somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কাদের মোল্লা যেভাবে হয় 'কসাই' কাদের !

১২ ই ডিসেম্বর, ২০১৩ সকাল ১১:১৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


জামায়াতে ইসলামীর আজকের নেতা, জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক সদস্য, একাত্তরের খুনি-ধর্ষক- ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লা, মিরপুরের কসাই কাদের হিসাবে প্রথম উঠে আসে তরুণ একদল সাংবাদিকের অনুসন্ধানী রিপোর্টে! সেই দলটির কনিষ্ঠতম সদস্য ছিলেন ইমন শিকদার। মিরপুরেই তার জন্ম, বেড়ে ওঠা। বাবা কাজ করতেন দৈনিক ইত্তেফাকে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আন্দোলনের প্রথম পর্যায়ের অন্যতম মুখপত্র্র পত্রিকা সাপ্তাহিক প্রিয় প্রজন্মের মাধ্যমে যে সব আগুন তরুণ এ আন্দোলনের ফ্রন্টলাইনে তথা মিডিয়ায় আসেন, ইমন তাদের অন্যতম। তিনি এখন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের আইটি কর্মকর্তা, ছবি বানান। কাদের মোল্লাকে নিয়ে আজকের হৈ হুল্লোড়ের পর ইমনকে মনে পড়লে ফেসবুকের মাধ্যমে তাকে আবার খুঁজে বের করি। আমার অনুরোধে তিনি লিখেছেন দূর্ধর্ষ সেই রিপোর্টে তার অংশপর্বের বৃত্তান্ত!
ইমনের লেখার চুম্বক অংশ সমূহ—“ঘটনাটা ১৯৯৪ এর মাচের্র শেষ দিকের কোন এক রাতের। আমি তখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অনাবাসিক ছাত্র। সে রাতে বাড়িতেই ছিলাম। রাত আনুমানিক ৯টার দিকে সাংবাদিক, ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির তৎকালীন অন্যতম তুখোড় সংগঠক জুলফিকার আলি মাণিক ভাই বাসায় আসেন। সঙ্গে তার এক বন্ধু। আমাকে এসে বলেন, বারী ভাই(ফজলুল বারী) পাঠিয়েছেন। একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজে আপনার সহযোগিতা লাগবে। এ ব্যাপারে মিরপুর এলাকায় বিশ্বস্ত-নির্ভরযোগ্য হিসাবে বারী ভাই আপনার নাম দিয়েছেন। সে কারনে আমরা আপনার কাছে এসেছি। সে সময় আমি 'প্রিয়প্রজন্ম' নামের সাপ্তাহিক পত্রিকায় কাজ করতাম। পত্রিকার সম্পাদক ফজলুল বারী ভাই পাঠিয়েছেন শুনে মনে করি এ আমার নতুন এক এ্যাসাইমেন্ট! যাদের হাতে আমার সাংবাদিকতার হাতেখড়ি, সাংবাদিক যাদের সঙ্গে প্রথম বন্ধুত্ব, বিড়ি খাওয়া সহ সবকিছুর শেয়ারিং হয়, তাদের অন্যতম হলেন বারী ভাই। তাই তার কথা শুনে আমি শুরুতেই রাজি।
প্রাথমিক আলাপচারিতার পর মাণিক ভাই আমাকে একটি দায়িত্ব দেন। তাহলো, শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নের্তৃত্বে গঠিত 'গণতদন্ত কমিশন'-এর পক্ষে একাত্তরের ঘৃণ্য যুদ্ধাপরাধী রাজাকার আব্দুল কাদের মোল্লা'র যুদ্ধাপরাধের স্বাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহের। এ ব্যাপারে কী কী করতে হবে, এ ব্যাপারে সরেজমিন তথ্যানুসন্ধানের প্রয়োজনীয় দিক-নির্দেশনা দিয়ে মাণিক ভাই অল্পক্ষণের মধ্যে চলে গেলেন। তিনি চলে যাওয়ার পর আমি এ দায়িত্বটাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নেই। এলাকায় আমার অগ্রজ, বন্ধুতুল্য মাহবুব আলম শাহীন ভাইকে সঙ্গে নিয়ে রাতেই আমি নেমে পড়ি তথ্যানুসন্ধানের কাজে ।
প্রথমে আমরা গেলাম একজন বৃদ্ধের কাছে। তিনি আমাদের এলাকার একজন বই বিক্রেতা। শিশুতোষ বইওয়ালা হিসেবে তার বইয়ের দোকানটি এলাকায় আমাদের সবার প্রিয় আড্ডাস্থল ছিল। 'শহিদুর রহমান' নামের এ বই পাগল মানুষটির কাছে গিয়ে বললাম, 'খুব কম সময়ের মধ্যে আমাদের গুরুত্বপূণ কিছু কাজ করতে হবে। আপনার সাহায্য লাগবে।' 'মুক্তিযুদ্ধে'র কথা শুনে তিনি মূহুর্তেই রাজি হলেন। আমরা বেরিয়ে পড়লাম তার সাথে । রাতে তিনি তার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু ফিরোজ আলীর মিরপুর ১১নং সেকশনের বি ব্লকের বাসায় আমাদের নিয়ে গেলেন। ফিরোজ আলী তখন মধ্য বয়স্ক এক ব্যক্তি, তিনি একাত্তর সালে স্বপরিবারে মিরপুরে থাকতেন। একাত্তরের ২৫ মাচের্র পর তার ভাই পল্লবকে শুধু 'জয় বাংলা'র অনুসারী হওয়ার অপরাধে কাদের মোল্লার নির্দেশে অবাঙ্গালি গুন্ডারা অকথ্য নির্যাতন করে নির্মম ভাবে হত্যা করে। তখন সমগ্র মিরপুরে হত্যা আর ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে কাদের