somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

নূর মোহাম্মদ নূরু
নূর মোহাম্মদ নূরু (পেশাঃ সংবাদ কর্মী), জন্ম ২৯ সেপ্টেম্বর প্রাচ্যের ভেনিস খ্যাত বরিশালের উজিরপুর উপজেলাধীন সাপলা ফুলের স্বর্গ সাতলা গ্রামে

মানব দেহের নীরব ঘাতক ফরমালিনঃ ব্যবহারে চাই সুষ্ঠ নীতিমালা

৩০ শে মে, ২০১৮ বিকাল ৪:২০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


ফর্মালিন (-CHO-)n হল ফর্মালডিহাইডের (CH2O) পলিমার। ফর্মালডিহাইড দেখতে সাদা পাউডারের মত। পানিতে সহজেই দ্রবনীয়। শতকরা ৩০-৪০ ভাগ ফর্মালিনের জলীয় দ্রবনকে ফর্মালিন হিসাবে ধরা হয়। ফর্মালিন সাধারনত টেক্সটাইল, প্লাষ্টিক, পেপার, রং, কনস্ট্রাকশন ও মৃতদেহ সংরক্ষণে ব্যবহৃত হয়। ফরমালিনে ফরমালডিহাইড ছাড়াও মিথানল থাকে, যা শরীরের জন্য ক্ষতিকর। লিভার বা যকৃতে মিথানল এনজাইমের উপস্থিতিতে প্রথমে ফরমালডিহাইড এবং পরে ফরমিক এসিডে রূপান্তরিত হয়। দুটোই শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
ফরমালিনের ক্ষতিকর দিকঃ
১। ফরমালডিহাইড চোখের রেটিনাকে আক্রান্ত করে রেটিনার কোষ ধ্বংস করে। ফলে মানুষ অন্ধ হয়ে যেতে পারে।
২। তাৎক্ষণিকভাবে ফরমালিন, হাইড্রোজেন পার অক্সাইড, কারবাইডসহ বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর কেমিক্যাল ব্যবহারের কারণে পেটের পীড়া, হাঁচি, কাশি, শ্বাসকষ্ট, বদহজম, ডায়রিয়া, আলসার, চর্মরোগসহ বিভিন্ন রোগ হয়ে থাকে।
৩। ধীরে ধীরে এসব রাসায়নিক পদার্থ লিভার, কিডনি, হার্ট, ব্রেন সব কিছুুকে ধ্বংস করে দেয়। লিভার ও কিডনি অকেজো হয়ে যায়। হার্টকে দুর্বল করে দেয়। স্মৃতিশক্তি কমে যায়।
৪। ফরমালিনযুক্ত খাদ্য গ্রহণ করার ফলে পাকস্থলী, ফুসফুস ও শ্বাসনালিতে ক্যান্সার হতে পারে। অস্থিমজ্জা আক্রান্ত হওয়ার ফলে রক্তশূন্যতাসহ অন্যান্য রক্তের রোগ, এমনকি ব্লাড ক্যান্সারও হতে পারে। এতে মৃত্যু অনিবার্য।
৫। মানবদেহে ফরমালিন ফরমালডিহাইড ফরমিক এসিডে রূপান্তরিত হয়ে রক্তের এসিডিটি বাড়ায় এবং শ্বাস-প্রশ্বাস অস্বাভাবিকভাবে ওঠানামা করে।
৬। ফরমালিন ও অন্যান্য কেমিক্যাল সামগ্রী সব বয়সী মানুষের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ। তবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ শিশু ও বৃদ্ধদের ক্ষেত্রে। ফরমালিনযুক্ত দুধ, মাছ, ফলমূল এবং বিষাক্ত খাবার খেয়ে দিন দিন শিশুদের শারীরিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হারিয়ে যাচ্ছে। কিডনি, লিভার ও বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নষ্ট, বিকলাঙ্গতা, এমনকি মরণব্যাধি ক্যান্সারসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ছে শিশু-কিশোররা। শিশুদের বুদ্ধিমত্তা দিন দিন কমছে।
৭। গর্ভবতী মেয়েদের ক্ষেত্রেও মারাত্মক ঝুঁকি রয়েছে। সন্তান প্রসবের সময় জটিলতা, বাচ্চার জন্মগত দোষত্রুটি ইত্যাদি দেখা দিতে পারে, প্রতিবন্ধী শিশুর জন্ম হতে পারে।
৮। এ ধরনের খাদ্য খেয়ে অনেকে আগের তুলনায় এখন কিডনি, লিভারের সমস্যাসহ বিভিন্ন রোগের সমস্যায় ভুগছেন। দেখা যাচ্ছে, কয়েক দিন পরপর একই রোগী ডায়রিয়ায় ভুগছেন, পেটের পীড়া ভালো হচ্ছে না, চর্মরোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।

