somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

হৃদয়ে ফাইবার ব্যাকবোন

০৩ রা মার্চ, ২০০৬ বিকাল ৪:৩০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আজকের দিনটায় বেশ ঝামেলা হবে বোঝা যাচ্ছে। আমি যাব অফিসে কিন্তু মহাখালীর এই জ্যামে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এখন অব্দি 40 মিনিট শেষ, জানি না আরো কতক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে। প্রাইভেট ভার্সিটি থেকে বিবিএ পাস করার পর রীতিমতো 'ফাইট' দিয়ে এই বছরেই চাকরিটা জোগাড় করেছি। এখন পর্যন্ত আমাকে চাকরি থেকে সরানোর ব্যাপারে আমার ওপরওয়ালা চেষ্টায় আছে। একটু উনিশ-বিশ হলে আমি শেষ। আমার স্থলে চলে আসবে তার শ্যালক। এতে তার শ্বশুরবাড়িতে সম্মান আত্তিই ঘটবে। মানুষমাত্রই পরের বাড়িতে নিজের অবস্থান করতেই ব্যস্ত। এই গোপন সত্য অফিসের সবাই জানে। তবে আমার খারাপ যাচ্ছে না, সময়টা কাজেই লাগছে। কিন্তু এই মহা জ্যাম প্রতিদিন চলতে থাকলে মনে হয় না চাকরিটা চালানো সম্ভব হবে। অবশ্য চাকরিটা যে খুব আনন্দ নিয়ে করছি তাও নয়। যদিও মাস শেষে মোটা অঙ্কের টাকা পকেটে আসছে তবুও করতে হয় কিছু একটা, সে জন্যই এই চাকরি। আমার মধ্যে অস্থিরতা খুব বেশি। কোনো কাজই একটানা করতে পারি না, আর এটাই সম্ভবত আমার জীবনের গতিটা স্বাভাবিক হতে দেবে না। জ্যাম ছুটে গেছে। প্রিমিয়াম বাস চলছে আর এসির শৈতপ্রবাহে চোখে মাদকতা সৃষ্টি করছে । কী জানি এরা এসির সঙ্গে ঘুমের কিছু মিশিয়ে দেয় কিনা! অবশেষে আমি শৈবাল মাহমুদ সকাল 10টার অফিস পেঁৗছলাম 12টায়। বনানী থেকে ফার্মগেট আসতে সময় খরচ হলো পুরো সোয়া 2 ঘণ্টা।
বিকেলে বাসায় বসে গান শুনছিলাম আর কম্পিউটারে ই-মেইল দেখার পাঁয়তারা করছি। এমন সময় বাসার কলবেল ফ্যাস ফঁ্যাস করে উঠল। গত দু মাস থেকে কলবেলের এই হাল। কাজের ছেলেটাকে বলেছিলাম পাল্টাতে, কিন্তু ওর মনে থাকবে না! আর এখন উঠতেও ইচ্ছে করছে না, কিন্তু উপায় নেই। একটু আগে ছেলেটাকে পাঠিয়েছি পেপসি আনার জন্য। বাধ্য হয়ে উঠতেই হলো। দরজা খুলতেই সামনে বিশাল ফুলের তোড়া। শাহেদ আর দীপু দাঁড়িয়ে আছে। শাহেদ চিটাগাং গিয়েছিল ঘুরতে। ও কবে ঢাকা এসেছে একবার ফোন করে জানানোর প্রয়োজনবোধ করেনি। ওর মুখ দাড়িতে ভর্তি। সাধুবাবা সাধুবাবা অবস্থা! ওর মধ্যে ভবঘুরে ভাবটা আমার থেকেও পাঁচগুণ বেশি। পার্থক্য হলো আমি কবিতা লিখি আর ও লেখে না।
-'শ্যাওলা মিয়া, ফুলগুলা ধরো। 150 টাকা দিয়া কিনছি। ফুল কিনতে গিয়া পকেটের সব টাকা শ্যাষ। এখন আমারে 500 টাকা লোন দেও।' কথাগুলো এক নিঃশ্বাসে দীপু বলে ফেলল। দীপুর এই এক দোষ_ কথা আস্তে বলতে পারে না এবং কথার মধ্যে কোনো বাহুল্য নেই। আর এই দুজন আমার নামের অর্থ শৈবাল থেকে করেছে শ্যাওলা। অবশ্য ইদানীং এদের মুখে হঠাৎ শৈবাল শব্দটা শুনলে নিজেই চমকে উঠি। আমি আসলে শ্যাওলা নামটাকেই বেশি পছন্দ করি। কিন্তু তা প্রকাশ করি না।
