
( খুলনা জেলার বাগের হাটে অবস্থিত যরত খান জাহান আলী (রঃ)'র মাজার শরীফ)
সভ্যতার নির্মাতা ‘খাঞ্জালি পীর’ নামে পরিচিত হযরত খান জাহান আলী (রঃ)। তিনি ছিলেন একজন সূফি, সিপাহ্সালার, ইসলাম প্রচারক ও স্থপতি। ১৪৪২ খ্রিস্টাব্দে ইলিয়াস শাহী বংশের নাসিরুদ্দীন মাহমুদ শাহ বাংলার সিংহাসনে আরোহণ করেন। মাহমুদ শাহের রাজত্বকালে (১৪৪২-৬০ খ্রি.) খুলনা অঞ্চলে (যশোর-খুলনা) আবির্ভাব ঘটে খান জাহান আলীর। কথিত আছে, তিনি সুলতান নাসিরুদ্দীন মাহমুদ শাহের কাছ থেকে সংগ্রহ করা সনদের মাধ্যমে সুন্দরবনের ভূমি পুনরুদ্ধার করে সেখানে জনবসতি স্থাপন করেন। ড. এমএ রহিম লিখেছেন, ‘তিনি বঙ্গদেশে মুসলিম শাসন সম্প্রসারণ ও ইসলাম বিস্তারের ক্ষেত্রে মূল্যবান অবদান রেখে গেছেন। সুলতানের প্রতিনিধি হিসেবে খান জাহান আলী বাগের হাট অঞ্চলে জনপদ সৃষ্টি করে "খলিফাত-্-আবাদ" নামকরণ করেন। জনপ্রবাদে তাঁকে আধুনিক খুলনা জেলার দুর্গম অঞ্চলগুলো জয়ের এবং ঐ এলাকাসমূহে আবাদি গড়ে তোলার কৃতিত্ব দান করে। তাঁর প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল খলিফাতাবাদ, যা বর্তমান বাগেরহাট জেলা। বাগেরহাটে খান জাহান আলীর যে খানকা গড়ে উঠেছিল, সেখানে প্রায় ৩০০ মসজিদ গড়ে ওঠে। ষাটগম্বুজ মসজিদ খান জাহান আলীর সবচেয়ে বিখ্যাত কীর্তি। মসজিদটি নামাজ আদায়ের পাশাপাশি খান জাহানের দরবার হিসেবেও ব্যবহার হতো। মসজিদটি ব্রিটিশ আমলে লর্ড কার্জনের এনসিয়েন্ট মনুমেন্টস প্রিজারভেশন অ্যাক্টের অধীনে সংস্কার করা হয়েছিল। এ অঞ্চলে মিঠা পানির অভাব ছিল বলে খান জাহান আলী অনেক পুকুর, দীঘি খনন করিয়েছিলেন। ৩৬০ সংখ্যাটি খান জাহান আলীর কিংবদন্তির সঙ্গে জড়িয়ে আছে। কথিত আছে, তাঁর ৩৬০ জন বিশ্বস্ত শিষ্য ছিলেনভ তাদের স্মৃতির স্মরনার্থে তিনি ৩৬০টি মসজিদ নির্মাণ এবং ৩৬০টি পুকুর খনন করিয়েছিলেন। ধারণা করা হয়, তখন বছর গণনা হতো ৩৬০ দিনে এবং এই সংখ্যাটি তাৎপর্যপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হতো। তাই হয়তো এ রকম কিংবদন্তি গড়ে উঠেছে। এই অঞ্চলসমূহ আয়ত্তাধীনে আনয়ন করার পর, তিনি লোকদের মধ্যে ইসলাম প্রচারে মনোনিবেশ করেন।’ ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে সংগ্রহ করা স্থানীয় এক লোকগাথায় আছে, ‘খান জাহান আলী এ অঞ্চলে এসেছিলেন সুন্দরবনের জঙ্গলে আচ্ছাদিত জমি পুনরুদ্ধার ও চাষাবাদ করতে। তিনি সম্রাট অথবা গৌড়ের রাজার কাছ থেকে এ জমির জায়গীর পেয়েছিলেন। এবং সে অধিকারে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর কাচারির (দরবার) বিবরণী থেকে তাঁর এই অবস্থান ও বিরাট কর্মযজ্ঞের বিষয়টি বোঝা যায়। তিনি যে কর্মসম্পাদন করেছেন, সেজন্য শ্রমিকদের একটি বিরাট ফৌজ দরকার। এছাড়া এটাও জানা যায় যে, তিনি আবাদি জমির খাজনাও গ্রহণ করতেন। ...