
চারপাশের কোথাও একটা ভ্যাকুয়াম তৈরি হচ্ছে। অচিরেই ভেঙ্গে পড়ার আশংকা নিয়ে দিন যাপন করছি। পেশাগত কারনেই আমাকে ১৮ থেকে ২৫ বছরের ছেলে-মেয়েদের সাথে দিনের একটা উল্লেখযোগ্য সময় কাটাতে হয়।সেখানে আমি একটা প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব করি এবং আরেকটি প্রজন্মকে পর্যবেক্ষন করি। অত্যন্ত দুঃখের সাথে লক্ষ্য করেছি এখনকার ছেলে মেয়েরা পড়ছে, ভালো ভাবে পাশও করছে। তবে তারা পড়াশুনাকে ভালোবাসে না। তবে তারা কী ভালোবাসে? সেটা আমি অনেক ভাবে জানার এবং বোঝার চেষ্টা করেছি। কিন্তু অদ্ভুত বিষয় হলো তারা কোনো কিছুকেই ভালোবাসে না। কেবল হিসেব আর হতাশা নিয়ে পরস্পরের প্রতি দোষারোপ করে যাচ্ছে। একটাই কথা, “তারা জীবনে কী পেয়েছে”। আমি প্রশ্ন করেছিলাম, “তোমরা আসলে কি পেতে চাও”। এবং উত্তর হচ্ছে “তারা সেটা জানে না”।
শূন্যতাটা কোথায়? কিসের? মানুষ বয়সকে ধারন করে আর সময়কে যাপন করে। যারা বর্তমান প্রজন্মকে নির্দ্বিধায় দোষারোপ করেন তারা কী ভেবে দেখেছেন "এই প্রজন্মকে কতটা অস্থির সময় পার করতে হচ্ছে?" মানসিক বয়:সন্ধিকালীন সময়ে এসে তারা দেখছে, আস্থা রাখার মতো মানুষ নেই। প্রযুক্তির হাতছানিতে কেবলই পিছিয়ে পড়ার আশংকা। ভীষণ অপ্রিয় সব বিষয়াদি চারপাশে আলোচিত। আপরাধ, অপ্রাপ্তি আর অপবাদ এই তিন নিয়েই তাদের সকাল দুপুর রাত। লাগামহীন প্রত্যাশার চাপে প্রতিনিয়ত চিড়ে চ্যাপ্টা। অথচ যাদেরকে আয়োজন করে দোষারোপ করা হচ্ছে, তাদের অনেকের-ই কৈশোরটুকু পেরিয়েছে, এই সেদিন। অথচ তাদের জীবন কৃত্তিমতায় মোড়া।
এই জেনারেশন সাহিত্যের বই পড়ে জীবনের বোধ গুলো বোঝে না। সিনেমা দেখে নারীর শরীর দেখার জন্য। রোদচশমার রং বদলে ফেলে যারা পৃথিবী বদলে ফেলার স্বপ্ন দেখে তাদের কাছে চাইবার কিছু নেই। এখনকার তরুন প্রজন্ম সারাক্ষন-ই ডেড মেটাল বা রক কিংবা র্যা পে মশগুল থাকে, নয়ত স্নায়ু টানটান করা ইংরেজি থ্রিলার পড়ে। অথাচ আমাদের প্রিয় ছিল জীবনান্দ। একটা প্রজন্ম; যারা প্রয়োজনীয়তা এবং অপ্রয়োজনীয়তকে আলাদা করতে পারে না। অপরিহার্য শব্দের মানে জানে না। চিন্তার দৈন্যদশাকে অতিক্রমের ভাবনা ভাবে না। ভুগছে কেবল কমোডিটি ফেটিশিজমে। সবকিছু আশাতীত দ্রুততা। ব্রান্ড কোহোলিক, আর ভোগবাদ!
