somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ভারত যায় অতি স্বল্প খরচে চাঁদের কাছে আর আমরা কিনি ৩৮ লাখ টাকা দিয়ে পর্দা!

০৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৯ সকাল ১১:৫৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

গতকাল গভীর রাতে তামাম দুনিয়ার চতুর্থ দেশ হিসেবে আমাদের অতি পাশের দেশ ভার‌তের রোবোটিক মহাকাশযান চা‌ঁদের মাটি স্পর্শ করতে চেষ্টা করল। ভাবতে পারেন? উঠতে বসতে যে দেশটাকে গালি দেন, যে দেশের নামটাও অনেকে সহ্য করতে পারেন না, ভুলে যান একাত্তরের বন্ধুত্বের কথা, তারা চাঁদে চলে যাচ্ছে, আর আমরা পড়ে আছি বালিশকান্ড আর ৩৮ লাখ টাকার পর্দা নিয়ে! আসুন, তার আগে কিছু কথা বলি।
.
কৈলাশভাদিব্য শিবান! গায়ের রঙ ন্যাতানো টাইপ কালো, টাক মাথা, আর দেখতে শুনতে ক্ষ্যাত এই লোক একজন চাষার ছেলে। ট্রাস্ট মি খাঁটি ভারতীয় ইংরেজি উচ্চারণের এই লোক দেখতে যেমন, তেমনি উঠেও আসা অতি নিম্ন গোত্র থেকে। দেখতে ঠিক ছোটবেলায় আমাদের বাড়িতে সাইকেলে করে দুধ দিতে আসা ঝকঝকে সাদা দাঁতওয়ালা হ্যাংলা পাতলা বিষ্ণু কাকার মত।
.
এই লোকের পড়ালেখা অতি সাধারণ গ্রামের স্কুলে। তার পুরা পরিবারে তিনিই প্রথম গ্রাজুয়েট এবং গ্রাজুয়েশনটা করেছেন তিনি এম আই টি থেকে। জ্বী না আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজি না; মাদ্রাজ ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজি। মাস্টার্স করেছেন আই আই টি ব্যাঙ্গালোর থেকে এবং পিএইচডি করেছেন আই আই টি বোম্বে থেকে।
.
ইয়েস, ড. কে শিবান, আ হান্ড্রেড পারসেন্ট মেইড ইন ইন্ডিয়া প্রোডাক্ট, যিনি হচ্ছেন ISRO ’র বর্তমান চেয়ারম্যান। ISRO চিনেন? ISRO হলো ভারতের নাসা। জী, Indian Space Research Organization এর চেয়ারম্যান এই ত্যাড়াবাকা চেহারার গ্রাম থেকে উঠে আসা ক্ষ্যাত মানুষটার নেতৃত্বেই ভারত চাঁদের মাটির খুব কাছাকাছি গেছে। তারপর হঠাৎ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন! হয়তো চাঁদেএ মাটির কাছের প্রচন্ড ধুলাঝরে নিজের গতিবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে সে মাটিতে বিধ্বস্ত হয়েছে। আবার হয়তো 'দ্য মার্শিয়ান' ছবির মতো কিছুদিন পর সিগন্যাল পাওয়াও যেতে পারে! অথবা হয়তো পরের মিশন গিয়ে অক্ষত চন্দ্রযানকেও পেতে পারে গিয়ে! কে জানে?
.
এটাকে আমি ব্যর্থতা বলতে নারাজ। অথচ ভারতবাসীকে হতাশ করেছেন ভেবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে জড়িয়ে ধরে সেই ড. কে শিবান বাচ্চাদের মতো কাঁদলেন! যেন স্কুলের বাচ্চাটা পরীক্ষায় অল্পের জন্য এ প্লাস মিস করে বাবাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে! মোদিজিও তাঁকে বুকে জড়িয়ে পিঠ চাপড়ে দিলেন অনেকক্ষণ। যেন বাবা তাঁর ছেলেকে বললেন, 'ব্যাপার না বেটা, যা হওয়ার হয়ে গেছে, সামনের দিকে তাকাও, সামনেরবার ঠিকই পারবে। আমার বাবা ঠিক এভাবেই আমাকে সাহস আর অনুপ্রেরণা দিতেন আমি যখন কোনো পরীক্ষা দিয়ে এসে কাঁদতাম..
.
একটা সিঙ্গেল মিশনে একসাথে ১০০ এর উপর স্যাটেলাইট আগে কেউ পাঠাতে পারেনি দুনিয়ায়। ভারত একসাথে ১০৪টা স্যাটেলাইট একই মিশনে পাঠিয়ে রেকর্ড গড়েছে এই কে শিবানের নেতৃত্বেই। ইস্রোকে নিয়েছেন অনন্য উচ্চতায়। তাঁর ব্যর্থতার দিনেও তাঁর পাশে তো গোটা ভারতবাসী থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। সেটাই যেন হয়।
.
হ্যা ভারত, যে দেশে প্রতিদিন গড়ে দশজন করে কৃষক আত্মহত্যা করে কেবল ঋণের বোঝা না বইতে পেরে, যে দেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে গরুর মলমূত্র পর্যন্ত পেট্রোনাইজ করা হয়, সেই একই দেশের একজন কৃষকের ছেলে নিজের দেশে পড়েই মহাকাশ গবেষণা সংস্থার প্রধান হন; চাঁদে অভিযানের নেতৃত্ব দেন। যোগ্য লোকটাকেই বেছে নিয়ে যোগ্য জায়গায় বসিয়ে দেওয়া হয়, দেখা হয় না তাঁর ধর্ম জাত পাত। মুসলিম কেউ তাই রাষ্ট্রপতি হতে পারেন এবং একজন রাষ্ট্রপতি এপিজে আব্দুল কালামকে তাই ভারতীয়রা আজও মাথার উপরেই রাখেন।
.
