
এদেশের ছেলেমেয়েদেরকে, জীবনের সবথেকে সংকটময় সময়ে পরিবার পরিজন ছেড়ে দূরে থাকতে হয়। একেবারে একা! অনাত্মীয় ঢাকাতে আবাসিক ঠিকানা পাওয়া যত সহজ। বন্ধু পাওয়া তত সহজ নয়। তাই মানুষ বন্ধুত্বের নামে প্রেমের দিকে ঝুকে যায়। সঙ্গ আর নির্ভরতা খুঁজতে গিয়ে নিজেকেই হারিয়ে ফেলে। এক ধরনের আইডেন্টিটি ক্রাইসিস তৈরি হয়। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, হৃদয়ঘটিত সম্পর্কের টানাপোড়েন। আকাংক্ষার অনুরূপ নয়, বরং তাদের অবিকলটাই চাই। সম্পর্ক ভাঙ্গা নিয়ে একগাদা অভিযোগ, কুৎসা রটনা। যে ছেড়ে গেছে দোষটা তার নয়, দোষটা আপনার। কী আছে আপনার যে একজন সারাজীবন আপনাকেই ভালোবাসবে।
অনেক সময় দেখা যায় কেউ হয়ত কাউকে প্রতিশ্রুতি দিয়ে বসে আছেন। কিন্তু সেই মানুষটির প্রতি কোনো রকম আকর্ষণ অনুভবই করছে না। কিন্তু তাকে ছেড়ে দিতেও মন চাইছে না। অনেক সময় অনেকেই বিয়ে করেন কেবলমাত্র একে ওপরের কাছে প্রতিশ্রুতি বদ্ধ থাকেন বলে। মানুষকে কাছ থেকে নয় বরং দূর থেকে দেখেই তাকে আমরা বিচার করতে থাকি। যার ফলে ভবিষ্যতে অনেক সময়ই বড় রকমের ধোকা খেতে হয়। ভালোলাগা, মোহ আর রোমান্টাসিজম জীবনের অনাবশ্যক অনুভূতি। এগুলো বাদ দিয়ে নয়, তবে বুঝে শুনে সিদ্ধান্ত নিতে নয়।
সাইকোলজিস্ট রবার্ট স্টেনবার্গ এর মতে, ভালোবাসায় তিনটি উপাদানের সমন্বয় থাকা দরকার। উপাদান গুলো হলো- আবেগ (যৌন অথবা রোম্যান্টিক আকর্ষণ), অন্তরঙ্গতা (গভীর অনুভূতি) এবং সহানুভূতি (শুধুমাত্র সম্পর্ককে রক্ষা করাই নয়, তাকে সসম্মানে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া)। অন্তরঙ্গতা, আবেগ এবং প্রতিশ্রুতি এই তিনটি উপাদান যখন ভালোবাসার মধ্যে মিলে মিশে যায় তখন সেটা অনবদ্য প্রেম। এই প্রেমে অন্তরঙ্গতা যে রকম থাকে, ঠিক তেমনি থাকে একে অপরের প্রতি বিশ্বাস, ভরসা।
আজকালকার প্রেমটা বড় পুঁজিবাদী। নাহলে পোষাচ্ছেনা বলে কেউ প্রেমকে পরিত্যাজ্য ঘোষণা করতে পারতোনা। আধুনিক প্রজন্ম পোশাকে আর প্রকাশে যতটা এগিয়েছে অনুভবে ঠিক ততটা এগিয়েছে কিনা সেটা কিন্তু ভেবে দেখবার মতো বিষয়! প্রেমেরও সামাজিক স্ট্যাটাস বাঁচিয়ে জন্মাবার প্রাকটিস রপ্ত করা হয়ে গেছে। এখন আর ক্রস স্ট্যাটাস প্রেম চোখে পড়ে না। না বাস্তব জীবনে, না গণমাধ্যমে। ছেলে মেয়ে বড় হলেই পারিবারিক পরিবেশে ছড়িয়ে দেয়া হয় "এমন কাউকে পছন্দ কোরো যাকে পারিবারিক ভাবে মেনে নেয়া যায়" পরিবার তো আর সমাজের বাইরে নই। তাই সামাজিক অবস্থানের শর্তটা এখানে বেশ উহ্যমান। মনে করে দেখুন