ফরমালিন, মানব দেহের জন্য ক্ষতিকারক এক প্রকার বিষ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল টক্সিকোলজি প্রোগ্রামের গবেষণায় মানুষের শরীরে ক্যান্সার রোগ সৃষ্টির জন্য সরাসরি দায়ী করা হয় ফরমালিনকে। এছাড়া ফরমালিনের প্রভাবে অন্ধত্ব, পেটের পীড়া, হাঁচি, কাশি, শ্বাসকষ্ট, বদহজম, ডায়রিয়া, আলসার, চর্মরোগসহ বিভিন্ন রোগ হয়। এ রাসায়নিক যৌগ ধীরে ধীরে মানবদেহের লিভার, কিডনি, হার্ট ও ব্রেন ধ্বংস করে। এর প্রভাবে মানুষের স্মৃতিশক্তিও কমে যায়। ফরমালিনের ব্যবহার হয় পরীক্ষাগারে এবং শিল্পকারখানায়। কিন্তু পরীক্ষাগারের নিয়ন্ত্রিত কক্ষ ছেড়ে ফরমালিন ঠিক কবে, কোন উর্বর মস্তিষ্কের ধারণা নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিল তার ইতিহাস আমাদের জানা নেই।

কিভাবে মাছ থেকে ফর্মালিনের দূর করবেনঃ
১।পরীক্ষায় দেখা গেছে পানিতে প্রায় ১ ঘন্টা মাছ ভিজিয়ে রাখলে ফর্মালিনের মাত্রা শতকরা ৬১ ভাগ কমে যায়।
২। লবনাক্ত পানিতে ফর্মালিন দেওয়া মাছ ১ ঘন্টা ভিজিয়ে রাখলে শতকরা প্রায় ৯০ ভাগ ফর্মালিনের মাত্রা কমে যায়।
৩। প্রথমে চাল ধোয়া পানিতে ও পরে সাধারন পানিতে ফর্মালিন যুক্ত মাছ ধুলে শতকরা প্রায় ৭০ ভাগ ফর্মালিন দূর হয়।
৪। সবচাইতে ভাল পদ্ধতি হল ভিনেগার ও পানির মিশ্রনে (পানিতে ১০ % আয়তন অনুযায়ী) ১৫ মিনিট মাছ ভিজিয়ে রাখলে শতকরা প্রায় ১০০ ভাগ ফর্মালিনই দূর হয়।
৫। ফল ও সবজি থেকে ফর্মালিন দূর করতে খাওয়ার আগে ১০ মিনিট গরম লবণ পানিতে ফল ও সবজি ভিজিয়ে রাখতে হবে।