মোল্লা ও তার অনুসারী অবাঙ্গালিরা । জবাই করে বাঙ্গালি হত্যা ছিল তাদের প্রতিদিনের রুটিনমাফিক কাজ। একেকটি জবাইর আগে ঘোষনা দিত যারা বাংলাদেশ তথা জয় বাংলা অনুসারী, তারা বিধর্মী-নাস্তিক-ভারতের দালাল, এদের হত্যা করা সওয়াবের কাজ! এমন জবাই’র নেশা বেড়ে যাওয়ায় কাদের মোল্লার নাম তখন এ তল্লাটে আতঙ্কের সমার্থক শব্দ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। স্থানীয়রা আব্দুল কাদের মোল্লাকে 'কসাই কাদের' নামকরণ করে । গরু জবাই এর মত মানুষ জবাই এ দক্ষতার নামডাকে(!) কসাই কাদের 'মিরপুরের কসা‌ই' নামেও পরিচিতি লাভ করে ব্যাপক ।
কসাই কাদের মোল্লার প্রতিহিংসার শিকার শহীদ পল্লবের ডাক নাম ছিল 'টুনটুনি'। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে বেশকিছু চলচিত্রে পার্শ্ব অভিনেতা হিসেবে অভিনয় করে সুখ্যাতি অর্জন করে প্রতিপক্ষের চক্ষুশূল হন পল্লব। এ কথা জানান ফিরোজ আলীর স্ত্রী। পল্লব ছাড়াও কবি মেহেরুননেছা নামের এলাকায় খুবই শান্ত-নিরীহ প্রকৃতির বাঙ্গালী গৃহবধূ কসাই কাদের মোল্লার প্রতিহিংসার বলি হন। মিরপুর ৬ নং সেকশন, ডি ব্লক মুকুল ফৌজের মাঠের কাছাকাছি একটি বাড়িতে থাকতেন কবি মেহেরুননেছা। তিনি ছিলেন কবি কাজী রোজী'র ঘনিষ্ঠ বান্ধবী । কসাই কাদের মোল্লার নির্দেশে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে লেখালেখি'র অপরাধে মেহেরুননেছাসহ তার পুরো পরিবারকে বটি দিয়ে কেটে টুকরো টুকরো করা হয়েছিল! এরপর টুকরো করা নরমাংস খন্ডগুলো নিয়ে ফুটবলও খেলা হয়েছিল ৬ নং মুকুল ফৌজ এর মাঠে! কসাই কাদের মোল্লার নির্দেশে ৩০/৩৫ জনের একটি অবাঙ্গালি ঘাতকের দল, মাথায় লাল ফিতা বেঁধে, ধারালো তলোয়ারে সজ্জ্বিত হয়ে অংশ নেয় কবি মেহেরুননেছা ও তার পরিবারকে হত্যাকান্ডে!
এ রকম আরও বেশকিছু তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করে রাতে বাসায় ফিরেই লিখে ফেলি মিরপুরের কসাই কাদের মোল্লা ও তার অবাঙ্গালি দোসরদের একাত্তরের কালো অধ্যায়ের মূহূর্তগুলো । লেখা শেষ হতে হতে ভোর হয়ে যায় । সারা রাত ধরে আমার সোর্সরা নানাভাবে আরও সব তথ্য-উপাত্ত, বক্তব্য জোগাড় করে দেন। আর ভোরের দিকে এসে মাণিক ভাইও নিয়ে যান সে প্রতিবেদন। এরপর মাণিক ভাই’র নেতৃ্ত্বে আরও একটি দল এ ব্যাপারে আরও অনুসন্ধান চালিয়ে বের করে আনে কসাই কাদের মোল্লার সবিস্তার বৃত্তান্ত! এরপর এক পর্যায়ে এটি গণতদন্ত কমিশনের একটি রিপোর্ট হিসেবে ১৯৯৪ সালের ২৬ মার্চ, স্বাধীনতা দিবসে গণআদালতের ২য় বাষির্কীতে গণতদন্ত কমিশনের চেয়ারম্যান কবি বেগম সুফিয়া কামাল ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটের সামনে রাজপথের বিশাল জনসমাবেশে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের হাতে তুলে দেন জাতীয় গণতদন্ত কমিশনের ৮টি রিপোর্ট!
যে রাতে মাণিক ভাই বাসায় এসেছিলেন সে রাতে খুব অল্প সময়ের মধ্যে আমরা একাত্তরের ঘৃণ্য যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার দ্ধারা ক্ষতিগ্রস্ত অসংখ্য মানুষের স্বজনদের দেখা পাই যারা সবাই মিরপুরের বাসিন্দা । এরপর থেকে এমন ক্ষতিগ্রস্ত আরও অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ হতে থাকে। ওই সময়ের বিরুপ রাজনৈতিক পরিবেশের কথা বিবেচনা করে আমরা তাদের অনেকের নাম ও বিবরণ তখন প্রকাশ করিনি। তবে সে ঘাটতি পরবর্তিতে পূরণ করেছেন মানবতা বিরোধী অপরাধ ট্রা‌ইবুনালের তদন্ত দল। তাদের অনুসন্ধান, তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের প্রক্রিয়াটি ছিল তুলনামূলক অনেক সংগঠিত-বিজ্ঞানসম্মত ও আইনানুগ। তাদের দ্বারা সংগৃহিত তথ্য, উপাত্ত ও স্বাক্ষ্যে কসাই কাদের মোল্লার সার্বিক যুদ্ধাপরাধ বৃত্তান্ত উঠে আসায় এবং এর বিচার হওয়াতে একাত্তরে তার হাতে প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া মীরপুরবাসীর মনের ক্ষত কিছুটা হলেও প্রশমিত হবে । আমার সেই তুখোড় যৌবনে এমন একটি কাজের সুযোগ করে দেয়া ফজলুল বারী ভাই, জুলফিকার আলি মাণিক ভাই তথা আমাদের সবার গুরু শাহরিয়ার কবির ভাই, আম্মা শহীদ জননী জাহানারা ইমাম সহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে কৃতজ্ঞতা।


