somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নবীপ্রেমের গল্প

১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৬ দুপুর ১২:১৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

হৃদয়ের মেহমান
নকীব মাহমুদ

রাত তখন গভীর। মক্কার আকাশে জ্বলজ্বল করছে লক্ষ তারা। পুরো শহর গভীর ঘুমে নিমগ্ন। ঠিক তখনই তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে নেমে আসেন রাস্তায়। এগিয়ে যান চুপি চুপি; নি:শব্দে। বার বার পেছনে ফিরে তাকান। হায় মাতৃভূমি! কষ্টে বুকটা ফেঁটে যায়।

কত রাতইতো তিনি জেগে জেগে কাটিয়েছেন। অন্ধকারে হেঁটেছেন মক্কার অলি-গলি। কখনোই তার প্রিয় শহরটাকে এতো অসহায় মনে হয়নি। আজ তাঁর বুকটা ফেঁটে যাচ্ছে বিচ্ছেদের বেদনায়। ভালোবাসা বুঝি একইে বলে! তিনি বার বার পিছনে ফিরে তাকান। “বিশ্বাস করো, ওরা যদি আমাকে তোমার বুক থেকে বের করে না দিতো, তাহলে কখনোই তোমাকে ছেড়ে যেতাম না।” নিজের মাতৃভূমির দিকে ফিরে ফিরে বার বার তিনি চোখ মুছেন।
আবারো হাঁটেন। হাঁটতে হাঁটতে একসময় পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে কাছের বন্ধুটির দরোজার সামনে এসে দাঁড়ান। কড়া নড়ে উঠার আগেই খুলে যায় দরোজাটা। তিনি অবাক হয়ে দেখেন, বন্ধ যে তার আগে থেকেই সেজে আছেন তাঁর অপেক্ষায়।
“যেদিন থেকে আপনার মুখে হিজরতের কথা শুনেছি সেদিন থেকেই তৈরি হয়ে আছি। রাতকে হারাম করে দিয়েছি; কখন আপনি আসেন তাই।” বিনয়ের সঙ্গে বলেন বন্ধুটি।
এই তো প্রকৃত বন্ধুত্ব। এই তে বন্ধুর জন্য বন্ধুর ভালোবাসা! বন্ধুর অকৃত্রিম ভালোবাসায় তিনি আবেগে আপ্লুত হয়ে ওঠেন। গভীর ভালোবাসায় নিজের বাহুবন্ধনে জড়িয়ে নেন বন্ধুকে।

তখনো পুরো শহর ঘুমিয়ে। রাত জাগা পাখির কিচির-মিচির আকাশে বাতাসে। তারাগুলো ঠিক আগের মতোই জ্বলছিলো। সবার অজান্তে পেছনের দরোজা দিয়ে বেরিয়ে পড়েন তারা। যেভাবেই হোক সূর্য উঠার আগেই ছাড়তে হবে মক্কাভূমি। চলে যেতে হবে শত্রুদের নাগালের বাইরে।

ঘর থেকে বেরিয়ে পথে এসে দাঁড়ান তারা। কোন পথ ধরে এগুবেন ভাবতে থাকেন। উত্তরের প্রধান সড়কটি চলে গেছে মদিনার দিকে। সকালে যখন কাফেররা বুঝতে পারবে তাদের শিকার হাত ছাড়া হয়ে গেছে তখন প্রথমেই তারা এ পথটি ধরে খুঁজতে থাকবে। মদিনায় যাওয়ার এ পথটিই তাদের প্রধান টার্গেট হবে। আর মক্কা থেকে দক্ষিণে যে পথটি বের হয়েছে সেটি চলে গেছে ইয়েমেনের দিকে। শাখা পথ হওয়ায় কাফেরদের সন্দেহ এ দিকটায় পড়বে না। তিনি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছিলেন কোন পথ দিয়ে মক্কা থেকে বের হবেন। তার ভাবনা দেখে সফরসঙ্গী; প্রিয় বন্ধু আবু বকর রা. বলে ওঠেন, “ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমার মনে হয় দক্ষিনে ইয়েমেনগামী পথটি ধরে হাঁটলেই সবচে ভালো হয়।