-'ফুলের জন্য ধন্যবাদ দেওয়া লাগবে নাকি? তোদের তো দিয়া দিয়া আমি শ্যাষ হইয়া গেলাম। এখন বাকি আছে খালি থ্যাংকস।' কথাটা বলে আমি হাসতে লাগলাম। আমি কখনোই এই দুই বন্ধুর জন্য প্রাণ খুলে কিছু খরচ করতে পারিনি; বরং ওরাই আমার জন্য অনেক কিছু করেছে। এমনকি আমি এই যে দুই রুমের বাসাটা নিয়ে আছি, তাও দীপুর খালার বদৌলতে। এত কম টাকায় বনানীতে কেউ বাসা ভাড়া দেবে না। আজকে আমার জন্মদিন। আমি জানতাম কেউ আমাকে উইশ করবে না। কিন্তু এই দুজনের কথা আলাদা। আমার জন্য এরা 'বন্ধু অন্ত প্রাণ'।
-'এখন এত কথা কওনের কাম নাই। চল, শার্টটা গায়ে দেও, আমাদের খাওয়াইবা। পিজা হাটের পিজা আমরা আইজ খামু, ট্যাকা বাইর করো মামু_ বলেই হাসতে থাকে সে। নিজের কাব্য প্রতিভায় মুগ্ধ। আমি দ্রুত তৈরি হয়ে নিই। বেশি দেরি করলে উল্টা আমাকে এরা খালি গায়েই নিচে নামাতে পারে। দীপুর মাথার কোনো ঠিক ঠিকানা নেই।
নিচে দীপুর টয়োটা মার্ক-2 দাঁড় করানো। ওরা দুজন সামনে আর আমি বরাবরের মতো পেছনে। দীপু আমার জন্য কখনো গাড়িতে সিগারেট খায় না। আমার অ্যাজমার সমস্যার কথা চিন্তা করে সে তার এই প্রিয় কাজটা করে না। বেচারা মনে হয় খুব কষ্ট পায়। শুনেছি সিগারেটের নেশা সব নেশার থেকে ভয়ঙ্কর। দীপু খোশ মেজাজেই গাড়ি চালাচ্ছে। আজকে গাড়ির গতি বেশ কম। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের এটিএম মেশিনের সামনে দীপু গাড়ি থামিয়ে ভেতরে গেল। কিছুক্ষণ পর ফিরে এল। গাড়িতে এসেই বলল, 'পিজা হাট কেনসেল। জন্মদিনের দিন এই কবি শালার পেটে পিজা সহ্য হবে না। এরে বাঙালি খাবারের দোকানে নিতে হবে।' শাহেদ মাথা দুলিয়ে হাসতে লাগল। ও হাসলে মাথা পেন্ডুলামের মতো দুলতে থাকে। হাসতে হাসতে যোগ করল_ 'ওরে টাকি মাছের ভর্তা, শুঁটকি ভর্তা, আলু ভর্তার দোকানে নিয়া যা। আর বাবুর্চিরে স্পেশাল ইন্সট্রাকশন দিয়া বেশি করে ঝাল দিতে ক। পরের দিন সকালে শালায় বাথরুম থাইকা এলে বাংলা সাহিত্যে ঝালের একখান কবিতা যোগ হবেই, এতে কোনো সন্দেহ নাই।' এই কথায় আমরা হাসতে লাগলাম। আমাদের এই হাসির শব্দে রাস্তার ধারের এক চাচামিয়া বিড় বিড় করে উঠল। পেছনে তাকিয়ে দেখি কেমন করে যেন চেয়ে আছে। ভাবছে বুঝি 'বড়লোকের পোলাপানরা সব গেছে!' দীপু গাড়ি দাঁড় করালো 'রসনা বিলাসে'। এদের খাবার এর আগেও আমরা এক সঙ্গে খেয়েছি। রূপচাঁদার আইটেম এদের অসাধারণ হয়। সন্ধ্যার পর অব্দি আমাদের ভোজনপর্ব চলল। আরো কিছুক্ষণ থাকা যেত কিন্তু শাহেদের জন্য থাকা গেল না। শাহেদের টার্ম ফাইনাল সামনে। চিটাগাংয়ে অনেকটা সময় নষ্ট হয়েছে। এখন আর সময় নষ্ট করলে নাকি বুয়েট পাস করতে পারবে না। শাহেদ এবার মেকানিকেল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শেষ বর্ষে। তাকে যেতে হবে আজিমপুর। 