
১ম পর্ব - Click This Link
কোনরকমে ও স্যান্ডউইচের টুকরোটা গিললো। কিন্তু টুকরাটা গলাতে গিয়ে আটকে গেলো। বীথির মনে হলো এখনই ও মরে যাবে। ও বার বার ঢোক গেলার চেষ্টা করলো। আসলাম খান তা লক্ষ্য করে পানির গ্লাসটা নিয়ে এসে ওকে পানি খাইয়ে দিলেন। বীথির মনে হলো ও যেন প্রাণটা ফিরে পেলো। আসলাম খান গ্লাসটা রেখে এসে বললেন,
---জানি তোমার খুব কষ্ট হচ্ছে। বিশ্বাস করো আমি তোমাকে কষ্ট দিতে চাইনি। কিন্তু কী করবো বলো তুমি কাজটাই যে এমন করেছ। আসলে তোমার কোন দোষ নেই। দোষ হলো তোমার নারী হয়ে জন্মানোর। নারী জাতটাই যে বিশ্বাসঘাতক। আমি তোমাকে মানা করে দিয়েছিলাম কারো সাথে বাড়তি কথা বলো না। কিন্তু তুমি আমার কথা অমান্য করলে। তাও কলেজের বাইরের কোন লোকের সাথে বার বার কথা বলতে থাকলে। তার উপর আমার কাছে ব্যাপারটা গোপণ রাখলে।
ভেবেছিলে আমি কিছুই টের পাবো না। কিন্তু আমি যে এতটা বোকা না বীথি। আমি একটা এক্সট্রা ঘিলু মাথায় নিয়ে চলি। কী ভেবেছিলে তুমি? ভেবেছিলে কলেজে আমি তোমাকে এমনি ছেড়ে দিয়েছি? কিন্তু তা তো না। কলেজে তোমার পেছনে আমি লোক লাগিয়ে রেখেছি। সে তোমার প্রতিটি কর্মকাণ্ডের খবর আমাকে দিতো। তার উপর তুমি আমার উপর শুরু করলে গোয়েন্দাগিরি। আমার জন্য আর কোন উপায়ই রাখলে না তুমি। ভেবেছিলাম তোমাকে নিয়ে সারাটা জীবন আমি কাটিয়ে দিবো। বাবার সাথেও কত কথা কাটাকাটি করলাম তোমার জন্য।
বীথি চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে আসলাম খানের দিকে। ও ভাবতেও পারছে না এমন একটা বদ্ধ উন্মাদকে ও ভালবেসেছিল!
----ভয় পেয়ো না। আমি তোমাকে ওদের মত একেবারে মেরে ফেলবো না। শুধু এখানে বন্দী করে রাখবো। যাতে তুমি আমাকে ছেড়ে কোনদিন যেতে না পারো।
বীথি কোনরকমে সাহস সঞ্চয় করে বলল,
----সবাই যখন জানতে চাইবে আপনার স্ত্রী কোথায়, তখন আপনি কী করবেন? তখন তো পুলিশ এসে আপনাকে ধরে নিয়ে যাবে।
আসলাম খান হেসে বললেন,
----এত সহজ না। চার চারটা খুন আমি করেছি। পুলিশ আমার টিকিটিও ছুঁতে পারেনি। এবারও পারবে না। সবাই জানে আমি বেড়াতে গিয়েছি অনেকদিনের জন্য। ফিরে এসে বলব, বউ অন্য লোকের হাত ধরে পালিয়ে গেছে। কিছুদিন হয়তো কানাঘুষা চলবে। কিন্তু কেউ কিছু প্রমাণ করতে পারবে না আমার বিরুদ্ধে।
বীথি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। ওর সমস্ত শরীর কেমন যেন নিস্তেজ হয়ে আসছে। এই পরিস্থিতি ও আর নিতে পারছে না।
---তুমি ঐ দখিনের ঘরটার রহস্য জানতে চেয়েছিলে না? আজ আমি তোমাকে সব খুলে বলব। এই জায়গাটা হচ্ছে আমাদের বাড়ির গোপন কুঠুরি। আমার দাদা এই বাড়িটা বানিয়েছিলেন। জমিদারী রক্ত শরীরে। কাজ কারবারও তাই ছিল জমিদারী স্টাইলের। বাড়িতে তিনি একটা গোপণ কুঠুরি রাখলেন।
কুঠুরিটা এমনভাবে বানানো হলো যাতে বাইরে থেকে কখনও বোঝা না যায় এখানে কোন গোপণ কুঠুরি আছে। ছোটবেলা থেকেই দেখেছি দখিনের ঐ ঘরটা তালাবদ্ধ থাকে। আমার বাবা চাচাও ঐ কুঠুরির কথা জানতেন না। ঐ ঘরটা তালাবদ্ধ ছিল তালাবদ্ধই পড়ে থাকতো। দাদার নির্দেশ অমান্য করার সাহস কারোর ছিল না। দাদা মারা যাওয়ার পরও তারা কখনও জানার চেষ্টা করেননি ঐ ঘরে আসলে কী আছে? কেন তালাবদ্ধ থাকে?
