somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ভেঙে ভেঙে গড়া ভালোবাসা-২

০৭ ই এপ্রিল, ২০১৫ রাত ১০:৩৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

২) একুশ বছরের গৌরী। বিয়ে হয়েছে চার বছরের কিছু বেশী। বাচ্চাটা হবার পর থেকেই অসুস্থ।

প্রথমে জ্বর, তারপর থেকে মাথা খারাপ। এক পর্যায়ে উন্মাদ, পাগল। কেউ বলে গৌরীকে জ্বীনে ধরেছে, কেউ বলে পেত্নী। আবার কেউ কেউ অন্যরকম মন্তব্যও করেছে।

সেয়ানা মেয়ে। বর্ষার নদীর মতোই ওর শরীরের সমস্ত বাঁক ভরাট হ’তে হ’তে একদিন ফলবতী গাছের মতো সবার চোখের সামনেই ন্যূয়ে পড়লো। তারপর আবার শরৎ- হেমন্ত এলো ওর শরীরে। এভাবে রোদের রঙ বদলের মতো গৌরীও অনেকখানি বদলেছে। ওর শরীরে এখন পানসে রঙ-এর দিন। ওকে ঘিরে হাজারো পুরুষের কৌতূহলী দৃষ্টি একসময় মাছির মতো ভিন ভিন করতো। হঠাৎ ওর পাগল হবার খবরে তা আবার প্রাণ পেলো। সারা শহর জুড়ে একটা চঞ্চলতা। দলে দলে ভীড় জমতে থাকে উৎসাহী মানুষের। সুযোগ বুঝে কেউ কেউ ‘দাওয়াই’ দেবার অজুহাতে গৌরীকে হাতড়ে নিতে চেয়েছিল। খবর পেয়ে কনট্রাকটর সতু ওর দেখাশোনা চিকিৎসা ও পথ্যের ভার নেয়।

বাবার বাড়িতেই গৌরীর চিকিৎসা চলছিল। নুন আনতে যাদের পান্তা ফুরোয় তাদের সংসারে ওর চিকিৎসা ফকির-ফকরদের টোটকা-ফোটকা ছাড়া এদেশে আর কি-ই বা আশা করা যায়। তবুও একবার ডাক্তার দেখানো হয়েছিল বৈ কি!

এদিকে অমিত- গৌরীর স্বামী বেচারা শ্বাশুড়ীর প্রতি অতিশয় বিনয়ী, শ্রদ্ধাশীল ও আস্থাবান একজন অসচ্ছ্বল মানুষ। কোন রকম ঝক্কি ঝামেলার ধার ধারে না। হাই স্কুলের শিক্ষক। মাঝে মধ্যে দু’চারটা কবিতা লিখে অবসর সময় কাটায়। পারিবারিক অসুখ-বিসুখে সে আজকাল ভগবানের উপর বেশী নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। যদিও এমনটি ছিল না কোনদিন। আজন্ম চোখা ছেলেটির এই পরিবর্তন অনেকের কাছেই কষ্টকর। এদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার শিকার কত যুবক যে এভাবে বোথা হয়ে গ্রাম-গ্রামান্তরে সমাজের ক্ষত আগলে দিনাতিপাত করছে!

অমিতের মতে এদেশে কোনও ভালো চিকিৎসক নেই। কারণ, জ্বর সর্দি, আমাশয় বাদে জটিল কোন রোগ হলেই অর্থশালী মানুষ ভারত-বিদেশ করে চিকিৎসা করিয়ে ফেরে। দেশীয় চিকিৎসায় এ পরীক্ষা সে পরীক্ষা করে একদিকে টাকার শ্রাদ্ধ, অন্যদিকে কালক্ষেপণ। সবকিছু পরীক্ষার পর রোগীর অবস্থার যখন পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় না, তখন চিকিৎসক বলবেন এদেশে এ রোগের ভালো চিকিৎসা নেই। একারণে একজন কবিতালেখক তদুপরি একজন স্কুল শিক্ষক তার অর্থের জোড়াতালি দেয়া সংসারের আঁচালে গৌরীকে ঢাকতে সাহস পায় না। যদিও গৌরী তার প্রেমিকা-স্ত্রী। তবু শ্বাশুড়ীর অজ্ঞতার পাশাপাশি নারীর টানের যোগসূত্রটিকে অমিত বেশী প্রাধান্য দিচ্ছে। মাঝে মাঝে ওর মাথাও বিগড়ে যেতে চায়, তবুও নিজেকে স্বাভাবিক রাখবার চেষ্টা ওর সবসময় থাকে। যখন খুব খারাপ বোধ হয়, তখন ঘুষি পাকিয়ে বারান্দার থামে অথবা নিজের হাতেই আঘাত করে ভাগ্যের চাকাটাকে বদলাতে চায়।