টু মি দ্যাটস দ্যা বিউটি অফ ইন্ডিয়া! একটা পিছিয়ে থাকা উন্নয়নশীল দেশ তার হাজারটা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও শিক্ষা এবং গবেষণা খাতকে সেই পর্যায়ে নিয়ে গেছে যেখানে তারা সামান্য একটা স্যাটেলাইট অন্যের কাঁধে পাঠিয়ে গর্ব করা দূরে থাক, আস্ত চাঁদে অভিযানে নামার সাহস করে সম্পূর্ণ নিজেদের পায়ে। নাসাকেও হারানোর দুঃসাহস যারা দেখায়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির গুরুত্বটা তারা বোঝে।
.
আমাদের পাব্লিক ইউনিভার্সিটিগুলোতে গণ হলরুমে গ্রাম থেকে আসা এরকম অনেক চাষাভুষোর মেধাবি ছেলে গাদাগাদি করে থাকে। সিট নেই, পুষ্টিকর খাবার নেই। উপরন্তু ক্লাস ফেলে মিছিলে যাওরে! এমন অনেকে আছে যারা ইংরেজি দূরে থাক, ভালো করে কথা বলতে পারে না, ন্যাতায়ে চুল আচড়ায়। ট্রাস্ট মি, এদের ভিতর অনেক কে. শিবান আছে যারা কেবল ভালো একটা শিক্ষাব্যবস্থা আর গবেষণার উপযুক্ত জায়গার অভাবে হয় ব্যাংকে চাকরি করে নাহলে বিদেশে পালায়ে বাঁচে। কেউ কেউ হতাশা থেকে গলায় দড়ি দেয়, আবার কেউ হলের গাছের ডাব পেরে খেতে গিয়ে পড়ে স্পট ডেড হয়। অধিকাংশই বাজে পরিবেশের স্বীকার হয়ে নেশার দিকে ঝুঁকে।
.
দেশের ভিতর লুকায়ে থাকা অথবা পালায়ে বাঁচা এইসব কে শিবানদের জন্যে আফসোস ছাড়া আমরা আর কিছুই দিতে পারিনি। যদি পারি, তাহলে আমরাও একদিন চাঁদে যাবো। প্রথম চেষ্টাতে না পারলেও পরের কোনো না কোনো চেষ্টায় পারবো। মূল কথা হলো, চেষ্টাটা করা চাই। অথচ ভারতের মিশন সফল হয়নি বলে আমাদের পত্রিকাগুলোর ফেসবুক পেইজে যেভাবে ভারতকে ও হিন্দুদেরকে ট্রল করা হচ্ছে, তা দেখে আপনাকে হতাশ হতেই হবে। আমরাও কীভাবে মন দিয়ে পড়ে একদিন চাঁদে বা মঙ্গলে যাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে পারি নিজেদের যোগ্যতায় সেটা না ভেবে এরা লিখছে-- 'গোমূত্রকে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করলে ঠিকই চাঁদে যেতে পারতি' অথবা 'গরুর সন্তানরা এর চেয়ে বেশি কি পারবে?' অথবা 'খুব ভালো হইছে, আল্লাহ বিচার করছে' অথবা 'পারলি না কেন? শিব না তোদের সাথে আছে?' অথবা 'তেত্রিশ কোটি দেবতা দিয়া ঠেলা দিয়াও পারলি না?' অথবা 'মালাউনের জাতটাই খারাপ। উচিত কাম হইছে' অথবা...
.
আশার কথা, সবাই একরকম নয়। কেউ কেউ প্রতিবেশী দেশকে সাহস দিয়ে বলেছে, 'ব্যাপার না, পরেরবার হবে'। এরাই আমাকে আশাবাদী করে। শত্রুরও ভালো কাজের প্রশংসা করতে হবে। শত্রুকেও সমীহ করতে হবে, তার থেকেও শেখার আছে অনেক কিছু। কিন্তু ভারত আমাদের শত্রু রাষ্ট্র নয়।
.
দেখলাম কয়েকজন খোঁচা দিয়ে বলছে, যে দেশে অনেকের টয়লেট নাই, এতো গরিব, সেই দেশ কেন চাঁদে যাওয়ার মতো বিলাসিতা করে? আসলে এটা বিলাসিতা নয়, এটা প্রয়োজন। যেভাবে উত্তরের বরফ গলছে আর বন উজাড় হচ্ছে, এমন একদিন আসতে পারে যেদিন এই পৃথিবী আর মানুষের বসবাসের উপযোগী থাকবে না। '২০১২' টাইপের হলিউড ছবিগুলো দেখতে পারেন। এগুলো একেবারে অমূলক চিন্তা নয়, বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্ত নিয়ে আগামীর সম্ভাবনা জানিয়ে মানুষকে সচেতন করার চেষ্টা। তেমন দিন যদি আসে, তাহলে গোটা বিশ্বের তখন সবকিছু বিক্রি করে যুক্তরাষ্ট্র, চীন আর রাশিয়ার মহাকাশ গবেষণা সংস্থার কাছে ভিক্ষা চাইতে হবে যে আমাদেরকেও চাঁদে বা মঙ্গলে নিয়ে যাও, এক টুকরো জমি দাও থাকার জন্য। সেদিন যদি ভারত আর বাংলাদেশেরও নাসার মতো শক্তিশালী মহাকাশ গবেষণা সংস্থা থাকে, তাহলে কারো মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে না, প্রভূত্ব স্বীকার করতে হবে না। সেই দিনটার জন্য নিজেদের শত গরিবানা হাজারো সমস্যা মোকাবিলা করেই বিজ্ঞান আর গবেষণার পিছে টাকা ঢালতে হবে। দুর্নীতিকে শূণ্যের কোঠায় এনে মেধাবি ও যোগ্যদের সঠিক জায়গায় বসাতে হবে। সেই কাজটা আপাতত দুঃসাধ্য মনে হলেও আমি আশাবাদী থাকতে চাই। আমি স্বপ্ন দেখি ভারত যেদিন মঙ্গলে পা রাখবে, আমরা সেদিন চাঁদে আমাদের প্রথমবার যাওয়ার চেষ্টাটা অন্তত করবো।
.
(লেখাটির কিছু অংশ ফেসবুক টাইমলাইনে পাওয়া। সেটা সম্পাদনা করে বাকি অনেকখানি কথা আমার নিজের জুড়ে দেওয়া।)
৯টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ছোট গল্পঃ ভ্রম

