somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গালিবার জন্য কান্না

২৬ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৬ রাত ২:৪৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



আজ ক্রিকেটে বাংলাদেশের জয়ের আনন্দে সবাই যখন আনন্দিত, সাকিবের ছোট্ট মেয়েটি যখন ওর বাবার বিশেষ অর্জনের দিনটিতে বাসায় বসে টিভিতে বাবাকে দেখছে, আমার ক্রিকেটার বন্ধু মিঠু তখন ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে ওর নবজাতক মেয়ে গালিবার নিথর দেহটি বুকে জড়িয়ে কাঁদছে। ফরিদপুরে ক’দিন আগে এই মেয়েটিকেই জন্মের পর ‘মৃত’ বলে ঘোষণা করে দিয়েছিলেন এক ডাক্তার। মিঠু জানিয়েছে এমনটাই। রাতে কবর দেয়া হয়না বলে সারারাত একটা প্যাকেটে করে মেয়েটিকে কবরস্থানে রাখা হয়। সকালে কবর দিতে গেলে দেখা যায় মেয়েটি বেঁচে আছে। তারপর আবার স্থানীয় শিশু হাসপাতালে নিয়ে গিয়েও অবস্থার উন্নতি নাহলে শিশুটিকে হেলিকপ্টারযোগে ঢাকায় নেয়া হয়। স্কয়ারে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখার পর আজ গালিবা নামের পরীটা আমাদের সকল প্রচেষ্টা ব্যার্থ করে দিয়ে আমাদের ছেড়ে চলে গেলো!

মিঠু আমার স্কুলের বন্ধু। একইসাথে ফরিদপুর জিলা স্কুলে পড়েছি। ও ছোট থেকেই ক্রিকেট খুব ভালো খেলতো। বিশাল বিশাল ছক্কা হাঁকিয়ে আমাদেরকে তাক লাগিয়ে দিতো। আমরা ভালো ছাত্ররাও ওর এই ক্রিকেটীয় গুণের কারণে ওকে আলাদা চোখে দেখতাম। সেদিন রাতে হঠাৎ মিঠুর ফোন। মেয়েটি যে ওর, সেই খবরটি জানাতেই এই ফোন। ক্ষোভ ঝেরে ওর দাবি, এই বিষয়টি নিয়ে আমি যেনো কিছু লিখি। সেই লেখা যে আজ এভাবে এমন সময়ে লিখতে হবে, আমি ভাবতে পারিনি।

যদিও সেদিন মিঠুকে আমি ‘নিশ্চয়ই স্রষ্টার প্রত্যক্ষ রহমতে তোর মেয়ে বেঁচে ফিরেছে’ বলে সাহস দিয়েছি, কিন্তু আমি এই কথাটি পুরোপুরি মন থেকে বিশ্বাস করিনা। স্রষ্টার ইচ্ছাতেই সবকিছু হয়-- এটা ঠিক, কিন্তু মর্তের মানুষের হাতেও অনেক কিছু করার থাকে। স্রষ্টার ইচ্ছাতেই মানুষ মানুষের উপকার করে। একজন ডাক্তারকে যদি কেউ স্রষ্টার পরে স্থান দেয়, তবে সেটা অতিরঞ্জন নয়। অবশ্যই অসুস্থ্য হলে মানুষ ডাক্তারের কাছেই যায়, শুধু মন্দির-মসজিদে গিয়ে প্রার্থনা করে না। সেই ডাক্তারের হাতে জন্ম-মৃত্যু বিধান করার ক্ষমতা না থাকলেও তিনি যদি একটু দায়িত্ব নিয়ে চেষ্টা করেন, হয়তো রোগী মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরেও আসতে পারে। ফিরে না আসলেও অন্তত রোগীর স্বজনেরা যদি ডাক্তারের সেবায় খুশি থাকে, তখন বলা যায় ‘সব তাঁর ইচ্ছা, এখানে আমাদের হাত নাই’। কিন্তু ডাক্তারের সেবার মানসিকতার বদলে যদি তাড়াহুড়ো করে বেশি রোগী দেখা এবং বেশি রোজগার করার মানসিকতাটা বেশি প্রাধান্য পায়, তখনই মানুষ সেই ডাক্তারের দিকে আঙ্গুল তোলে। সব ডাক্তারকে মানুষ গালি দেয় না, বেশিরভাগ ডাক্তারকেই মানুষ দোয়া দেয়, শ্রদ্ধা করে। আমি বলবো না ফরিদপুর শিশু হাসপাতালের সেই ডাক্তারটির আরেকটু ভালো করে সময় নিয়ে চেক-আপ করে শিশুটিকে মৃত ঘোষণা করা উচিৎ ছিলো। আবার আমি আমার বন্ধু মিঠুর পিতৃ-হৃদয়ের ক্রন্দনকেও উপেক্ষা করতে পারিনা। আমি চাই এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হোক এবং ডাক্তারের সেবায় ত্রুটি পাওয়া গেলে তাঁকে আইনের আওতায় আনা হোক। আমি একটু বেশি করে আশা রাখতে চাই যে, আমার ডাক্তার বন্ধুরা গতবারের মতো এবারও আমাকে গালি না দিয়ে এবং আনফ্রেন্ড না করে বরং তারাও আওয়াজ তুলবে, ভালোকে খারাপের সাথে মিশিয়ে ফেলবে না।

