somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আরাফাত রহমান কোকো: যে স্বপ্নের শেষ অধ্যায় লেখা হয়নি

১২ ই আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:১২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আজ ১২ আগস্ট।
আরাফাত রহমান কোকোর জন্মদিন।

১৯৬৯ সালের এই দিনে জন্মেছিলেন তিনি। আজ বেঁচে থাকলে ৫৭ বছরে পা দিতেন। কিন্তু ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি, মাত্র ৪৫ বছর বয়সে, মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে হৃদ্‌যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে থেমে যায় তাঁর জীবন।

আরাফাত রহমান কোকোকে বাংলাদেশের মানুষ মূলত একটি রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান হিসেবেই চেনে। তিনি ছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ছোট ভাই।



কিন্তু তাঁর গল্প শুধু একটি রাজনৈতিক পরিবারের গল্প নয়।

তাঁর জীবনের একটি বড় অধ্যায়জুড়ে ছিল ক্রিকেট।

রাজনীতির পরিবারের সন্তান, ক্রীড়াঙ্গনের মানুষ

কোকোর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিচয়গুলোর একটি ছিল ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে তাঁর ভূমিকা।

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল ২০০০-এর দশকের শুরুতে। ২০০২ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত তিনি BCB-এর Games Development Committee-এর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৩ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত তিনি BCB Advisory Council-এর সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।

বাংলাদেশের ক্রিকেটের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে তাঁর সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল তরুণ ক্রিকেটারদের নিয়ে কাজ করা।

রাজনীতির প্রভাবশালী পরিবারের সন্তান হয়েও ক্রীড়াঙ্গনেই তিনি নিজের একটি আলাদা পরিচয় গড়ে তুলেছিলেন।

তরুণ ক্রিকেটার তৈরির স্বপ্ন

২০০৪ সালে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড High Performance Training Programme চালু করে।

লক্ষ্য ছিল সম্ভাবনাময় তরুণ ক্রিকেটারদের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের জন্য প্রস্তুত করা। ব্যাটিং, বোলিং ও ফিল্ডিংয়ের পাশাপাশি ফিটনেস, পুষ্টি, শক্তি ও কন্ডিশনিং, কৌশলগত সচেতনতা এবং মানসিক দক্ষতার ওপরও দেওয়া হয়েছিল গুরুত্ব।

এই কর্মসূচির সঙ্গে কোকো, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড এবং অস্ট্রেলীয় কোচ রিচার্ড ম্যাকিনেসসহ সংশ্লিষ্টরা কাজ করেছিলেন।

পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের ক্রিকেটে শাকিব আল হাসান, মুশফিকুর রহিম ও তামিম ইকবালের মতো ক্রিকেটারদের উঠে আসার পেছনে যে বয়সভিত্তিক ও High Performance কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, তার প্রাথমিক সময়ের সঙ্গে কোকোর কর্মকাণ্ডও জড়িয়ে আছে।

তাঁর ক্রিকেট-ভাবনার মূল জায়গাগুলোর একটি ছিল—আজকের দল নয়, আগামী দিনের ক্রিকেটার তৈরি করা।

ক্রিকেট শুধু মাঠের খেলা নয়

কোকোর সময়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল ক্রিকেট অবকাঠামোর উন্নয়ন।

মিরপুরে বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য আধুনিক অবকাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগের সঙ্গে তাঁর ভূমিকা ছিল। আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ ও ইনডোর সুবিধা তৈরির পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ক্রিকেটের অবকাঠামো উন্নয়নের কাজও এগিয়ে যায়।

ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, সিলেট, খুলনা ও বগুড়ায় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ভেন্যু গড়ে ওঠার সময়কার উন্নয়ন কার্যক্রমের সঙ্গেও তাঁর সময়ের উদ্যোগ জড়িয়ে আছে।

Old DOHS Club-এর সঙ্গেও ছিল তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পৃক্ততা। তিনি ক্লাবটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

অর্থাৎ কোকোর ক্রিকেট-সম্পৃক্ততা শুধু একটি পদে বসে দায়িত্ব পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না।

