somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সাগরের তলদেশে ছুটছে ৯,০০০ মাইল দীর্ঘ উষ্ণ পানির ‘মালবাহী ট্রেন’! সামনে কি আসছে ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর সুপার এল নিনো?

২৩ শে মে, ২০২৬ সকাল ৯:৫৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জলবায়ু নাটকের মঞ্চ এখন প্রশান্ত মহাসাগরের গভীরে।

সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে নিঃশব্দে এগিয়ে যাচ্ছে উষ্ণ পানির এক বিশাল ঢেউ, যাকে বিজ্ঞানীরা বলেন “কেলভিন ওয়েভ” (Kelvin Wave)। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ৯,০০০ মাইল। আকারে এটি এতটাই বিশাল যে একে অনেক বিজ্ঞানী “সাগরতলের মালবাহী ট্রেন” বলে তুলনা করছেন।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই ঢেউয়ের ভেতরের পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৭.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি পাওয়া গেছে। সমুদ্রের গভীরের পানি সাধারণত খুব ধীরে গরম বা ঠান্ডা হয়। তাই সেখানে এমন অস্বাভাবিক উত্তাপকে বিজ্ঞানীরা ভবিষ্যৎ জলবায়ু বিপর্যয়ের শক্তিশালী সংকেত হিসেবে দেখছেন।


কেলভিন ওয়েভ আসলে কী?

সহজ ভাষায় বললে, প্রশান্ত মহাসাগরের পশ্চিম অংশে—ইন্দোনেশিয়া ও আশপাশের এলাকায়—বছরের পর বছর ধরে বিপুল পরিমাণ উষ্ণ পানি জমা হয়।

কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে শক্তিশালী বাতাস এই উষ্ণ পানিকে ধাক্কা দিয়ে পূর্ব দিকে, অর্থাৎ দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলের দিকে ঠেলে দেয়।

এই বিশাল উষ্ণ পানির ভর যখন সমুদ্রের গভীরে পূর্ব দিকে যাত্রা শুরু করে, তখনই তৈরি হয় কেলভিন ওয়েভ।

এটি সাধারণ সমুদ্রের ঢেউ নয়। সৈকতে আছড়ে পড়া ঢেউয়ের মতো চোখে দেখা যায় না। এটি সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে কয়েক হাজার মাইল পথ অতিক্রম করে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলে।

কেন এটি এত গুরুত্বপূর্ণ?

কারণ এই উষ্ণ পানি যখন দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলে পৌঁছে যায়, তখন সমুদ্রের গভীরের ঠান্ডা পানি ওপরে ওঠার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়।

ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা দ্রুত বাড়তে শুরু করে এবং জন্ম নেয় এল নিনো (El Niño)।

এল নিনো হলো এমন একটি বৈশ্বিক জলবায়ু ঘটনা, যা পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা, খরা, ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার ধরণ বদলে দিতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতি কেন উদ্বেগজনক?

যুক্তরাষ্ট্রের আবহাওয়া গবেষণা সংস্থা NOAA-এর বিজ্ঞানীরা বলছেন, বর্তমান কেলভিন ওয়েভটি ভয়ংকর শক্তিশালী।

অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, এটি ১৯৯৭ সালের ঐতিহাসিক সুপার এল নিনোর সঙ্গে তুলনীয়।

১৯৯৭-৯৮ সালের এল নিনোর কারণে বিশ্ব অর্থনীতির প্রায় ৯৬ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছিল। পৃথিবীর বহু অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা, খরা, দাবানল ও খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছিল।

আর আজকের পৃথিবী ১৯৯৭ সালের চেয়েও অনেক বেশি উষ্ণ।

অর্থাৎ একই ধরনের এল নিনো এখন সৃষ্টি হলে তার প্রভাব আরও ভয়াবহ হতে পারে।

কেন এত উষ্ণতা জমেছে?

বিজ্ঞানীদের মতে এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে—

• দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক উষ্ণায়ন (Global Warming)

• গত কয়েক বছরে ধারাবাহিক লা নিনা পরিস্থিতি

• উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরে বিস্তৃত সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ

• পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে অস্বাভাবিক পরিমাণ উষ্ণ পানির সঞ্চয়

ফলস্বরূপ সমুদ্রের প্রায় ১,০০০ ফুট গভীর পর্যন্ত বিপুল পরিমাণ তাপ জমে আছে, যা এখন ধীরে ধীরে পূর্ব দিকে ছড়িয়ে পড়ছে।

এর প্রভাব কী হতে পারে?

