের কারিগর আরেকজন।

সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে জুলাই, ২০১৬ রাত ১০:১১
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আন্দোলনের সময় বেকারদের দরকার ছিল, এখন কি আর নেই?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৫ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ২:২০


সারজিস আলমকে দেখে একসময় মনে হয়েছিল, বাংলাদেশের রাজনীতিতে হয়তো সত্যিই নতুন কিছু আসতে যাচ্ছে। কোটা আন্দোলনের আইকনিক মুখ, গর্বিত ঢাবিয়ান, এনসিপির বড় নেতা। শেখ হাসিনার আমলে সকাল বিকাল... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশ কি মক্কা চুক্তিতে যুক্ত হবে?

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২৫ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:৩২

বাংলাদেশ কি মক্কা চুক্তিতে যুক্ত হবে?

প্রশ্নটি এখন আর নিছক কল্পনা নয়।
গত ৭ আগস্ট সৌদি আরবের মক্কায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান Makkah Joint Defence Agreement-এ স্বাক্ষর করেছে। চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যারা জানেন না তাদের জন্য! কফি এনিমা (Coffee Enema)!

লিখেছেন সাহাদাত উদরাজী, ২৫ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:৩৩

কফি এনিমা হলো মলদ্বার দিয়ে কোলন বা বৃহদন্ত্রে তরল কফি প্রবেশ করিয়ে পেট পরিষ্কার করার একটি বিকল্প পদ্ধতি। নিচে এটি শরীরে দেওয়ার সাধারণ প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে উল্লেখ করা হলোঃ

প্রয়োজনীয় উপকরণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

মিলাদুন্নবী: ভালোবাসার নবী, মানবতার শ্রেষ্ঠ আদর্শ

লিখেছেন জুয়েল তাজিম, ২৫ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৮


মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মদিন বা মিলাদুন্নবী শুধু একটি ঐতিহাসিক স্মরণদিন নয়; এটি মানবতার জন্য এক মহান আদর্শের কথা স্মরণ করার উপলক্ষ। তাঁর আগমন ছিল এমন এক... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাদ্রাসায় শিশুর নিরাপত্তা কোথায়?

লিখেছেন রাবব১৯৭১, ২৫ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৫০

মাদ্রাসায় শিশুর নিরাপত্তা কোথায়?
====================
একটি ১১ বছরের শিশু যার বয়স খেলাধুলা, পড়াশোনা আর স্বপ্ন দেখার। সেই শিশুকে যদি যৌন নির্যাতনের শিকার হতে হয় এবং তার গর্ভে একটি সন্তান জন্ম নেয়, তাহলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×