তরুণ ক্রিকেটার, প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো ও ক্রীড়া সংগঠন—সব মিলিয়ে ক্রিকেটকে একটি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোর মধ্যে এগিয়ে নেওয়ার সময়ের একজন সংগঠক ছিলেন তিনি।

তারপর আসে ১/১১

২০০৭ সাল তাঁর জীবনের বড় একটি মোড়।

ওয়ান-ইলেভেনের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে ৩ সেপ্টেম্বর ২০০৭ সালে মিথ্যা মামলায় ঢাকা সেনানিবাসের বাসা থেকে তাঁর মা, তৎকালীন বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে আরাফাত রহমান কোকোকেও গ্রেপ্তার করা হয়।

২০০৮ সালের ১৭ জুলাই তিনি জামিনে মুক্তি পান। পরে চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ড যান এবং সেখান থেকে মালয়েশিয়ায় চলে যান।

এরপর তাঁর জীবনের বড় একটি সময় কেটে যায় দেশের বাইরে।

রাজনৈতিক অস্থিরতা, মামলা, চিকিৎসা এবং প্রবাসজীবন—সবকিছু মিলিয়ে তাঁর জীবনের গতিপথ বদলে যায়।

দেশের বাইরে শেষ কয়েকটি বছর

২০০৮ সালের পর তাঁর জীবনের বড় একটি সময় কেটেছে দেশের বাইরে।

থাইল্যান্ডে চিকিৎসার পর তিনি মালয়েশিয়ায় অবস্থান করেন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেখানেই ছিলেন।

স্ত্রী শর্মিলা রহমান সিঁথি এবং দুই কন্যা জাফিয়া ও জাহিয়াকে নিয়ে সেখানেই কাটে তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়।

একজন মানুষের জন্য প্রবাসে কাটানো এই সময় শুধু রাজনীতি বা আইনি বাস্তবতার গল্প নয়।

এটি পরিবার থেকে দূরে থাকা, অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করা এবং নিজের দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকারও গল্প।

২০১৫: হঠাৎ থেমে গেল সব

২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি।

কুয়ালালামপুরে নিজ বাসায় হৃদ্‌যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান আরাফাত রহমান কোকো।

বয়স তখন মাত্র ৪৫।

তাঁর মৃত্যুর খবর বাংলাদেশে পৌঁছানোর পর রাজনৈতিক অঙ্গনের পাশাপাশি ক্রীড়াঙ্গনেও শোক নেমে আসে।

তাঁর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। ২৭ জানুয়ারি ঢাকায় তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয় এবং পরে বনানী কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।

বিপুলসংখ্যক মানুষ সেদিন তাঁকে শেষ বিদায় জানাতে এসেছিলেন।

যে প্রশ্নটির উত্তর আর কখনো জানা যাবে না

কোকো যদি আরও ১০, ২০ কিংবা ৩০ বছর বেঁচে থাকতেন, কী করতেন?

বাংলাদেশের ক্রিকেটে তাঁর ভূমিকা কতটা বিস্তৃত হতো?

তরুণ ক্রিকেটার তৈরির যে কাঠামোর সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন, সেটি নিয়ে আরও কতটা কাজ করতে পারতেন?

ক্রীড়া প্রশাসনে তাঁর পথ কোথায় গিয়ে দাঁড়াত?

এসব প্রশ্নের উত্তর আর কখনো জানা যাবে না।

কারণ ইতিহাস তাঁকে সেই সময়টুকু দেয়নি।

জন্মদিনে কোকো

আজ তাঁর জন্মদিন।

তাঁকে শুধু রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সন্তান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছেলে কিংবা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ছোট ভাই হিসেবে স্মরণ করলে তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাদ পড়ে যায়।

তিনি ছিলেন একজন ক্রীড়া সংগঠক।

বাংলাদেশ ক্রিকেটের Development কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত একজন সংগঠক।

তরুণ ক্রিকেটারদের উন্নয়নের একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে ওঠার সময়ের একজন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বশীল ব্যক্তি।

