somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ভেঙে ভেঙে গড়া ভালোবাসা: ৬

১৭ ই এপ্রিল, ২০১৫ রাত ১২:৩৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

(৬)
সতু ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ে। দ্রুত এগিয়ে গিয়ে হেরিকেনটা উস্কে দেয়। গৌরীর দিকে তাকায়। লক্ষ্য করে ওর মুখের দিকে, যেখানে শ্মশানের ভয় জমেছিল সেখানে এখন সাহসের ক্ষীণ একটা আলো প্রজ্জলিত হচ্ছে।

ওঝা সাগরেদকে চলে যাবার ঈশারা করে। সাগরেদ সরে যায় লোকের ভিড়ে। দরজা বন্ধ হবার শব্দ তার পিঠের ওপর আছড়ে পড়ে।

ঘরের ভেতর পিন পতন নিস্তব্ধতা। মাঝে মধ্যে দু’একটা ইঁদুর ঘরের এপাশ-ওপাশ করছে। আবার খটাখট শব্দ হচ্ছে কখনও। যদিও বাইরে মানুষের ভিড়, শলাপরামর্শ কথোপকথনের শব্দ শুনতে শুনতে সতু ঘরে ঢুকেছে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে এ ঘরের ক’টি নিঃশব্দ মানুষ ছাড়া ধারে-কাছে কোথাও কোন জনমানবের সাড়া নেই। বাইরের কোন শব্দই এখন আর সতুর কানকে স্পর্শ করছে না। হয়তো ওঝার কর্মকান্ডের প্রতি একাগ্রতাই সতুকে এ মুহূর্তে বধির করে ফেলেছে।

শুরু হলো গৌরীর চিকিৎসা। ওঝা লাল গামছা দুটোর একটা গৌরীর নিম্নাঙ্গে আর অন্যটা উর্ধাঙ্গে জড়িয়ে ওর পরনের কাপড়টা বদলাতে বলে সতুকে। প্রথমটায় ও একটু সংকোচ বোধ করলেও প্রচণ্ড খরার পর রিমঝিম বৃষ্টির সুখে শেষ পর্যন্ত আর সংশয় বোধটা থাকে না।

ওঝা ততক্ষণে বিড়বিড় করে কী সব বলতে শুরু করেছে। ঠোঁট দুটো নড়ছে। সতু গৌরীর কাছে এগোয়। ওর পরনের কাপড়ের জায়গায় সাবধানে গামছা দুটো জড়ায়। গৌরী নিঃশব্দে তা মেনে নেয়।

ওঝা হিন্দু ব্রাহ্মণের পূজার আয়োজনের মতো চাল, তেল, হাড়ি কুড়িতে টুংটাং আওয়াজ তুলে অস্ফুট তন্ত্র মন্ত্র পাঠ করে দীর্ঘক্ষণ। সতু পেছন থেকে দাঁড়ানো অবস্থার গৌরীকে ধরে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে ওঝার ফু-ফার ওজন পরিমাপ করে।

স্বপ্ন-দুঃস্বপ্নের মধ্য দিয়ে বেশ কিছুটা সময় অতিবাহিত হয়। বিভিন্নভাবে গৌরীর চিকিৎসা চললো। কিছুক্ষণের মধ্যেই গৌরীর শরীর অসার হয়ে এলো। সতু ওর কোমড় জড়িয়ে দাঁড়ায়। গৌরী সতুর ঘাড়ে গলায় কয়েকবার মুখ ঘসলো। ওর শরীরে গৌরীর ন্যুয়ে পড়া শরীর এ মুহূর্তে মোহময় মনে হয়। সুক্ষ্ম একটা নেশার অনুভূতিতে সতু আক্রান্ত হয়ে পড়ে। অকস্মাৎ সম্বিত ফিরে পায়। এ চিকিৎসার সাথে গোপনীয়তার একটা যোগসাজশ আছে মনে করে এসব অনুভূতি সে গায়ে মাখে না। তবু ধড়ফড় বুক ক্রমশ দ্রুততর হয়। মনে মনে ভাবে, সর্বনাশটা হয়তো এখনই পুরো হতে যাচ্ছে। এরই মধ্যে অবস্থার হাতে নিষ্ক্রিয় সতু এ যাত্রা রক্ষার একটা পথ খুঁজতে থাকে মনে মনে। এক সময় পেয়েও যায়।

‘ওকে আর ধরে রাখতে পারছি না’ –মুখ খোলে সতু।
-এইতো আর অল্প সময়।
-না, আজ থাক। আমার ভাল লাগছে না।
-ক্যান, ভাল্লাগতেছে না ক্যান?
-তা বলতে পারবো না, তবে খারাপ লাগছে এইটেই সত্যি।

