somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মেডিকেল লিভে, ঝাপসা হয়ে আসা মুখ কিংবা শাদী মে জরুর আনা…

০৫ ই ডিসেম্বর, ২০১৮ রাত ১০:৩৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



ফয়সাল আহমেদের সাথে আমার বিয়ে ঠিক হয় পারিবারিক ভাবে। আমাদের দুই পরিবার দীর্ঘদিনের বন্ধু। ফয়সাল সাহেব বাবার বন্ধুর বড় ভাইয়ের বড় ছেলে। রীতিমত পরিবারের বড় বৌয়ের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রটি আমাকে চিত্রায়ণ করতে হবে বলে উপর মহল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন। আমাদের মানে আমার এবং ফয়সাল সাহেবের কাজ হলো লক্ষ্মী ছেলেমেয়ে হয়ে বড়দের সব কথা মেনে বিয়ের পিড়িতে বসা। যদিও কোনোভাবেই আমরা ছোট ছিলাম না। আমি তখন পড়াশুনার পাঠচুকিয়ে চাকরিতে জয়েন করেছি আর ফয়সাল সাহেব ইউরোপ থেকে উচ্চতর ডিগ্রী সম্পন্ন করে সদ্য দেশে ফিরেছেন।

হুট করে শুনলে কেমন হয় ভেবে আমার মা মাসখানিক আগে থেকে ফোনে বেশি বেশি সানজিদা চাচীদের গল্প জুড়ে দিতে শুরু করলেন। আমিও সরল মনে গল্পে অংশ নিই। হঠাৎ চাচীর ফোনকল। কেমন আছি, কী নিয়ে ব্যস্ত আছি, বাসায় যাবো কবে ইত্যাদি তথ্য আদান প্রদান শেষে মূল প্রসঙ্গে আসেন। মামনি ফয়সাল আমার ভাসুরের ছেলে। ওকে আমি নিজের ছেলের মতোই ভালবাসি। চার মাস আগে পিএইচডি করে দেশে ফিরেছে। ওকে আমরা বিয়ে দেয়ার কথা ভাবছি এবং তোমাকে আমাদের বিশেষ পছন্দ। আমরা অবশ্য দুই বছর আগে থেকেই পারিবারিক ভাবে বিষয়টি নিয়ে সিরিয়াস। ফয়সাল জানে সবকিছু। কিন্তু তোমাকে বলা হয়নি। কারণ ফয়সালের এককথা দেশে এসে সিদ্ধান্ত জানাবে। মা তুমি আর ফয়সাল এই সপ্তাহে একবার দেখা করো। জানি তুমি ব্যস্ত থাকো, তবু সুবিধামত একটা সময় বের করো, ফয়সাল সেই দিন ফ্রি থাকবে। বলে রাখা ভাল, শাহানা চাচী আমার প্রিয় চাচীদের একজন, কী উত্তর দিবো বুঝে উঠতে পারছিলাম না। অগত্যা আমাদের দেখা করতেই হলো।

একটা স্বনামধন্য কফি শপে আমার দেখা করার ব্যবস্থা করানো হলো। যথারীতি আমি যথা সময়ে পৌছে গেলাম, ফয়সাল সাহেব পৌছোলেন মিনিট বিশেক বাদে। নো শাড়ী, নো মেকাপ, নো ঢং। আমি নিজেকে নিয়ে গেলাম। আমি যেমন ঠিক তেমন। দরজা দিয়ে ঢুকতে গিয়ে যখন সবগুলো মুখ একসাথে আমার দিকে ঘুরে গেল বিষয়টা একটু আনইউজুয়াল লাগলো। দুই সিটের একটা টেবিলে বসে আমি মনোযোগ দিয়ে মেন্যুকার্ড পড়ছিলাম। প্রায় দৌড়ে নায়ক দৃশ্যপটে এন্ট্রি নিলেন।