তো শেষ কবে, ধনীর দুলাল আর গরীবের মেয়ে কিংবা ধনীর দুলালীর সাথে গরীব পুত্রের প্রনয় এবং পরিণয় দেখেছেন। প্রেমের মতো সাবলীল একটা সম্পর্কেও বৈচিত্র্য থাকা জরুরি। আজকাল প্রেম ভেংগে যাওয়ার কারন বলা হয় "পোষাচ্ছে না"। এই শহরে প্রকাশ্যে প্রেমের প্রকাশ করলেই যত দোষ! প্রেমকে তুলে রাখা হয় শোবার ঘরের জন্য, প্রেমের জন্য নির্জনতা খুঁজতে হয়, আড়াল খুঁজতে হয়, অন্ধকার খুঁজতে হয়। ভালোবাসি কথাটা মুখে বলতেই বাংগালীর যত বিপত্তি।
ইদানিং মানুষজন স্যান্ডেল সেলাই করে পরেননা। হালকা-পলকা ফ্যাশনদুরস্ত স্যান্ডেল পরে, তাই হয়ত ছিড়ে গেলেই ফেলে দেবার মত মনোভাব পোষন করে। শেষ কবে স্যান্ডেল সেলাই করে পরেছেন, মনে করতে পারবেন? এই বিষয়টাকে 'মনোবিজ্ঞান' এর ভাব ধার করে নিয়ে বলি, "দিনে দিনে 'টেম্পোরারি' তে অভ্যস্ত হয়ে গেছি'। টানাপোড়ন, মানিয়ে নেয়া এইগুলো বোধহয় জীবন থেকে হারিয়েই গেলো। অনিশ্চয়তাহীন, পিছুটানহীন জীবন যাপন রপ্ত করে ফেলেছি। যেটা প্রয়োজনীয়তা হারিয়েছে, সেটা এক সময় কতখানি অবদান রেখেছিল তা ভুলতে মুহূর্তকাল সময় নেই। নতুনে অভ্যস্ত হতে হতে, নতুনত্বও এখন আবেদনহীন।
বোতাম আটকানো ঝামেলা থেকে মুক্তি দিয়েছে ছেলেদের তথাকথিত টিশার্ট। বুকের পকেটে প্রেমপত্র নিয়ে যে প্রেমিক গলির মোড়ে অপেক্ষা করেনি, সে আদর্শ প্রেমিক হয়ে উঠতে পারেনি। তার মায়াময় চোখের বিশুদ্ধ ভালোবাসায় যে প্রেমিকা সুখ স্বপ্নে বিভোর হয়নি, সে স্ত্রী হতে পেরেছে, প্রেমিকা হয়ে উঠতে পারেনি। অতঃপর বালিকারা বিস্মৃত হয় যে, বুক পকেটের নিচে তার প্রেমিকেরও একটা হৃদয় ছিলো।
প্রেমে পড়লেই মেয়েরা সবথেকে বেশি সচেতন হয়ে ওঠে। প্রেমিকের চোখে তাকেই সবচেয়ে বেশি সুন্দর লাগবে তো। তাই প্রেমিক আর আয়না ছাড়া তাদের জগতে তখন আর কোন কিছুই গুরুত্বপূর্ণ নয়। আজকাল মেয়েরা ভালোবেসে প্রেমিকের বুক পকেট হতে চাই। যেন হৃদয়ের আরো কাছে থাকা যায়! ছেলেরা হতে চায় চোখের কাজল। যত্নের সাথে যেখানে লুকিয়ে থাকে আবেগ। বালিকারা মনে রাখবেন, হৃদয়ের কিন্তু তাপ এবং উত্তাপ দুটোই থাকে। শুধু তাপ নিবেন আর উত্তাপ নিবেননা, তা হবেনা। বালকের ব্যস্ততা নিয়েই বালিকার যত মান অভিমান। ব্যস্ততা তো জীবনের-ই অংশ। তাই, মেনে নিয়েন এবং মানিয়ে নিয়েন। জেনে রাখবেন, আপনিই বালকের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পুরো শার্ট রোদে পুড়ে বৃষ্টি তে ভিজে, বিবর্ণ আর মলিন হবে। কিন্তু বেশির ভাগ শার্টের-ই বুক পকেটের নিচের অংশটুকু থেকে যায় অমলিন আর বর্ণময়। আপনার আর ছেলেটার ভালোবাসা হল শার্টের সেই অমলিন আর বর্ণময় অংশ। জায়গাটুকু হয়ত ছোট, কিন্তু আনন্দময় মুহুর্তগুলোর মতোই চির আপন।