বাজার অর্থনীতিকে ফুলিয়ে ফাপিয়ে মানুষকে স্বভাব অভাবী করে তোলা হচ্ছে। টেকনোলজি এডাপ্ট করা আর আইডিওলজি এডাপ্ট করা এককথা নয়। তাই তো যা কিছু আজ ব্যক্তিগত তাই রাজিনৈতিক। যেকোন পরিবর্তনে তারুন্য-ই যোগ্যতম সময়। শুধু যোগ্যতম বললে, কমিয়ে বলা হয়, বলা উচিৎ যথার্থ সময়। আপনি অর্জন করবেন তারুন্যে, বর্জনও করবেন তারুন্যে। দূর্নীতিকে না বলার সময় এই তারুন্য। অনিয়মকে রুখে দাড়াবার সময় এই তারুন্য। উপায়ের নৈতিকতার বিচার হওয়া উচিৎ উদ্দেশ্যের সততার ভিত্তিতে। তারুন্যকে গালমন্দ করার জন্য মুখিয়ে থাকাতো অগ্রজদের নিজেদের লজ্জ্বা ঢাকবার ব্যর্থ চেষ্টা। কী উদাহরন , কিংবা নজির, কিংবা দৃষ্টান্ত অগ্রজরা রেখে যাচ্ছেন তরুণদের জন্য।
বাংলালিংক এই জেনারেশনকে বলছে “শেয়ারিং জেনারেশন”। ইন্টারনেট শেয়ার করে মুগ্ধ করছে পরিবারের অগ্রজদের। এরা আসলে পুজিবাদের পোকায় খাওয়া “Neck Down” জেনারেশন। " এদের ঐক্যটা আদর্শের নয়, তর্কের। কোড আর ইমেজ দ্বারা নির্মিত বাস্তবতায় বুকের মধ্যে সংগ্রামের স্বপ্ন ধারন করার সাহস এদের দেয়া হয়না। বনসাই করে রাখা হয়। আহত অনুভূতির ক্ষত সারতে তারা কেএফসি’র শীতল বাতাসকে বেছে নেয়। সেখানে বিশ্বাস আর মূল্যবোধের বড় অভাব, যা জীবন বোধের প্রকাশ। সমাজে সোশাল ক্যাপিটাল নেই। বিশ্বাস, আস্থা, সততা, নিষ্ঠা, স্বচ্ছতা। সময়টা নির্লজ্জভাবে দুর্নীতি পরায়ন হয়ে উঠেছে। বিবেক বর্জিত ভোগবাদ আর “give & take” ফাঁদে মুখ থুবড়ে পড়েছে। সুস্থ জীবনার্দশের অনুপস্থিতিতে শ্রেনিভেদে বদলে যাচ্ছে বিশ্বাস আর মতাদর্শ। যার পরিনাম এক ও অভিন্ন।
সুযোগ বাড়লে, সম্ভাবনা বাড়ে। তবে তাতে সাফল্যের হার নিশ্চিত ভাবে বাড়েনা, যতক্ষণ না আপনি সুযোগের সদ্ব্যবহার করছেন। আমাদের কলেজে একজন শিক্ষক ছিলেন মনিরুজ্জামান স্যার। স্যারের একটা কথা আমি প্রায়শই বলি, জীবনে এক্সট্রা কারিকুলাম এক্টিভিটিস গুলো শুন্য। আর লেখাপড়া হচ্ছে এক। একের পরে শুন্যের সংখ্যা বাড়লে জীবনের মান বাড়ে। না হলে শুন্য গুলো মুল্যহীন হয়ে থাকবে।
জ্ঞানের স্বচ্ছতা আর ভাষার প্রতি ভালোবাসা থাকা চাই। ভাববেন না, আমি প্রজন্মকে গালমন্দ করার জন্য মুখিয়ে আছি। পারিপ্বার্শিকতা দেখে আমার মনে হচ্ছে। অবস্থা এবং অবস্থানের পরিবর্তন দরকার। শুন্যতা এবং কৃত্তিমতা পরিহার করা চাই। জীবনে কোথাও না কোথাও পৌঁছতে হয়। তাই চালকের আসনে বসে নিষ্ঠাটা বড্ড জরুরি। শুধু অনুরোধ অতি আবেগে জানালা দিয়ে হাত, মাথা বের করে নিজের ক্ষতি করবেন না।
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই ডিসেম্বর, ২০২০ রাত ৮:৪৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