যদি এই কেলভিন ওয়েভ পূর্ণমাত্রার সুপার এল নিনো তৈরি করে, তাহলে ২০২৭ সালে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে দেখা যেতে পারে—

• দীর্ঘস্থায়ী খরা

• অস্বাভাবিক ভারী বৃষ্টিপাত

• আকস্মিক বন্যা

• তীব্র তাপপ্রবাহ

• রেকর্ড মাত্রার আর্দ্রতা

• কৃষি উৎপাদনে ক্ষতি

• খাদ্যদ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি

• বন দাবানলের ঝুঁকি বৃদ্ধি

• শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ও চরম আবহাওয়া

বিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রশান্ত মহাসাগরে যা ঘটে তা শুধু প্রশান্ত মহাসাগরেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি মহাদেশে অনুভূত হয়।

বাংলাদেশের জন্য কী অর্থ বহন করে?

বাংলাদেশ সরাসরি প্রশান্ত মহাসাগরের পাশে না থাকলেও এল নিনোর প্রভাব থেকে মুক্ত নয়।

শক্তিশালী এল নিনো হলে দক্ষিণ এশিয়ার মৌসুমি বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে যেতে পারে।

ফলে দেখা দিতে পারে—

• অতিবৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যা

• কোথাও আবার দীর্ঘ শুষ্কতা

• তীব্র গরম ও অস্বাভাবিক আর্দ্রতা

• কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনে চাপ

• পানিসম্পদের ওপর বাড়তি ঝুঁকি

যদিও নির্দিষ্ট প্রভাব নির্ভর করবে পরবর্তী কয়েক মাসে এল নিনো কতটা শক্তিশালী হয় তার ওপর।

শেষ কথা

পৃথিবীর গভীর সমুদ্রে এখন যা ঘটছে, তা হয়তো সাধারণ মানুষের চোখে ধরা পড়ে না। কিন্তু সেই অদৃশ্য উষ্ণ পানির ঢেউই আগামী বছরের আবহাওয়া, কৃষি, অর্থনীতি এবং কোটি কোটি মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করতে পারে।

সাগরের তলদেশে ছুটে চলা এই “উষ্ণ পানির মালবাহী ট্রেন” শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের আরেকটি সুপার এল নিনো ডেকে আনে কি না, সেটাই এখন বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানীদের সবচেয়ে বড় নজরদারির বিষয়।

প্রকৃতি কখনো হঠাৎ করে সংকেত দেয় না। সে আগে থেকেই সতর্ক করে। প্রশ্ন হলো—আমরা কি সেই সতর্কবার্তা শুনছি?

সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে মে, ২০২৬ সকাল ১০:০৯
৪টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীর ভাবনা

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ০৫ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৫৭


আজ দেশজুড়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী পালিত হচ্ছে। ২৪ -এর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিভ্ন্নি সময়ে বহু নিরীহ প্রাণ অকালে ঝরেছে। আবু সাঈদ, মুগ্ধ ছাড়াও নাম জানা-অজানা হাজারো ব্যাক্তি তাদের প্রাণ হারিয়েছেন।... ...বাকিটুকু পড়ুন

তেহরানের ছায়া কি এখন ঢাকা সেনানিবাসে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৬ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ৩:০১


সোমবার সকালে জলসিঁড়িতে একটা অনুষ্ঠান হলো। ফিতা কাটা, ফুলের তোড়া, বক্তৃতা, ক্যামেরার ফ্ল্যাশ, স্বাভাবিক একটা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যা যা থাকে সবই ছিল। সেনাপ্রধান ওয়াকার উজ জামান নিজে হাজির, পাশে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাতিঘর (Lighthouse)

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ০৬ ই আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৮:৪৬



বাতিঘর (Lighthouse)

বাতিঘর নিয়ে সেই ছোট্টবেলা থেকেই আমার অনেক কৌতুহল ছিল। কেন ঐ বয়সেই বাতিঘর নিয়ে আমার এতটা আগ্রহ ছিল, তার কারণ আজও খুঁজে পাই না। অথচ আমি নিজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

"‘৫ই আগস্ট সবার জন্য ভালো হয়েছে’- একটি বক্তব্যের রাজনৈতিক পাঠ"

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৬ ই আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৮:৪৯



"‘৫ই আগস্ট সবার জন্য ভালো হয়েছে’- একটি বক্তব্যের রাজনৈতিক পাঠ"

"৫ই আগস্ট সবার জন্য ভালো হয়েছে। শেখ হাসিনার প্রয়োজন ছিল বিশ্রাম। আওয়ামী লীগের দরকার ছিল শুদ্ধিকরণ। অন্যান্য দলগুলোরও... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে বিষয়ে মজিবর ও হাসিনা এক বিন্দুও ভুল করেনি!

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ০৬ ই আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:২৫


বাংলাদেশের ইতিহাসে মজিবরের শেষ শাসন কাল ও হাসিনার শেষ শাসন কাল দুটি ভিন্ন সময়ে হলেও গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত মিল বহন করে। নির্বাচনী বৈধতার নিরিখে ১৯৭৩ সালের নির্বাচনের সংগে ২০১৪, ২০১৮... ...বাকিটুকু পড়ুন

×