কিন্তু আমার মনে খুব আগ্রহ ছিল জানার। তাই একদিন ঐ ঘরে ঢুকে পড়ি আমি। প্রথমে একটা স্বাভাবিক ঘরই মনে হলো দেখে। পরে অনেক খোঁজাখুঁজি করে একটা দরজা খুঁজে পেলাম একটা আলমারির ভেতরে। সেই দরজা খুলে তারপর এই ঘরে আসতে হয়। আমি ব্যাপারটা কাউকে বললাম না। আবার ঘরটা যেমন তালাবদ্ধ ছিল তেমনই রেখে দিলাম।
আমার বয়স তখন আঠারো, আর শায়লার বয়স পনেরো। ঐ সময়টাতে আমি আমার বাবাকে খুব মিস করতাম। রাতেরবেলা একা একা বাবার জন্য কাঁদতাম। মনে মনে ভাবতাম বাবা যদি আবার ফিরে আসতেন, কোন অলৌকিকভাবে। মার কথা কখনোই মনে হত না আমার। মাকে আমি মনে প্রাণে ঘৃণা করতাম। ঐ মহিলার জন্যই আমি আমার বাবাকে হারিয়েছি।
একদিন রাতে বাবার জন্য কাঁদছিলাম আমি। রাত তখন দুইটা কি তিনটা। হঠাৎ আমার চুলে কারো স্পর্শ পেয়ে জেগে উঠলাম আমি। মাথা তুলে তাকিয়ে দেখি বাবা আমার পাশে বসে আছেন। সস্নেহে আমার চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন বাবা, যেমনটি ছোটবেলায় দিতেন। আনন্দে ভরে উঠলো আমার মনটা। বাবা বললেন, এখন থেকে তিনি আমার সাথেই থাকবেন। কিন্তু আমি যেন এই কথাটা কাউকে না বলি। সেই থেকে বাবা আমার সাথেই থাকেন। জানি আমার কথা বিশ্বাস হচ্ছে না তোমার। কিন্তু এটাই সত্যি।
বীথি আর মাথাটা সোজা রাখতে পারছিল না। এক পাশে হেলে পড়লো ওর মাথাটা। কিন্তু সেদিকে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই আসলাম খানের। তিনি বলে যাচ্ছিলেন। ঐ হেলে পড়া অসার অবস্থায়ই বীথির কানে কথাগুলো ঢুকছিল।
----
রূপম কলেজে গিয়ে বীথির খোঁজ করতেই জানতে পারলো বীথি আজ কলেজে আসেনি। রূপমের মনটা কু ডাকলো। কিছু হলো না তো মেয়েটার? আসলাম খান আবার এই মেয়েটাকেও মেরে ফেলল না তো। ও তাড়াতাড়ি বাড়িতে গিয়ে, বেশ পাল্টে একটা ট্যাক্সি নিয়ে চলে এলো আসলাম খানের বাড়িতে। সোহরাব মিয়া গেটেই ছিল। রূপম ভেতরে ভেতরে খুব উদ্বিগ্ন ছিল। কিন্তু বাইরে তা প্রকাশ করলো না। হাসিমুখে কথা বলছিল সোহরাব মিয়ার সাথে। এক সময় ও জিজ্ঞেস করলো,
----তোমার নতুন ম্যাডামের খবর কী? সব ভাল চলতেসে তো?
