somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

শত্রুর শত্রু

০৬ ই জুলাই, ২০২৬ সকাল ৯:১৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

উগ্রবাদী আর উদারবাদী, দুটি ইসলামই একই রাজনীতি করে। তাবলীগ জামাতের লোকটি মাঠে এসে বলে মেয়েদের ফুটবল হারাম। তারপর বিশ্বকাপে সৌদি আরবকে সমর্থন করে রাস্তায় নামে। এই দুটি আচরণ পরস্পরবিরোধী নয়। এরা দুটি আলাদা ধারণার প্রতিনিধিত্ব করে। প্রথমটি ধর্মীয় বিধান—খেলাধুলা হারাম, হাঁটুর উপর কাপড় হারাম। দ্বিতীয়টি রাজনৈতিক পরিচয়—মুসলিম দেশ জিতলে মুসলমানরা জেতে, মুসলিম দেশ হারলে মুসলমানরা হারে, এমনতর উম্মাবেগ (উম্মাহ+আবেগ)। প্রথমটির নাম ইসলামপন্থা। দ্বিতীয়টির নাম প্যান-ইসলামিজম বা সর্বঅন্তর্ভুক্ত-ইসলামপন্থা। এই পার্থক্যটি না বুঝলে বাংলাদেশের—এবং বিশ্বের—রাজনীতির অনেক কিছু বোঝা যায় না।

প্যান-ইসলামিজম সংজ্ঞানুসারে ইসলামের ধর্মীয় বিধান মানে না। সে শাহরুখ খানকে নিয়ে গর্ব করে, মোহাম্মদ রফির গান ভালোবাসে, হলিউডে মুসলিম অভিনেতা দেখলে উচ্ছ্বসিত হয়। সে লিবারেল, সেকুলার, এমনকি বামপন্থী পরিচয়ও নিতে পারে। কিন্তু তার কাছে পৃথিবী দুভাগে বিভক্ত—মুসলিম এবং অমুসলিম। ফিলিস্তিন, কাশ্মীর, ইরান—এগুলো তার কাছে মানবাধিকারের প্রশ্ন নয়, মুসলিম পরিচয়ের প্রশ্ন। অর্ওয়েল বলতেন, যেকোনো রাজনৈতিক অবস্থানকে বিচার করো তার সামঞ্জস্য দিয়ে। যে শ্রীলংকার মুসলিম নিপীড়ন নিয়ে কথা বলে কিন্তু উইঘুর নিয়ে চুপ থাকে—তার অবস্থানটা মানবাধিকারের নয়, প্যান-ইসলামিজমের। যে ভারতের কাশ্মীর নিয়ে সরব কিন্তু পাকিস্তানের কাশ্মীর নিয়ে নীরব—একই কথা।

ইরানের দিকে তাকালেই ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল পাঠ শেখা যায়, ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে তেহরানের আন্দোলনকারীরা যে শ্লোগান দিয়েছে, সেই শ্লোগানটি তিন পক্ষের বিরুদ্ধে— মোল্লা, বামপন্থী, এবং মুজাহেদিন। মোল্লাদের বিরুদ্ধে ক্রোধ বোধগম্য। কিন্তু বামপন্থীদের বিরুদ্ধে কেন? কারণ ইরানের নতুন প্রজন্ম ইতিহাস জানে। ১৯৭৯ সালে খোমিনি এসেছিলেন বামদের কাঁধে চড়ে। তখন মিশেল ফুকো তেহরানে গিয়ে লিখেছিলেন এটি "আধ্যাত্মিক রাজনীতি"র জন্ম। সিমোন দ্য বোভোয়ার উৎসাহিত হয়েছিলেন। জাঁ পল সার্ত্র নীরব ছিলেন। তারপর খোমিনি শরিকদের একে একে সরিয়ে দিলেন। নারী ঘরে ফিরল, সেকুলার ইরান ধ্বংস হলো, বামেরা হয় পালাল নয় গুলি খেল। যে মুজাহেদিনদের বিরুদ্ধে শ্লোগান—তারা ছিল ইসলামী মার্কসবাদী, খোমিনির সহযোদ্ধা। ইসলাম আর মার্কসবাদের মিশ্রণ। ইরানের নতুন প্রজন্ম এই মিশ্রণটাকে ক্ষমা করেনি। বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে এই পাঠটি এখনো শেখে নি। 'বামৈস্লামিক' (বাম+ইসলামিক) প্রজাতির নামকরণ আমার 'বাঙ্গুবাম=বাঙ্গুমুমিন' সূত্রেরই উপজাত।

