somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বাংলাদেশে সৎ ও স্বচ্ছ রাজনীতির আদর্শ নেতা সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের মৃত্যুতে শোকাহত আমরা

০৪ ঠা জানুয়ারি, ২০১৯ বিকাল ৪:৩৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


না ফেরার দেশে চলে গেলেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম সেরা রাজনীতিবিদ সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। গতকাল বৃহস্পতিবার (৩ জানুয়ারি) রাত সাড়ে ৯ টার দিকে থাইল্যান্ডের বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন (ইন্নালিলাহি…রাজিউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিলো ৬৭ বছর। দীর্ঘ দিন ধরে তিনি থাইল্যান্ডে চিকিৎসাধীন ছিলেন। উল্লেখ্য সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের স্ত্রী সৈয়দা শিলা ইসলাম ২০১৭ সালের ২৩শে অক্টোবর লন্ডনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এরপর থেকেই তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। পরবর্তীতে তাঁকে থাইল্যান্ডের বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অসুস্থ অবস্থাতেই তাঁকে কিশোরগঞ্জ-১ আসনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রার্থী করা হয়। দেশে না থেকেও সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম কিশোরগঞ্জ সদর ও হোসেনপুর উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসন থেকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। কিন্তু সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেয়ার আগেই তিনি না ফেরার দেশে পাড়ি জমান। রাতে তাঁর এই মৃত্যু সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে তার এলাকাসগ সমগ্র দেশে শোকের ছায়া নেমে আসে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও প্রেসিডিয়াম সদস্য সাবেক মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের মৃত্যুতে গভীর শোকাহত আমরা।


সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ১৯৫২ সালের ১লা জানুয়ারি ময়মনসিংহে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা বাংলাদেশের মুজিবনগর অস্থায়ী সরকারের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম। শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলামের সন্তান চার ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে সবার বড় ছিলেন সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। পারিবারিক ঐতিহ্যের সূত্র ধরে তিনি ছাত্র জীবন থেকেই রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। তিনি ছাত্র জীবন থেকেই রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। ১৯৭১ সালে অংশ নেন মুক্তিসংগ্রামে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধে মুক্তি বাহিনীর একজন সদস্য ছিলেন। স্বাধীনতার পর তিনি বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এবং কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহ-প্রচার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৫ সালের ৩রা নভেম্বর কারাগারে পিতা সৈয়দ নজরুল ইসলামসহ জাতীয় চার নেতার নির্মম হত্যাকান্ডের পর তিনি যুক্তরাজ্য চলে যান। প্রবাস জীবনে তিনি যুক্তরাজ্যে আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করার ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার ডাকে বাংলাদেশে আওয়ামীলীগের রাজনীতিতে ফিরে এসেছিলেন। ১৯৯৬ সালে দেশে ফেরার পর অংশ নেন ১২ই জুনের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। ১৯৯১ সালে বিএনপির কাছে হারানো কিশোরগঞ্জ সদর (তৎকালীন কিশোরগঞ্জ-৩) আসনটি ১৯৯৬ সালের ১২ই জুনের নির্বাচনে পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে রাজনীতিতে অবিস্মরণীয় প্রত্যাবর্তন হয় সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের। এই প্রত্যাবর্তনের পর একজন ভদ্র, বিনয়ী রাজনীতিবিদ হিসেবে দলের সবার শ্রদ্ধা ও ভালবাসা কুড়াতে বেশি সময় নেননি সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম।


১৯৯৬ সালের ১২ই জুনের নির্বাচনে প্রথম বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০০১ সালের নির্বাচনে দলের চরম ভরাডুবির সময়েও সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এই আসন থেকে টানা দ্বিতীয় বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালের ২৯শে ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে হ্যাট্রিক জয়ের পর সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম মহাজোট সরকারের মন্ত্রীসভায় লাভ করেন স্থানীয় সরকার পল্লীউন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব। এ সময়ে টানা দুইবার তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের পদঅলঙ্কৃত করেন। এর আগে ওয়ান ইলেভেন পরবর্তী সময়ে দলের ক্রান্তিলগ্নে দলের হয়ে অসাধারণ ভূমিকা পালন করায় তিনি আবির্ভূত হন। এই সময়ে অতিকথন ও ক্ষমতার দম্ভ সৈয়দ আশরাফকে স্পর্শ করতে পারেনি। একজন উদার পশ্চিমা গণতান্ত্রিক রাজনীতিবিদের মতোই তিনি নীরবে নিভৃতে পথ হেঁটেছেন। ২০০৮ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি পুনরায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে মন্ত্রীসভা গঠিত হলে তিনি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। ২০১৪ সালের ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পুনরায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং পুনরায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। ২০১৫ সালের ৯ জুলাই তার দায়িত্বে অবহেলার কারণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীত্ব থেকে অব্যহতি দিয়ে দপ্তরবিহীন মন্ত্রী করেন। এক মাস এক সপ্তাহ দপ্তরবিহীন মন্ত্রী থাকার পর ১৬ জুলাই প্রধানমন্ত্রী নিজের অধীনে রাখা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেন।