'বালের পরীক্ষায় আমার লাইফ হেল বানায়ে দিবে। শালার কোন দুঃখে যে বুয়েটে ভর্তি হইছিলাম!'-শাহেদ আক্ষেপ করে। আমরা উঠলাম। বরাবরের মতো বিল দিল দীপু। আমাকে বাসায় নামিয়ে দিয়ে গাড়ি থেকে গলা বাড়িয়ে দীপু বলল, 'কালকে বাসায় আসিস পারলে, মা তোরে ডাকছে।' আমি হাত নাড়লাম। বিদায় পর্বটা হলো খুবই সংক্ষিপ্ত।
চারতলা সিঁড়ি ভেঙে ছাদের মধ্যে আমার দুই রুমের বাসা। সামনে খোলা ছাদ। রাতে হাঁটাহাঁটি করা যায়। ঘরে ঢুকে দেখি ছোট্ট রান্নাঘরে কাজের ছেলেটা রান্না চাপিয়েছে। আমি আর তাকালাম না কী রান্না করছে সেটা দেখার জন্য। ঘরে ঢুকে কমঙ্িউটার অন করে মেইল দেখা শুরু করলাম। আমার ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট কানেকশন। তাই কম্পিউটার অন করলেই ইন্টারনেট পাওয়া যায়। নতুন কোনো মেইল নেই। শুধু ইয়াহু ক্যালেন্ডার সার্ভিস থেকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা পাঠিয়েছে। যদিও পুরো মেইলটাই কম্পিউটার প্রোগ্রাম দিয়ে তৈরি, তারপরেও ভালো লাগল। সময় কাটানোর জন্য চ্যাট-আড্ডার সিদ্ধানত্দ নিলাম। তা ছাড়া আজকে আমার জন্মদিন, কারো সঙ্গে কথা বললে খারাপ হয় না। আইআরসি1 ডাল নেটে2 সংযুক্ত হলাম। আজ মনটা বেশ ভালো তার ওপরে জন্মদিন, তাই প্রতিদিনের কমন নাম 'শ্যাওলা কবি' না নিয়ে নিলাম 'ভবঘুরে মেঘ'। তারপর ঘুকে গেলাম বাংলাদেশ রুমে3। আজকে রুমে মনে হয় কোনো ঝগড়া চলছিল। কারণ রুমের মেইন পর্দায় লেখালেখির কায়দা বন্ধ করে রাখা আছে। আমার প্রতি ব্যক্তিগত বার্তা এল। রোখসানা নামের কেউ বার্তাটি দিয়েছে। শুধুই 'হাই' যার জবাবে আমি লিখলাম 'হ্যালো'। এরপর আমাকে লিখল 'নামটা তো বেশ সুন্দর, কবি নাকি?' জবাবে লিখলাম, 'এই দেশে কাক আর কবির সংখ্যা নিয়ে তো একটা বিতর্ক আছেই। কারো মতে কাকের সংখ্যা বেশি আর কারো মতে কবির। তা সেই ধারায় আমিও কবি। মানে কবিতা লেখার চেষ্টা করি।' 'তাহলে একটা কবিতা শোনান। অনেক দিন কবিতা শোনা হয় না।' জবাবে লিখলাম, 'ভ্রমরীর মতো চুপে সৃজনের ছায়াধূপে ঘুরে মরে মন/আমি নিদালির অাঁখি, নেশাখোর চোখের স্বপন!/নিরালায় সুর সাধি, বাঁধি মোর মানসীর বেণী,/মানুষ দেখেনি মোরে কোনোদিন, আমারে চেনেনি!' জীবনানন্দ দাশের 'কবি' ঝাড়া মুখস্ত লিখে গেলাম। এরপর অনেকক্ষণ কোনো জাবাব নেই ওই প্রান্ত থেকে। অবশেষে সে লিখল, 'খুব ভালো লাগল কবিতাটা। খুবই সুন্দর, কেমন যেন হাহাকার, মাথা তছনছ করে দেয়। কবে লিখছেন এটা? আমি বললাম, 'এটা জীবনানন্দ দাশের কবিতা। আমার না।' ওপারের মানুষটি বলে, 'আপনার নিজের কোনো কবিতা নেই? তবে যাই হোক কবিতাটা আমার ভালো লেগেছে। আমি জীবনানন্দের সব কবিতা পড়িনি। তাই বুঝতে পারিনি। আপনার কবিতা শোনান। আমি লিখলাম, 'ভালোবেসে হেসে হেসে/আমিও যাব মিশে/কোন একদিন,/রবে শুধু ছায়ার মতোন/ভালোবাসা অরূপরতন/আমি প্রতিদিন।' 