ছবিঃ কাদের মোল্লা একাত্তর এ ( লাল দাগ)

সাংবাদিক ফজ্লুল বারী'র ফেসবুক থেকে অনুলিখিত ঃ-
১৬টি মন্তব্য ৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

অবৈধ উপার্জনের সুযোগ ও উৎস বন্ধ করুন - মদ, জুয়া, পতিতাবৃত্তি এমনিতেই কমে যাবে ।

লিখেছেন স্বামী বিশুদ্ধানন্দ, ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ সকাল ৭:২৯

দুর্নীতিই বাংলাদেশের প্রধান সমস্যা | আমরা যেমন অক্সিজেনের মধ্যে বসবাস করি বলে এর অস্তিত্ব অনুভব করতে পারি না, আমাদের গোটা জাতি এই চরম দুর্নীতির মধ্যে আকণ্ঠ নিমজ্জিত রয়েছে বিধায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রভাতী প্রার্থনা

লিখেছেন ইসিয়াক, ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ দুপুর ১:৫৫


প্রভাত বেলার নব রবি কিরণে ঘুচুক আঁধারের যত পাপ ও কালো ,
অনাচার পঙ্কিলতা দূর হোক সব ,ভালোত্ব যত ছড়াক আলো ।

আঁধার রাতের... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের কাশ্মীর ভ্রমণ- ১৫: যবনিকা পর্ব

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ বিকাল ৩:৪১

এর আগের পর্বটিঃ আমাদের কাশ্মীর ভ্রমণ- ১৪: বেলা শেষের গান


শ্রীনগর বিমান বন্দর টার্মিনালের মেঝেতে বিচরণরত একটি শালিক পাখি

টার্মিনাল ভবনের প্রবেশ ফটকে এসে দেখলাম, তখনো সময় হয়নি বলে নিরাপত্তা প্রহরীরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আত্মপক্ষ সমর্থন

লিখেছেন স্বপ্নবাজ সৌরভ, ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ বিকাল ৩:৫৯



আর কিছুদিন পর সামুতে আমার রেজিস্ট্রেশনের ৮ বছর পূর্ণ হবে।রেজিস্ট্রেশনের আগে সামুতে আমার বিচরণ ছিল। এই পোস্ট সেই পোস্ট দেখে বেড়াতাম। মন্তব্য গুলো মনোযোগ সহকারে পড়তাম।... ...বাকিটুকু পড়ুন

কালোটাকা দেশে বিপুল পরিমাণে বেকারত্বের সৃষ্টি করছে

লিখেছেন চাঁদগাজী, ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ রাত ১০:০৫



কালোটাকা হলো, দেশের উৎপাদনমুখী সেক্টর ও বাজার থেকে সরানো মুদ্রা; কালোটাকা অসৎ মালিকের হাতে পড়ে স্হবির কোন সেক্টরে প্রবেশ করে, কিংবা ক্যাশ হিসেবে সিন্ধুকে আটকা পড়ে, অথবা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×