somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ভেঙে ভেঙে গড়া ভালোবাসা- ৭

১৮ ই এপ্রিল, ২০১৫ রাত ১০:২৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

(৭)
ভালোয় ভালোয় দু’দিন কেটে গেলো। যে গৌরীর চার-চারটি মাস নিদ্রাহীন কাটলো, সে এ দুটো দিনে অঘোরে ঘুমুলো। ঘুম ভাঙ্গলে প্রচুর খেলোও। যা বিগত চারমাস কল্পনাতীত ছিল। ওঝার দেয়া তেল এবং তার নির্দেশিত পন্থায় গোসলে এ ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা যাচ্ছে বলে কেউ কেউ মন্তব্যও করে বসলো। সতু, অমিত ওরাও বিষয়টি নিয়ে ভাবলো...।

হঠাৎ দু’দিন পরেই গৌরীর পাগলামির মাত্রাটা এত বেশী বাড়লো যে, ওকে আর মুক্ত অবস্থায় রাখা কারো সমীচীন মনে হলো না। সে হাতের কাছে কোন বাচ্চাকে পেলেই প্রহার করে। কুকুর দেখলে তেড়ে আসে। মানুষ দেখলে লাঠি নিয়ে পেটাতে আসে।
এভাবে কেটে যায় এক সপ্তাহ। গৌরীর অবস্থার অবনতি দেখে অমিতের ভেতর কোন পরিবর্তন লক্ষ্য করা না গেলেও হরিদাসী ও মৌরী যে বেশ বিচলিত তা বোঝা গেলো।

সবার মনেই অস্থিরতা। কি করি- কি করি ভাব। এমন ভাবের পরিমন্ডলে সতু পড়লো বিপাকে। কেমন যেন কাণ্ডজ্ঞানহীন, কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা। ওর মাথায় কোন বুদ্ধি খেলছে না। সেদিন ওভাবে ওঝাকে ফেরত পাঠানোর কারণে বাড়ির লোকেরা তাকে কি চোখে দেখছে, এ রকম অপরাধবোধের সাথে অধিকারবোধের ক্যাচাল ওকে বিব্রত করে তুলল। কিছুক্ষণ নিজের চুলে আঙুল চালাল। তারপর গৌরীর প্রতি ভালোবাসা আর দায়বোধের ঘোড়ায় চেপে ঊর্ধ্বশ্বাসে শহরের দিকে ছুটল। তখন বেলা দশটা।

স্টেশন বাজারে পরিচিত দু’একজনকে কথায় কথায় গৌরীর কথা পাড়লো। ওর পরিবর্তনশীল অবস্থার সাথে ওঝার কর্মকাণ্ডের একটা ডাটা গভীরভাবে উপস্থাপন করলো সতু।

বিষয়টি সবার মনেই দাগ কাটলো। সতুকেও ভাবিয়ে তুললো। একজন প্রৌঢ় সতুর বর্ণনা শুনে কিছুক্ষণ চুপ থাকলেন। তারপর বললেন, ‘বাবু, আজকাল মানুষ পাওয়া খুব ভাগ্যের দরকার। বেশীরভাগ মানুষই কুকুর স্বভাবের। যে যেভাবে পারে খাবলে দেয়।’ তিনি উদ্বেগের স্বরে আরও বললেন, ‘আমার কি মনে হয় জানো? আমার মনে হয় ওঝা ঐ পাগলীটারে নষ্ট করছে। যাতে তোমরা আবার ওরে ডাকো। আর সেই সুযোগে ও ওর কুমৎলব হাসিল করতে পারে।’
বৃদ্ধের কথাগুলো সতুর মাথায় ঘুরলো।

বৃদ্ধ চলে গেলে একজন যাত্রী তাদের গ্রামের একজন ফকিরের নাম উল্লেখ করে বললো, ‘বিষ দিয়া বিষ তুলতি অয়, বুঝলেন? এই পাগলীর একমাত্র চিকিৎসা এহন আমাগ্যার গেরামে। দ্যাশ-বিদ্যাশের কতো রোগী আসে- কাউরে তো শুনলাম না ফকিরের বদনাম করতি।