অনেকটা সময় তিনি বিরাট জমিদার হিসেবে কাটানোর পর জাগতিক কর্মকাণ্ড থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিয়ে ফকিরের জীবন যাপন শুরু করেন’।” আজ এই আউলিয়ার ৫৫৯তম ওফাত দিবস। ১৪৫৯ সালের আজকের দিনে তিনি ষাট গম্বুজ মসজিদের দরবার গৃহে এশার নামাজ রত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। মুসলিম ধর্ম প্রচারক এবং বাগেরহাটের স্থানীয় শাসক খান জাহান আলী(রঃ) ৫৫৯তম মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি

(বাগের হাটের ঐতিহ্যবাহী ষাট গম্বুজ মসজিদ)
হযরত খানজাহান আলি (রঃ) ১৩৬৯ খ্রিষ্টাব্দে (জন্ম তারিখ অজ্ঞাত) দিল্লিতে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম আকবর খাঁ এবং মাতার নাম আম্বিয়া বিবি। হজরত খান জাহান আলী (রহ.)-এর প্রকৃত নাম উলুঘ খান। তাঁর উপাধি ছিল খান-ই-আযম, খান জাহান তার উপাধি বিশেষ। নাম দৃষ্টে ধারণা করা হয় যে তার পূর্বপুরুষগণ তুরস্কের অধিবাসী ছিলেন। বৃহত্তর যশোর-খুলনা অঞ্চলে তিনি পীর খাঞ্জালি নামে সমধিক পরিচিত। খানজাহান আলির প্রাথমিক শিক্ষা তার পিতার কাছে শুরু হলেও তিনি তার মাধ্যমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন দিল্লিস্থ বিখ্যাত ওয়ালি এ কামিল পির শাহ নেয়ামত উল্লাহর কাছে। তিনি কুরআন, হাদিস, সুন্নাহ ও ফিকহ শাস্ত্রের উপর গভীর জ্ঞানার্জন করেন। খান জাহান আলী ১৩৮৯ খ্রিস্টাব্দে তুঘলক সেনাবাহিনীতে সেনাপতির পদে কর্মজীবন আরম্ভ করেন। অতি অল্প সময়ের মধ্যেই প্রধান সেনাপতি পদে উন্নীত হন। ১৩৯৪ খ্রিস্টাব্দে মাত্র ২৭ বছর বয়সে তিনি জৈনপুর প্রদেশের গভর্ণর পদে যোগ দেন। পরবর্তী জীবনে নানা ধাপ পেরিয়ে জৈনপুর থেকে প্রচুর অর্থসম্পদ এবং প্রায় চল্লিশ হাজার সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী নিয়ে বাংলাদেশে আগমন করেন। তার এই বাহিনীতে কয়েকজন সূফি ও প্রকৌশলী ছিল। তিনি তদানীন্তন বাংলার রাজধানীর দিকে না যেয়ে অজ্ঞাত কারণে সুন্দরবন অঞ্চলের দিকে আসেন। তিনি প্রথম বর্তমান যশোর শহর থেকে ১১ মাইল উত্তরে অবস্থিত বারোবাজারে এসে ছাউনি ফেলেন। প্রাচীনকালে এই বারোবাজার গঙ্গারিডীর রাজধানী ছিল। খানজাহান আলীর আগমনে এই প্রাচীন নগরী নতুন করে প্রাণ লাভ করে। এখানে একটি দীঘি খনন করা হয় এবং নির্মিত হয় একটি মসজিদ। তবে এখানে তিনি বেশিদিন থাকেননি। কিন্তু তার স্মৃতি থেকে যায়। মসজিদটি খাঞ্জালি মসজিদ হিসেবে অভিহিত। বারোবাজার থেকে খান জাহান আলী মুরলিতে এসে অবস্থান করেন। তার বিশাল বাহিনীর আগমনে এখানেও একটি শহর গড়ে ওঠে। এখানেও তিনি অবস্থান করেননি। অনেক পথ সফর শেষে খান জাহান আলী সদলবলে বাগেরহাটে এসে স্থায়ী বসত স্থাপন করেন। নির্মাণ করেন ষাট গম্বুজ, নয় গম্বুজ মসজিদ। ষাট গম্বুজ মসজিদের গম্বুজ সংখ্যা আসলে ৭৭টি। এটা যেমন ছিল নামাজের স্থান, তেমনি ছিলেএকটি সেনানিবাস। তিনি এই বৃহৎ অঞ্চলে কৃষি বিপ্লবের সূচনা করেন। নোনা পানির এই অঞ্চলে মিঠা পানির ব্যবস্থা করেন অসংখ্য বিশাল বিশাল দীঘি খনন করে, যার অনেকই খাঞ্জালির দীঘি নামে পরিচিত। অনেক সুরম্য রাস্তা নির্মাণ করেন। তার নির্মিত রাস্তা খাঞ্জালির জাঙ্গাল নামে অভিহিত। তিনি এই অঞ্চলে শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে বিভিন্ন স্থানে মাদরাসা স্থাপন করেন।

