সকাল থেকেই আকাশটা ভারী হয়ে আছে। বৃষ্টি হচ্ছে গুঁড়ি গুঁড়ি। রাস্তায় পানি জমতে এখনো শুরু করেনি, তবে জমতে কতক্ষণ! আজ সকালে আজিজ স্যারের খুব গুরুত্বপূর্ণ ক্লাস, মিস করা যাবে না। তাছাড়া ইমন বলেছিল, বিকেলে কোথাও ঘুরতে যাওয়া হবে, এমন কোথাও যেমনটা মিলি ভাবেনি কখনো!
ইমনের সাথে ঘুমের ঘোরে কথা বলতে তার খুব ভালো লাগে। কাল রাতে কতোনা গল্প হয়েছে, দুষ্টুমি, ছেলেমানুষি, মান অভিমান। গল্পের মাঝে হঠাৎ হঠাৎ ও ছুঁয়ে ফেলে মিলিকে। কী অভাবিত শিহরণ! শরীরে কাঁটা দিয়ে ওঠে বরবার। মিলি ভাবছে। আচ্ছা এমন কেন হয়? এরই নামকি ভালোবাসা? কেন ইমনকে ছাড়া আমার এক মুহূর্ত ভালো লাগে না? কেন বারবার ছুটে যেতে ইচ্ছে করে তার কাছে? ভাবতেই মিলি শিহরিত হয়ে ওঠে।
‘‘মিলি, নাশতা খেয়ে নে” মা তাড়া দেন। ‘‘ আসছি মা”।
কার্জন হলের সবুজ ঘাসের উদ্যানে বন্ধুরা সবাই বসে আছে বৃত্ত করে। নরম ঘাসের মাঠের পাশেই সুশোভিত ফুলের বাগান। আকাশটা এখনো মেঘলা। রোদের প্রতাপ নেই। আহ! আজ দিনটা যে কী যে সুন্দর !
“তোর আজ দেরী কেনরে মিলি, এমনটাতো হয় না?” নাফিসার জিজ্ঞাসা।
“ এইতো , মানে বৃষ্টি হচ্ছিল তো, তাছাড়া মা একটু অসুস্থ, তাই। ”
“ তাহলে তুই কী যাচ্ছিস না আজ আমাদের সাথে?” প্রশ্নটা মিলনের, কিন্তু উদ্বিগ্ন শ্রোতাটি হচ্ছে ইমন। “কোথায় যাবি তোরা, বাসায় তো বলে আসিনি” জানায় মিলি।
“পদ্মার ধু ধু বালুচরে। সাদা বকের ঝাঁকের মাঝে সারি সারি কাশবন। নির্জন বালুচর। আমার তো ভাবতেই খুব ভালো লাগছে।” ইমন উত্তর দিল। বললো “এছাড়া শরতের এ সময়টা পদ্মার রূপ ঠিক দেখার মতো। যারা যায়নি, তাদের কখনো তা বোঝার নয়।”
মিলির মনে শিহরণ জাগে। “হ্যাঁ, যাবতো বটেই। তা কোথায় সেটা?” “মুন্সীগঞ্জে। দুপুরে ভাজা ইলিশ দিয়ে হবে মধ্যাহ্নভোজন” ফটিক বলে বসে। সবাই খুব উল্লসিত। হৈ হৈ কান্ড, রৈ রৈ ব্যাপার। আহা! জীবনটা যদি শুধু এমনই থাকতো!! বন্ধুদের সাথে আড্ডা, ঘোরাঘুরি, দলবেঁধে সিনেমা দেখা। আর ভালোবাসার মানুষটির হাত ধরে সারাদিন বৃষ্টিতে ভেজা। তার চোখে চোখ রেখে না বলা অনেক কথা বলে যাওয়া। মিলি আবার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল ছাত্র ছাত্রী ভাড়া করা একটি গাড়িতে করে হাজির হয় পদ্মার তীরে। বাসযাত্রাটা ছিল মনোরম। পিকনিকের মেজাজে গান গাইতে গাইতে তারা হাজির হয় নদীর তীরে। নদীর ঢেউ বেশ বাড়ন্ত। আশেপাশের বাড়িঘর, দোকানপাট ডুবে গেছে অনেকখানি। তবে এরই মাঝে খেলে বেড়াচ্ছে ছোট শিশুরা। দস্যিপনার চূড়ান্ত করছে। জলে ঝাঁপাচ্ছে, ডুব দিচ্ছে, সাতার কাটছে, যেন এর মাঝে খুঁজে নিচ্ছে জীবনের না পাওয়া সুখটুকু।