লোকটার কথা সতুকে নতুন পথের সন্ধান দেয়। কি জানি কার মধ্যে কী আছে? কোথায় কার মুক্তি নিহিত? ও লোকটার কাছ থেকে ফকিরের বাড়িটার ঠিকানা জেনে নেয়। মনে মনে জেদ আঁটে, ‘প্রয়োজনে অন্য ফকির দেখাবো, তবু ঐ ওঝাকে আর ডাকবো না। যাকে দেখলে গা ঘিন ঘিন করে, হাড্ডি তেতো হয়ে যায়, তাকে দিয়ে আবারও গৌরীর চিকিৎসা? গৌরী মরে গেলেও না’।

শহর থেকে ফেরে সতু। বাড়ি এসে প্রথমেই বিষয়টি অমিত ও মৌরীর সাথে আলোচনা করলো, তারপর হরিদাসী, প্রতিবেশী নগেন, এমনইভাবে অনেকেরই মত চাওয়া হলো। সকলেই একবাক্যে ফকিরবাড়ি গৌরীকে নেবার জন্য সায় দিলো। তৎক্ষণাৎ ঠিকানাসহ একশত টাকার নোট দেয়া হলো নগেনকে। কাল সকালেই নগেন ফকির বাড়ি যাবে এবং ফকিরের সব ধরণের খোঁজ জেনে আসবে।

নগেন ফকির বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলো। আবার সন্ধ্যার আগেই সে ফিরে এসে ফকির বাড়ি সম্বন্ধে বেশ ভাল ধারণা উপস্থাপন করলো। সকলেই আশ্বস্ত হোল নগনের খবরে। নগেন আরও জানালো যে আগামীকাল গৌরীর চিকিৎসার জন্য উপযুক্ত দিন এবং ফকির এসব চিকিৎসা রাতেই করেন।

রাতের চিকিৎসা প্রসঙ্গে সতু বরাবরই সন্দিহান থেকেছে। এবারেও যেন নগেনের কথায় ও একটু হোঁচট খেলো। তবুও এ মুহূর্তে কারও বিরুপভাজন হতে চাইলো না। শুধু সবার চোখের ওপর দিয়ে একবার চোখদুটো ঘোরালো। দেখল সবার চোখেই চকচকে তারা জ্বলছে। খুশির শ্বাস ফেলছে মৌরী। আনন্দে কাঁধ ঝাকালো পরশী স্বজনেরা। কোন প্রতিক্রিয়া নেই শুধু অমিতের। ও শুধু ভাবলেশহীন চোখে সবার চোখের তারা দেখছে। একসময় সিদ্ধান্ত হলো পরদিন দুপুরেই ফকিরবাড়ি যাওয়া হবে। গৌরীর সাথে যাত্রী হবে অমিত, হরিদাসী, সতু ও নগেন। দু’শো টাকায় একটা মহিষের গাড়ি ভাড়া করা হলো। বিশ মাইল জল কাদার রাস্তা, উঁচু-নীচু, তার উপর পাগল নিয়ে যাওয়া। সতু বুঝতে পারলো ভাড়াটা একটু বেশিই হয়ে যাচ্ছে, তবু উপায় নেই। দুপুর তিনটেয় ওরা রওয়ানা হলো।

বাড়ি থেকে বেরুনোর পথেই নারী-পুরুষ-বাচ্চাদের হৈ-হুল্লোড় পড়ে গেলো। কেউ গাড়ির পিছু পিছু অনেকটা পথ এগিয়ে এলো। যেতে যেতে গাড়ির পেছনে দু’চারজন করে লোক বাড়লো-কমলো। মৌরীও খানিকটা পথ এগিয়ে দিয়ে গেলো।

বিশ মিনিটের মধ্যে গাড়ি শহরে এসে পড়লো। শহরের মাঝ বরাবর পথ। গাড়ি এগিয়ে চলছে সামনে। ভেতরে গৌরী পিঠ মোড়া করে শক্ত রশি দিয়ে বাঁধা। সাওতালদের মতো আঁটসাঁট করে কাপড় পড়ানো। ওর চারদিকে অমিত, সতু, নগেন ও হরিদাসী।