এটা সেটা টুকটাক কথা, আসতে কোন অসুবিধা হয়েছে কিনা ধরনের। এবার মূল প্রসঙ্গে আসলেন ফয়সাল। 'আপনার নামটা সুন্দর। এখানে দেখা করতে আসার উদ্দেশ্য হলো একটা গৃহিত সিদ্ধান্ত অনুমোদন কিংবা নাকচ করতে হবে। বিষয়টা নিয়ে আমার পক্ষ থেকে আসলেই একটা বড় পদক্ষেপ। কারণ গত দুই বছর আমাকে আপনার কথা এতবার এতভাবে বলা হয়েছে যে সেটা রীতিমত আমার চিন্তাসূচির অংশ করে তোলা হয়েছিল। আমার প্রেমপূর্ণ বাসনাকে নিয়ন্ত্রন করে কেবল বার বার তাগাদা পড়ালেখা শেষ করে দেশে আসো। আর আমারও ভাগ্য, আপনার তো এতোদিনে বিয়ে করে ফেলা উচিৎ ছিলো। দেখেন আমি পরিবারের বড় ছেলে, আমার উপর এই পরিবারের প্রত্যেকটা মানুষের অধিকার বোধের শেষ নাই। আমার না বলা মানা, আমার রাগ করা অনুচিৎ, আমার জন্য স্বার্থসচেতন হওয়া অসম্ভব'। এমন সব আলোচনায় পরিবেশ রীতিমত গুরুগম্ভীর। কফি আসলো সাথে কিছু স্ন্যাকস। খেতে খেতে ফয়সাল সাহেব বলেই ফেললেন, আপনি কি স্বল্পভাষী? ভালো শ্রোতা এটা বলা বাহুল্য। আমার আর ভাল লাগছিলো না। তাই ওয়েটারকে ডেকে বিল নিলাম এবং পরিশোধ করলাম। ফয়সাল সাহেব হার্ট হলেন, বললেন আমি তো আরো এককাপ কফি নিবো। অগত্যা আরো কিছুক্ষন বসতে হলো। এবার ভদ্রলোক সোজা চোখে আমার দিকে তাকালেন। আমি জানি আপনি ফর্মালিটি মেইন্টেন করলেন। মেঝ মার অনুরোধে দেখা করতে এসেছেন এবং আপনার মনোভাব যেটা সাথে করে নিয়ে এসেছিলেন সেটাই বলোবৎ রইলো। মানে হলো আপনি বিয়েটা করছেন না। তাই আগবাড়িয়ে বিল দিয়ে দিলেন। ঋণ শোধ করার জন্য আরও একদিন দেখা করার অপশানটা বন্ধ করলেন। ভেরি স্মার্ট লেডি। নন্দিনী খুব কম সময়ে আপনাকে যতটুকু বুঝলাম একটা এডভাইস অবশ্যই দিবো, কখনো আপোষ করবেন না। সবাইকে আপোষ করা মানায় না। যা চান, যেভাবে চান অর্জন করে নিন। আর জেনে রাখুন যে আপোষ করতে শুরু করে, আপোষ তার পিছু ছাড়ে না।

কফি শপ থেকে বেরিয়ে রিকশাতে বসেই ফয়সাল সাহেবের এসএমএস পেলাম। সব কিছুর জন্য ধন্যবাদ। জীবনটাকে নিজের মত করে যাপন করবেন। ভালো থাকবেন। মাস ছয়েকের মধ্যে ফয়সাল সাহেব বিয়ের পিড়িতে বসেন। পাত্রী সুন্দরি, তখন এমএ করছিলেন। বিয়ের বছরখানিকের মাথায় একসকালে তার মৃত্যু সংবাদটা পাই। হার্টএট্যাক। খেলাধুলা করতে ভালোবাসতেন। ফুটবল খেলার মাঠেই অসুস্থবোধ করছিলেন, হসপিটালে নেয়ার পথে মারা যান। জীবনটা ভীষন রকম কেমন যেন! অনেক দিন বাদে কফি শপটাতে গিয়ে কথাগুলো মনে পড়লো। আজ চেষ্টা করেও ফয়সাল সাহের চেহারা ঠিক মতো মনে করতে পারলাম না। ফয়সাল সাহেবের কথা মনে পড়তেই একটা লাইনই মাথায় ঘুরছে, 'কোন সুখ ফুরায়নি যার, তার কেনো জীবন ফুরায়'।

