somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

স্ববাক বাংলা চলচ্চিত্রের প্রথম মুসলিম অভিনেত্রী বনানী চৌধুরীর ২৪তম মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি

০৫ ই জানুয়ারি, ২০১৯ বিকাল ৫:২৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


উপমহাদেশের প্রথম বিএ পাস মুসলমান অভিনেত্রী বনানী চৌধুরী। আজ থেকে ১০০ বছরেরও বেশি সময় আগে উপমহাদেশে চলচ্চিত্রের এ যাত্রা নানা কারণে মোটেও সহজ ছিল না। সীমাহীন বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে এ অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত হয় চলচ্চিত্র। বিশেষ করে এর সঙ্গে যুক্ত কলাকুশলীদের সামাজিক বাধা, কুসংস্কারের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকতে হয়েছে এ পেশায়। তবে চলচ্চিত্র গবেষকদের দৃষ্টিতে এ বাংলার মুসলমান কলাকুশলীদেরই সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে। গত শতকের শুরুতে এমন ঘটনাও ঘটেছে যে, যেসব মুসলমান চলচ্চিত্রের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তাদের অনেকেই নিজেদের নাম আড়াল করে অন্য নামে চলচ্চিত্রে কাজ করতেন। এ রকম পরিবেশে কোনো মুসলমান নারীর চলচ্চিত্রে নাম লেখানোর বিষয়টি ছিল অকল্পনীয়। তৎকালীন সমাজে মুসলিম নারীদের বাড়ির বাইরে প্রবেশে ছিল নিষেধাজ্ঞা। কিন্তু শত বাধা পেরিয়ে তিনি গড়েছেন এক দৃষ্টান্ত এবং সহজ করে দিয়েছেন তাঁর পরবর্তী মুসলিম অভিনেত্রীদের চলচ্চিত্রে অংশেগ্রহণের পথ। প্রথম মুসলমান বাঙালি অভিনেত্রী হিসেবে চলচ্চিত্রে নাম লেখান রোকেয়া খাতুন নামের এক নারী। সমাজের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে অভিনয়ে নামলেও পদে পদে তাকে বেগ পেতে হয়। শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের লাহোরে গিয়ে নির্বাক ছবি ‘ওয়ান্ডার ড্যান্সার’ দিয়ে ছবির ক্যারিয়ার শুরু হয় রোকেয়ার। রোকেয়া খাতুনের পর আরো একজন মুসলমান বাঙালি নারী চলচ্চিত্রে নাম লিখিয়ে ইতিহাস গড়েছিলেন এক নতুন প্রতিভা তার নাম বনানী চৌধুরী (আসল নাম বেগম আনোয়ারা নাহার চৌধুরী লিলি)। তাকে ধরা হয় উপমহাদেশের প্রথম স্ববাক চলচ্চিত্রের প্রথম বিএ পাস মুসলমান অভিনেত্রী হিসেবে। ‘চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন’ ছবিতে মাস্টার দা’র স্ত্রীর ভূমিকায় অভিনয় করার পর তিনি সারা বাংলায় প্রশংসিত হন। ১৯৭০ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকায় তিনি জহির রায়হান পরিচালিত ‘লেট দেয়ার বি লাইট’ ছবিতে অভিনয় করেন। পঞ্চাশের দশকের শেষার্ধে ঢাকায় তার অভিনীত ছবি হলো—ধীরে বহে মেঘনা, সুখ দুঃখের সাথী, আল্লাহ মেহেরবান, আকাশপরী ইত্যাদি। মঞ্চেও তিনি নিয়মিত অভিনয় করতেন। আকাশবাণী কলকাতায় তিনি নিয়মিত অভিনয় করতেন। চলচ্চিত্রে অভিনয় ছাড়াও বনানী চৌধুরী কলকাতার মঞ্চ ও বেতারের সংগে সংযুক্ত ছিলেন। বাংলা চলচ্চিত্রের উজ্জ্বল এ তারকার আজ ২৪তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৯৫ সালের আজকের দিনে এ অভিনেত্রী ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। স্ববাক বাংলা চলচ্চিত্রের প্রথম মুসলিম অভিনেত্রী বনানী চৌধুরী মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি।