নদীতীরে একটা বড়সড় কাপড় বিছিয়ে ইলিশ ভাজা সহ সবাই দুপুরের খাবার সেরে নিল। বিকেলের আলো যখন নেমে আসছে এসময় একটা নৌকা ভাড়া করে সবাই বেরুল নির্জন, সবুজ একটি চরের সন্ধানে। ছপাৎ সরে জলের ধারা ছিটকে পড়ছে নৌকার গায়ে। হাত বাড়িয়ে মুঠো ভরে পদ্মার জল নিয়ে মিলিকে ভিজিয়ে দিল ইমন। মিলি একটু শিউরে ওঠে। “যাও সরো” ইমনের মুঠো খুলে নিতে প্রাণপণ চেষ্টা করে মিলি। কিন্তু ইমনতো ছেড়ে দেবার পাত্র নয়। দুহাতে মিলির হাত চেপে ধরে। টাল সামলাতে না পেরে মিলি ইমনের গায়ের ওপর এসে পড়ে। ইমন মিলির দুকাঁধ টেনে ধরে । সারা শরীর থরথর করে কাঁপতে থাকে মিলির। ইমন সে কাঁপুনির রোমাঞ্চ অনুভব করে সহসাই।
দুরন্ত পদ্মার মাঝে জেগে ওঠা চরটি বেশ বড়সড়ই। জনমনিস্যি নেই। চরটির ঠিক মাঝ বরাবর চিরে চলে গেছে ছোট একটি জলের ধারা, খালের মতো। এর পাশেই ঘন সাদা কাশবন। আহা কী আপরূপ!! ছেলেমেয়েরা যে যার মতো হুল্লোড়ে মেতে ওঠে। “আহা কী আনন্দ, আকাশে বাতাসে।” মিলি এগিয়ে যায় একাকী। এতো সুন্দর প্রকৃতির মাঝে নির্জনতার প্রশান্তি অনন্য । কাশবনের ফাঁকে ফাঁকে পাখির ওড়াওড়ি। কিচিরমিচির শব্দে মোহনীয় চারপাশ। সবাইকে ছাড়িয়ে মিলি এগিয়ে যায় অনেকদূর।
“শুনছো“। মিলি ভয়ে হঠাৎ কেঁপে ওঠে। পাশে ইমনকে দেখে সম্বিত ফিরে পায়। “ একা যে” ইমন শুধায়। “ একা কেন, এই যে তুমি আছো”। ইমন হেসে ফেলে। হাসতেই থাকে। মিলি অপরূপ দৃষ্টিতে তাকে দেখতে থাকে। সুদর্শন, লম্বাটে, কোঁকড়ানো চুলের যুবকটিকে তার খুব আপন মনে হয়। সব জড়তা ভুলে তাকে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করে মিলির। ওর বুকের মাঝে নিজেকে সঁপে দিতে ইচ্ছে করে। কিন্তু , ইমনকী তাকে ঠিক এভাবেই ভালোবাসে, সে যেমন বাসে? মিলি দোটানায় দোলে।
ইমন হাসি থামিয়ে মিলিকে চেয়ে চেয়ে দেখে। নৈঃশব্দের চরাঞ্চলে, সাদা কাশবনের ফাঁকে এলোচুলে পথ হারানো প্রিয়তম নারীটিকে সে অপার বিস্ময়ে দেখতে থাকে। এভাবে কখনোতো মিলিকে সে দেখেনি। তারুন্যের অনবদ্য রূপ ছাড়িয়ে মিলি যেন রূপকথায় রাজকন্যার রূপধরে তার কাছে ধরা দেয়। তার সচকিত চাহনি ইমনের মনকে নাড়া দেয় ভীষনভাবে । মিলিকে তার কাছে পেতে ইচ্ছে করে খুব।
“ খুব সুন্দর লাগছে তোমাকে। মনে হচ্ছে যেন রূপকথার ডানাকাটা সাদা পরী। ” ইমনের প্রশংসা শুনে মিলি লজ্জা পায়। হাত বাড়িয়ে মিলির হাতটা কাছে টেনে নেয় ইমন। মিলি হাত ছাড়িয়ে নেয় না। দুজনে হাত ধরে হাঁটে। কাশবনের ফাঁকে ছোট খালের পাড়ে এসে বসে দুজনে। মিলির দুচোখে চোখ রাখে ইমন। ঠিক জানে না, মনের মাঝে কেন এতো আলোড়ন চলছে।
“ কিছু বলবে?” মিলি বলে ওঠে। “ হুম। মানে, মনে হচ্ছে এ যেন স্বপ্ন।” ইমন উত্তর দেয়। “ এই যে তুমি আমি দুজনে, এই নির্জনে। এ কাশবনের মাঝে, পদ্মার চরের এ অনন্য প্রকৃতির মাঝে। এ কী কখনো সত্যি হতে পারে?” ইমন মিলিকে জড়িয়ে ধরে। মিলি দ্বিধা বিসর্জন দিয়ে নিজেকে সঁপে দেয়। কাছে পিঠে আর কেউ নেই। শুধু ওরা দুজন।