দূরের বন্ধু সরফরাজের সাথে কথা হচ্ছিল। বললো সময় থাকলে ‘শাদী মে জরুর আনা’ মুভিটা দেইখো। সিজনচেঞ্জের জ্বরে পড়ে অনেকদিন বাদে ঠিক সময় পেয়ে গেলাম। এই বছর প্রথম কোনো হিন্দি মূলধারার সিনেমা দেখলাম যেখানে পেশাদার যৌনক্রিয়া বাদে একটা গল্প বলার চেষ্টা করা হয়েছে। আমি তো রাজকুমারের ফ্যান হয়ে গেলাম। দূর্দান্ত অভিনয়। এতবেশি বাস্তবের কাছাকাছি যে গুলিয়ে ফেলছিলাম। মুভির ডায়লগগুলো অভিনেতা অভিনেত্রীরা এতখানি ন্যাচারল করে বলেছেন যে দ্বিমত পোষনের জায়গা নেই। একটা অদৃশ্য বাধাও যে কতখানি অভেদ্য হতে পারে দেখলাম। সত্যি বলছি, ‘জীবনে সিনে মে আগ লাগাটা বহুত জরুরি’। কেউ এই আগুন জীবন গড়ার কাজে লাগায়, কেউ বিকিয়ে দেয়ার কাজে। এন্ড দ্যা চয়েস ইজ ইওরস।

সিনেমা দেখা শুরু করলে আমি আবার একটা দেখি না। কমপক্ষে দুইটা সময় পেলে আরো বেশি। এই দফায় দেখেছি ৩টা।
১) শাদী মে জরুর আনা
২) ক্যালেন্ডার গার্ল- রুপালী জগতের হাতছানি, অমসৃন পথ পাড়ি দেয়া ৫টা মেয়ে যাদের সামাজিক অবস্থান, পারিবারিক মূল্যবোধের গল্প। একটা গল্পে মধুর ভান্ডারকার তুলে এনেছেন।
৩) এক ফালি রোদ- সমাজবিজ্ঞান নিয়ে কাজ করা একগবেষকের মাধ্যমে তুলে আনা গল্পে যীশুর অভিনয় সত্যি ভাললাগার মত। মাঝেমধ্যে একটা ব্ল্যাংক এসএমএসের মূল্যও অমূল্য হতে পারে জানা গেল। যীশুর বয়ানে প্রপোজ করার দৃশ্যটুকু নিজ দায়িত্বে বার কয়েক টেনে টেনে দেখেছি।

শেষ করি আজকের ঘটনা বলে। প্রফেসর জামান স্যারের সাথে মিটিং ফিক্সড ছিলো। সিটিং সার্ভিসে করে ঢাবি’র পথে। নীলক্ষেত নেমে রিকশা নিবো। রাপা প্লাজার সামনে আসতেই বাস অর্ধেক খালি হয়ে গেল। পেছনের সীটে বসা ছেলেটার সেলফোন বেজে উঠলো।চমৎকার ভয়েসে হ্যালো বলতেই মস্তিস্কের মনোযোগ সেদিকে চলে গেল। শুরু হলো কথোপকথন,

মেয়েটা- তুমি কি আমাকে কোন এসএমএস পাঠিয়েছো
ছেলেটা- হুম পাঠিয়েছি। রাতে। পেয়েছো?
মেয়েটা- কী লিখছো?
ছেলেটা- কেন পড়া যাচ্ছে না?
মেয়েটা- যাচ্ছে তবুও জানতে চাচ্ছি। মুখে বলো
ছেলেটা- আমি এখন পাবলিক বাসে ইরা। বাসায় থাকলে চিল্লায় চিল্লায় বলতাম।
মেয়েটা- কেন লিখছো?
ছেলেটা- দেখো ইরা বেশ কিছুদিন হলো আমরা অনেক অনেক কথা বলছি। হ্যা স্বীকার করছি প্রথম প্রথম আমাদের মধ্যে ভালোলাগা ছিলো। বিষয়টা এখন আর ভালোলাগাতে নেই। আমরা প্রশ্র্য দিয়ে ইস্যুটাকে সামনে এগিয়েছি। শুধু বন্ধুরা এত কথা বলে না। আর আমার মনে হলো ভালোবাসি জানিয়ে দেয়ার সময় এসেছে। নতুবা দেরি হয়ে যেতে পারে।আয়েস করে আফসোস করার চেয়ে সাহস করে বলে ফেলা কী ভাল না? তোমার যদি সম্মতি না থেকে তাহলে হবে না। দেখ চেষ্টা না করে হেরে গিয়ে হারিয়ে যেতে আমি রাজি না। তুমি না বললে, আই প্রমিজ রাজ আর কখনো কোনোদিন তোমাকে কল দিবে না, আই মিন বিরক্ত করবো না।