ফরমালিন এখন আমাদের প্রায় প্রতিটি খাদ্য দ্রব্যে। যেহেতু এটি পচন প্রক্রিয়াকে রোধ করে, তাই পচনশীল দ্রব্য যেন ভালো থাকে, লাভের অংকে যেন টান না পড়ে, তাই ব্যবসায়ীরা ইচ্ছেমতো ব্যবহার করছে রাসায়নিকটি। গণমাধ্যমের কল্যাণে আজ সবার জানা ফরমালিনের ক্ষতিকারক দিক। বিভিন্ন দৈনিকের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বাজারগুলোতে বিক্রি করা ফল ও মাছে ফরমালিনের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। যারা এটি খাদ্য দ্রব্যে ব্যবহার করেন তারা নিজেরাও জানেন, এর ক্ষতিকারক দিক, কিন্তু ক্ষতির চেয়ে তাদের লাভের অংক যেহেতু বড়, তাই জেনে-শুনে মানুষকে বিষ খাওয়াতে কৃপণতা নেই। ফরমালিনের দামও হাতের নাগালে। ১ কেজি ফরমালিনের দাম মাত্র ২৫০ টাকা। এ টাকা বিনিয়োগ করে যদি কয়েক হাজার টাকার পচনশীল দ্রব্য বাঁচানো যায়, তাহলে এর ব্যবহারে লোভের ছায়া তো পড়তে বাধ্য। এর প্রমাণ স¤প্রতি পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের তথ্যে জানা যায়, গত বছর দেশে ফরমালিন আমদানি হয়েছে ২৫০ টন, যদিও প্রয়োজন ছিল মাত্র ১০০ টনের। চাহিদার অতিরিক্ত দেড়শ’ টন খাদ্যদ্রব্যের সঙ্গে প্রবেশ করেছে আমাদের শরীরে। ফরমালিন আমদানির হার ফি বছর বাড়ছে। কারণ এর সহজলভ্যতা, সহজপ্রাপ্যতা এবং কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা। ফরমালিন আমদানির অনুমোদন নীতিমালা বেশ নমনীয়। আমদানি লাইসেন্স ফিও হাতের নাগালে। এক লাখ টাকা পর্যন্ত আমদানিতে সরকারি তহবিলে জমা দিতে হয় দুই হাজার ১০০ টাকা।

এবার আসি ফরমালিনের গোঁড়ার কথায়। সোভিয়েত ইউনিয়নের রসায়নবিদ আলেকজান্ডার বুতলারভ ১৮৫৯ সালে বর্ণহীন, দুর্গন্ধযুক্ত একটি রাসায়নিক যৌগের অস্তিত্ব জানতে পারেন। পরবর্তীকালে এ রাসায়নিক যৌগটিকে ফরমালডিহাইড বা মিথান্যাল নামে চিহ্নিত করা হয়। দেখতে সাদা পাউডারের মতো পানিতে দ্রবীভূত ফরমালিন টেক্সটাইল শিল্প, প্লাস্টিক, পেপার, রং, কনস্ট্রাকশন এবং মৃতদেহ সংরক্ষণে ব্যবহৃত হয়। এই যৌগটির প্রধান বৈশিষ্ট্য, এটি সংক্রমিত হতে দেয় না এবং পচন প্রক্রিয়ার জন্য দায়ী ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক ধ্বংস করতে পারে। তবে উপকারী দিকের চেয়ে যৌগটির ক্ষতিকারক দিকই বেশি। রুশ বিজ্ঞানী ফরমালিন আবিষ্কার করলেও তিনি হয়তো দুঃস্বপ্নের ভেতরেও ভাবতে পারেননি, দুইশ’ বছর পেরিয়ে এ রাসায়নিক যৌগটি একটি জাতির ধ্যান-জ্ঞানে পরিণত হবে। এটা একটি জাতিকে ধ্বংস করতে অপরিহার্য হয়ে উঠবে।
ফরমালিনের ক্ষতিকারক নানা রকম দিক বিবেচনা করে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এর ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো ফরমালিনসম্পৃক্ত জিনিসপত্র ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। আমাদেও দেশেও এ বিষয়ে আইন আছে। পিওর ফুড অর্ডিন্যান্স, ১৯৫৯ অনুযায়ী খাদ্যপণ্যে ফরমালিনের ব্যবহার ও বিক্রি নিষিদ্ধ। ফরমালিনের বিষয়ে হাইকোর্টের নির্দেশও রয়েছে। সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদে খাদ্য নিরাপত্তার কথা নিশ্চিত করা হয়েছে। তবুও কাজীর গরু কেতাবে আছে, গোয়ালে নেই-এ প্রবাদ যেহেতু আমাদের জানা, তাই আইনের প্রয়োগ যেমন নেই, তেমনি ব্যবসায়ীদেরও তা মানার বালাই নেই। বাস্তব কারণেই ফরমালিন আমদানি নিষিদ্ধ সম্ভব নয়। এটা যুক্তিসঙ্গতও নয়। কারণ এর মূল যে ব্যবহার শিল্পকারখানা এবং পরীক্ষাগারে, তা সচল রাখতেই আমদানি অব্যাহত রাখতে হবে। কিন্তু ফরমালিনের ব্যবহার যেন যথাযথ হয়, তা নিশ্চিত করা দরকার। আমদানির পর ফরমালিন কী কাজে ব্যবহার হচ্ছে, সে বিষয়টি নিশ্চিত করা দরকার।