Old DOHS Club-এর চেয়ারম্যান।

একজন স্বামী।

দুই কন্যার বাবা।

এবং মাত্র ৪৫ বছরে থেমে যাওয়া একজন মানুষ।

তাঁর জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক জায়গাটি হয়তো এখানেই—

একটি জীবন শেষ হয়ে গেছে, কিন্তু সেই জীবনের সম্ভাবনাগুলো কোথায় গিয়ে পৌঁছাতে পারত, সেটি আর কখনো জানা যাবে না।

আজ ১২ আগস্ট।

আরাফাত রহমান কোকোর ৫৭তম জন্মদিন হতো আজ।

মানুষটি নেই।

রয়ে গেছে তাঁর স্মৃতি, তাঁর কাজ এবং কিছু অসমাপ্ত সম্ভাবনার গল্প।

শুভ জন্মদিন, আরাফাত রহমান কোকো।

আল্লাহ তাঁর ভুলত্রুটি ক্ষমা করুন এবং তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন।

সর্বশেষ এডিট : ১২ ই আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:১৩
৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাহাড়ে “উপজাতি” নাকি “আদিবাসী”? আন্তর্জাতিক আইন ও ইতিহাসের নির্ভেজাল সত্য!​

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১১ ই আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১১:২৭


সূচনা ও প্রেক্ষাপট:
লেখক পার্বত্য চট্টগ্রামে ২০০১ সালে তিনি যখন সেখানে দায়িত্ব পালন করেন, তখন পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে 'উপজাতীয়' (Tribal) হিসেবে ডাকা হতো। কিন্তু ২০১৫-১৬ সালের দিকে সেখানে পুনরায় পোস্টিং পাওয়ার... ...বাকিটুকু পড়ুন

হঠাৎ কেন ঢাকায় র প্রধান?

লিখেছেন ...নিপুণ কথন..., ১১ ই আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১২:২২


দিল্লী দখল ঠেকাতে ঢাকায় চলে এলেন র প্রধান!

হ্যাঁ, ঠিকই শুনলেন। ক'দিন ঐ র‍্যাডিসন ব্লুতে বসে অনেকের হাতে-পায়ে ধরলেন; বললেন, "তোমরা প্লিজ দিল্লী আক্রমণ করো না। আমাদের মিসাইল, অস্ত্র সব... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের আদি জনগোষ্ঠী কারা

লিখেছেন কিরকুট, ১১ ই আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:৫৬


বাংলাদেশের আদি জনগোষ্ঠী নিয়ে আলোচনা হলেই আমাদের সামনে সাধারণত পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা কিংবা অন্যান্য পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর কথা আসে। কিন্তু একটি প্রশ্ন প্রায়ই এড়িয়ে যাওয়া হয় বাংলাদেশের আদি জনগোষ্ঠী... ...বাকিটুকু পড়ুন

দেবী!

লিখেছেন করুণাধারা, ১১ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ৯:৩৩



১)
দেবী খুবই বুদ্ধিমতী এবং সুন্দরী। এক উচ্চাভিলাষী পরিবারে দেবীর জন্ম, এমনই উচ্চাভিলাষী যে তাদের একমাত্র ভাবনা কীভাবে সবাইকে ছাড়িয়ে উপরে ওঠা যায়! দেবীর যখন জন্ম হলো তখন তার ভাইয়ের... ...বাকিটুকু পড়ুন

র-প্রধানের ঢাকা সফর: খবর শুনেই হাসপাতালে ভর্তি পাকিস্তানের হাইকমিশনার !

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১২ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:১৭


রসিকতা বাদ দিয়ে বলি, দুটি ঘটনাই সত্যি। বাংলাদেশে RAW এর প্রধান পরাগ জৈন এসেছেন এবং পাকিস্তানের হাইকমিশনার এখন হাসপাতালে আছেন। দুটি ঘটনা আসলে পরস্পরবিচ্ছিন্ন, একটার সঙ্গে আরেকটার কোনো... ...বাকিটুকু পড়ুন

×