“মিলি জানো, তোমার কথা যখন ভাবি, যখন তোমাকে দেখি, তোমাকে যখন স্পর্শ করি তখন.....তখন অসম্ভব ভালো লাগে। এ অনুভূতি ঠিক বলার মতো নয়। মনে হয় সারাক্ষণ তোমাকে ঘিরে থাকি। ভয় হয়, তোমাকে কখন যেন হারিয়ে ফেলি.....। আমাকে ছেড়ে দূরে কোথাও যাবে নাতো মিলি, বলো।” “কক্ষনো নয়, ইমন । বেঁচে থাকতে নয়।” মিলি জবাব দেয়। মিলির কাঁধ ধরে আরো কাছে টানে ইমন। চুলের খোঁপা ধরে প্রিয়তম মুখখানি এগিয়ে আনে তার কাছে। মিলি আবেগে চোখ বোঁজে। মিলির অধরে ইমন এঁকে দেয় ভালোবাসার চিত্রকলা। দুজনের অধরোষ্ঠ গভীর থেকে গভীরতর হয়ে মিশে যায়। মিলির চোখে জল আসে। সুখের অশ্রু। “প্রিয়তমা মিলি, অনেক ভালোবাসি তোমায়” অস্ফুট স্বরে বলে ওঠে ইমন। ওর ভালোবাসার পংক্তিমালা মিলির হৃদয়ে ঢেউতোলে। “তুমি আমারই ইমন, তুমি আমার ভালোবাসা। আমার জীবনের আলো।” ইমনের প্রবল আলিঙ্গনের মাঝে গলে গলে যেতে থাকে মিলির ছোট্ট দেহখানি।
গোধুলীর আলোয় সাদা সাদা বকের সারি উড়ে যায় দিনান্তের পথ ধরে। পদ্মার নির্জন চরাঞ্চলে হুটোপুটি খায় বুনোহাঁস। কোথায় যেন বেজে চলে সঙ্গীতের দ্যোতনাময় অপূর্ব সুর। মিলি আর ইমন দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরে রাখে দীর্ঘক্ষণ। আবেগের বাঁধভেঙে পড়তে চায় মুহুর্মুহু।ইমনের প্রবল আলিঙ্গনের মাঝে গলে গলে যেতে থাকে মিলি।
”এই মিলি, ই..ম..ন...” মিলন, নাফিসার ডাক ভেসে আসে।
”চলো, ওঠা যাক” ইমন তাড়া দেয়। “উঁহু... এখনি নয়। আরো কিছুক্ষণ।” মিলির ইচ্ছে করে না এ মুহুর্তটা এখনি হারিয়ে যাক। রুদ্ধশ্বাসে বলে ওঠে,
“চলোনা ঘর বাঁধি এই নির্ঝন দ্বীপে। তুমি হবে আমার প্রেমিক কিষাণ আর আমি হবো কিষাণী। মাঠ ভরে ফসল ফলাবে তুমি, আর আমি চড়ুইভাতির রান্নাশেষে তোমাকে মুখে তুলে খাইয়ে দেব নিজ হাতে। আমাদের রাত কাটবে স্বপ্নডানায় গল্প মেলে, ভোর হবে পাখির ডাকে। নদীর ছলাৎ ছলাৎ কলতানে প্রতিটি রাতই হবে আমাদের নতুনতর বাসর। বৃষ্টির রাতে টোনাটুনির গল্প শোনাবে তুমি, শীতের রাতে আদরে আদরে ঢেলে দেবে সকল উষ্ণতা। শুধু তুমি আর আমি। এখানে , এ নির্জন চরে, আর কেউ নয়।” মিলি একটানা বলে যায়। ইমনের খুব ভালো লাগে কথাগুলো। শুধু শুনতেই ইচ্ছে করে।
“এই যে,তোরা এখানে। ফিরতে হবে না?” নাফিসা এসে পড়ে হঠাৎ। তাইতো। বেলা যে বয়ে এলো। ইমনের হাত ধরে উঠে আসে মিলি।
গোধুলীর রাঙা আলোয় পদ্মার মায়াময় জলকেটে এগিয়ে চলে ওদের ছোট্ট নৌকা খানি। পড়ে থাকে পেছনে, একটুখানি স্বপ্ন, একটুখানি কাছে আসার রোমাঞ্চ। হাতে রেখে হাত, দুজনে দুজনার । ফিরে চলে নীড়ে ওরা , পড়ে থাকে পেছনে, শুধু কিছু মুহুর্ত। ভালোবাসার, কাছে পাবার।
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই অক্টোবর, ২০১৫ রাত ১২:২৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