রাশিয়ার নিজস্ব দ্বৈতনীতি মোতাবেক রাশিয়া হামাসকে সমর্থন করে। হিজবুল্লাহকে অস্ত্র দেয়। ইরানের পাশে দাঁড়ায়। একই রাশিয়া নিজের ভেতরে মুসলিম ব্রাদারহুড নিষিদ্ধ করেছে ২০০৩ সালে। সম্প্রতি আবাসিক ভবনে জামাতে নামাজ নিষিদ্ধ করেছে। ইসলামপন্থী আলেমদের গ্রেফতার করেছে। এটা স্ববিরোধিতা নয়। এটা পরিচ্ছন্ন বাস্তববাদ। শত্রুর শত্রু বন্ধু—এই নীতিতে বাইরে ইসলামপন্থীদের মদত দাও। কিন্তু নিজের ঘরে একই আদর্শ ঢুকতে দিও না। মাদক বিক্রেতা নিজে মাদক নেয় না—এই পুরনো নীতি।

রাশিয়ার দেওয়ালে অনেক মহান শিল্পকর্ম ঝোলে, কিন্তু একজন রুশ মুফতি তার কার্যালয়ে ১২২৩ সালের তাতার-মোঙ্গল আক্রমণের চিত্রকর্ম টাঙিয়েছিলেন। আর এটা নিছক ইতিহাসপ্রেম নয়। ১২২৩ থেকে ১৩১৩—এই সময়ের মধ্যে মোঙ্গলরা ইসলাম গ্রহণ করেছিল, বাতু খানের ভাই বেরকে খান হয়েছিলেন রাশিয়ার প্রথম মুসলিম শাসক, সুলতান গিয়াসউদ্দিন উজবেক ১৩১৩ সালে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করেছিলেন। মুফতির বার্তা সূক্ষ্ম কিন্তু স্পষ্ট—একসময় রাশিয়া ইসলামী শাসনের অধীনে ছিল। তাকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন, তাতার-মোঙ্গল শাসন রাশিয়াকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল, বহুজাতিক রাষ্ট্র গঠনে সহায়তা করেছিল। ভারতে মুসলিম সাম্রাজ্য নিয়েও ঠিক একই যুক্তি দেওয়া হয়। মুঘলরা ভারতকে একত্রিত করেছিল—অতএব মুঘল শাসন গৌরবের। কিন্তু যারা এই গৌরব দাবি করে তারা নিজেদের ভারতীয় নয়, মুসলিম সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী মনে করে। অর্ওয়েল বলতেন, ইতিহাস ব্যবহারের পেছনে সবসময় একটি বর্তমান রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকে। চীনও একই কাজ করে। উইঘুরদের উপর নিপীড়ন চালায়, একই সময়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে ফিলিস্তিনের পক্ষে ভোট দেয়, পাকিস্তানে জঙ্গিদের অস্ত্র দেয়, সেই অস্ত্র পাকিস্তান থেকে মায়ানমারের রোহিঙ্গা-ইসলামী জঙ্গিদের হাতে পৌঁছায়, যেমন চব্বিশের জুলাইতে ঢাকার রাস্তার চাইনিজ রাইফেলকে একে৪৭ বলে ছড়ানো গুজবে দেখা গেছে। সেই চাইনিজ রাইফেল দেখতে আবার কালাশনিকভের ধারেকাছেও না। যাহোক, সেই চীনই আবার মায়ানমারের জুন্তাকে সমর্থন দেয় যারা কিনা রোহিঙ্গা তথা মুসলমানদের বিতাড়িত করতে চায়। সমাজতন্ত্রী চীনও সেই হিসেবে রাশিয়ার মতই সন্ত্রাসের দ্বৈতনীতি প্রয়োগ করে।

