somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বিংশ শতাব্দীর সুবিখ্যাত স্পেনীয় চিত্রশিল্পী ও ভাস্কর পাবলো পিকাসোর ৪২তম মৃত্যুৃবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি

০৮ ই এপ্রিল, ২০১৫ সকাল ১০:৫৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


বিংশ শতাব্দীর বরেণ্য স্পেনীয় চিত্রশিল্পী ও ভাস্কর পাবলো পিকাসো। এ শতাব্দীর শিল্পকলার সঙ্গে তার নাম অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। তাকে বিশ শতকের মহত্তম শিল্পী বলে অভিহিত করা হয়। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ছবি এঁকেছেন, পাবলো পিকাসে যিনি সব সময় বলতেন, ‘চিত্রকলার অনেককিছুই শেখা হলো না ৷ শিল্পের বিচিত্র সব মাধ্যমে তিনি সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে কাজ করে বিশ্বের চারুকলাকে সমৃদ্ধ করেছেন।’যদি জানতে চাওয়া হয়, বিশ্বে চিত্রশিল্পের সবচেয়ে আবেদনময়ী সৃষ্টিকর্ম কোনটি? এর জবাবে প্রথমেই যে সৃষ্টির কথা চোখে ভেসে ওঠে, তার নাম গ্যোয়ের্নিকা। জার্মানদের বোমা বর্ষণে স্পেনের বিদ্ধস্ত গ্রাম গ্যার্নিকা’র দুঃখ্-দুর্দশা ও বেদনার এক গভীর প্রতিফলন গ্যোয়ের্নিকা৷ বিংশ শতাব্দীর বিশাল ক্যানভাসে কিউবিক ফর্মে সাদা-কালো ও কোলাজে আঁকা যুদ্ধ বিরোধী এক অসাধারণ ছবি৷ পিকাসোর লা ভি, ওল্ড গিটারিস্ট, থ্রিমিউজিশিয়ানসসহ আরো কয়েকটি ভুবনবিখ্যাত চিত্রকর্ম রয়েছে। তাঁর আরেকটি মহৎ কীর্তি বিশ্বশান্তির প্রতীক শ্বেত কপোত। কিন্তু গ্যোয়ের্নিকা ছাপিয়ে গিয়েছে সবকিছু। মানুষের ওপর অন্যায়, নীপিড়নের এমন আবেদন সৃষ্টিকারী চিত্রকর্ম বুঝি আর একটিও নেই। বিখ্যাত স্প্যানিশ চিত্রশিল্পী ও ভাস্কর পাবলো পিকাসো ১৯৭৩ সালের আজকের দিনে ফ্রান্সের সগিন্সে পরলোকগমন করেন। আজ তাঁর ৪২তম মৃত্যুবার্ষিকী। আধুনিক শিল্পকলার মহিরুহ বরেণ্য চিত্রশিল্পী পাবলো পিকাসোর মৃত্যুৃবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি।


(পনের বছর বয়সে পাবলো পিকাসো)
পাবলো পিকাসো ১৮৮১ সালের ২৫ অক্টোবর স্পেনের মালাগায় জন্মগ্রহণ করেন। পিকাসোর পুরো নাম পাবলো দিয়াগো হোসে ফ্রান্সিসকো ডি পওলা জোয়ান নেপোমেসিনো মারিয়া ডি লস রেমেডিওস সিপ্রিয়ানো ডি লা সান্টিসিমা ত্রিনিদাদ রউস ই পিকাসো। তার বাবার নাম ডন জোসে রুইজি বস্নাসকো এবং মায়ের নাম মারিয়া পিকাসো লোপেজ। তার নামের শেষাংশ তার মায়ের নামের মধ্যাংশ থেকেই নেয়া। পিকাসোর পিতা ছিলেন বার্সেলোনার চারুকলা বিদ্যালয়ের অধ্যাপক। পিকাসোর শিল্পী হওয়ার পেছনে তার বাবার অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। কারণ পিকাসোর বাবাও একজন চিত্রকর ছিলেন। অল্প বয়স থেকেই অঙ্কনের প্রতি পিকাসোর এক ধরনের ঝোঁক ছিল। আর ফিগার ড্রইং এবং তৈলচিত্রের আনুষ্ঠানিক হাতেখড়ি তার বাবার কাছেই। ছবি আঁকা শুরুর কয়েক বছরের মধ্যে এমন সিদ্ধহস্ত হয়ে ওঠেন বয়স ১৩ হতে না হতেই বাবাকেও ছাড়িয়ে যান৷ ছেলের প্রতিভায় বিস্মিত হয়ে ছবি আঁকাই ছেড়ে দেন বাবা এবং নিজের সব রং, তুলি দিয়ে দেন ছেলেকে। পিকাসো ১৪ বছর বয়সে ১৮৯৫ সালে স্কুলে ভর্তি হওয়ার পরীক্ষায় পাস করেন। এর দুই বছর পর তিনি মাদ্রিদে যান রয়াল একাডেমিতে পড়াশোনা করতে।