----হ্যাঁ। তা ভালই চলতেসে। স্যার তো নতুন ম্যাডামকে নিয়ে বেড়াইতে গেলেন।
রূপমের বুকটা ধ্বক করে উঠলো। আরেকটা কচি প্রাণ বুঝি ঝরে পড়লো এবার।
----কোথায় বেড়াতে গেসে ওরা?
----তা তো বলতে পারবো না। তবে অনেকদিনের জন্য গেসেন। বাড়ির সব কাজের লোককে ছুটি দিয়ে দিসেন।
রূপমের মনে হলো একদম সময় নেই হাতে। যদি মেয়েটা এখনও মরে না গিয়ে থাকে তাহলে যে করেই হোক বাঁচাতে হবে ওকে। কিন্তু ওদেরকে রূপম খুঁজে পাবে কী করে। ঐ খুনিটা কোথায় নিয়ে গেলো ওকে? দ্রুত গিয়ে ট্যাক্সিতে উঠলো রূপম।
----
----প্রতিদিন রাতে বাবা আসতেন। আমি বাবার জন্য অধির হয়ে অপেক্ষা করতাম। বাবা আমাকে বলতেন আমি যেন কখনোই কোন মেয়েকে বিশ্বাস না করি। আমি বলতাম, ঠিক আছে বাবা তাই হবে। কিন্তু তুমি যেন কখনও আমাকে ছেড়ে না যাও। সারাজীবন আমার পাশে থাকবে তুমি। বাবা বললেন, ঠিক আছে। কিন্তু তোকে সব সময় আমার কথামত চলতে হবে। আমি বললাম, চলব বাবা।
তারপর একদিন রাতে বাবা এসে বললেন,
---আসলাম আমার মেয়েটাকে তুই বাঁচা।
আমি বললাম,
---কেন বাবা কী হয়েছে শায়লার?
বাবা বললেন,
----আর কদিন পরেই মেয়েটা আমার পাপের পথে যাবে। কারণ ও যে মেয়ে। আর মেয়ে মানেই পাপ। না জানি কার সর্বনাশ করে পাপের ভাগিদার হয়ে বসবে মেয়েটা আমার। ও যেমন আছে ওকে তেমনই রেখে দে।
আমি বললাম,
----কিন্তু সেটা কী করে সম্ভব?
বাবা বললেন,
----ওকে ঐ দখিনের কুঠুরিটায় নিয়ে মেরে ঝুলিয়ে রাখ। তাতে ওর পাপ হবে না। আবার ও আমাদের চোখের সামনেই থাকবে।
আমি বললাম,
---কিন্তু বাবা ও যে আমার অনেক আদরের।
---আদরের বলেই তো বাঁচাবি। ওকে মেরেই তবে বাঁচাতে হবে। চুপিচুপি চলে যা ওর ঘরে। তারপর বালিশটা চেপে ধর মুখে। দেখবি, ও একটুও ব্যথা পাবে না। চল, আমি আছি তোর সাথে।
আমি বাবার কথা মত উঠে গেলাম শায়লার ঘরে। দেখি ও অঘোরে ঘুমোচ্ছে। নিষ্পাপ শান্ত চেহারা ওর। চোখ দুটো নিমিলিত। আমার খুব মায়া হলো। তারপর মনে হল, বাবার কথাই ঠিক। এই নিষ্পাপ বোন আমার একদিন পাপের বোঝায় ভারী হয়ে উঠবে। আমি তা কিছুতেই হতে দিতে পারি না। তাড়াতাড়ি পাশে রাখা বালিশটা তুলে প্রচণ্ড শক্তি দিয়ে চেপে ধরলাম ওর মুখে। ও ছটফট করতে করতে এক সময় নিস্তেজ হয়ে এলো।
আমি ওর নিথর দেহখানি কাঁধে তুলে নিলাম। তারপর নিয়ে এলাম এখানে। এখানে এনে ঐ রেলিঙে ঝুলিয়ে রাখলাম ওকে, যাতে ইচ্ছে হলেই ওকে দেখে যেতে পারি। কেউ জানতেও পারলো না আমার বোনটাকে আমি কোথায় লুকিয়ে রেখেছি। সবাই জানলো ও কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। এমন কি চাচাও বুঝতে পারলেন না এই বাড়িতেই আমি লুকিয়ে রেখেছি আমার বোনটাকে।