লিখেছেন সামিয়া, ০৫ ই জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৩



চোখ বন্ধ করলেই আমি ধোঁয়া দেখি। ঘন, ধূসর ধোঁয়া। যেন কেউ ভেজা কাঠ জ্বালিয়েছে। তার সঙ্গে মিশে থাকে পোড়া কাপড়ের গন্ধ। কখনও মনে হয় প্লাস্টিক, কখনও মনে হয় পুরোনো... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড় আমি ভালোবাসি

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ০৫ ই জুলাই, ২০২৬ দুপুর ২:৪৩

পাহাড় আমি ভালোবাসি
...........................................



চললাম তবে তোমার সাথে,
হাতটি রেখে হাত বাড়াতে।
পিছুটানের বাঁধন ছিঁড়ে,
হারাবো ওই মেঘের ভিড়ে।

পাহাড় চূড়ায় রোদের হাসি,
শুনছো ! তোমায় ভালোবাসি।
চলবে নদী আপন বেগে,
নতুন কোনো আশার মেঘে।

ইচ্ছেগুলো পাক না ডানা,
আজকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

পৃথিবীতে শ্রেষ্ঠ সম্পদ কি?

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৫ ই জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:২১



এই মুহুর্তে আমি গাজীপুর যাচ্ছি।
সময় সকাল দশটা। রবিবার। রাস্তায় জ্যাম যেতে অনেক সময় লাগবে। লাগুক। সমস্যা নেই, হাতে অনেক সময় আছে। আজ আমার কোনো কাজ নেই। বউ বাচ্চা বাসায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

"তোমরা আমাদের মানুষদের কেন খুন করলে?"

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৫ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ৮:০১

জাপানের মানুষেরা আজও বুঝতে পারে নাই, কেন তাঁদের ছেলেমেয়েদের এভাবে হত্যা করা হলো। সেই দেশের মুরুব্বীরা এখনো এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে ফেরেন। আক্ষেপ করেন। আমার বোনের জামাই জাপানে পোস্ট ডক... ...বাকিটুকু পড়ুন

শত্রুর শত্রু

লিখেছেন তানভীর রাতুল, ০৬ ই জুলাই, ২০২৬ সকাল ৯:১৪

উগ্রবাদী আর উদারবাদী, দুটি ইসলামই একই রাজনীতি করে। তাবলীগ জামাতের লোকটি মাঠে এসে বলে মেয়েদের ফুটবল হারাম। তারপর বিশ্বকাপে সৌদি আরবকে সমর্থন করে রাস্তায় নামে। এই দুটি আচরণ পরস্পরবিরোধী নয়।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×