১৯ বছর বয়সে ছবি এঁকে তিনি প্রথম শিল্প সমালোচকদের দৃষ্টি কাড়তে সক্ষম হন। ১৯০৪ সালে মাদ্রিদের পড়াশোনা শেষে পিকাসো স্থায়ীভাবে প্যারিসে চলে আসেন এবং আমৃত্যু তার শিল্প সাধনার ক্ষেত্র হয়ে ওঠে প্যারিস নগরী। এখানে তিনি বন্ধু ম্যাক্স জ্যাকবের সহায়তায় ভাষা এবং সাহিত্যের ওপর দখল নেন। প্যারিসে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যে তিনি বিত্তের মুখ দেখেছিলেন তা নয়। চরম দারিদ্র্য ও ক্ষুধার সঙ্গে অবিরাম লড়াই করে ধাপে ধাপে তিনি শিল্পী হিসেবে খ্যাতি ও সুখের মুখ দেখেছিলেন। চিত্রকর হিসেবে পিকাসোর জীবন বেশ কয়েকটি অধ্যায়ে বিভক্ত। এসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘ব্লু পিরিয়ড’, প্রথম মহাযুদ্ধ ও তার অন্তর্বর্তীকাল ‘রোজ পিরিয়ড’, ‘নিগ্রো পিরিয়ড’, ‘কিউবিস্ট পিরিয়ড’। কিউবিস্ট ধারার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে বিখ্যাত পিকাসোর শিল্পকর্ম বৈচিত্র্যের জন্যও সমাদৃত। শৈশব এবং কৈশোরে রিয়ালিস্টিক ধারায়ও অতিপ্রাকৃতিক শৈল্পিক মেধার পরিচয় দিয়েছিলেন পিকাসো। তবে বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে তিনি বিভিন্ন শিল্প তত্ত্ব, কৌশল এবং ধারণার মুখোমুখি হন। নিয়ত রূপান্তরশীল শিল্পী হিসেবে পিকাসো উল্লিখিত পর্বে বিভক্ত সময়সীমার মধ্যেও তার পরবর্তীকালে আরো বহুবিধ শিল্পনীতি নিয়েও পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ব্যাপৃত থেকেছেন। বাস্তববাদী অঙ্কনরীতি যেমন তার হাতে নতুন মাত্রা পেয়েছে, তেমনি পরাবাস্তববাদী শিল্পরীতিও সমৃদ্ধ হয়েছে তার প্রতিভার স্পর্শে। ১৯১০ সালের মধ্যেই কিউবিষ্ট অঙ্কনশৈলী তার একাগ্র চেষ্টায় পূর্ণতা লাভ করে।


(পিকাসোর বিখ্যাত ছবি গোয়ের্নিকা)
বিখ্যাত ওই শিল্পীর মধ্যে সব সময় কাজ করত একটা স্বত:স্ফূর্ত সৃষ্টিশীলতা, সে শিল্পের মাধ্যমটা যাই হোক না কেন। সাধারণ রঙেও কালজয়ী ছবি আঁকা সম্ভব, অন্যদের মধ্যে এমন ভাবনা না থাকলেও পাবলো পিকাসো তা ব্যবহার করেছিলেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য শিল্পকর্ম হলোঃ ল্যা মূল্যাঁ দা ল গালেৎ, দ্য ব্লু রুম, ওল্ড গিটারিস্ট, সালত্যাঁবাঁক, সেল্ফ-পোট্রেট, টু নুডস, আভাগঁর রমণীবৃন্দ, থ্রি মিউজিশিয়ানস, স্কাল্পটর, মডেল অ্যান্ড ফিশবৌল, থ্রি ডান্সার্স, গিটার, গ্লাস অব আবস্যাঁৎ, সিটেড বাথার, পালোমা এবং গোয়ের্নিকা ইত্যাদি। পিকাসো বিলাসবহুল জীবন যাপন করার পাশাপাশি সাঙ্ঘাতিক কাজও করতেন। তিনি একের পর এক ছবি আঁকছেন, ভাস্কর্য গড়ছেন, প্রিন্ট ও খোদাইয়েরও কাজ করছেন! যখন কাজ করতেন না তখন পিকাসো মেতে থাকতেন বুলফাইটিং বা ষাঁড়ের লড়াই নিয়ে। আর্ল বা নিম শহরের রোমান অ্যারিনাগুলোতে যত বড় বড় বুলফাইটিং হত, প্রায় সবগুলোতেই তিনি তখন বন্ধুদের নিয়ে দেখতে যেতেন। পিকাসোর আরো একটি প্রতিভার কথা ঢাকা পড়ে গেছে তাঁর চিত্রশিল্পে খ্যাতির নিচে। তিনি ১৯৩৫ থেকে ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত তিন শতাধিক কবিতা রচনা করেছেন।