-----
----তুই যা বলছিস তার সবই আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু এভাবে শুধু অনুমানের উপর নির্ভর করে আমরা ঐ লোকটাকে গ্রেফতার করতে পারি না।
----বললাম তো এটা আমার অনুমান না, আমি নিশ্চিত লোকটা ঐ মেয়েটাকে খুন করবে বা ইতিমধ্যে করেই ফেলেছে। শোন, যদি তোরা এখন কোন অ্যাকশন না নিস, তাহলে একটা নির্দোষ মেয়ের মৃত্যুর জন্য তোরাই দায়ী থাকবি। কারণ আমি তোদেরকে বলার পরেও তোরা কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করিস নি।
পুলিশ স্টেশনে বসে খুব উত্তেজিত কণ্ঠে কথাগুলো বলল রূপম। পুলিশ ইন্সপেক্টর মইনুল চৌধুরী ওর বাল্যবন্ধু। একসাথে স্কুল কলেজে ওরা লেখাপড়া করেছে। রূপমের কথাগুলো মইনুলকে যেন একটু নাড়া দিলো।
----কিন্তু তুই তো বলছিস লোকটা বাড়িতে নেই। কোথাও চলে গেছে। তাহলে ওকে খুঁজে বের করবো কী করে?
---রক্ষক যদি এমন বেকুবের মত কথা বলে তাহলে সাধারণ মানুষের কপালে দুর্ভোগ আছে। ঐ লোকটার প্রাইভেট নাম্বার আমার কাছে আছে। তুই তাড়াতাড়ি ফোনটা ট্র্যাক করার ব্যবস্থা কর। কিন্তু যা করার একটু তাড়াতাড়ি কর প্লীজ।
------
আসলাম খান বলে চলেছেন। আর বীথি অসার দেহ নিয়ে শুনে চলেছে সেই ভয়ঙ্কর লোকটার ভয়ঙ্কর সব কাহিনী। বিস্ময় বা ভয় কোনটাই এখন আর ওর মধ্যে কাজ করছে না। ওর শরীর আর মন দুটোই অসার হয়ে গেছে। সব ধরণের অনুভূতির ক্ষমতা ও হারিয়ে ফেলেছে। মাথাটা একদিকে হেলে পড়েছে। চোখ দুটো স্থির হয়ে আছে। কিন্তু কানদুটো এখনও সজাগ। ও সব শুনতে পাচ্ছে।
----তারপর আমি ভার্সিটিতে ভর্তি হলাম। আমি একটু অমিশুক টাইপ মানুষ। তাই একরকম বন্ধুহীন সময় কাটাতাম। আমারই ক্লাসের একটি মেয়ে হঠাৎ করে আমার পিছু লাগলো। নাম ছিল নীতা। আমি বুঝতে পারতাম ও আমাকে পছন্দ করতে শুরু করেছে। আমারও যে ওকে খারাপ লাগতো তা না। ধীরে ধীরে আমি ওকে প্রশ্রয় দিতে লাগলাম। এক সময় আমাদের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে উঠলো। কিন্তু কেউ সেটা জানতো না।
আমি ওকে মানা করে দিলাম কাউকে আমাদের সম্পর্কের কথা জানাতে। ও আমার কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করতো। পাগলের মত ভালবাসতো আমাকে। এভাবেই অনেকদিন কেটে গেলো। একদিন বাবা এসে বললেন,
----আসলাম, নীতা মেয়েটা বড় ভাল রে।
আমি বললাম,
---হ্যাঁ বাবা, খুব ভাল ও। আমাকে ভীষণ ভালোবাসে ও।
বাবা বললেন,
---এই ভালবাসা জিনিসটা বড় ক্ষণিকের বাবা। কদিন পরই ঐ মেয়ে অন্য কাউকে ভালবাসতে শুরু করবে। এটাই হলো মেয়েলোকের ধর্ম। তুই কি তাই চাস?