রেল স্টেশনের কাছে আসতেই এক মজমা মানুষ এসে গাড়িটা ঘিরে ফেলে। চিড়িয়াখানার জন্তু দেখার মতো তারা গৌরীকে দেখছে। গাড়ি শ্লথ গতিতে এগোয়।
গাড়ির চারদিকে মানুষের উৎসুক দৃষ্টি। ত্যক্ত-বিরক্ত বানরের মতো গৌরীর পাগলামিও এ সময় খানিকটা বেড়ে যায়। সতু ও অমিত ওকে নিবৃত করার চেষ্টা করে। গৌরীর লড়াকু ভাবটা চরমে ওঠে। সতুরাও শক্তি খাটায়। শক্তি পরীক্ষার এক পর্যায়ে গৌরীর বুকের স্ফীত অংশ বেরিয়ে পড়ে। হরিদাসী তখনই কাপড় টেনে সামাল দেয়। গৌরীর সাথে ধ্বস্তাধ্বস্তি চলে। এক সময় আকাশের দিকে পা ছোঁড়ে সে। কাপড় বেসামাল হয়ে যায়। হরিদাসীও সামাল দিতে ব্যস্ত হয়ে ওঠে। ভিড় ঠেলে কেউ কেউ উঁকি দেয়, বিটলেমী করে। কেউ শিষ বাজায়, কারও নজর খোঁজে অন্য কোন কিছু। দু’জন কুলি কুরমুর করে মুড়ি চিবোয় আর গৌরীর যৌবন উপভোগের ফাঁকে স্টেশনের ঘুসকীদের দিকে তাকায়, যারা গৌরীকে এক পলক দেখে ফিরে এসেছে। একজন ঘুসকির দৃষ্টি সেদিকে পড়তেই মুখে ভেংচি কেটে ঘাড় বাঁকায়। অন্য একজন উচ্চস্বরে বলে, ‘দ্যাখ, খানকির বাচ্চারা, ভালো কইরা দ্যাখ।’ একজন বলে, ‘হায় আল্লাহ, অই সুন্দর মাইডার একি আজাব? তুই অরে ভালো কইরা দে, আল্লাহ!’

/...চলবে। উপন্যাসের আগের অংশ পড়তে আমার টাইমলাইনে অথবা কবি বাবু ফরিদীর পেইজে যান। ধন্যবাদ।

উপন্যাসঃ ভেঙে ভেঙে গড়া ভালোবাসা,
লেখকঃ কবি বাবু ফরিদী,
প্রকাশকালঃ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৮ ।
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার : বিচারপতি নাভি পিল্লাইকে নির্বাচন করা হয়েছে

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৬

গাজা গণহত্যা’ প্রতিবেদনের তত্ত্বাবধানকারী জাতিসংঘের সাবেক মানবাধিকার প্রধান নাভি পিল্লাই নোবেল শান্তি পুরস্কার জিতেছেন।
জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের প্রধান হিসেবে তার দায়িত্বকালে, পরিষদটি ইসরায়েলের নিন্দা জানিয়ে
বিশ্বের বাকি অংশের সম্মিলিত প্রস্তাবের চেয়েও বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ড.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:৪৮

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি....

বন্দর শুধু রাজস্ব আয়ের প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামহোয়্যারইন ব্লগের সেরা ব্লগার

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১১:০৮



আমাদের দেশে যে কোনো ক্রিটিক্যাল সময়ে লক্ষ্য করা যায় কোনো না কোনো পণ্যের অভাব লেগে গিয়েছে। কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ, ভোজ্য তৈল এমনকি রিলিফ গায়েব হয়ে যায়। বন্যায় আক্রান্ত বন্যায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

তৌহিদি জনতা কবে দেশ রক্ষায় আন্দোলনে নামবে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:০১


আলহামদুলিল্লাহ। তৌহিদি জনতার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সুনামগঞ্জে মেয়েদের একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ বন্ধ করা গেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে মেয়েদের খেলাধুলা নিষিদ্ধ এবং অশ্লীল কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়। সুনামগঞ্জের মাটিতে এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপার ফিরে আসার পদ্ধতি কি?

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:২৩



আপা কেন ভারতে বেড়াতে গেলেন সেটা সবাই জানে। আগামী ডিসেম্বরে আপা দেশে ফিরে আসার আগ্রহের কথা জানিয়েছেন সেটাও সবাই জানে। আপা কিভাবে দেশ থেকে রাষ্ট্রীয় সফরে ভারতে গেলেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×