'বাঃ এটা আপনার কবিতা! খুব ভালো। কিন্তু এখানেও কেমন যেন দুঃখ। কবিতায় এত হাহাকার কেন? আনন্দের কোনো কবিতা জানেন না?' আমি লিখলাম, 'আমি সব সময় উল্টা কাজ করি তো তাই আনন্দের দিনে আমি দুঃখের কবিতা পড়ি। এতে আমি বেশ ব্যালান্সে থাকি।' 'তো কী এমন আনন্দের ঘটনা ঘটেছে আজকে?' আমি বললাম, 'আজ আমার জন্মদিন'। 'ওয়াও! শুভ জন্মদিন।' এর জবাবে আমি তাকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করলাম। তাকে জানিয়ে দিলাম আমার নাম শ্যাওলা, থাকি বনানী, একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে কাজ করি। মার্কেটিং অফিসার। সে জানাল তার নাম রোখসানা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফলিত রসায়ন বিভাগে প্রথম বর্ষে পড়ে। থাকে আজিমপুর। আগে তারা বনানীতেই ছিল। 7 নম্বর রাস্তায়। আমি শুনলাম। কবিতা নিয়ে মেয়েটির ভালোবাসা আছে তা বুঝতে পারলাম। অবশেষে আমরা ই-মেইল ঠিকানা আদান-প্রদান করলাম। আজকের মতো আলাপ শেষ হলো। বিদায় নিলাম চ্যাট রুম থেকে।
আজকে অফিসে গিয়েই প্রথমে আমার মেইল চেক করতে বসলাম। মেইল বঙ্ েরোখসানা ইয়াসমিনের কাছ থেকে একটি মেইল এসেছে। খুললাম। পড়লাম। আবার পড়লাম। আমার চোখে স্বপ্ন খেলা করছে। কী যে ভালো লাগছে! একেই বলে বুঝি নিজেরে হারায়ে আবারও আবিষ্কার। এরই নাম বুঝি স্বপ্নের বাস্তবে পা দেওয়া। মেয়েটি আমার কবিতার প্রতি তার স্বপ্নকে জুড়ে দিয়ে বিশাল চিঠি লিখেছে। আরো বলেছে আজকে বিকেল 5টায় যেন অবশ্যই চ্যাট রুমে থাকি। আজ আমি অফিস করছি বেশ ঘোরের মধ্যে। কোনো কাজ মাথায় আসছে না। আমার এই অবস্থা দেখে মুর্শিদ সাহেব আমাকে বাসায় যেতে বললেন। মুর্শিদ সাহেব আমার ঊধর্্বতন কর্মকর্তা। তার কথা শুনতেই হলো। বাসায় এসেই চ্যাট রুমে ঢুকে বসেই রইলাম। চেয়ার থেকে উঠলাম না। মোবাইল ফোন বন্ধ করে দিলাম, যাতে কেউ বিরক্ত করতে না পারে। 5টা বাজে, তবু সে আসছে না। আমি বসে আসি শকুনের মতো। শেষ পর্যন্ত সে এল। দেরির কারণ ভার্সিটি থেকে দেরিতে ফেরা, আর ইন্টারনেটের সংযোগ পেতে সমস্যা। আমরা কথা শুরু করলাম। আমার স্বপ্নের কথা বললাম। যে স্বপ্নগুলোকে শাহেদ এবং দীপু পাগলামি ছাড়া আর কিছুই মানতে রাজি নয়, সেগুলো বললাম। মেয়েটি আমার স্বপ্নের সাথে তার স্বপ্নের নৌকা ভাসাল। ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথে আমাদের স্বপ্ন ভেসে বেড়াতে থাকল।