আমি বললাম,
----না বাবা এটা আমি কিছুতেই হতে দেবো না। নীতা শুধু আমাকেই ভালবাসবে আর কাউকে না।
তারপর একদিন আমি নীতাকে বললাম,
---নীতা, আমি যা বলবো তা তুমি করতে পারবে?
নীতা বলল,
---অবশ্যই। তুমি বললে নিজের প্রাণটাও আমি তোমাকে দিয়ে দিতে পারবো।
----আমার বড় শখ গভীর রাতে তোমাকে নিয়ে একবার লং ড্রাইভে যাওয়ার। একদম চুপিচুপি। কেউ যাতে না জানতে পারে।
নীতা বলল,
---ধুর, এটা কোন ব্যাপার হল? আমি রাজী। ব্যাপারটা কিন্তু খুব থ্রিলিং টাইপ। ভেবেই আমার খুব মজা লাগছে।
সেদিন রাত বারোটার পর ওর বাড়ির কাছে গাড়ি নিয়ে আমি অপেক্ষা করতে লাগলাম। একসময় ও নেমে এলো চুপিচুপি। ও গাড়িতে উঠে বসতেই আমি ওর মুখ চেপে ধরলাম ক্লোরোফর্ম মাখা রুমাল দিয়ে। যেমনটি তোমাকে চেপে ধরেছিলাম সেভাবে। আমাদের বাড়ির পেছন দিকে একটা গেট আছে। ওদিকেই তোমাকে নিয়ে এসেছিলাম। ওকেও নিয়ে এলাম।
শায়লাকে যেভাবে বালিশ চেপে মেরেছিলাম ঠিক সেভাবে ওকেও মারলাম। অন্য কাউকে ভালবাসার আর ওর উপায় রইল না। তারপর ওকে এখানে এনে ঝুলিয়ে রাখলাম। ও আমার প্রিয় একজন মানুষ ছিল তো। প্রিয় মানুষগুলোকে আমি কখনও চোখের আড়াল হতে দেই না।
-----
----ফোন ট্র্যাক হয়ে গেছে রূপম। কিন্তু তুই তো বললি লোকটা শহরের বাইরে কোথাও গেছে।
---হ্যাঁ। আমি তো তাই জানি।
---কিন্তু ট্র্যাকিং বলছে লোকটা ওর বাড়িতেই কিংবা বাড়ির আশেপাশেই আছে।
---বলিস কী? কী চালাক লোকটা দেখেছিস? সবার চোখে ধোকা দিয়ে নিজের ঘরে বসেই ভয়াবহ সব কাণ্ড করে যাচ্ছে। এখন তোর বিশ্বাস হচ্ছে তো?