ফরিদপুর সেই বৃটিশ আমলেরও আগে থেকেই ঐতিহ্যবাহী এক জেলা শহর। তবুও যুগে যুগে শহরটি বঞ্চিত হয়েছে। এখনো রাজধানী ঢাকার সাথে জেলাটির যোগাযোগ সহজ নয়। পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ঘাটে মাঝে মাঝেই চারটির মাঝে বেশিরভাগ ফেরিঘাট অচল থাকে। অন্য রুটে পদ্মা সেতুটি হলে কিছুটা সমস্যা হয়তো কমবে, কিন্তু সেটি হতে এখনও অনেক দেরী। ফরিদপুরের হাসপাতালগুলোতে উন্নত সুযোগ-সুবিধা আজও আপ্রতুল। বেশি সমস্যা হলে রোগীকে ঢাকায় নিতে অনেক সময় লেগে যায়। তার ওপর যদি ডাক্তারদের থেকে এমন সেবা পাওয়া যায়, তবে ফরিদপুরবাসী যাবে কোথায়? বন্ধু মিঠু ঢাকায় থাকে, ঈদে বাড়ি এসেছিলো। ফরিদপুরে সুচিকিৎসার ব্যবস্থা থাকলে হয়তো আজ ওর মেয়েটা মরতো না।

এই রকম দুঃসংবাদ শুনলে আমার বারবার সেই রাতের স্মৃতি মনে পড়ে যায়, যেই রাতে আমার বাবা মারা গিয়েছিল। ২০০৮ সালের ২০ জুলাই অ্যাম্বুলেন্সে করে নিয়ে গেলাম বাবাকে প্রথম ফরিদপুর পরিচর্যা হাসপাতালে। রাত পৌনে ১০টায় সেখান থেকে জানিয়ে দেয়া হলো, সেখানে একজন ডাক্তারও নেই! গেলাম সদর হাসপাতালে, সেখানেও নাকি ডাক্তার নেই। আমি বাবাকে সেখানে রেখে দৌড়ে গেলাম একটু দূরের ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজে, ডাক্তারের খোঁজে। গেটে একজন ভদ্রলোককে দেখে নাবালক আমি বলে ফেলেছিলাম, ‘স্যার, আপনি কি ডাক্তার? আমার বাবার ঠান্ডা হয়ে পড়ে আছে সদরে। আপনি একটু আমার সাথে চলেন না!’ ডাক্তার সাহেব সোজা মুখে বলে দিলেন, ‘এভাবে কি এতো রাতে যাওয়া যায়? আমার চেম্বার আছে, পিএস আছে। তুমি পিএসের সাথে যোগাযোগ করো, ডেট নাও, তারপর দেখা যাবে...’ । কথাগুলো মনে আছে, কিন্তু নাম আর চেহাড়া মনে নেই। ফিরে গিয়ে দেখি সদরে কান্নার রোল পড়ে গেছে। একজন ইন্টার্নি চিকিৎসককে খুঁজে আনা হয়েছিলো। তিনি অক্সিজেন দিয়ে নাকি দেখেছেন, বাবা আর নেই! অ্যাম্বুলেন্সে ফেরার পথে অন্য হাসপাতালে গিয়ে দেখাতে চাইলে আমাকে জানিয়ে দেয়া হলো, ফরিদপুরে এর চেয়ে বেশি কিছু নাকি করে দেখার নেই।

