লঞ্চটা যখন ঘাট ছেড়ে নদীর মাঝখানে এগিয়ে চলেছে, নয়ন ডেকের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে সবকিছু মুগ্ধ হয়ে দেখছিল।
লঞ্চের পেছনের দিকে গেলে শব্দটা আরও স্পষ্ট শোনা যেত।
ফট... ফট... ফট... ফট... ফট... ফট...
মনে হতো যেন বিশাল কোনো লোহার দানব বুক ভরে শ্বাস নিচ্ছে আর ছেড়ে দিচ্ছে। ইঞ্জিনের কম্পন পুরো লঞ্চের শরীর জুড়ে ছড়িয়ে পড়ছিল। মাঝে মাঝে শব্দটা আরও ভারী হয়ে উঠত—
ভট-ভট-ভট-ভট-ভট... ফট-ফট-ফট...
লঞ্চের উঁচু চিমনি থেকে কুণ্ডলী পাকিয়ে ঘন কালো ধোঁয়া বের হচ্ছিল। ধোঁয়াগুলো আকাশে উঠে বাতাসে ভেসে যাচ্ছিল, কখনো লম্বা কালো রেখার মতো, কখনো মেঘের টুকরোর মতো ছড়িয়ে পড়ছিল। ডিজেলের কটু গন্ধ বাতাসে মিশে ছিল, যা সেই সময়ের নদীপথের যাত্রার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
নয়ন আরও পেছনের দিকে তাকাল।
সেখানে ছিল এক অন্য দৃশ্য।
লঞ্চের বিশাল প্রপেলারগুলো পানির নিচে অবিরাম ঘুরছিল। তাদের প্রচণ্ড শক্তিতে নদীর শান্ত জল যেন ক্ষেপে উঠেছিল। লঞ্চের পেছনে সাদা ফেনার এক লম্বা রাস্তা তৈরি হচ্ছিল। পানি ঘূর্ণি খেয়ে উঠছিল, ছোট ছোট ঢেউ একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খাচ্ছিল।
মনে হচ্ছিল যেন নদীর বুক চিরে কেউ একটা বিশাল সাদা দাগ এঁকে দিয়েছে।
প্রপেলারের আঘাতে পানির রংও বদলে যাচ্ছিল। যেখানে নদী ছিল শান্ত ও সবুজাভ, সেখানে ফেনা হয়ে উঠছিল দুধের মতো সাদা। ঘূর্ণিগুলো কিছুক্ষণ নেচে বেড়াত, তারপর ধীরে ধীরে আবার নদীর জলে মিলিয়ে যেত।
এই সময় ডেকের ভেতর থেকে একটা পরিচিত ডাক ভেসে এল।
— ঝালমুড়ি... ঝালমুড়ি... চানাচুর ঝালমুড়ি...!
একজন ঝালমুড়িওয়ালা মাথায় টিনের বাক্স নিয়ে যাত্রীদের মাঝখানে ঘুরে বেড়াচ্ছিল।
তার বাক্সের ভেতর ছোট ছোট কৌটায় সাজানো ছিল মুড়ি, চানাচুর, চিনাবাদাম, কাঁচা মরিচ, ধনেপাতা, পেঁয়াজ, সরিষার তেল আর লেবু।
কেউ ডাকলেই সে মুহূর্তের মধ্যে কাজ শুরু করত।
একটা টিনের বাটিতে মুড়ি ঢালত, তারপর চানাচুর, ভাজা বাদাম, কুচি পেঁয়াজ, কাঁচা মরিচ। শেষে কয়েক ফোঁটা সরিষার তেল আর লেবুর রস দিয়ে লম্বা চামচ দিয়ে ঝটপট মিশিয়ে ফেলত।
খচাখচ... খচাখচ...
চামচের শব্দ শুনলেই জিভে পানি এসে যেত।
সরিষার তেলের ঝাঁঝালো গন্ধ বাতাসে ছড়িয়ে পড়ত। অনেক যাত্রী কাগজের ঠোঙা হাতে নিয়ে নদী দেখতে দেখতে ঝালমুড়ি খাচ্ছিল।
নয়নেরও খুব ইচ্ছে হচ্ছিল।
কিন্তু তার বাবা হেসে বললেন,
— একটু পরে খাবে। আগে কিছু ভালো খেয়ে নাও।
বাবা তাকে নিয়ে লঞ্চের ক্যান্টিনের দিকে গেলেন।
ক্যান্টিনটা ছিল ছোট্ট, কিন্তু ব্যস্ত। কাচের শোকেসে বিস্কুট, কলা, কেক আর স্যান্ডউইচ সাজানো ছিল। ভেতরে পুরনো একটা ফ্যান ঘুরছিল ধীরে ধীরে।
বাবা কাউন্টারে গিয়ে একটা স্যান্ডউইচ কিনলেন।
সাদা পাউরুটির ভেতরে শসা, ডিম আর মাখনের পুর। কাগজে মোড়ানো স্যান্ডউইচটা হাতে পেয়ে নয়নের চোখ চকচক করে উঠল।
সে জানালার পাশে বসে ধীরে ধীরে কামড় দিল।
পাউরুটি ছিল নরম, মাখনের স্বাদ মিষ্টি, আর ক্ষুধার কারণে সেটাই তার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুস্বাদু খাবার মনে হচ্ছিল।
স্যান্ডউইচ খেতে খেতে সে জানালার বাইরে তাকাল।
নদীর ওপর বিকেলের রোদ ঝিকমিক করছে। দূরে জেলেদের নৌকা। আকাশে ভেসে যাচ্ছে কালো ধোঁয়ার রেখা।
আর নিচে, কোথাও অদৃশ্য গভীরে, লঞ্চের প্রপেলার এখনও অবিরাম ঘুরছে—
ফট... ফট... ফট... ফট...
তার পেছনে রেখে যাচ্ছে ফেনায় ভরা এক দীর্ঘ সাদা পথ, যেন নদীর বুকের ওপর আঁকা এক অন্তহীন স্মৃতি।
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