----তাই তো মনে হচ্ছে। লোকটার গতিবিধি মোটেই সুবিধার মনে হচ্ছে না।
----তাহলে চল। আর দেরী নয়। এখনই অ্যাটাক করতে হবে ওর বাড়িতে।
----না, না অ্যাটাক করা যাবে না। তাতে হিতে বিপরীত হতে পারে। ধর যদি মেয়েটা এখনও বেঁচে থাকে আর আমরা অ্যাটাক করি লোকটা ঝোঁকের মাথায় মেয়েটাকে মেরে ফেলতে পারে।
---কিন্তু দেরী করলেও তো সেই একই অবস্থা হতে পারে।
----এটুকু রিস্ক নিতেই হবে। ভেবেচিন্তে এগোতে হবে আমাদের। আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপ অত্যন্ত সাবধানতার সাথে গ্রহণ করতে হবে।
----
---তারপর আমার জীবনে এলো রূপা। আমারই একটা অফিসে চাকরি করতো ও। ওকে আমার ভীষণ ভাল লেগে যায়। ওর সাথেও আমি গোপণ সম্পর্ক গড়ে তুলি। কেউ জানতো না সেই সম্পর্কের কথা। তারপর একদিন নীতার মতই রূপাকেও আমি এখানে নিয়ে আসি। কেউ জানতেও পারে না রূপার মৃত্যুর পেছনে রয়েছে আমারই হাত।
এরপর অনেকদিন কেটে যায়। এক সময় আমার খুব একাকী বোধ হতে থাকে। আমি ঠিক করি এবার আমি বিয়ে করবো। আমার সুরভীকে পছন্দ হয়। সুরভীকে আমি বিয়ে করি। সুরভী মনে হয় পৃথিবীর সবচেয়ে ভাল মেয়ে ছিল। ওর মত ভাল মানুষ মনে হয় পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি নেই। ওর মনটা ছিল বিশাল। সব মানুষের জন্যই মমতায় টলমল করতো ওর হৃদয়। তোমাকে আমি সুরভী সম্পর্কে যা বলেছিলাম তার সবটাই মিথ্যা।
অন্য কোন লোকের সাথে ওর কোন সম্পর্কই ছিল না। আর ও আত্মহত্যাও করেনি। ওর সাথে অনেকটা দিন আমি ভালই কাটালাম। যত দিন যেতে লাগলো ওর জন্য আমার মনে ভালবাসা বাড়তেই লাগলো। তারপর এক সময় বাবা আসলেন এবং আমাকে সেই একই কথা বলতে লাগলেন। বললেন সুরভীকে বাঁচা। মেয়েটা বড় ভাল। ওকে ভালই থাকতে দে। তুইই পারিস ওকে রক্ষা করতে পাপ থেকে।
আমার ভয় হতে লাগলো। আমি সুরভীকে কিছুতেই হারাতে চাইতাম না। আমার মনে হলো ও একদিন আমার মায়ের মত আমাকে ছেড়ে চলে যাবে। আমি কিছুতেই তা হতে দিতে পারি না। একদিন ও ওর বাবার বাসায় গেলো। দুইদিন পর রাতেরবেলা আমি ওকে চুপিচুপি ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে বললাম। ও আমার কথা মত বেরিয়ে এলো। আমরা গাড়িতে করে লেকটার পাশে গেলাম।
তারপর ওকে বললাম, চলো লেকের পাড়ে একটু হাঁটাহাঁটি করি। আমরা গাড়ি থেকে নেমে লেকের পাড়ে হাঁটতে লাগলাম। আমি জানতাম সুরভী সাঁতার জানে না। হঠাৎ আমি ধাক্কা মেরে জলে ফেলে দিলাম ওকে। ও হাবুডুবু খেতে খেতে এক সময় জলের নিচে তলিয়ে গেলো। পরের দিন ওর লাশটা ভেসে থাকতে দেখা গেলো লেকের জলে। সবাই ভাবলো ও আত্মহত্যা করেছে। সব ফর্মালিটি সেরে ওকে কবর দেয়া হলো।
কিন্তু আমার মনটা খচখচ করতে লাগলো। সুরভীর জন্য মনটা কেমন করতে লাগলো। মনে হলো ও যেন আমার কাছ থেকে অনেক দূরে চলে গিয়েছে। তাই সেদিন রাতেই আমি ওর কবরে গেলাম। কবর খুঁড়ে ওর লাশটা তুলে নিয়ে এলাম এখানে। কিন্তু এখন আমি আর কাউকে মারতে চাই না বীথি। বিশ্বাস করো। তোমাকে আমি মারবো না। আমি বাবাকে বুঝিয়ে বলেছি। বাবা রাজি হয়েছেন। তুমি এখানেই থাকবে। এই ঘরে। আমার চোখের সামনে আজীবন।