প্রতিদিন অফিসের ফোনে সে ফোন করে, আমরা কথা বলি। কোনো দিনও মোবাইল ফোনে সে ফোন করে না। এমনকি মোবাইল নম্বর পর্যন্ত নিতে তার আগ্রহ নিই। খারাপ যাচ্ছে না। প্রতিদিন অফিসে যাই। বিকেলে বাসায় এসে নাস্তা খেয়ে রোখসানার সঙ্গে চ্যাট করি। আমার কবিতার খাতা থেকে ওকে কবিতা শোনাই। জীবনানন্দের বই থেকে কবিতা পড়ি। ও শোনে। বাড়াবাড়ি রকমের উচ্ছাস প্রকাশ করে। ফলত আমার স্বপ্নের গাঁথুনি পাকাপোক্ত হতে থাকে। যার মনে কবিতা লেখার ঝোঁক তার তো এমন মানুষ পছন্দ হবেই। এই রুটিনে এক মাস চলে গেল। এ সময় শাহেদ এবং দীপুর সঙ্গে দেখা হয়নি। শুধু ফোনেই যোগাযোগটা অক্ষুণ্ন আছে।
এক মাস পরের কথা। রোখসানার কাছে আমি ওর ছবি চাইলাম। ও বলে, 'ছবি তো দিতে পারব না। ভাইয়ার নিষেধ আছে। তাছাড়া আমার ছবি স্ক্যান করা নেই। আমি আপনাকে ছবি দিতে পারব, কিছুদিন পর।' 'তোমার ভাইয়া তো পীরবাবা হয়ে গেছে। এত পণ্ডিতি করে কেন?'- আমি লিখলাম। সে লিখল 'পণ্ডিতি তো করবেই। ভাইয়া খুব ভালো ছাত্র। এবার মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হচ্ছে। বুয়েটে আছে।' আমি আর কি বলি! অভিমান করে চ্যাট রুম থেকে বেড় হয়ে যাই। পরের দিন শুক্রবার। অফিস বন্ধ। মনের মধ্যে অভিমানের বোঝা। তাই বেড় হলাম শাহেদের বাড়ির উদ্দেশে। ওর মা সংবাদ দিয়েছেন। শুক্রবার তাই রাস্তাঘাট ফাঁকা। আজিমপুর যেতে বেশি সময় লাগল না। শাহেদদের ফ্লাট তৃতীয়। বেল চাপলাম। দরজা খুলে দিল শান্তা, শাহেদের বোন। 'কেমন আছো শান্তা? সব খবর ভালো?' শান্তা স্বভাবসুলভ মিষ্টি করে হাসল, কিছু বলল না। 'শাহেদ কোথায়? ওকে ডাক দাও আর আমাকে এক গ্লাস ঠাণ্ডা পানি খাওয়াও।' শান্তা আমার চোখের দিকে তাকিয়ে শুধু বলল, 'আচ্ছা'। আমার শরীর রিন রিন করে ওঠে। রোখসানার সঙ্গে মিল আছে গলার। হয়তো মনের ভুল। রোখসানার কথা সব সময় ভাবি, তাই হয়তো সবার গলা তার মতো মনে হয়। শাহেদ এল, সঙ্গে তার মা। আমি দাঁড়িয়ে সালাম দিলাম। শাহেদের মা আমাকে বসতে বললেন। আমি বসলাম। শান্তা পানির গ্লাস নিয়ে সামনে দাঁড়াল। পানির গ্লাস নিতে গিয়ে তার চোখের দিকে তাকালাম। অপূর্ব সুন্দর সে চোখ। ডাগর ডাগর চোখে রাজ্যের সরলতা। চোখের মধ্যে যেন নিসর্গ অাঁকা আছে শিল্পীর তুলি দিয়ে। আমি পানি শেষ করলে শান্তা চলে গেল। শান্তা কোনোদিনও কথা বলে না। লক্ষ্মী স্বভাবের মেয়ে। এমন ভালো মেয়েকে যে ঘরে পাবে তার ভাগ্যের কথা চিন্তা করে হিংসা লাগে রীতিমত। শাহেদের মা জানালেন আসল খবর। শান্তার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। ছেলে মেরিন ইঞ্জিনিয়ার। চিটাগাংয়ে বাড়ি। শুনে আমি খুবই খুশি হই। যোগ্য পাত্রই পাওয়া গেছে। আমাকে দিয়ে বিয়ের কার্ডের দাওয়াতপত্রের লে-আউট করানোর ইচ্ছে। আমি আরো খুশি হয়ে উঠি। শান্তার মতো লক্ষ্মী মেয়ে তার ওপর শাহেদের বোন। এর বিয়ের কার্ডের দায়িত্ব নিতে আমার আনন্দ হওয়ারই কথা। বরপক্ষ, কনেপক্ষের সমস্ত কিছু কাগজে লিখে দিতে বললাম। শাহেদ তা আমার পকেটে ঢুকিয়ে দিল। বাসায় ফিরলাম তাড়াতাড়ি।