সুপারভাইজার নীলক্ষেত চলে এসেছে বলে জানান দিলো। অনিচ্ছা সত্ত্বে আমাকে বাস থেকে নেমে পড়তে হলো। কথোপকথনের শেষটা আর জানা হলো না। তবে ইরাবতী আর রাজকুমার সারাদিন মস্তিস্কে রয়ে গেল। দুজন মানুষ নিজের ভালোবাসা প্রকাশে অকৃপন হোক। আগামী বসন্ত আমি নির্দ্বিধায় লিখে দিতে চাই ইরাবতী আর রাজকুমারের নামে। পাটভাঙ্গা শাড়ীতে ইরাবতী হয়ে উঠুক স্বর্গের অপ্সরী, রাজকুমার তার হাতটা আরো একটু শক্ত করে ধরে থাকুক সারাজীবন…
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে ডিসেম্বর, ২০২০ রাত ১২:০০
১১টি মন্তব্য ১০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শুধু উপবাস নয়, আত্মশুদ্ধি অর্জনই রোজার মূল উদ্দেশ্য

লিখেছেন নতুন নকিব, ০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ৯:০১

শুধু উপবাস নয়, আত্মশুদ্ধি অর্জনই রোজার মূল উদ্দেশ্য

ছবি, সংগৃহিত।

সারসংক্ষেপ

রমজানের রোজা ইসলামের অন্যতম মৌলিক ইবাদত। সাধারণ মুসলিম সমাজে রোজা ভঙ্গের ধারণা প্রধানত পানাহার ও যৌন সংসর্গের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অথচ কুরআন,... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভ্রমণব্লগ: আলোছায়ার ঝলকে এক অপার্থিব যাত্রা”

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৩:৫৬

মালয়েশিয়া আমার বেশ পছন্দের একটি দেশ। আমার জীবনের একটি অংশের হাজারো স্মৃতি এই দেশে। একটা সময় ছিল যখন এই দেশ ছিল আমার সেকেন্ড হোম।‌ এখন ও আমার আত্নীয়-স্বজন, ঘনিষ্ঠ বন্ধু-বান্ধবের... ...বাকিটুকু পড়ুন

Will you remember me in ten years!

লিখেছেন করুণাধারা, ০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ৮:৫৫



উপরের ছবিটি ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে একজন ব্লগার তার এক পোস্টে দিয়েছিলেন। জানতে চেয়েছিলেন দশ বছর পর কেউ তাকে মনে রাখবে কিনা!! গতমাসে এই পোস্ট যখন আমার নজরে এলো, হিসাব... ...বাকিটুকু পড়ুন

মানুষ

লিখেছেন বিপ্লব০০৭, ০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ৯:৫৭



মানুষ আসলে কী?

Sophies Verden কেতাবে নরওয়েজিয়ান ইয়স্তেন গার্ডার (Jostein Gaarder) এক বিশাল বয়ান পেশ করেছেন ছোট্ট মেয়ে সোফির জীবনের গল্প বলতে বলতে। নীতি-নৈতিকতা, জীবন-জগৎ, সৃষ্টি নিয়ে সোফির ধারণা ছিলো... ...বাকিটুকু পড়ুন

শোনো হে রাষ্ট্র শোনো

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১১:০২


নিশ্চল শহরে আজ ক্ষুধারা হাঁটে পায়ে পায়ে
ফুটপাথে শুয়ে রয় ক্ষুদার্ত মুখ।
চালের বস্তার সেলাই হয়নি ছেড়া,
রুটির দোকানে আগুন ওঠেনি জ্বলে।
ক্ষুদার্ত আধার জাপটে ধরে আষ্টেপৃষ্টে।

আমার চোখ লাল, ভেবো না নেশায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×