
০৫ দিনে ২য় সরকারি পাসপোর্ট হাতে পেলাম। কিন্তু কিছু বাজে অভিজ্ঞতাও হয়েছে।
গত বুধবার রেবিসের টিকা নিয়েই ফরিদপুর পাসপোর্ট অফিসে যাই বলে শরীর দুর্বল ও ব্যাথা ছিলো। তাই মাকে নিচে বসিয়ে দালালদের এড়িয়ে সহজে কাজ করতে উপরে গিয়ে উপপরিচালক স্যারকে পাইনি। কারণ অন্য অফিসাররা যার যার ডেস্কে ছিলেন না বলে অনেক সেবাপ্রার্থী দাঁড়িয়ে ছিলেন লাইনে। ডিডি স্যারের রুমের দরজা বন্ধ, দরজা জুড়ে দারোয়ান দাঁড়ানো যিনি সেবাপ্রার্থী কাউকে ভেতরে ঢুকতে দিচ্ছেন না। দুপুর প্রায় ২টার কিছু আগে, আমি জানতে চাইলাম তিনি লাঞ্চে বা মিটিংয়ে কিনা। কিছুই না বলে দারোয়ানই বড় অফিসারের ভাব নিয়ে জানালো ভেতরে যাওয়া যাবে না। তখন আমি জানালাম সামনের রুমে জিও ভেরিফাই করার ডেস্কে কেউ নেই, আধাঘন্টার উপরে দাঁড়িয়ে আছেন বলে বৃদ্ধারা জানাচ্ছেন। তিনি তাতেও কেয়ার করলেন না। আমি তখন সামনের সোফায় বসে ডিডি স্যারকে ফোন করলাম, কিন্তু তিনি ফোন রিসিভ করলেন না।
কিছুক্ষণ পরে দেখি ডিডির রুমের দরজা খোলা হলো, সামনের রুমেও লোকজন ঢুকছে। বুঝলাম আমার কথা ভেতরে পৌঁছেছে। ভেরিফাই করে নিয়ে আবার ডিডির রুমে গেলাম। তিনি বসতে দিলেন। এবার ডিডি স্যার (যেহেতু তিনি ৬ষ্ঠ গ্রেডে, আমি এখনও প্রমোশন পাইনি) আমাকে ধর্মীয় বাণী শুনিয়ে বুঝাতে লাগলেন ধৈর্যধারণের কী গুণ। ভাবটা এমন যেন অন্যায়ের প্রতিবাদ করে আমিই অন্যায় করে ফেলেছি! আমি বললাম আমিতো অসুস্থ শরীরেও অপেক্ষা করেছিই, আমার সাথে খারাপ আচরণ না করে তিনি আমাকে বললেই পারতেন আপনি লাঞ্চে আছেন বা মিটিংয়ে আছেন জরুরি। তাহলেই তো আমাকে আর প্রতিবাদ করতে হতো না। সাবেক এসপি আলীমুজ্জামান স্যারের উদাহরণ টেনে আমি তাঁকে বললাম, সরকারি অফিসের দরজা সেবাপ্রার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকা উচিত বলে আমি মনে করি। না হলে দারোয়ানসহ দালাওচক্রের পোয়াবারো হয়। সামান্য তথ্যের বিনিময়েও টাকা চায়, হয়রানি করে বাইরের দালালদের কাছে পাঠায় যাতে দালালদের মাধ্যমে ফিরে আসে। কিন্তু তাঁর সামনে আমাকে রেখেই দরজা খোলা রেখে সেই দারোয়ান চলে গেলো এবং একজন সাজিয়ে আনা ছাত্রকে এখানে কোনো ভোগান্তি হচ্ছে না মর্মে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য ডেকে নিলো। আমি তার পরিচয় জানতে চাওয়ায় ডিডি স্যার তাকে থামিয়ে তাকে ফেরত পাঠিয়ে দিলেন এবং আমার জন্য অধীনস্তকে ফোন করে আমার কাজটা দ্রুত করে দিতে বলে দিয়ে এ নিয়ে আর লেখালেখি না করতে বললেন।
এরপর আমি আরও এক রুম হয়ে নিচে গিয়ে ছবি তুললাম। তখন কম্পিউটারের সামনের ছেলেটা আমাকে আমার ধর্ম পরিচয় জিজ্ঞেস করলো। আমি অবাক হয়ে বললাম, হিন্দুই তো পূরণ করেছি, দেব দুলাল গুহ হিন্দু ছাড়া আর কার নাম হবে? সে জানালো, আগের অফিসিয়াল পাসপোর্টে নাকি আমার ধর্ম লেখা ছিলো 'ইসলাম'! ইদানিং নিজের ধর্ম পরিচয় নিজেই পূরণ করা যায় অনলাইনে পাসপোর্টের আবেদন করার সময়। কিন্তু আগেরবার তা করতে পারিনি, এটা তখন পূরণ করেছিলো পাসপোর্ট অফিসই। পাসপোর্ট অফিসের দালালচক্র ও দুর্নীতি নিয়ে কথা বলায় ও ডিসি স্যারকে জানানোয় তারা ইচ্ছা করে ধর্ম পরিচয় ভুল লিখে থাকতে পারে বলে আমার ধারণা। ফলে বর্ডারে আমাকে অনেক বাজে অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয়েছে যা আমি তখন বুঝি নাই যে কেন এমন হচ্ছে। আমাকে অফিসিয়াল পাসপোর্ট নিয়েও অনেকক্ষণ বারবার লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে। আমার উপর হামলাও হয়েছে ট্রেনে কয়েকবার। সে কথা আপনারা জানেন। তখন এই পাসপোর্ট অফিসের দায়িত্বে ছিলেন মো: আজমল কবির আর তাঁর কাছে গিয়েছিলাম তাঁর আগের অফিসার মানিক দেবনাথদার মাধ্যমে। দুজনই জানেন আমি হিন্দু, তবুও আমাকে কেন ইসলামের অনুসারী দেখানো হলো, কেন আমাকে সবাই ধর্মান্তরিত বয়েছি ভেবে ভুল বুঝলো আমি নিজেই তা বুঝলাম না!