বামপন্থীদের বারবার একই ফাঁদে পড়া দেখাটা হাস্যকরই বটে। ভারতবর্ষে খিলাফত আন্দোলনের সময় কংগ্রেস ও বামেরা সমর্থন দিয়েছিল। কারণ এটা নাকি ছিল সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলন। যদিও এটা কেবলই ছিল তুরস্কের খিলাফত রক্ষার উপমহাদেশীয় প্রচার-প্রয়াস, যা কিনা কামাল আতাতুর্ক নিজেই ভেঙে দেয়ার পর স্বভাবতই স্তিমিত হয়ে যায়। ১৯৭৯ সালে ইরানে বামেরা খোমিনিকে সমর্থন দিয়েছিল। কারণ মার্কিন-সমর্থিত শাহের বিরুদ্ধে আন্দোলন। ২০২৪ সালে বাংলাদেশে কিছু বামপন্থী উৎসাহিত হয়েছিল। কারণ ভারতীয় আগ্রাসনপন্থী সরকারের পতন আন্দোলন। প্রতিবার একই যুক্তি। প্রতিবার একই পরিণতি। অর্ওয়েল 'কাতালোনিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা'তে (Homage to Catalonia) দেখিয়েছিলেন, বামেরা কীভাবে নিজেদের শত্রুকে শক্তিশালী করে—কারণ তারা শত্রুর শত্রুকে বন্ধু মনে করে, শত্রুর শত্রুর আদর্শটা কী সেটা না দেখেই। ইরানের নতুন প্রজন্ম এই ভুলটা মাফ করেনি। তারা শ্লোগানে বলেছে—মোল্লা, বামপন্থী, মুজাহেদিন—তিনজনকেই বাদ দিন। এই শ্লোগানটি বাংলাদেশেও উচ্চারিত হবে একদিন।
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই জুলাই, ২০২৬ সকাল ৯:১৫
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ছোট গল্পঃ ভ্রম

লিখেছেন সামিয়া, ০৫ ই জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৩



চোখ বন্ধ করলেই আমি ধোঁয়া দেখি। ঘন, ধূসর ধোঁয়া। যেন কেউ ভেজা কাঠ জ্বালিয়েছে। তার সঙ্গে মিশে থাকে পোড়া কাপড়ের গন্ধ। কখনও মনে হয় প্লাস্টিক, কখনও মনে হয় পুরোনো... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড় আমি ভালোবাসি

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ০৫ ই জুলাই, ২০২৬ দুপুর ২:৪৩

পাহাড় আমি ভালোবাসি
...........................................



চললাম তবে তোমার সাথে,
হাতটি রেখে হাত বাড়াতে।
পিছুটানের বাঁধন ছিঁড়ে,
হারাবো ওই মেঘের ভিড়ে।

পাহাড় চূড়ায় রোদের হাসি,
শুনছো ! তোমায় ভালোবাসি।
চলবে নদী আপন বেগে,
নতুন কোনো আশার মেঘে।

ইচ্ছেগুলো পাক না ডানা,
আজকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

পৃথিবীতে শ্রেষ্ঠ সম্পদ কি?

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৫ ই জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:২১



এই মুহুর্তে আমি গাজীপুর যাচ্ছি।
সময় সকাল দশটা। রবিবার। রাস্তায় জ্যাম যেতে অনেক সময় লাগবে। লাগুক। সমস্যা নেই, হাতে অনেক সময় আছে। আজ আমার কোনো কাজ নেই। বউ বাচ্চা বাসায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

"তোমরা আমাদের মানুষদের কেন খুন করলে?"

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৫ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ৮:০১

জাপানের মানুষেরা আজও বুঝতে পারে নাই, কেন তাঁদের ছেলেমেয়েদের এভাবে হত্যা করা হলো। সেই দেশের মুরুব্বীরা এখনো এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে ফেরেন। আক্ষেপ করেন। আমার বোনের জামাই জাপানে পোস্ট ডক... ...বাকিটুকু পড়ুন

শত্রুর শত্রু

লিখেছেন তানভীর রাতুল, ০৬ ই জুলাই, ২০২৬ সকাল ৯:১৪

উগ্রবাদী আর উদারবাদী, দুটি ইসলামই একই রাজনীতি করে। তাবলীগ জামাতের লোকটি মাঠে এসে বলে মেয়েদের ফুটবল হারাম। তারপর বিশ্বকাপে সৌদি আরবকে সমর্থন করে রাস্তায় নামে। এই দুটি আচরণ পরস্পরবিরোধী নয়।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×