সতু কথার মাঝেই গৌরীর অচেতন শরীরটা মাটিতে শুইয়ে ছাড়া কাপড় দিয়ে ওকে ভালো করে ঢেকে দেয়। ওঝা আশ্চর্যান্বিত হয়ে প্রশ্ন করে, ‘সে কি! শুইয়ে দিলেন?’
-দেবো না তো কি করব? দেখছেন না ওর অবস্থা? তাছাড়া হেরিকেনে আলো কম আর আমারও এখন ধৈর্য নেই। আজ থাক।
-এ জন্যেই তো কইছিলাম- আমার সাগরেদরে দরকার, আপনার দ্বারা এডা অবে না, আপনে তা শুনলেন না।
-থাক ভাই, সামনের দিন আপনার সাগরেদকে কাজে লাগাবেন। আমি বকশিস দেবো। আজ থাক।

এবার আর আপত্তি করে না ওঝা। সে তার ঝোলার জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে ঘর থেকে বেড়োয়। সতু তার দিকে দুটো পঞ্চাশ টাকার নোট মেলে ধরে।
‘খুব পরিশ্রম অইছে বাবু’ –বিনীত কণ্ঠস্বর ওঝার।
‘নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই অনেক পরিশ্রম করেছেন’ সতু আরও একটা পঞ্চাশ টাকার নোট ওঝার দিকে বাড়ায়।
-আজ আপনি আসুন, দুদিন বাদে আবার আপনাকে ডেকে পাঠাবো।
-জ্বি আচ্ছা।

ওঝা সালাম জানিয়ে চলে যেতে উদ্যত হয়, আবার কি ভেবে ছোট একটা ঔষধের বোতল সতুকে দিয়ে বললো, ‘এক পোয়া তিলা তৈলের সাথে এই তৈল মিশাইয়া দিনে চাইর পাইচবার রোগিণীর মাথায় মাখবেন, আর রোজ তিনবার কইরা ঠাণ্ডা পানি দিয়া গোসল করবেন। ভাল অইয়া যাবে।’ মৌরী ও অমিত ওঝার পাশে এসে দাঁড়ায়।

ওঝা চলে যাবার সময় ওর চোখে একশত পঞ্চাশ টাকার খুশী খুশী ভাবটা লক্ষ্য করে সতু আশ্বস্ত হয়। হাত ঘড়ির দিকে তাকায়। রাত দশটা বেজে সাঁইত্রিশ। সমাগত দর্শকদের অনেকেই কেটে পড়েছে ইতিমধ্যে। যারা ছিল, তারাও ওঝার পিছু পিছু ছোটে। সাথে সাগরেদ।

/...চলবে।
[ আগের অংশ পড়তে টাইমলাইন অথবা বাবু ফরিদীর পেইজে দেখুন। ]

উপন্যাসঃ ভেঙে ভেঙে গড়া ভালোবাসা
লেখকঃ কবি বাবু ফরিদী
প্রথম প্রকাশঃ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৮ ।
প্রকাশকঃ বোস ব্রাদার্স ।
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার : বিচারপতি নাভি পিল্লাইকে নির্বাচন করা হয়েছে

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৬

গাজা গণহত্যা’ প্রতিবেদনের তত্ত্বাবধানকারী জাতিসংঘের সাবেক মানবাধিকার প্রধান নাভি পিল্লাই নোবেল শান্তি পুরস্কার জিতেছেন।
জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের প্রধান হিসেবে তার দায়িত্বকালে, পরিষদটি ইসরায়েলের নিন্দা জানিয়ে
বিশ্বের বাকি অংশের সম্মিলিত প্রস্তাবের চেয়েও বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ড.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:৪৮

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি....

বন্দর শুধু রাজস্ব আয়ের প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামহোয়্যারইন ব্লগের সেরা ব্লগার

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১১:০৮



আমাদের দেশে যে কোনো ক্রিটিক্যাল সময়ে লক্ষ্য করা যায় কোনো না কোনো পণ্যের অভাব লেগে গিয়েছে। কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ, ভোজ্য তৈল এমনকি রিলিফ গায়েব হয়ে যায়। বন্যায় আক্রান্ত বন্যায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

তৌহিদি জনতা কবে দেশ রক্ষায় আন্দোলনে নামবে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:০১


আলহামদুলিল্লাহ। তৌহিদি জনতার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সুনামগঞ্জে মেয়েদের একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ বন্ধ করা গেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে মেয়েদের খেলাধুলা নিষিদ্ধ এবং অশ্লীল কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়। সুনামগঞ্জের মাটিতে এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপার ফিরে আসার পদ্ধতি কি?

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:২৩



আপা কেন ভারতে বেড়াতে গেলেন সেটা সবাই জানে। আগামী ডিসেম্বরে আপা দেশে ফিরে আসার আগ্রহের কথা জানিয়েছেন সেটাও সবাই জানে। আপা কিভাবে দেশ থেকে রাষ্ট্রীয় সফরে ভারতে গেলেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×