এরপর সব কাগজপত্র জমা দিয়ে বের হয়ে আসার সময় দুপুর আনুমানিক ৩টার দিকেই দেখি পাসপোর্ট অফিসের লাইন খালি। এক মহিলা দেখলাম বিরবির করতে করতে যাচ্ছেন, "খালি কয় সার্ভার ডাউন, কালকে আসেন। আর কতদিন ঘুরব?" আরও কয়েকজনের থেকে নানা অজুহাতে হয়রানির কথা জানতে পারলাম। কিন্তু আমিতো আর সাংবাদিক নেই, এই অফিসেরও কেউ নই, তাই কিছু করতে পারলাম না।
বাড়ি ফিরে আসার পর লাঞ্চ করতে বসেছি, এমন সময় আবার অফিস থেকে ফোন। ছেলেটা জানালো আমি নাকি NID কার্ড জমা দেইনি! বললাম, আমিতো সব কাগজই জমা দিয়েছি, তখন কেন চেক করে বলেননি? এখন তো বাড়ি চলে এসেছি, দুই হাতে দুটি টিকা নিয়েছি বলে অসুস্থ, দু-তিনদিন আর বাইরে যাওয়া সম্ভব না। তখন ডিডি স্যারকে এ কথা জানালে তিনি ব্যবস্থা নিয়ে জানাবেন বললেন, কিন্তু পরক্ষণে আর তাঁকে ফোনে পেলাম না। তখন সেই ছবি তোলার ছেলেটিকে ফোন করে অনুরোধ করে আর অফিসে না গিয়ে কাজটা করতে পেরেছি। এজন্য ঐ ছেলেটিকে ধন্যবাদ জানাই।
জমা দেওয়ার ৫ দিন পর এস,এম,এস এলো পাসপোর্ট হয়ে গেছে, ইমেইলও এসেছে। কিন্তু গতবার আমার মায়ের পাসপোর্টের বেলায় কোনো এস,এম,এস বা ইমেইল আসেনি। কেউ ফোন করেও জানায়নি যে পাসপোর্ট হয়ে গেছে। আমিও নানা ব্যস্ততা ও অসুস্থতায় থাকায় যেতে পারিনি খোঁজ নিতে। তাই সেপ্টেম্বরে হয়ে থাকা পাসপোর্ট গত বুধবারে নিলাম।
একটা ব্যাপার লক্ষ্য করলাম, শুধু পাসপোর্ট প্রদানের কাউন্টার ছাড়া বাকি প্রায় সব কাউন্টারেই হুজুরদের আধিপত্য.. সেই দারোয়ান, ভেরিফাই যিনি করেন তিনি, নিচের কম্পিউটার ও ক্যামেরা নিয়ে বসা ছেলেটা, এমনকি ডিডি স্যারও। এমনটা ঐ অফিসে আগে কখনও দেখিনি। হুজুররা ধর্ম মেনে চলেন বলে তাঁদের থেকে ভালো সেবাই আশা করে সবাই। ধর্মীয় পরিচয় মূখ্য নয়, কে কেমন কাজ করছে কেমন সেবা দিচ্ছে সেটাই মূখ্য। কিন্তু এখানে অভিজ্ঞতা খুব একটা সুখকর হলো না।
তবে আগের চেয়ে অনেক সহজ হয়েছে সেবা। অনলাইনেই ফরম পূরণ করা যাচ্ছে, টাকা জমা দেওয়া যাচ্ছে, আবার পাসপোর্ট রেডি হয়েছে কিনা বা কোথায় কোন অবস্থায় আছে তাও কুরিয়ার সার্ভিসের মতো রিয়েল টাইমে অনলাইনে দেখা যাচ্ছে। এই আধুনিকতার পাশাপাশি দাললদের রুখে দেওয়া গেলে আর অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের থেকে আরও ভালো সেবা নিশ্চিত করা গেলে খুব ভালো হবে। পাসপোর্টের মানও আগের চেয়ে অনেক উন্নত হয়েছে। শুধু ছবিটা ফ্ল্যাশ দিয়ে তুললে মনে হয় আরও ভালো ও স্পষ্ট মানের ছবি পাওয়া যেত। দেব দুলাল গুহ।
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই মার্চ, ২০২৪ রাত ১১:৫৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



