
এখন রাতের ঘুমানোর আগের সময়টুকু আমার জীবনের সবচেয়ে মধুর সময় ! এ সময় আমার ছোট্ট বাবাই সোনা আমার গলা জড়িয়ে কোল ঘেঁষে শুয়ে রাজ্যের গল্প টুক টুক করে করতে থাকে তারপর কখনও ও আগে বা আমি ঘুমিয়ে পড়ি ।বেশির ভাগ গল্পই প্রশ্নোত্তর টাইপ । আজকের বিষয় - মা তুমি বুড়ো হলে তোমাকে কে দেখে রাখবে ? আমি বললাম , বাবা তুমি বল - উত্তর এল আমি তোমাকে দেখে রাখব মা ( হয়ত কখনও বলেছিলাম সেটাই সে মনে রেখেছে !) ।তারপরের প্রশ্ন - বাবা বুড়ো হলে ? আমি বললাম , তোমাকেই দেখে রাখতে হবে সোনা । আমাকে সবাইকে দেখে রাখতে হবে! জী বাবা তোমাকেই সবাইকে দেখে রাখতে হবে । কিছুক্ষণ পর - মা , আমি বুড়ো হলে কে দেখে রাখবে ?( বেশ একটা দুঃখ দুঃখ ভাব নিয়ে ) আমার বুকের কাছে কেমন একটা দলা পাকিয়ে ওঠে , কিছুক্ষণ সময় নিয়ে উত্তর দিলাম -তোমার ছেলেমেয়েরা দেখে রাখবে বাবা ! (বলতে পারলে খুব ভাল লাগত , আমি তোমাকে দেখে রাখব বাবা । ) তারপর পর্ব দীর্ঘায়িত হতে থাকে ......
স্নেহ নাকি নিম্নগামী ! তা যে কতটা সত্যি , আমার ছেলেকে দেখে বুঝতে পারি ।না হলে ‘আমাকে কে দেখে রাখবে মা ’কথাটি শুনে কেন বুকের মধ্যে এত হাহাকার জন্মাবে ? আমার বাবার বয়স সত্তরের কাছাকাছি , মা পঁয়ষট্রিই হবে। এ বয়সেও তারা সংসারের সমস্ত দায়িত্ব পালন করে চলেছে । নিজের চাকরি , সাংসারিক দায়িত্ব এসব পালন করে পারছিনা তাদের প্রাপ্য সময়টুকু দিতে । তারাও নিজেদের সংসার ছেড়ে এসে থাকতে পারছেন না আমার কাছে । ভাবি , দু’বোন তো আছে তাদের পাশে তারা নিশ্চয়ই ঠিকঠাক দেখে রাখবে ।
আজকাল একটি বিষয় বেশ ভাবায় , এইযে আমার মত শিক্ষিত নারী (?) যারা পড়াশুনা করে চাকরি করছে , নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করছে , নারী অধিকার / নারী স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলছে - আমরা আসলে কতটুকু সফল হয়েছি ? আমি আমার জীবন এবং চারপাশ থেকে যা দেখেছি তা হচ্ছে , আমার জন্মের পর থেকে বিয়ের আগ পর্যন্ত আমার মা যেমন আমার সব দায়িত্ব পালন করতেন , বিয়ের পরও সন্তান জন্মাবার পর যেহেতু আমি চাকরি করি আমার বাচ্চাদের , সংসার আগলে রাখার দায়ও যেন তারই ।এমনি ভাবেই হ্য় মা , নয় শাশুড়ি মা অথবা বাসার সাহায্যকারী মানুষটির বিনিময়ে আমি আমার চাকরির সুযোগটুকু পাচ্ছি অথবা বলা যায় আরেকটা নারীর অধিকার লঙ্ঘন করে !
এদেশে এখনও আমরা নারীদের কাজ করার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারিনি । সরকারিভাবে মাতৃত্বকালীন ছুটি ছয় মাস হলেও বেসরকারি অনেক ক্ষেত্রেই এখনও ০৩ মাস অথবা নেই , অনেককে চাকরিও ছেড়ে দিতে হয় । সরকারি / বেসরকারি ভাবে ডে কেয়ার সহায়তাও তেমন নেই , নেই পার্ট টাইম কাজের সুযোগ অথবা পিতৃত্বকালীন ছুটি ! যাতে বাবা - মা সমানভাবে শিশু সন্তানটির যত্ন নিতে পারে । তাই স্বামী -স্ত্রী দুজনই যখন চাকুরীজীবী হন তখন বাচ্চার দেখা - শোনার ভার দাদা-দাদি , নানা -নানি অথবা বাসার সাহায্যকারী মানুষটির উপরই বর্তায় - তারপরও অনিশ্চয়তা থেকেই যায় । যেখানে দাদা-দাদি বা নানা - নানির তাদের নাতি- নাতনির সঙ্গে সুন্দর সময় কাটানোর কথা সেখানে তা তাদের উপর অর্পিত হচ্ছে দায়িত্ব হিসেবে !
জীবনের শেষ সময়টুকু সবাই চায় সুন্দরভাবে পার করতে এবং তাই হওয়া উচিত । বাবা - মার জন্য কতটুকু করতে পেরেছি / পারব জানিনা , নিজের জন্য যা ভাবি তা হচ্ছে ,যা দিনকাল পড়েছে , আজ থেকে ৩০/৩৫ বছর পর কি হবে কে জানে ? শেষ আশ্রয় হয়তো বৃদ্ধাশ্রমই হবে ! কিন্তু সাড়ে তিন বছর বয়সী বাচ্চার মুখে যখন শুনি , আমি বুড়ো হলে কে দেখে রাখবে মা ? - তখন বুকের মধ্যে কেমন তোলপাড় হয় । আহারে আমার বুড়ো খোকাটাকে যদি এভাবেই বুকে আগলে পারতাম । জীবন এত ছোট কেনে !
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই অক্টোবর, ২০১৫ সকাল ১০:৫৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