আমরা সাধারণ মানুষেরা ডাক্তারদের থেকে কী চাই? আমরা চাই অসুস্থ হলে একটু হাসিমুখে সাহস যোগানো, একটু সুচিকিৎসা। এটুকু পেলেই তো আমরা খুশি। একটু পর মরে যাবো, তবুও যদি ডাক্তার একটু ভালো করে আমাকে একটু বেশি সময় নিয়ে দেখে আমাকে বাঁচানোর চেষ্টাটা ভালোভাবে করে হেসে পিঠ চাপড়ে বলেন, ‘আরেহ, কিচ্ছু হয়নি, বুকে সাহস রাখো’, তবে আমি মরার আগে এটুকু শান্তি তো পাবো যে আমাকে বাঁচাতে সবাই যথাসাধ্য করেছে। ফরিদপুরে এমন ডাক্তার যে নেই, তা নয়। আমার থেকে ভিজিট না নিয়েও ঘন্টার পর ঘন্টা আমার মায়ের চেক-আপ করেছেন, সুপরামর্শ দিয়েছেন, বিপদের দিনে আমাকে সাহস দিয়েছেন, গভীর রাতে ফোন ধরে ডাক্তারি পরামর্শ দিয়েছেন, এমন ডাক্তাররূপী ফেরেশতার কথা আমি ভুলে যাই কী করে? আমরা এমন ডাক্তার চাই, এমন হাসপাতাল চাই, যারা টাকাকে নয় সেবাকে আগে প্রাধান্য দেবে। এজন্য ডাক্তারদের যা যা সুযোগসুবিধা লাগে তা সরকারিভাবেই দেয়া হোক। আমরা চাইনা আর কোনো বাবার বুকে এভাবে খালি হোক। চাইনা, আর কোনো মায়ের বুক ভরে ওঠার আগেই এভাবে প্রশ্নবোধক চিকিৎসার দরুণ খালি হোক। চাই ফরিদপুরের চিকিৎসাব্যবস্থা, সুযোগসুবিধা আরও উন্নত হোক।

-দেব দুলাল গুহ।
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৬ দুপুর ১২:০৪
৩টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

গল্পঃ মোহাম্মদপুরে কখনও বিচ্ছেদ হয় না

লিখেছেন রাজসোহান, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৪





আমার দোকানের নাম নিউ শাপলা কম্পিউটার ও ফটোস্ট্যাট। সাইনবোর্ডের শাপলা ফুলটা এঁকে দিয়েছিলো তাজমহল রোডের এক সাইনম্যান, দেখতে হয়েছিলো কচুরিপানার মতো। চৌদ্দ বছর ধরে ঝুলে আছে। রোদে রঙ উঠে... ...বাকিটুকু পড়ুন

২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা তার সাথে কিছু রুঢ় সত্য যা বদলে দিয়েছিলো দেশের রাজনীতি।

লিখেছেন অন্তর্জাল পরিব্রাজক, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:৩৪





২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা সম্পর্কে আমরা সবাই মোটামুটি জানি। এই হামলায় কারা জড়িত ছিল সেটাও আজকের দিনে অজানা নয় একমাত্র নিতান্ত দলকানা ছাড়া। তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধানমন্ডি ৩২ যারা ভেঙেছিল, আর যারা বিচার চাওয়ার পথ বন্ধ করে দিল- তারা কি একই?

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:৪৪



ধানমন্ডি ৩২ যারা ভেঙেছিল, আর যারা বিচার চাওয়ার পথ বন্ধ করে দিল- তারা কি একই?

ধানমন্ডি ৩২ ভাঙা হয়েছিল- কে দেখেনি, কে জানে না, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই।,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন থেকে যারা আওয়ামী লীগকে ভালোবাসেন এখন তাদেরকে আওয়ামী লীগের প্রয়োজন

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:৪০



ক্ষমতায় গেলে কোন দল যাদেরকে মনে রাখে না ক্ষমতায় গেলে তাদেরকেই তারা সবচেয়ে বেশী মিস করে। সেই নিখাঁদ দল প্রেমিকদেরকে এখন আওয়ামী লীগ খুঁজছে। তারা লগি বৈঠা নিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

৫ই আগস্ট ছিলো আরো একটি ১৫/২১শে আগষ্টের অপচেষ্টা।

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৫২



২১শে আগস্ট পালন করা অর্থে , আমার কাছে মনে হচ্ছে আবারো জঘন্য কোনো ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে। কারন আমরা ঐ নারকীয় হত্যাকাণ্ডের কোনো বিচার সম্পন্ন করতে পারিনি। আমরা যারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×