খাদ্যে ফরমালিনের ব্যবহার বন্ধে জনগণের যে সচেতনতা প্রয়োজন, সে বার্তা ইতিমধ্যে মানুষের কাছে চলে গেছে। সরকার নানা ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে। ভ্রাম্যমাণ আদালত বাজারে অভিযান চালাচ্ছে। মানুষকে সচেতন করতে সরকারের পাশাপশি ব্যবসায়ী সংগঠনের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেয়া হয় ফরমালিনমুক্ত বাজারের। প্রথম পর্যায়ের বিভিন্ন ধাপে রাজধানীর সাতটি কাঁচাবাজারকে ফরমালিনমুক্ত ঘোষণা করা হয় এবং মাছ মাংশ সহ শাক সবজিতে ফরমালিন চিহ্নিত করতে নিযুক্ত করা হয় পরীক্ষক। তবে ফলাফলে খুব উন্নতি নেই। কারণ এখানেও প্রতারিত হচ্ছেন ক্রেতারা। ফরমালিন পরীক্ষার সঙ্গে যুক্ত টেকনিশিয়ানদের যুক্তি, খাদ্যে দশমিক ৯৯ পিপিএম পর্যন্ত ফরমালিন সহনীয়। অথচ ফুড অর্ডিন্যান্স স্পষ্ট বলছে, ফরমালিন এক প্রকার বিষ এবং মানব দেহের জন্য ক্ষতিকর। তাই খাদ্যপণ্যে কোনো মাত্রার ফরমালিনই গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ বিষের কোনো সহনীয় মাত্রা থাকতে পারে না। বিষের ভংগ্নাংশও বিষ। অথচ ফুড অর্ডিন্যান্সকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে ব্যবসায়ীদের নিযুক্ত টেকনিশিয়ানরা খাদ্যপণ্যে ফরমালিনের মাত্রা ঠিক করে দিচ্ছে। ব্যবসায়ীদের দাবী অনুযায়ী যেহেতু এসব বাজারে বিক্রি হওয়া পণ্যে ফরমালিন নেই, তাই পণ্যের দামও অন্য বাজারের তুলনায় বাড়িয়ে দেন এখানকার ব্যবসায়ীরা। দুষ্টের যেহেতু ছল-চাতুরির অভাব নেই, তাই এসব বাজারে এসব খোঁড়া যুক্তির কাছে সত্যিকার অর্থেই অসহায় ক্রেতারা। সত্যি সেলুকাস, কী বিচিত্র এ দেশ!

