somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

নূর মোহাম্মদ নূরু
নূর মোহাম্মদ নূরু (পেশাঃ সংবাদ কর্মী), জন্ম ২৯ সেপ্টেম্বর প্রাচ্যের ভেনিস খ্যাত বরিশালের উজিরপুর উপজেলাধীন সাপলা ফুলের স্বর্গ সাতলা গ্রামে

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দুঃখবাদী কবি যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের ৬৪তম মৃত্যুবার্ষিকীেতে শ্রদ্ধাঞ্জলি।

১৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৮ সন্ধ্যা ৭:২৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


নজরুল ও তিররিশের কবিদের পূর্বসূরিত্বের দাবিদার কবি যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত। বাংলা কাব্যকে অবাস্তব কল্পনার জগৎ থেকে বাস্তবতায় নিয়ে আসার ক্ষেত্রে তাঁকে একজন পথিকৃৎ বলা যায়। সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের পরে তিনিই মনে হয় প্রথম কবি যিনি সমাজের অন্ত্যজ শ্রেণীর জয়গান গেয়েছেন। যতীন্দ্রনাথ ছিলেন একজন যুক্তিবাদী ও মননশীল লেখক; সমাজ ও সমকাল তাঁর কাব্যের বিষয়বস্তু। ভাষার মধ্যে তর্ক, কটাক্ষ ও প্রচ্ছন্ন পরিহাস তাঁর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য। দর্শন ও বিজ্ঞান উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই তিনি ছিলেন দুঃখবাদী, আর এই দুঃখবাদ তাঁর কাব্যের মূল সুর। প্রকৃতি ছলনাময়ী, জীবন দুঃখময়, সুখ অনিত্য ও ক্ষণিকের এই দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি জগৎ-সংসারকে দেখেছেন। কোনোরূপ ভাববাদের বশবর্তী হয়ে নয়, বরং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও বাস্তব পর্যবেক্ষণ থেকে তিনি দুঃখ ও নৈরাশ্যের চিত্র এঁকেছেন। আধুনিক বাংলা কবিতাকে চিরাচরিত আবেগ থেকে মুক্তিদানের প্রথম প্রয়াস চালিয়েছিলেন যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত। যিনি রবীন্দ্র সাহিত্যের দোর্দন্ড প্রতাপের মধ্যে সাহিত্যকর্ম শুরু করেও রবীন্দ্র নিগড় থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছিলেন। ‘দুঃখবাদী কবি’ বলে খ্যাতি অর্জন করলেও তিনি ছিলেন সমাজসচেতন ও মানবতাবাদী কবি। তাঁর দুঃখের সূতিকাগার ছিল মানবপ্রেম। মানুষের দুঃখ-বেদনা সামাজিক অবিচার ও বৈষম্যে তাঁর কবি হৃদয় হাহাকার করে উঠেছিল। বাংলা কবিতার প্রবল রোমান্টিক যুগে জন্মগ্রহণ করেও, রোমান্টিক আবহে নিমজ্জিত থেকেও তিনি কবিতাকে বাস্তবতার কঠিন মাটিতে দাঁড় করাতে চেয়েছেন। দুই বাংলার বিভিন্ন পাঠ্যপুস্তকে তাঁর বেশ কিছু কবিতা অন্তর্ভুক্ত করা আছে। পেশাগত জীবনে তিনি একজন প্রকৌশলী হিসেবে তাঁর বিজ্ঞানমনস্ক অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পেরেছিলেন। আজ দুঃখবাদী এই কবির ৬৪তম মৃত্যুবার্ষিকী। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের মৃত্যুবার্ষিকীেতে শ্রদ্ধাঞ্জলি।


