
শিক্ষাব্রতী ও সমাজসেবক দানবীর হাজী মোহাম্মদ মোহসীন। পৃথিবী থেকে ঋণ নিয়ে যাচ্ছিনা, বরং পৃথিবীকে-মানুষকে যাচ্ছি ঋণী করে- বিদায় বেলায় ক’জন এ’কথা বলতে পারে? হাজী মোহাম্মদ মোহসীন ঐ সকল মুষ্টিমেয় মানুষের একজন, যাঁরা বলতে পারেন, জগৎ কে ঋণী করে গেলাম। শুধু দানশীলতা নয়, আরবি ফরাসি-উর্দু ও ইংরেজি ভাষায় এবং ইতিহাস বীজগণিতে তাঁর অগাধ পাণ্ডিত ছিল। অনাড়ম্বর জীবনযাপনের অধিকারী হাজী মোহাম্মদ মেহসীনের মনোবৃত্তি আমাদের আজকের ভোগবাদী সমাজে এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে কাজ করছে।বিশাল সম্পত্তির আয় চিরকুমার মোহসিন নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য ব্যয় না করে দীন-দুঃখীর দুঃখ মোচনের জন্য ব্যয় করেছেন। বাংলাদেশের বিভিন্ন শহরে বিশেষ করে কলকাতার সীমানাবর্তি এলাকাগুলোতে তিনি অনেক সম্পতি আহলে বাইতের অনুসারী শীয়াদের নামে ওয়াক্বফ করে গেছেন। হুগলী-ঢাকা-চট্টগ্রাম-যশোর প্রভৃতি স্থানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বহু অর্থ দান করেছেন। মৃত্যুর ছয় বছর পূর্বে ১৮০৬ সালে একটি তহবিল গঠন করে ধর্ম ও জনহিতকর কার্যে সম্পত্তি দান করেন। মোহসীন তহবিলের অর্থে ‘হুগলী মোহসিন কলেজ’ (১৮৩৬), হুগলী দাতব্য চিকিৎসালয় (১৮৩৬) এবং হুগলরি নতুন ইমামবাড়া (১৮৪৫) স্থাপিত হয়। মোহসিন তহবিলের বৃত্তির অর্থ দিয়ে হাজার হাজার ছাত্রের উচ্চশিক্ষালাভের প্রসার ঘটে। আজ দানবীর হাজী মোহাম্মদ মোহসীনের ২৮৬তম জন্মবার্ষিকী। ১৭৩২ সালের আজকের দিনে তিনি ভারতে জন্মগ্রহণ করেন। শিক্ষাব্রতী ও সমাজসেবক দানবীর হাজী মোহাম্মদ মোহসীনের জন্মবার্ষিকীতে ফুলেল শুভেচ্ছা।

মোহাম্মদ মোহসীন ১৭৩২ সালের ৩ জানুয়ারী ভারতের পশ্চিম বাংলার হুগলীতে এক সম্ভ্রান্ত মুসলীম ধনী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন ইরানের ইসপাহান প্রদেশের মানুষ এবং শীয়া সম্প্রদায়ের লোক । তার পিতার নাম হাজী ফাইজুল্লাহ এবং মাতার নাম জয়নাব খানম। এটি ছিলো জয়নব খানমের দ্বিতীয় বিবাহ। তার প্রথম স্বামী আগা মোতাহার বিশাল ধন সম্পত্তির মালিক ছিলেন পরে যার মালিক হন তার একমাত্র কন্যা মন্নুজান খানম। মন্নুজান ও মোহসীন পারিবারিকভাবে ক্বোরআন, হাদিস সম্পর্কে বিষদ জ্ঞান লাভ করেন। পরে উচ্চ শিক্ষার জন্য মোহসীন মুর্শিদাবাদ গমন করেন। ইতি মধ্যে মোহসীনের পিতার মৃত্যু হলে তিনি তার সৎবোন মন্নুজান যত্নে বড় হন। ১৭৬৭ সালে মন্নুজানের বিয়ে হলে মোহসীন বিভিন্ন দেশ ভ্রমণে বেরিয়ে পড়েন। তিনি এশিয়ার বিভিন্ন দেশ যেমন ইরাণ, ইরাক, তুর্কি ভ্রমন করেন। তিনি মক্কা, মদিনা, কারবালার প্রান্তর ও কুফাসহ অনেক পবিত্র নগরী ভ্রমন করেন। হ্জব্রত পালন করার পরে তিনি হাজী মোহাম্মদ মোহসীন নামে পরিচিতি লাভ করেন।

(ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও হাজি মুহাম্মাদ মহসীন হল)
ইতিমধ্যে মন্নুজান বিধবা হন। অল্পবয়সে বিধবা হয়ে যাওয়া নি:সন্তান মন্নুজান তাঁর বিশাল সম্পত্তি দেখাশোনার জন্য মোহসীনকে ব্যকুলভাবে দেশে ফিরে আসার আহবান জানান। বোনের সনির্বন্ধ অনুরোধ সেই আহবানে সাড়া দিয়ে মোহসীন দীর্ঘ সাতাশ বছর পর নিজ গৃহে হুগলিতে প্রত্যাবর্তন করেন। মোহসীন যখন ফিরে এলেন হুগলীর তখন যথেষ্ট পরিবর্তন হয়েছে। মন্নুজানের স্বামী সালাহউদ্দিন তখন পরলোকে। মহসীন তখন সৎ বোন মন্নুজানের সাথে থাকতেন এবং তার নবাব স্টেট দেখাশুনা করতেন। উল্লেখ্য হাজী মোহাম্মদ মোহসীনের মাতা জয়নব খানমের প্রথম স্বামী আগা মোতাহার হুগলি, যশোহর, মুর্শিদাবাদ ও নদীয়াতে বিশাল স্থাবর ও অস্থাবর ধনসম্পত্তি রেখে যান। ১৮০৩ সালে সৎ বোন মন্নুজান পরলোক গমন করেন। এরপর সংসার ধর্মে চির উদাসীন মহসীন আরো বৈরাগী হয়ে যান। এই সময় মুলত দান করেই তিনি সময় কাটাতেন। তার মৃত সৎ বোন মন্নুজানের বিশাল সম্পত্তি জনগনের সেবার জন্য উইল করে দেন। তাঁর দানের টাকায় বহু পরিবার চলত। তার আর্থিক সহয়তায় ইমামবারা, মহসীন কলেজ তৈরি হয়। এখনও হুগলিতে মহসীন ফান্ড আছে। সেখান থেকে ছাত্রছাত্রীরা সাহায্য পেয়ে থাকনে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, হুগলী ও যশোরের মাদ্রাসা মোহসীনের অর্থে পরিচালিত হয়েছে। মোহসীনের সম্পত্তির উদ্বৃত্ত অর্থ থেকে হুগলী কলেজেরও সূত্রপাত হয় ১৮৩৬ খ্রি.। সুদীর্ঘ সাইত্রিশ বছর যাবত এই কলেজের জন্যে মোহসীনের ফান্ড থেকে সেকালে বার্ষিক পঁচাত্তর হাজার টাকা করে ব্যয় হতো। দানবীর মোহসীনের এই আয় থেকে এখনো দুস্থ ও মুসলিম কৃতী ছাত্র-ছাত্রীদের দেয়া হয় বৃত্তি। এ বছরও ৩০ হাজার রুপি করে বৃত্তি প্রদান করা হয়েছে ১১৮ জন ছাত্রী-ছাত্রীকে।
বাংলার প্রথম গ্রাজুয়েট বঙ্কিম চন্দ্র, ভূদেব মুখোপাধ্যায়, বাংলার প্রথম মুসলিম গ্রাজুয়েট খান বাহাদুর দেলওয়ার হোসেন (১৮৬১ খ্রি. মুসলমানদের মধ্যে প্রথম বি.এ পাশ করেন), বিপারপতি আমীর আলী, স্ত্রী শিক্ষার অগ্রনায়িকা মিসেস আর.এস হোসেনের স্বামী খান বাহাদুর শাখাওয়াত হোসেন প্রমূখ মনীষীরা মোহসীনের কলেজে মোহসীনের অর্থে শিক্ষালাভ করেছেন। শিক্ষাব্রতী সমাজসেবক হাজী মোহাম্মদ মোহসীন ১৮১২ খৃষ্টাব্দের ২৯ নভেম্বর পরলোক গমন করেন। বাংলার একজন দানবীর মানুষ হিসাবে খ্যাত হাজি মুহাম্মদ মহসীন মানুষের কল্যাণে বহু কাজ করেছেন। এখনও মহসীনের নামে বহু শিক্ষালয় আছে। চট্টগ্রামে হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজ, খুলনার হাজী মহসীন কলেজও ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও হাজী মুহাম্মাদ মোহসীনের নামে ছাত্রাবাস আছে।

অনাড়ম্বর জীবনযাপনের অধিকারী হাজী মোহাম্মদ মোহসীনের ২৮৬তম জন্মবার্ষিকী আজ । শিক্ষাব্রতী ও সমাজসেবক দানবীর হাজী মোহাম্মদ মোহসীনের জন্মবার্ষিকীতে ফুলেল শুভেচ্ছা।
নূর মোহাম্মদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী
[email protected]
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা জানুয়ারি, ২০১৯ সকাল ১১:১৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