সরকার আইন তৈরি করেছে, ফরমালিনের অস্তিত্ব পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নিচ্ছে, কিন্তু কমছে না এর ব্যবহার। এ জন্য দায়ী ব্যবসায়ীদের লোভ। কারন আইন প্রয়োগের দায়িত্ব যার বা যাদের ওপর, তারা যদি আন্তরিক না হন, একবারও না ভাবেন যে, তাদের সন্তানও এই নীরব বিষের প্রভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ছে, তাহলে সর্ষের ভেতরের ভূতের আছর কোনো দিনই যাবে না। জনগনের পক্ষে এর সমাধান সম্ভব নয় কারণ তারা সচেতন হলেও কোনো লাভ হচ্ছে না। তাদের প্রয়োজন মেটাতে পণ্য কিনতেই হবে, যেহেতু সামনে কোনো বিকল্প নেই। তাই বাধ্য হয়েই, জেনে, বুঝে, শুনেই ফরমালিন মেশানো খাদ্যপণ্য কিনতে হচ্ছে, ব্যবহার করতে হচ্ছে। তবে সরকারের প্রচেষ্টা আরেকটু সফল হতে পারে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্যদের আন্তরিকতায়। দায়িত্ব পালনের সময় তারা যদি কোনো লোভের কাছে পরাজিত না হন, তাহলে অপরাধীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারবেন। আর অপরাধীর দণ্ড নিশ্চিত হলে, পরবর্তী সময়ে অপরাধ করার আগে অপরাধী দ্বিতীয়বার ভাবতে বাধ্য হবে। আমাদের তো আইনের অভাব নেই। ফুড অর্ডিন্যান্স আছে, আছে ভোক্তা অধিকার আইন। কিন্তু তার প্রয়োগের বেলাতেই যত গণ্ডগোল। কারণ অতীত অভিজ্ঞতায় আমরা জেনেছি, সর্ষের মাঝেই থাকে ভূত। সেই ভূতের আছর থেকে আমরা প্রায়ই মুক্ত হতে পারি না। তবে ভূতের আছর যে সর্ষের ওপরও কখনো কখনো পড়ে তা কিন্তু তলিয়ে দেখি না আমরা। ফরমালিন মেশানো খাবার আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্য বাজার থেকে কেনেন, সেই খাবার তাদের সন্তানের মুখেও তুলে দিতে হয়। সরকারের একার পক্ষেও এই অপরাধ দমন সম্ভব নয়। সে ক্ষেত্রে জনবল সংকট একটি বড় বাধা। এর সঙ্গে রয়েছে দক্ষ, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মীর অভাব। লোকবলের অভাব আমাদের আছে, কিন্তু যা আছে, তারও কি সঠিক প্রয়োগ হচ্ছে?

ফরমালিনের ভয়াবহতা সম্পর্কে কমবেশি সবাই জানেন। দেশের অধিকাংশ মানুষ সচেতনভাবে বা অচেতনভাবে ফরমালিনযুক্ত ফলমূল খাচ্ছে এবং পড়ছে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে। যে শাকসবজি ও ফলমূল থেকে পুষ্টির বড় অংশের জোগান পাওয়ার কথা, কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর কারণে তা থেকে উল্টোটিই মিলছে। পুষ্টির জোগান তো মিলছেই না বরং এগুলো শরীরের ক্ষতি করছে।
কীটনাশক ব্যবহার করা হয় শাকসবজি বা ফলমূলে যেন পোকা না ধরে। গ্রোথ হরমোন ব্যবহার হয় ভালো ফলনের জন্য। রাইপেনিং বা কৃত্রিমভাবে ফল পাকানোর জন্য ব্যবহার করা হয় কার্বাইড।
শাকসবজি ও ফলমূল যাতে দ্রুত নষ্ট হয়ে না যায় সেজন্য ফরমালিনসহ বিভিন্ন ধরনের কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয়। শাকসবজি ও ফলমূল দীর্ঘ সময় ধরে পানিতে ভিজিয়ে রেখে কিছুটা ফরমালিনমুক্ত করা গেলেও গ্রোথ হরমোন ও কীটনাশক থেকে মুক্ত করা যায় না, এগুলো শাকসবজি ও ফলমূলে থেকেই যায়।
মিথানল ও ফরমালিনে থাকা ফরমালডিহাইড পলিমার মানব শরীরের মারাত্মক ক্ষতি করে। যকৃতে মিথানল এনজাইমের উপস্থিতি প্রথমে ‘ফরমালডিহাইড’ এবং পরে ফরমিক এসিডে রূপান্তর করে, যা শিশু, বৃদ্ধ, গর্ভবতী নারীসহ সব বয়সীদের জন্য খুব ঝুঁকিপূর্ণ।
গ্রোথ হরমোন, ফরমালিন, কীটনাশকসহ বিভিন্ন ধরনের বিষাক্ত পদার্থযুক্ত ফলমূল ও শাকসবজি খেয়ে মানুষ মরণব্যাধি ক্যান্সারেও আক্রান্ত হচ্ছে। এছাড়া বিকলাঙ্গতা, সন্তান প্রসবে জটিলতা, প্যারালাইজড, এলার্জি, চোখের সমস্যা, শ্বাসকষ্ট, কিডনি নষ্ট হওয়াসহ বিভিন্ন জটিল রোগের জন্য ফরমালিনযুক্ত খাদ্য উপাদান দায়ী।