সতুর প্রতি অমিতের শ্রদ্ধা আপন বড়দার মতো। ও এ বাড়িতে আসার পর থেকে অমিত নিজেকে কিছুটা হালকা বোধ করছে।

সতু এসে প্রথমেই বিগড়ে যায়। গ্রামের মানুষ ভেঙে পড়েছে বাড়িতে। রান্নাঘরের কোণে ঝি-বৌরা ঘোমটা মাথায় আঁচল মুখে চেপে দাঁড়িয়ে। কী বিতিকিচ্ছিরি কাণ্ড!
উঠোনের মধ্যখানে গৌরী। ওর অর্ধ-উলঙ্গ শরীরে মনে হচ্ছিল বিছুটির জ্বালা। ক্রোধে সে দিশেহারা। লাল চুনির মতো রক্তবর্ণ চোখ। মাটিতে পা আছড়ায়, হাত চাপড়ায়, ইনিয়ে-বিনিয়ে কাঁদে। মাটির উপর তর্জনী দিয়ে দাগ কাটে, মুখে যন্ত্রণা, বুকে পিপাসা, পিপাসার দহনে কুঁচকে গেছে ত্বক। এক এক সময় নিজের মুখটাই খামচে দেয়। আঁকাবাঁকা রেখা ফুটে ওঠে মুখে। চিনচিন জ্বালা শুরু হয়। মুখের ফর্সা রং-এর মাঝে নীল শিরা দেখা দেয়। দেখা দেয় বিন্দু বিন্দু ঘাম।

হঠাৎ ও স্খলিত কন্ঠে বলে ওঠে, ‘যাহ্‌!’ তারপর এক দৌড়ে মানুষের ভীড় ঠেলে ছুটে যায় বাড়ির সংলগ্ন এঁদো পুকুরে।

এ দৃশ্য দেখে সতু প্রথমে অবাক, হতবাক। এক সময় নিজেই গৌরীর কাণ্ডকারখানা অন্যদের সাথে দু’চোখ ভরে উপভোগ করতে থাকে।

পুকুরের চারদিকে হর্ষ-উৎফুল্ল জনতা।

গৌরী জলে ঝাঁপ দেয়। এক ডুবে মাঝপুকুরে গিয়ে মাথা তোলে, আবার ডোবে। আবার ওঠে। মাঝ পুকুরে গভীর জলে ডুবে থেকে শীতল হতে চায়।

এভাবে কেটে যায় এক ঘণ্টার মতো। তারপর হরিদাসীর অনুরোধে সতু কাপড় বদলে পুকুরে নামে। মাঝ পুকুর থেকে ওকে টেনে এনে পাড়ে তুলতেই এক ঝাটকায় সতুর হাত থেকে নিজেকে মুক্ত করে আবারও জলে আছড়ে পড়ে গৌরী। এভাবে আরও কিছুটা সময় অতিবাহিত হয়। তারপর অমিতের সহায়তায় সতু একসময় ওকে পাড়ে তোলে। টেনে-হিচড়ে ঘরের বারান্দায় আনা হলো। উবু হয়ে, হাটু পর্যন্ত কাপড় তুলে পায়ের উপর চিপতেই ওর ভরাট বুক বেরিয়ে পড়ে। দর্শনার্থীদের মধ্যে চঞ্চলতা বাড়ে। হয়তো এতে গৌরীর মনে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হলো। সে পরণের শুভ্র শাড়ীর আঁচল ফেলে সামনের দিকে এগোয়। পট পট করে লাল ব্লাউজের বোতামগুলো খুলতে খুলতে বলে- ‘আয় জাউরার ছাওয়াল জাউরারা, আয় আয়’। গৌরী হাঁপাতে হাঁপাতে উঠোনে নেমে পড়ে। দর্শনার্থীরা ভয়ে ছোটাছুটি করতে থাকে।

সতু হতবম্ব হয়ে যায়। পরক্ষণেই সম্বিত ফিরে পায়। দ্রুত পায়ে এগোয়। গৌরীর গতি রোধ করে। দু’হাতে ওকে জড়িয়ে ধরে ভাঙা গলায় অনুযোগের সুরে বলে, ‘ছিঃ ছিঃ, একি হচ্ছে?’ সতু গৌরীকে ঘরের ভেতর নিয়ে যায়।