বালকেরা জেনে রাখুন, কাজল সৌন্দর্যের পাশাপাশি আবেগ প্রকাশেরও ভাষা থাকে। যত্ন করে কাজল পরে বালিকারা যেমন মনোযোগ আদায় করে, ঠিক তেমনি অসংগত আচরণে কষ্ট পেয়ে, কেঁদে কাজল মলিনও করে। বুঝতে চেষ্টা করবেন এবং কথা দিয়ে কথা রাখবেন। কারন, আপনাকেই বালিকা অন্যদের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব দেয়। চোখের কাজল যদি বালিকা আপনাকে মুগ্ধ করার জন্য পরে, তবে আপনার আচরণ আর উদাসীনতার কারনেই সেটা ম্লান হয়। যে কথা আপনি রাখতে পারবেননা তা দেয়ার অধিকার আপনার নাই। মানিয়ে নিতে নিতে, ছাড় দিতে দিতে; বালিকারা হয়তো আর বলবেনা “ নহে প্রিয়, এ নয় আঁখি জল। মলিন হয়েছে ঘুমে চোখেরও কাজল”। বালিকারা তাদের আবেগকে আর লুকাবেনা, যত কঠিন বাস্তবতা-ই আসুক, প্রকাশ করতে আর কিছুতেই দ্বিধান্বিত হবে না।
নিজেকে প্রস্তুত না করে যারা সম্পর্কের স্বপ্ন দেখেন, তাদের সাথে আমার সামান্য মতদ্বৈততা আছে। প্রেম হতে হয় স্বতস্ফূর্ত। সেটাকে মনের উপর জোর করে চাপিয়ে দিতে হয়না। প্রেম কেউ চুরি করতে পারে না। প্রপোজ করতে হয়। বিশ্বাস-আস্থা-ভালোবাসা-অপরিহার্যতা ছাড়া সম্পর্কে যে পরিবর্তনই এসেছে, তা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারেনি। আবেগ দিয়ে প্রেমে করা যায়, বিবেক ছাড়া প্রেম পড়া যায়না। ধারনক্ষম নাহয়ে গ্রহনের আগল খুলে দিবেননা প্লিজ। আগন্তুককে বসার জন্য চেয়ার দিবেন, অতি আবেগী হয়ে কোল বাড়িয়ে দেয়ার দরকার নাই।
প্রেমের নির্বুদ্ধিতা হলো, এদেশে জাতে উঠতে গেলে বিজাতীয় হতে হয়। মানে বয়ফ্রেন্ড-গার্লফ্রেন্ড হতে হয়। ভার্চুয়াল লাইফের যন্ত্র-ই একেক সময় যন্ত্রণা হয়ে ওঠে। প্রেমে ভেঙ্গে গেলে লড়াই কখনোই খুব ভালো কিছু নয়। হোক সেটা শাররীক কিংবা মানসিক। ভালো না লাগলে দুরত্ব বাড়িয়ে নিন। যোগাযোগে কমিয়ে দিন। উৎসুক চোখের জবাবে জানিয়ে দিন, আমরা আর এক সাথে থাকছি না। লড়াইএ জেতার জন্য অন্যকে দোষারোপ করা, ছোট করা, অভিযুক্ত করা বুদ্ধির পরিচয় নয়। সম্পর্ক না থাকলেও সৌজন্যতা প্রদর্শন করা যায়। নিরবতায় থাকে সবথেকে গ্রহনযোগ্য উত্তর। প্রেজেন্ট পার্টনার নিয়ে প্রায়শ অনেককে বিব্রত পরিস্থির সম্মুখিন হতে হয়। তা হলো পার্টনারের পরিচয় সংক্রান্ত। হাত ধরাটা সহজ, সারাজীবন ধরে রাখা বোধহয় সহজ নয়।


অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