রমজান মাসের শুরু থেকেই গ্রীষ্মের রসালো ফলে বাজার ভরে গেছে। কিন্তু ফরমালিনমুক্ত ফল ও শাকসবজি পাওয়া খুবই কঠিন। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী কেবল নিজেদের স্বার্থে শাকসবজি, ফলমূলসহ বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্যে ফরমালিন মেশায়। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, এসব দেখার যেন কেউ নেই। রাজধানীসহ সারা দেশের বাজারে যেসব ফল পাওয়া যাচ্ছে তার অধিকাংশে রয়েছে এই বিষাক্ত ফরমালিন, যা শিশু, বৃদ্ধসহ সব বয়সী মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। শাকসবজি ও ফলমূলে ফরমালিনসহ অন্যান্য বিষাক্ত পদার্থ ব্যবহার বন্ধে কঠোর আইন ও তার প্রয়োগ দরকার। কোনো অসাধু ব্যক্তি ফলমূল ও শাকসবজিতে ফরমালিন ব্যবহার করলে তাকে জেল-জরিমানাসহ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। শুধু তাই নয়, কেউ যাতে অপরাধ করার পর লঘু শাস্তি ভোগ করে পার পেয়ে না যায় সে বিষয়ে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে। মাঠ পর্যায় থেকে শুরু করে সব পর্যায়ে ফরমালিন পরীক্ষা করার যে সীমাবদ্ধতা আছে সে সমস্যার সমাধান করতে হবে। শাকসবজি ও ফলমূলে ব্যবহার্য সবরকম বিষাক্ত পদার্থের বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি দরকার। সেই সঙ্গে মাঠ পর্যায় থেকে শুরু করে শাকসবজি ও ফলমূল বাজারজাতকরণ পর্যন্ত মানুষের মাঝে সচেতনতা বাড়াতে হবে, যাতে কেউ এ ধরনের সমাজবিরোধী কাজ করতে না পারে। ফল মজুদের স্থান, আড়তসহ ছোট ও বড় বাজারে ফরমালিন, কীটনাশকসহ বিভিন্ন ধরনের বিষাক্ত পদার্থ শাকসবজি ও ফলমূলে আছে কিনা, তা শনাক্তকরণের জন্য ল্যাবরেটরি থাকাও বাঞ্ছনীয়। কিন্তু আমাদের দেশে এর বাস্তবায়ন এখনো সুদূর পরাহত। যদিও আইন ও বিধির কমতি নেই। কমতি কেবল বাস্তবায়নে। কিন্তু নিরাশ হলেতো চলবে না এই চক্র তো ছিন্ন করতে হবে। ফরমালিন মেশানোর ফলে যে ক্ষতি তা থেকে মুক্তির জন্য যে অচ্ছেদ্য চক্র, তা ছিন্ন করতে বড় দায়িত্ব পালন করতে হবে ব্যবসায়ীদেরই। তারা যদি নীতির পরিবর্তন করেন, তাহলেই ফরমালিনমুক্ত খাদ্যপণ্য পাওয়া সম্ভব। তাই জনগণের আগে সচেতন হতে হবে ব্যবসায়ীদের। তাদেরকেও ভাবতে হবে ফরমালিন মেশানো বিষাক্ত খাদ্যদ্রব্য কোনো না কোনোভাবে তিনি নিজে খাচ্ছেন, তার সন্তানকেও খাওয়াচ্ছেন। পিতা সবসময় তার সন্তানকে ভালোবাসেন। সন্তানের দুঃখে দুঃখী হন। সন্তানের ভালোবাসার জন্য পিতার ত্যাগের ইতিহাস পৃথিবীতে অনেক। সন্তানের জন্য পিতার জীবন দেয়ার ঘটনাও বিরল নয়। আমরা সবাই যদি সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে একবার ভাবি, শুধু লাভের আশায় যে বিপজ্জনক পথে হাঁটছি, তা থেকে আমার সন্তানও বিপদের মুখে পড়ছে, তাহলেই হয়তো মুক্তির দেখা মিলবে।