মিনিট দু’য়েক পর ঘর থেকে বেরিয়ে উৎসুক জনতার উদ্দেশ্যে কিছু বলতে গিয়েও থেমে যায়। ওর বুকের ভেতর একাত্তরের ভয়ত্রাস, পোড়াবাড়ি, মরা মানুষের গন্ধ ঘুরপাক খায়। ভয় পাহারা দেয় ওকে। একবার মনে হয় চিৎকার করে বলে, ‘দাঁড়িয়ে কি দেখছেন আপনারা?? আমাদের কি মান-সম্মান নেই?’ কিন্তু বলতে পারে না। অব্যক্ত ক্রোধ সংবরণ করতে কষ্ট হয় ওর। কামড়ে খাবলে নিতে চায় মাংসের দলা। অথচ কিছুই হয় না। চোখে শুধু জল চিক চিক করে সমুদ্রতটের বালুর মতো। গৌরীর প্রতি ভালোবাসার অদৃশ্য আঁচলে চোখ মোছে সতু। বুক ঠাসা কষ্টগুলো একপাশে সরিয়ে ফিকে হলুদ হাসি হেসে শুধু বলে, ‘আপনারা এখন যান। সবারই তো ঘরে মা-বোন আছে?’

উঠোনের মানুষ একে একে সরে পড়ে। অমিত এসে সতুর গা ঘেঁষে দাঁড়ায়। সতু অমিতের চোখে চোখ রেখে আশ্চর্য বন্ধুত্বপূর্ণ হাসি হেসে ওকে দুশ্চিন্তামুক্ত হবার অভয় দেয়। অমিত মাথা নত করে। সতু ওর পিঠে হাত রেখে বাড়ির ভেতর চলে যায়। অমিত একা একা উঠোন পাড়ি দেয়। বাড়ির পালানে এসে সবুজ ঘাসের উপর বসে পড়ে গৌরীর কথা ভেবে। যে গৌরী আজ অমিতের কাছে একই সঙ্গে কত কাছের, আবার কত দূরের।

/চলবে...

উপন্যাসঃ ভেঙে ভেঙে গড়া ভালোবাসা
লেখকঃ কবি বাবু ফরিদী

১ম অংশ:
www.somewhereinblog.net/blog/nipun_kothon/30028451
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ড.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:৪৮

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি....

বন্দর শুধু রাজস্ব আয়ের প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামহোয়্যারইন ব্লগের সেরা ব্লগার

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১১:০৮



আমাদের দেশে যে কোনো ক্রিটিক্যাল সময়ে লক্ষ্য করা যায় কোনো না কোনো পণ্যের অভাব লেগে গিয়েছে। কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ, ভোজ্য তৈল এমনকি রিলিফ গায়েব হয়ে যায়। বন্যায় আক্রান্ত বন্যায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

তৌহিদি জনতা কবে দেশ রক্ষায় আন্দোলনে নামবে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:০১


আলহামদুলিল্লাহ। তৌহিদি জনতার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সুনামগঞ্জে মেয়েদের একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ বন্ধ করা গেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে মেয়েদের খেলাধুলা নিষিদ্ধ এবং অশ্লীল কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়। সুনামগঞ্জের মাটিতে এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কি আসলেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

লিখেছেন অন্তর্জাল পরিব্রাজক, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৮:৪৪



“রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন “, “মূর্খের দেশে আবার কীসের বিশ্ববিদ্যালয়” – এসব প্রচারণা আমাদের দেশে অনেকদিন ধরেই হয়ে আসছে। বিশেষ করে ফেসবুকে আকছারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১৯৭১ঃ নদী-নালায় ভেসে থাকা স্বদেশের কান্নাঃ শহীদদের প্রতি নিবেদিত একটি কাব্যগাথা জাতির রক্ত, অশ্রু ও স্বাধীনতার অমর ইতিহাস

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:০৫


পঁচিশে মার্চ ১৯৭১
রাত্রি তখন গভীর, নগরীর বাতিগুলো
যেন অনাগত বিপদের সামনে অসহায়
ঢাকার আকাশে হঠাৎ গর্জে উঠল কামান
ট্যাংকের চাকার নিচে কেঁপে উঠল রাজপথ
গুলি ছুটে গেল মানুষের ঘুমন্ত জানালায়
আগুন ছড়িয়ে পড়ল... ...বাকিটুকু পড়ুন

×