তিনিও এমনটাই ভাবছিলেন। ওদিকে সকাল হয়ে এলো বলে। তিনি আর সময় ক্ষেপণ করতে চাইলেন না। বন্ধু আবু বকর রা. কে বললেন, আবু বকর, চলো দক্ষিণের পথটি ধরেই এগিয়ে যাই। ওরা সকালে যখন আমাদেরকে দেখবে না তখন উত্তরে মদিনার পথটি ধরেই আগে খোঁজবে।

চাঁদের আলোয় র্দীঘ পাঁচ মাইল পথ অতিক্রম করে অবশেষে ‘গারে সওরের’ সামনে এসে দাঁড়ান তারা। ততক্ষণে সূর্য রাঙিয়ে দিয়েছে আরবের আকাশ। হয়তো কাফেররা খুঁজতে বেরিয়ে গেছে তাদেরকে। তিনি ভাবলেন, দিনের আলোয় এভাবে মক্কা ছাড়া যাবে না। সিদ্ধান্ত নিলেন, আপাতত গারে সওরের কোনো একটি গুহায় আশ্রয় নিবেন।

চোখের সামনে আকাশছোঁয়া পর্বত। এখানে ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে পাথরের পর পাথর। জায়গাটায় কখনো কোনো মানুষের ছোঁয়া লেগেছে বলে মনে হয় না। তিনি ও আবু বকর রা. দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছেন, কীভাবে আশ্রয় নেবেন পর্বতের গুহায়। পেছনে শত্রুরা। এদিকে সময়ও বেশি নেই। এতো কিছুর পরও তাঁর চেহারায় চিন্তার লেশমাত্র নেই। ভাবলেশহীন কন্ঠে আবু বকর রা. কে ডেকে বলেন, “আবু বকর! চলো এখানেই কোনো গুহা খুঁজে নেই।”
তিনি তাঁর পবিত্র জুতা মুবারক খুলে হযরত আবু বকর রা. এর হাতে দিয়ে পায়ের এক কোণ দিয়ে হাঁটতে লাগলেন। তিনি এই কৌশল অবলম্বন করেছেন যাতে শত্রুরা তাঁদের অবস্থানের ব্যাপারে জানতে না পারে।

কন্টকাকীর্ণ পথ পেরিয়ে অবশেষে একটি গুহা খুঁজে পেলেন। হযরত আবু বকর রা. চিন্তিত কন্ঠে আরজ করলেন, “ইয়া রাসুলুল্লাহ! আমি আগে এতে প্রবেশ করে ভালোভাবে দেখে নেই তারপর আপনি প্রবেশ করুন।”

হযরত আবু বকর রা. গুহায় প্রবেশ করে অনেকগুলো সাপের গর্ত দেখে চিন্তায় পড়ে যান। “হায় এতে আমার প্রিয় নবি কীভাবে থাকবেন!” সব ভেবে নিজের কাপড় ছিড়ে ছিড়ে গর্তের মুখগুলো বন্ধ করে দেন। তারপরও দুটো গর্ত বাকি রয়ে যায়। আবু বকর রা. গভীর দু:শ্চিন্তায় পড়ে যানÑ এই ছিদ্র দুটিই যদি বন্ধুর বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়! তাহলে উপায়?
তিনি সিদ্ধান্ত নেননি নিজের পা দিয়ে বন্ধ করে রাখবেন ছিদ্র দুটি। করলেনও তাই।
এবার তিনি নিশ্চিন্ত। প্রানের বন্ধু; আখেরি নবি এবার নিরাপদ। গুহা থেকে মুখ বের করে ডাকেন, “ ইয়া রাসুলাল্লাহ! দয়া করে গুহায় প্রবেশ করুন।”

দীর্ঘ সফরের ক্লান্তিতে আবু বকর রা. এর কোলেই মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েন তিনি। হযরত আবু বকর রা. জেগে থাকেন। দুচোখের পাপড়ি এক করেন না একটি মূহুর্তের জন্যও। যদি প্রিয় নবির কিছু দরকার হয়, তাই।