কবি যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত ১৮২৭ সালের ২৬ জুন ভারতের নদীয়া জেলার শান্তিপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তার পৈতৃক নিবাস নদীয়ার হরিপুর গ্রামে। ১৯০৮ সালে শ্রীমতী জ্যোতির্লতা দেবীর সাথে বিবাহ হয় যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের। তিনিও সে সময়কার মহিলাকবিদের মধ্যে ছিলেন অন্যতমা। যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত ১৯১১ সালে তিনি শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি লাভ করে প্রথমে নদীয়া জেলাবোর্ড ও পরে কাসিমবাজার রাজ-এস্টেটের ওভারসিয়ার হন। চাকরির পাশাপাশি তিনি সাহিত্য চর্চাও শুরু করেন এবং অল্পকালের মধ্যেই কবি হিসেবে খ্যাতি ও প্রতিষ্ঠা অর্জন করেন। যতীন্দ্রনাথের ভাষা আবেগমুক্ত ও যুক্তিসিদ্ধ; তিনি সরাসরি বিষয়ের প্রকাশ ঘটান। তবে অন্ত্যপর্বের কাব্যগুলিতে তাঁর রোম্যান্টিক বিহবলতা ও চাঞ্চল্য প্রকাশ পেয়েছে। মহাত্মা গান্ধীর জীবনদর্শন ও রাজনীতিতে তিনি বিশ্বাসী ছিলেন। তাঁর জীবনদৃষ্টিতে মানবতাবাদ ও দরিদ্র শ্রমজীবী মানুষের প্রতি গভীর মমতা লক্ষণীয়। বহুকালচালিত সংস্কার শাসন নিষ্পেষণ এবং ধর্মের নামে মানুষকে নির্যাতনের যে অলিখিত নিয়ম চালু হয়েছিল, যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত সেগুলো গভীরভাবে লক্ষ্য করেছিলেন। সমাজের কিছু মানুষ একদিকে জীবনের রূপ-রস-অর্থ-প্রাচুর্য কুক্ষিগত করেছে, আর অপরদিকে কিছু মানুষ কেবলই হয়েছে শোষিত। সমাজের গরিব শ্রেণীর মানুষ ধনীদের ভোগ-বিলাস উৎযাপনের টোপ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। যতীন্দ্রনাথ এই বৈষম্যের জন্য কেবল মানুষকেই দোষারোপ করেননি, তিনি বিধাতাকেও সন্দেহসংকুল করে ফেলেছেন। যতীন্দ্রনাথের মতে মানুষের জীবনের প্রথমার্ধ অবিরত দ্বন্দ্ব-সংঘাতের মধ্য দিয়ে নিদারুণ দুঃখ-কষ্টে অতিবাহিত হয়, দ্বিতীয়ার্থে অপরাধ জরা-ব্যাধি ভারাক্রান্ত অবসন্নতা নেমে আসায় রাত্রির অন্ধকার-সদৃশ অনিশ্চয়তার মধ্যে কাটে। প্রেম, প্রকৃতি বা ঈশ্বর মানবজীবনের দুঃখের দহনজ্বালা ও নৈরাশ্যের অবসন্নতা দূর করতে পারে না। তাঁর বিশ্বাস ছিল এমন যে, ঈশ্বর স্বয়ং দুঃখময়, ঈশ্বরের বার্তা মানুষের জন্য কোনো কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না; জগৎ যেমন তেমনই থাকে; প্রেম বলে কিছু নেই, চেতনাই জড়কে সচল করে।


যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের কাব্যে সমাজ সচেতনতা কোন প্রক্ষিপ্ত বিষয় ছিল না। কাব্য রচনাকে তিনি মানবতাবাদের পক্ষে এক আন্দোলন হিসেবে নিয়েছিলেন। যে কারণে তার কাব্যগ্রন্থের নামের মধ্যেও একটি ধারাবাহিকতা লক্ষ্য করা যায়। মরু-মরীচিকা (১৯২৩), মরুশিখা (১৯২৭), মরুমায়া (১৯৩০), সায়ম (১৯৪০), ত্রিযামা (১৯৪৮) প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থে তাঁর সমাজ সচেতনতা ও মানবতাবাদের জয়গান বিধৃত হয়েছে। এছাড়াও তার নিশান্তিকা (১৯৫৭) এবং কবিতা-সংকলন অনুপূর্বা (১৯৪৬)। প্রথম তিনখানি কাব্যের নামকরণে অগ্নি, রুদ্র ও মরুর দহন এবং শেষের তিনটির নামকরণে রাত্রির অন্ধকারের প্রতীক-দ্যোতনা প্রকাশ পেয়েছে। শেষ বয়সে তিনি ম্যাকবেথ, ওথেলো, হ্যামলেট, কুমারসম্ভব ইত্যাদি অনুবাদ করেন। তাঁর কাব্য-পরিমিতি (১৯৩১) একখানা সমালোচনামূলক গদ্যগ্রন্থ। মাসিক বসুমতীতে (১৯৪৯)‘বিপ্রতীপ গুপ্ত’ ছদ্মনামে তিনি স্মৃতিকথা নামে আত্মজীবনী প্রকাশ করেন। যতীন্দ্রনাথ মূলত মানবতাবাদী কবি। সমাজের অনাচার বৈষম্যে ব্যথিত কবির মর্ম থেকে উঠে এসেছে বেদনার জয়গান। তাঁর বহু কবিতায় কখনো হালকাভাবে আবার কখনো তীক্ষ্ন ব্যঙ্গ, তির্যক বিদ্রূপের মধ্য দিয়ে শোষকগোষ্ঠীর প্রতি বিদ্বেষ রূপায়িত হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে তিনি অত্যন্ত প্রত্যয়ী মনোভাব নিয়ে বিশ্বাস করেছেন সমাজের যে বঞ্চিত, সর্বহারা নিপীড়িত মানুষের দল যুগ যুগ ধরে অন্যায়, অত্যাচার, অবিচার ও নিষ্ঠুরতা সহ্য করে আসছে একদিন আবর্তের পর আবর্ত রচনা করে এমন এক শঙ্খধ্বনি জাগাবে, যে ধ্বনিতে অগণিত ভাষাহীন, মৌনমুখ বঞ্চিতদের বিদ্রোহের ধ্বনি বেজে উঠবে। আজ মানবতাবাদী এই কবির ৬৪তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৫৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দুঃখবাদী কবি যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের মৃত্যুবার্ষিকীেতে আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।

নূর মোহাম্মদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী
[email protected]
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৮ সন্ধ্যা ৭:২৪
৫টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

জামায়াতের দ্বিচারিতায় পরিপূর্ণ রাজনীতি

লিখেছেন অনিকেত বৈরাগী তূর্য্য , ২২ শে জুলাই, ২০২৬ ভোর ৫:২৮


১৯৪১ সালে ব্রিটিশ ভারতের লাহোরে ইসলামী চিন্তাবিদ সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী ‘জামায়াতে ইসলামী’ গঠন করেন। পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর এটি ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধার্মিক কে অনুসরণ করুন ভন্ডকে নয় ।

লিখেছেন কিরকুট, ২২ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১২:৩৮

আমরা প্রায়ই নিজেদের ধর্মপ্রাণ জাতি বলে পরিচয় দিতে ভালোবাসি। কিন্তু প্রশ্ন হলো ধর্ম কি সত্যিই আমাদের নৈতিকতা, মানবিকতা ও সত্যের পথে পরিচালিত করতে পারছে, নাকি কিছু অসভ্য মানুষ ধর্মকে নিজেদের... ...বাকিটুকু পড়ুন

ক্যাপাসিটি চার্জের পর এবার নজর খাম্বায়

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২২ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ৯:০৩


বিদ্যুৎ বিল নিয়ে সাধারণ মানুষের অভিযোগের শেষ নেই । বিশেষ করে যারা নির্দিষ্ট বেতনে সংসার চালান কিংবা যেসব পরিবারে কেবল একজন মাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি আছেন, তাদের মাসে প্রিপেইড মিটারে... ...বাকিটুকু পড়ুন

কে হবেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি?

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২২ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ৯:৫৯



কে হবেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি?

বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি পদটি সংবিধানের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়ন যোগ্যতার চেয়ে দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতেই বেশি হয়।... ...বাকিটুকু পড়ুন

চাকরির জন্য সুপারিশ

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ২৩ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ১২:৫৮



গত কয়েকদিন যাবত ফেসবুক, ইউটিউব সহ অনলাইন সকল পত্র-পত্রিকা, টিভি নিউজ সহ এমন কোনো স্থান বাদ নেই যেইখানে এক ব্যক্তির রাজনীতি, সাংসদ, সংসদ, চরিত্র, বিবাহ, কাবিন নামা, প্রথম স্ত্রী,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×