আমার পৃথিবী অন্ধকার। বাড়িঘর সব দুলছে। শুধু মনে হচ্ছে, আমি চেয়ার থেকে গড়িয়ে পরে যাচ্ছি। চেয়ারে বসে ঘুমালে পরে ঘুম ভাঙার সময় যেরকম অনুভূতি হয় অনেকটা সেরকম মনে হচ্ছে। আমি দেখছি কনের পরিচিতি। কনের নাম রোখসানা ইয়াসমিন (শান্তা)। ফলিত রসায়ন, প্রথম বর্ষ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। আমার ক্ষণ-ধৈর্য-স্বভাব এবং ঔদাসীন্য কোনো দিন কোনো কিছু জানার আগ্রহ তৈরি করেনি। শাহেদদের বাসার মানুষ সম্পর্কে। আমি শুধু শাহেদ আর দীপুরই খবর রাখতাম। সে রাতেই আমি খুলনা রওনা হলাম, আমার বাড়ি। যাওয়ার আগে দীপুকে ফোন করে বললাম, 'শাহেদকে বলিস গুরুত্বপূর্ণ কাজে বাড়ি যাচ্ছি তাই বিয়ের কার্ডের কাজটা করতে পারলাম না।'
11 দিন খুলনায় কাটানোর পর আজ সকালে ঢাকায় ফিরেছি। আজ শান্তার বিয়ের অনুষ্ঠান। গতকাল চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে আমাকে, জেনেছি মোবাইলে। আমি চুপচাপ বন্ধ কম্পিউটার স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছি। দুুুুপুরের একটু আগে দীপু এল। 'ওই শালা কবির বাচ্চা, আইজ শান্তার বিয়ার অনুষ্ঠান আর তুমি শালা থাকো খুলনা। আমি আর শাহেদ দৌড়াইয়া দৌড়াইয়া ফুল প্যান্টরে হাফপ্যান্ট বানায়া ফালাইলাম আর তুমি এখনো বইসা আছো?' আমি হাসলাম। আমার চোখের নিচে কালি। দীপুর এসব নিয়ে মাথাব্যথা নেই। 'দীপু আমারে একটা র্যাপিং পেপার আইনা দে তো।' দীপু পেপার আনতে গেল বিনা বাক্য ব্যয়ে। দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সেই জীবনানন্দ দাশের কাব্যসংগ্রহ আমার হাতে, যেটি থেকে শান্তাকে রাত জেগে জেগে কবিতা শোনাতাম, তার প্রথম পাতায় লিখলাম, 'আমিও যাব মিশে/কোনো একদিন।/তোমার হাতের পরে অন্য একটি হাত।' দীপু ফিরে এসেছে। আমাকে সাহায্য করছে বইটা সুন্দর করে প্যাকেট করতে। দুপুরে দুজনে বের হলাম ধানমন্ডির পার্টিপ্যালেস কমিউনিটি সেন্টারের উদ্দেশে। সেখানে আজ অনেক হৈচৈ। বইয়ের প্যাকেটটা হাতে নিয়ে কনের স্টেজের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি স্থির চোখে। খুব সুন্দর করে সাজিয়েছে শান্তাকে। চোখ ফেরানো যাচ্ছে না। প্যাকেটটি হাতে তুলে দিলাম, আমার হদয়তান্ত্রিক নিউরাল নেটওয়ার্ক ডিসকানেক্ট হলো। আর দাঁড়াই না। হাঁটা শুরু করি। বুকের ভেতর নিরো তার বাঁশি বাজানো শুরু করেছে। কিছু একটা ধ্বংস তো হবেই। ফাইবার অপটিকে ভেসে বেড়ানো আমার ব্যাকুলতা ইন্টারনেট বুঝুক বসে বসে, কোনো দায় নেই আমার।