হঠাৎ এক সাপ এসে দংশন করে হযরত আবু বকর রা. এর পায়ে। মূহুর্তেই পুরো শরীর নীল হয়ে যায়। ফুরিয়ে যেতে থাকে সব শক্তি। কিন্তু তখনো তিনি ছিদ্রের মুখ থেকে পা নড়ান না। যদি এতে হুজুর সা. এর ঘুম ভেঙে যায়। যদি তিনি কষ্ট পান। কিন্তু বিষের জ্বালা আর কতক্ষণ সহ্য করা যায়। তাইতো নিজের অজান্তেই দুফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ে হুজুর সা. এর পবিত্র চেহারা মুবারকে। ঘুম ভেঙে লাফিয়ে উঠেন তিনিÑ “আবু বকর! তোমার চোখে পানি কেনো?”
কি উত্তর দেবেন খুঁজে পান না হযরত আবু বকর রা.।

তিনি আবারো জিজ্ঞেস করলেন, “ কি হয়েছে তোমার আবু বকর?” হযরত আবু বকর রা. ভাঙা ভাঙা কন্ঠে বলেন, “ইয়া রাসুলাল্লাহ. আমাকে বিষাক্ত সাপ দংশন করেছে।”
তিনি অবাক হলেন, “তুমি আমাকে ডাক দিলে না কেন?”
“ইয়া রাসুলাল্লাহ, আপনার ঘুমে ব্যঘাত ঘটবে বলে ডাক দেইনি।”

অবাক হয়ে রাসুল সা. দেখলেন তাঁর প্রিয় সাহাবী বন্ধু হযরত আবু বকর রা. কে। দেখলেন নবিপ্রেমিক এক মহান ব্যক্তিকে। খুশিতে তাঁর বুকটা ভরে ওঠলো। দ্রুত নিজের পবিত্র লালা মুবারক লাগিয়ে দিলেন দংশিত স্থানে। দ্রুত সেরে উঠলেন হযরত আবু বকর রা. আর তাতেই পৃথিবী পেলো একজন খাঁটি নবিপ্রেমিক। নবির ভালোবাসায় উৎসর্গীত এক মহান পুরুষকে।

সর্বশেষ এডিট : ১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৬ দুপুর ১২:১৯
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

গল্পঃ মোহাম্মদপুরে কখনও বিচ্ছেদ হয় না

লিখেছেন রাজসোহান, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৪





আমার দোকানের নাম নিউ শাপলা কম্পিউটার ও ফটোস্ট্যাট। সাইনবোর্ডের শাপলা ফুলটা এঁকে দিয়েছিলো তাজমহল রোডের এক সাইনম্যান, দেখতে হয়েছিলো কচুরিপানার মতো। চৌদ্দ বছর ধরে ঝুলে আছে। রোদে রঙ উঠে... ...বাকিটুকু পড়ুন

২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা তার সাথে কিছু রুঢ় সত্য যা বদলে দিয়েছিলো দেশের রাজনীতি।

লিখেছেন অন্তর্জাল পরিব্রাজক, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:৩৪





২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা সম্পর্কে আমরা সবাই মোটামুটি জানি। এই হামলায় কারা জড়িত ছিল সেটাও আজকের দিনে অজানা নয় একমাত্র নিতান্ত দলকানা ছাড়া। তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধানমন্ডি ৩২ যারা ভেঙেছিল, আর যারা বিচার চাওয়ার পথ বন্ধ করে দিল- তারা কি একই?

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:৪৪



ধানমন্ডি ৩২ যারা ভেঙেছিল, আর যারা বিচার চাওয়ার পথ বন্ধ করে দিল- তারা কি একই?

ধানমন্ডি ৩২ ভাঙা হয়েছিল- কে দেখেনি, কে জানে না, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই।,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন থেকে যারা আওয়ামী লীগকে ভালোবাসেন এখন তাদেরকে আওয়ামী লীগের প্রয়োজন

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:৪০



ক্ষমতায় গেলে কোন দল যাদেরকে মনে রাখে না ক্ষমতায় গেলে তাদেরকেই তারা সবচেয়ে বেশী মিস করে। সেই নিখাঁদ দল প্রেমিকদেরকে এখন আওয়ামী লীগ খুঁজছে। তারা লগি বৈঠা নিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

৫ই আগস্ট ছিলো আরো একটি ১৫/২১শে আগষ্টের অপচেষ্টা।

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৫২



২১শে আগস্ট পালন করা অর্থে , আমার কাছে মনে হচ্ছে আবারো জঘন্য কোনো ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে। কারন আমরা ঐ নারকীয় হত্যাকাণ্ডের কোনো বিচার সম্পন্ন করতে পারিনি। আমরা যারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×