(বাগেরহাটের খাঞ্জেলী দীঘির উত্তর পাড়ে হজরত খান জাহান আলী (রঃ) এর মাজার)
ব্যক্তিগত জীবনে হযরত খান জাহান আলীর দুইজন স্ত্রী ছিলো তবে তাদের কোন সন্তান ছিলোনা। তাঁর প্রথম স্ত্রীর নাম সোনা বিবি। কথিত আছে সোনা বিবি ছিলেন খানজাহানের পির নুর-কুতুবুল আলমের একমাত্র কন্যা। খানজাহানের দ্বিতীয় স্ত্রী রূপা বিবি ওরফে বিবি বেগনি ধর্মান্তরিত মুসলমান ছিলেন। খানজাহান আলি তাঁর দুই স্ত্রীর নাম অনুসারে সোনা মসজিদ এবং বিবি বেগনি মসজিদ নামে মসজিদ নির্মাণ করেন। কোনো দলিল কিংবা প্রচলিত বিবরণীতে খান জাহান আলীর কোনো সন্তানের বিবরণ পাওয়া যায় না। এর কারণ হিসেবে প্রচলিত রয়েছে যে, তিনি নপুংসক ছিলেন। কথিত আছে তার দুই স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া হয়, তখন একজন বিষ খেয়ে বাড়ির পাশের পুকুরে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন। অন্যজনও মারা যান। ইতিহাসবিদরা অনেকেই এই দুজন নারীকে খান জাহান আলীর স্ত্রী নয় বরং পরিচারিকা বলে আখ্যায়িত করেছেন। তাঁহার বিবাহিতা কোন স্ত্রী থাকিলে তাঁহার সমাধি খাঁ জাহানের সমাধির পার্শ্বেই দেখা যাইত, শহরের এক কোণে অতি হীনাবস্থায় একটি এক গুম্বজ মসজিদ দেখা যাইত না। হিজরি ১৪৩৬ সালের ২৬ জিলহজ আরবি তারিখের হিসাব অনুযায়ী হিজরি ৮৬৩ সালে হজরত খান জাহান আলী (রহ.) প্রায় ৯০ বছর বয়সে বাগেরহাটের নিজ বাড়িতে নামাজরত অবস্থায় এই নশ্বর দুনিয়া থেকে চিরস্থায়ী আবাসভূমিতে প্রস্থান করেন। ইংরেজি তারিখ মতে সেদিন ছিল ১৪৫৯ খ্রিস্টাব্দের ২৫ অক্টোবর। ২৬ অক্টোবর তাঁকে দাফন করা হয়। খাঞ্জেলী দিঘীর উত্তর পাড়ে তাঁর সমাধি সৌধ নির্মাণ করা হয়। খান জাহান আলী (রহ.)-এর মাজারের সামনেই রয়েছে বিশাল দীঘি। কিছুদিন পূর্বেও এই এই দীঘিতে বিশালাকারের কুমির ছিল। এই কুমির নিয়ে নানা ধরনের জনশ্রুতি রয়েছে। প্রতি বছর চৈত্র মাসের পূর্ণিমার সময় খান জাহান আলীর মাজারে ওরস অনুষ্ঠিত হয় এবং লক্ষাধিক লোক তাতে সমবেত হয়। বর্তমানে মোড়ল বংশ তারই সবচেয়ে নিকটবর্তী বংশধর হিসেবে খুলনা ,রামপালসহ বিভিন্ন দেশ বিদেশ এ বসবাস করছে। আজ এই মহান সাধকের ৫৫৯তম ওফাত দিবস। সভ্যতার নির্মাতা হজরত খান জাহান আলী(রঃ) এর ওফাত দিবসে শ্রদ্ধাঞ্জলি
নূর মোহাম্মদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী
[email protected]

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



