
গত তিন দশক ধরে আমি আমার মাকে দেখছি প্রতিদিন ফজরের নামাজের ওয়াক্তে উঠতে । নামাজ শেষে তার তিন কন্যা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তার দায়িত্ব ছিল মেয়েদের ঘুম ভাঙিয়ে তাদের হাল্কা চা-নাস্তা দিয়ে পড়াশোনায় মনোনিবেশ করানো । তারপর সারাদিন ধরে মেয়েদের স্কুল -কলেজে পাঠানো , তাদের প্রাইভেট পড়াশোনা সংক্রান্ত তদারকি , তাদের জন্য মজার মজার খাবার বানানো, বাসায় পড়াশোনা করানো সহ নানাবিধ কাজ সম্পন্ন করা ।আমাদের কখনও মনে হয়নি তারও বিশ্রাম, আরাম- আয়েশের প্রয়োজন আছে!
সেই সত্তরের দশকে গ্রামের এক মৌলানা পরিবারের প্রতিকূল পরিবেশে তার বেড়ে ওঠা হলেও পড়াশুনার প্রতি ছিল তার প্রচণ্ড আগ্রহ । নানা বাঁধা - বিপত্তি পেরিয়ে তিনি পৌঁছেছিলেন কলেজ পর্যন্ত ! তারপর বিয়ে সন্তান-সন্তানাদি ।নিজে কিছু করবেন বলে যোগদান করেছিলেন একটি স্কুলেও ।কিন্তু স্বামীর বদলীর চাকরি , সন্তানদের দেখাশোনা এসব কারণে সেই চাকরি শেষপর্যন্ত আর ধরে রাখতে পারেননি ।সম্ভবতঃ সেকারণেই তার স্বপ্ন ছিল - তিনি তার তিনকন্যাকে সুশিক্ষিত করে মানুষের মত মানুষ করে গড়ে তুলবেন । তিনি কতটা সফল হয়েছেন জানিনা, কিন্তু আমার মনেহয় শুধুমাত্র তার নিরলস চেষ্টা আর সৃষ্টিকর্তার নিকট প্রতিনিয়ত প্রার্থনার বলেই আজ একজন একটি স্কুলের প্রধান, একজন সামরিক কর্মকর্তা আর একজন ডাক্তারে পরিণত হয়েছেন ।
অনেকেই আমার মাকে বলেন রত্নগর্ভা । আসলে কি তাই ? আমার মতে তিনি নিজেই একজন রত্ন ! আমি আমার মায়ের মত খুব কম মানুষকে দেখেছি এত গুণে গুণান্বিত হতে - হস্তশিল্পের যত ধারা - কাপড় কাটা ,সেলাই করা , উলবোনা, বিভিন্ন ধরনের সূতার কাজ , শো পিস বানানো , মোড়া - চাটাই বানানোসহ এমন কোন কাজ নেই যা তিনি জানেন না ! আর তার বানানো আচার - সুস্বাদু রান্না তো আছেই ।আমরা তিনবোন তার একাংশও পাইনি । তাই তিনি রত্নগর্ভা নন , তিনি নিজেই একজন রত্ন!
এই যে একজন মা যে শুধু নিজের সন্তানদের জন্য নিজের যাবতীয় স্বাদ - আহ্লাদ বাদ দিয়ে তার তিন কন্যাকে আজ একটা সম্মানজনক অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত করেছেন - এখন কি তার অখণ্ড অবসর ? না, দায়িত্ববোধ তাকে এখনও মুক্তি দেয়নি । এখনো তিনি সেই ভোরেই ওঠেন ফজরের নামাজের পর বৃদ্ধ স্বামীকে চা-নাস্তা দিয়ে তার দিন শুরু হয় - বড় মেয়ে বিয়ের পর চাকরিসূত্রে তার কাছেই থাকতেন - বড় মেয়ের দেখাশোনা , তার বাচ্চার যত্নআত্তি এসব করতে করতে যখন বড় মেয়ে আলাদা বাসা নিল - তার কিছুদিন পরেই ছোট মেয়ে তার মাতৃত্বকালীন ছুটিতে মায়ের কাছে চলে এলেন। এখন চলছে ছোট মেয়ের যত্নআত্তি - ছোট্ট নাতির যত্নআত্তি ।
আমার মনেহয় এ গল্প শুধু আমার মায়ের নয় , এ গল্প পৃথিবীর সফল - অসফল সকল সন্তানের মায়েদের ।আজ নারী দিবসে সেইসব অসামান্য নারীদের জানাই সালাম!
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই মার্চ, ২০১৫ বিকাল ৩:২৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।