ব্যক্তিগত জীবনে সৈয়দ আশরাফুল ব্রিটিশ ভারতীয় শীলা ঠাকুরের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। শীলা লন্ডনে শিক্ষকতা করতেন এবং ২৩ অক্টোবর ২০১৭ সালে তিনি মৃত্যুবরন করেন। এই দম্পতির মেয়ে রীমা ঠাকুর, যিনি লন্ডনের এইচএসবিসি ব্যাংকে চাকরি করেন। ২০১৭ সালের ২৪ অক্টোবর সৈয়দ আশরাফুলের স্ত্রী মারা যাওয়ার পর তিনি প্রায়ই অসুস্থ হন। তিনি ফুসফুসের ক্যান্সারে ভুগছিলেন। ২০১৮ সালের নভেম্বর তার ফুসফুসের ক্যান্সার ৪র্থ ধাপে পৌঁছে। পরবর্তীতে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ২০১৯ সালের ৩রা জানুয়ারি থাইল্যান্ডের ব্যাংককে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।


মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলামের সন্তান হিসেবে পারিবারিক ঐতিহ্য এবং একজন সৎ, ভদ্র ও বিনয়ী মানুষ হিসেবে ক্লিন ইমেজের এমন রাজনীতিবিদ বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিরল। তার মৃত্যুতে আমরা গভীর শোকাহত।

নূর মোহাম্মদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী
[email protected]
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা জানুয়ারি, ২০১৯ বিকাল ৪:৩৪
৯টি মন্তব্য ৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

প্রকাশিত হলো আমার নতুন উপন্যাস “১০ সেকেন্ড”

লিখেছেন সুম১৪৩২, ১৩ ই জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:৩২

আমার সদ্য প্রকাশিত উপন্যাস “১০ সেকেন্ড” পড়ার জন্য সবাইকে আন্তরিক আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। আশা করি গল্পটি আপনাদের হৃদয়ে একটি বিশেষ অনুভূতি তৈরি করবে।




বইয়ের ফ্লাপের লেখা

শামসু কখনো নায়ক হতে চায়নি। সে শুধু... ...বাকিটুকু পড়ুন

পেঁপের বেগুনী, কুমড়োর চপ, কাঁঠালের বার্গার, ডিম সিদ্ধ করে ফ্রিজে ও পেঁয়াজ কুচি করে শুখিয়ে সংরক্ষন!!

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১৩ ই জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:৫৯

উহা পলাতক। যাহা কখনো পালায়না উহাই পালিয়েছে। উহা রান্না করা ভাত তরকারী বাস্প উড়ছে খেতে পারেনি কিন্তু তাতে কি উহা প্রতিদিন ১০,০০,০০০ (দশ লক্ষ) টাকা প্রতিদিন খেয়েছে! :B#... ...বাকিটুকু পড়ুন

জীবনের আনন্দের ফুল

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১৩ ই জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৯



প্রেয়সি হে প্রিয়তমা গিয়েছ কোথায়?
হারায় অমৃত ঘুম খোলা আখি পাত
বিবর্ণ অনেক লাগে জোছনার রাত
তোমায় হারিয়ে প্রিয়া আঁধার জীবন।
আসবে কি ফিরে তুমি সুখের প্রভায়
জীবন রাঙ্গিয়ে দিতে? অপেক্ষার হাত
তোমার পরশ... ...বাকিটুকু পড়ুন

অন্ধের হাতি দেখা ও আধুনিক ব্লগারির এক করুণ রম্যকাব্য

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১৪ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ১:২১


মানুষের জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে একটি প্রাচীন উপকথা যুগে যুগে নতুন অর্থে ফিরে এসেছে অন্ধের হাতি দেখা। কয়েকজন অন্ধ মানুষ হাতির ভিন্ন ভিন্ন অঙ্গ স্পর্শ করে প্রত্যেকে নিজেকে সত্যের একমাত্র অধিকারী... ...বাকিটুকু পড়ুন

চাঁদগাজীর বয়ানে সত্যিকারের দেশপ্রেমিক!

লিখেছেন মাথা পাগলা, ১৪ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ২:৩৭



গাজী সাহেব বলেছেন, এই ছবির একদম পেছনে যাকে দেখছেন, তিনি ৭১-এর যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। একই পরিবারের আত্নীয়সহ আরও পাঁচজন ৭১-এর যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। পরিবারের যিনি কোনোভাবে বেঁচে আছেন, তাঁর... ...বাকিটুকু পড়ুন

×