নূর মোহাম্মদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী
[email protected]
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে মে, ২০১৮ বিকাল ৪:২১
১৫টি মন্তব্য ১৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

এভাবেই নাকি এখন চলে!

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৬ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১:০৯



চাবি সহযোগে তালা খোলা অতিশয় সহজ
কিন্তু আজকাল প্রায়শই গুলিয়ে ফেলি তালগোল!
এটা নিয়ে নিত্য বাহাসে ভেঙে যায় পাখিদের পার্লামেন্ট!
অতঃপর গোপনে সেরে ফেলি সহজ বোঝাপড়া!

প্রতিদিন যে পথে আসি... ...বাকিটুকু পড়ুন

Dr. Jahangir kabir স্যারের কোন পরামর্শ বা উপদেশ নতুন কিছু না।

লিখেছেন লিংকন বাবু০০৭, ২৬ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১:২৬

Dr. Jahangir kabir স্যারের কোন পরামর্শ বা উপদেশ নতুন কিছু না। আর এগুলো কোন কিছুই তার বানানো না। একেকটির বয়স শত বছর থেকে কিছুর ইতিহাস হাজার বছরের ও।
যদিও সে... ...বাকিটুকু পড়ুন

নদীর টানে, সবুজের গানে

লিখেছেন মাকার মাহিতা, ২৬ শে জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৩৫

বয়ে চলে নদী দূর হতে দূরে,
অনন্তকালের শান্ত এক সুরে।
তার দুই কূলে রূপের মেলা,
সবুজ প্রকৃতির মিষ্টি খেলা।
হাওয়ায় দোলে ঘাস আর বন,
আকাশের সাথে মেলায় মন।
নদীর জলে আলোর ঝিলিক,
বাতাসে মেশে পাখির কিচিরমিচির।
গাছের ছায়ায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

"এ ট্রাজেডি অর ট্রাজেক্টরি অফ লাভ" (পর্ব-৩)

লিখেছেন তাহমিদ রহমান, ২৬ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ১০:০৩

৩. নিষিদ্ধ স্বর্গ


পরদিন দুপুরবেলা। ইলির আকাশ আজ কিছুটা পরিষ্কার, মেঘের ফাঁক দিয়ে ফ্যাকাশে রোদ উঁকি দিচ্ছে।
ক্লারা তার ট্রাভেল এজেন্সির অফিসের ডেস্কে বসে কফি খাচ্ছিল। গতকাল ব্যাংকের সেই তরুণ এশীয় অফিসারটির... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফ্যাসিবাদের দোসর কোনো সাংবাদিককে কেনো আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে শাস্তি দিচ্ছে না?

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২৬ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ১০:৪৭

ফ্যাসিবাদের দোসর কোনো সাংবাদিককে এখনো আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে শাস্তি দিচ্ছে না কেন?

মানবাধিকার সংস্থা Odhikar আয়োজিত Human Rights Abuses and Access to Justice for Victims বিষয়ক সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন আইন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×