(পিকাসার প্রথম স্ত্রী ডোরা মার, দ্বিতীয় স্ত্রী গিলোট এবং প্রেমিকা মেরি থেরেসে ওয়াল্টার)
রোমান্টিক ধারার কবি হলেও পিকাসোর পারিবারিক জীবনে ছিল অস্থিরতা। পিকাসোর প্রথম স্ত্রী ছিলেন ডোরা মার। তিনি পিকাসোর প্রেমে উন্মত্ত ছিলেন। তাঁর কাছে গ্যোয়ের্নিকা অতিযত্নে সংরক্ষিত ছিল। এরপর পিকাসো আরো দুটি বিয়ে করেছিলেন। তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী গিলোট ছিলেন পিকাসোর চেয়ে ৪০ বছরের ছোট। ১৯২৭ সালে পিকাসো ১৭ বছর বয়সী মেরি থেরেসে ওয়াল্টার নামে এক তরুণীর প্রেমে পড়েন। এ সময়গুলোয় পিকাসো স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছিন্ন জীবনযাপন করতেন। পিকাসোর মৃত্যুর চার বছর পর থেরেসে আত্মহত্যা করেন।


পিকাসো বলেছিলেন, চিত্রশিল্প হলো এমন এক মিথ্যা, যা আমাদের সত্যিকে উপলব্ধি করতে শেখায়। তাঁর এ বাণী যে কতটা বাস্তবসম্মত, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ গ্যোয়ের্নিকা। বিখ্যাত স্প্যানিশ চিত্রশিল্পী ও ভাস্কর পাবলো পিকাসো ১৯৭৩ সালের ৮ এপ্রিল ফ্রান্সের সগিন্সে পরলোকগমন করেন। মুত্যুকালে তার বয়স হয়েছিলো ৯১ বছর। বিখ্যাত স্প্যানিশ চিত্রশিল্পী ও ভাস্কর পাবলো পিকাসোর ৪২তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। বরেণ্য চিত্রশিল্পী পাবলো পিকাসোর মৃত্যুৃবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি।
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই এপ্রিল, ২০১৫ সকাল ১০:৫৯
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ড.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:৪৮

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি....

বন্দর শুধু রাজস্ব আয়ের প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামহোয়্যারইন ব্লগের সেরা ব্লগার

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১১:০৮



আমাদের দেশে যে কোনো ক্রিটিক্যাল সময়ে লক্ষ্য করা যায় কোনো না কোনো পণ্যের অভাব লেগে গিয়েছে। কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ, ভোজ্য তৈল এমনকি রিলিফ গায়েব হয়ে যায়। বন্যায় আক্রান্ত বন্যায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

তৌহিদি জনতা কবে দেশ রক্ষায় আন্দোলনে নামবে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:০১


আলহামদুলিল্লাহ। তৌহিদি জনতার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সুনামগঞ্জে মেয়েদের একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ বন্ধ করা গেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে মেয়েদের খেলাধুলা নিষিদ্ধ এবং অশ্লীল কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়। সুনামগঞ্জের মাটিতে এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কি আসলেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

লিখেছেন অন্তর্জাল পরিব্রাজক, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৮:৪৪



“রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন “, “মূর্খের দেশে আবার কীসের বিশ্ববিদ্যালয়” – এসব প্রচারণা আমাদের দেশে অনেকদিন ধরেই হয়ে আসছে। বিশেষ করে ফেসবুকে আকছারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১৯৭১ঃ নদী-নালায় ভেসে থাকা স্বদেশের কান্নাঃ শহীদদের প্রতি নিবেদিত একটি কাব্যগাথা জাতির রক্ত, অশ্রু ও স্বাধীনতার অমর ইতিহাস

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:০৫


পঁচিশে মার্চ ১৯৭১
রাত্রি তখন গভীর, নগরীর বাতিগুলো
যেন অনাগত বিপদের সামনে অসহায়
ঢাকার আকাশে হঠাৎ গর্জে উঠল কামান
ট্যাংকের চাকার নিচে কেঁপে উঠল রাজপথ
গুলি ছুটে গেল মানুষের ঘুমন্ত জানালায়
আগুন ছড়িয়ে পড়ল... ...বাকিটুকু পড়ুন

×