-----
সাদা পোশাকের পুলিশ ঘিরে রেখেছে আসলাম খানের বাড়িটা। রাত প্রায় বারোটা বেজে গেছে। রূপম আর মইনুলও এসেছে। রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছে ওরা আসলাম খানের জন্য। এক সময় না এক সময় লোকটা বেরিয়ে আসবেই। যেহেতু সবাই জানে ওরা বেড়াতে গেছে তাই আসলাম খান রাতের বেলায়ই বের হবে। আর যদি বের নাই হয় তবে আগামীকাল ওর বাড়ি অ্যাটাক করা হবে এমনটাই ঠিক হয়েছে।
রূপম আর মইনুল বাড়ির পেছনের গেট থেকে একটু দূরে অবস্থান নিয়েছে। যেহেতু সামনের দিকে দারোয়ান আছে, আসলাম খানের বাড়ির পেছনের দিকে বের হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। আর এদিকটা অনেক নীরব। জনমানবশূন্য। এদিকেই লোকটা মনে হয় ওর সব কুকর্ম করে। কেউ টেরও পায় না।
রাত সাড়ে বারোটার দিকে আসলাম খান বাড়ি থেকে বের হলো। সাথে সাথে মইনুল কয়েকজন পুলিশকে ইশারা করলো। ইশারা করতেই ওরা চুপি চুপি হেঁটে এসে আসলাম খানকে ধরে ফেলল। ঘটনার আকস্মিকতায় চমকে উঠলেন আসলাম খান। হাতকড়া লাগিয়ে টেনে বাড়ির ভেতরে নিয়ে আসা হলো আসলাম খানকে। সারা বাড়ি খুঁজে কোথাও পাওয়া গেলো না বীথিকে। দখিনের তালাবদ্ধ ঘরের দরজাটার চাবিটা চাইলে আসলাম খান কিছুতেই চাবি দিলেন না। মইনুল বলল,
----এ ঘরেই রেখেছেন আপনার স্ত্রীকে?
আসলাম খান গম্ভীর ভঙ্গিতে চুপ করে রইলেন।
----কী কথা বলছেন না কেন? কী করেছেন উনার সাথে? মেরে ফেলেছেন?
আসলাম খান চুপ।
---চাবি দিন। নয়তো দরজা ভেঙে ফেলা হবে।
আসলাম খান আর কোন উপায় না দেখে অবশেষে চাবিটা দিয়ে দিলেন। তাকে অনেকটা হতাশ আর ক্লান্ত মনে হলো। ওরা ঘরে ঢুকে কোথাও বীথিকে খুঁজে পেলো না। আসলাম খান যেন হাল ছেড়ে দিলেন। কী মনে করে নিজেই আলমারিটা খুলে কুঠুরিতে যাওয়ার পথটা দেখিয়ে দিলেন পুলিশকে। প্রায় অর্ধমৃত অবস্থায় বীথিকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হলো।
----
পরিশেষ
বীথি এক সময় শারীরিকভাবে সুস্থ হয়ে উঠলো। কিন্তু যে মানসিক আঘাতটা ও পেয়েছিল তা কাটিয়ে উঠতে ওর অনেকদিন সময় লেগেছিল। রূপম বীথিকে নিজের বাসায়ই আশ্রয় দিয়েছিল এবং ওর যথাসাধ্য দেখাশোনা করেছিল। এখন বীথি আবার পড়ালেখা শুরু করছে। সুস্থ হওয়ার পর বীথি আর রূপমের বাসায় এভাবে আশ্রিতা হয়ে থাকতে চায়নি। তাই রূপম ওকে একটা হোস্টেলে সিট নিয়ে দিয়েছে। রূপম ওকে কয়েকটা টিউশনিও জোগাড় করে দিয়েছে। সব দুঃস্বপ্ন পাড়ি দিয়ে জীবনের পথে ধীর পায়ে এগিয়ে চলেছে বীথি। আর আসলাম খানকে জেল থেকে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে মানসিক হাসপাতালে। সেখানেই এখন কাটছে তার একাকী জীবন।
সমাপ্ত
©নিভৃতা
(এত ব্যস্ততার মাঝেও যারা কষ্ট করে এত বড় গল্পটা শেষ পর্যন্ত পড়েছেন তাদের সবাইকে অন্তরের অন্তস্থল থেকে অশেষ কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানাই। শুভ কামনা রইল সবার জন্য। ভালো থাকবেন সব সময়।)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।