পরিশিষ্ট
1। আইআরসি (ওজঈ-ওহঃবৎহবঃ জবষধু ঈযধঃ)-ইন্টারনেটে কোনো একটা সার্ভার নেটওয়ার্ককে ব্যবহার করে আড্ডা দেওয়ার বিশেষ সার্ভিস।
2। ডাল নেট (উঅখ ঘঊঞ-িি.িফধষ.হবঃ)-ইন্টারনেটে আড্ডা দেওয়ার সবচেয়ে বড় সার্ভার নেটওয়ার্ক।
3। চ্যাট রুম-আড্ডা দেওয়ার সার্ভার নেটওয়ার্কে নির্দিষ্ট কোনো স্থান, যেখানে রুমের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী লোকজন প্রবেশ করে আড্ডা দেয়। সাধারণত এই রুমগুলোর নাম দেশের নামে হয়ে থাকে, যাতে সেই দেশের লোকজন এখানে প্রবেশ করে আলাপ জমাতে পারে।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০
১৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

হিন্দু মুসলমান ভুলে গিয়ে, আমরা সবাই মানুষ হই

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৩ রা মে, ২০২৬ দুপুর ১:৫৭



আমি জন্মগত ভাবে মুসলমান।
অবশ্য ধর্মীয় নিয়ম কানুন কিছুই মানতে পারি না। মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় সে মানুষ। এখন তো আর এটা ফকির লালনের যুগ না। মানবিক এবং সচেতন... ...বাকিটুকু পড়ুন

নান্দাইলের ইউনুস ও স্বপ্নভঙ্গের বাংলাদেশ

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০৩ রা মে, ২০২৬ বিকাল ৩:৪০


নব্বইয়ের দশকে বিটিভিতে প্রচারিত হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয় একটি নাটকে একজন ভাড়াটে খুনীর চরিত্র ছিল। খুনীর নাম ইউনুস - নান্দাইলের ইউনুস। গ্রামের চেয়ারম্যান তার প্রতিদ্বন্দ্বী একজন ভালো মানুষ স্কুল শিক্ষককে হত্যার... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্বনির্ভর অর্থনীতি থেকে ঋণনির্ভর, আমদানিনির্ভর, পরনির্ভর রাষ্ট্রে পরিনত হতে যাচ্ছি।

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৩ রা মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৩৪




মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কাছে নতজানু হয়ে যে রাষ্ট্রগুলো নিজের অর্থনীতি, কৃষি আর ভবিষ্যৎ বিক্রি করে দেয়- তার পরিণতি কী, তার জীবন্ত উদাহরণ পাকিস্তান। কোটি কোটি মানুষকে ভিক্ষুক বানানোর সেই পথেই... ...বাকিটুকু পড়ুন

এরা খুবই বিপদজনক

লিখেছেন শ্রাবণ আহমেদ, ০৩ রা মে, ২০২৬ রাত ১১:০১

যে তোমার সাফল্য দেখে হিংসে করে,
যে তোমার বিপদ দেখে খুশি হয়,
যে তোমার সামনে এক আর পেছনে আরেক।
তাকে তোমার গোপন কথা কিংবা তোমার কোনো পরিকল্পনার কথা বলতে যেও না।
সবসময় তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্পিরিট শোন বাই আমেরিকান এয়ারলাইন্স-এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত!

লিখেছেন ঢাকার লোক, ০৪ ঠা মে, ২০২৬ ভোর ৪:১৫

গতকালের একটা বড় খবর ছিল আমেরিকার একটি অন্যতম জনপ্রিয় বিমান সংস্থা স্পিরিট এয়ারলাইন্স দেউলিয়া হয়ে তাদের সব সেবা তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে। বেশ কিছুদিন ধরেই স্পিরিট অর্থনৈতিক সংকটে হাবুডুবু খাচ্ছিলো,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×