বনানী চৌধুরী ১৯২৪ সালের মে মাসে পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁতে জন্মগ্রহন করেন। তাঁর আসল নাম বেগম আনোয়ারা নাহার চৌধুরী লিলি। বনানী তাঁর প্রতিকী নাম। তিনি বনানী নাম ব্যবহার করেন কারণ মানুষ বিশেষ করে মুসলিম সমাজের মানুষ যেন ভাবে তিনি হিন্দু ধর্মের এবং তাঁর উপর সমাজের প্রতিবন্ধকতা কম আসে। বনানী চৌধুরীর পুলিশ কর্মকর্তা পিতার নাম আফসার উদ্দিন। বনগাঁ ছিল তাঁর বাবার কর্মস্থল। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তাদের পৈতিক নিবাস ছিল বৃহত্তর যশোর জেলার শ্রীপুর থানার সোনাতনদি গ্রাম। যা বর্তমানে মাগুরা জেলাতে অবস্থিত। তার প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় ভারতের মুর্শিদাবাদ জেলাস্থ সাগরদিঘী গ্রামের একটি স্কুলে। অল্প বয়সে তাঁর বিয়ে হয় এবং পরে তিনি স্বামীর উৎসাহেই পড়ালেখা চালিয়ে যান। ১৯৪১ সালে তিনি ম্যাট্টিক পাস করেন। এবং পরে আই. এ. ও তারপর বি. এ. পাস করেন। ছোটবেলা থেকেই তাঁর শিল্পী প্রতিভার পরিচয় মিলতে থাকে। গ্রামে বা বিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ এবং পুরষ্কার পাওয়ার মাধ্যমে। এছাড়া কবিতা আবৃত্তিতেও তাঁর সুনাম ছিল। ছোটবেলা থেকেই তাঁর চলচ্চিত্রের প্রতিও একটা দুর্বলতা ছিল। এই আকর্ষণকে বাস্তবে রূপ দেন বনানী চৌধুরীর স্বামী ও তাঁর দুই বন্ধু মানিক বন্দোপাধ্যায় এবং সুলতান আহমেদ। চলচ্চিত্র জীবনের শুরু থেকে বনানী চৌধুরী কিছু বিখ্যাত মানুষের সাথে কাজ করেছেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেঃ পাহাড়ী সান্যাল,প্রমথেশ বসু,হেমেন গুপ্ত,নীতিশ বসু,ছবি বিশ্বাস, জহির রায়হান ,জহর গাঙ্গুলীসহ অন্যান্যরা। তার অভিনীত প্রথম ছবি ‘তপোভঙ্গ’। এরপর ১৯৪৬ সালে অভিনয় করেন ‘বিশ বছর আগে’ ছবিতে। নির্মাণের দুই বছর পর ছবিটি মুক্তি পেলে আলোচনায় আসেন বনানী চৌধুরী। এরপর একে একে করেন ‘চলার পথে’, ‘অভিযোগ’, ‘পূর্বরাগ’, ‘নন্দরাণীর সংসার’, ‘পরশপাথর’, ‘মহাসম্পদ’, ‘বিষের ধোঁয়া’, ‘মায়াজাল’, ‘চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন’, ‘শাপমোচন’, ‘শোন বরনারী’, ‘আম্রপালী’, ‘শেষের কবিতা’, ‘ঝাঁসী কি রাণী’, ‘তাপসী’, ‘কেরী সাহেবের মুনসী’ প্রভৃতি। ১৯৪৯-১৯৫১ সালের মধ্যে বনানী অভিনীত ও মুক্তিপ্রাপ্ত বিষের ধোঁয়া, মায়াজাল ও চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন ছবি তিনটি সাড়া পায়। ১৯৭০ সালে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে তিনি জহির রায়হান পরিচালিত ‘লেট দেয়ার বি লাইট’ ছবিতে অভিনয় করেন। পঞ্চাশের দশকের শেষার্ধে ঢাকায় তার অভিনীত ছবির মধ্যে অন্যতম ‘ধীরে বহে মেঘনা’, ‘সুখ দুঃখের সাথী’, ‘আল্লাহ মেহেরবান’ ও ‘আকাশপরী’


১৯৯৫ সালের আজকের ৫ জা্নুয়ারি এ ভিনেত্রী ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর পর তাঁকে ঢাকার বানানী কবরস্থানে কবর দেয়া হয়। মুসলিম সমাজ চলচ্চিত্র জগতের তারকাকে যখন ভালো চোখে দেখত না সেই যুগে মুসলমান মেয়ে বনানী চৌধুরী এক অর্থে বিদ্রোহ করেই ফিল্মে এসেছিলেন এবং সফলও হয়েছিলেন। চলচ্চিত্রে শুরুটা তিনি যে সাহসিকতার মধ্য দিয়ে করেছিলেন, মৃত্যু অবধি ঠিক একই রকমভাবে চলচ্চিত্রকে ভালোবেসে গেছেন বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এ অভিনেত্রী। সে জন্য এখনও অনেকে তার কথা মনে করেন। বনানী চৌধুরী সত্যিই অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব।’বাংলা চলচ্চিত্রের উজ্জ্বল এ তারকার আজ ২৪তম মৃত্যুবার্ষিকী। স্ববাক বাংলা চলচ্চিত্রের প্রথম মুসলিম অভিনেত্রী বনানী চৌধুরীর মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি।

নূর মোহাম্মদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী
[email protected]
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই জানুয়ারি, ২০১৯ রাত ৯:০৯
৩টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

প্রকাশিত হলো আমার নতুন উপন্যাস “১০ সেকেন্ড”

লিখেছেন সুম১৪৩২, ১৩ ই জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:৩২

আমার সদ্য প্রকাশিত উপন্যাস “১০ সেকেন্ড” পড়ার জন্য সবাইকে আন্তরিক আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। আশা করি গল্পটি আপনাদের হৃদয়ে একটি বিশেষ অনুভূতি তৈরি করবে।




বইয়ের ফ্লাপের লেখা

শামসু কখনো নায়ক হতে চায়নি। সে শুধু... ...বাকিটুকু পড়ুন

পেঁপের বেগুনী, কুমড়োর চপ, কাঁঠালের বার্গার, ডিম সিদ্ধ করে ফ্রিজে ও পেঁয়াজ কুচি করে শুখিয়ে সংরক্ষন!!

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১৩ ই জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:৫৯

উহা পলাতক। যাহা কখনো পালায়না উহাই পালিয়েছে। উহা রান্না করা ভাত তরকারী বাস্প উড়ছে খেতে পারেনি কিন্তু তাতে কি উহা প্রতিদিন ১০,০০,০০০ (দশ লক্ষ) টাকা প্রতিদিন খেয়েছে! :B#... ...বাকিটুকু পড়ুন

জীবনের আনন্দের ফুল

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১৩ ই জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৯



প্রেয়সি হে প্রিয়তমা গিয়েছ কোথায়?
হারায় অমৃত ঘুম খোলা আখি পাত
বিবর্ণ অনেক লাগে জোছনার রাত
তোমায় হারিয়ে প্রিয়া আঁধার জীবন।
আসবে কি ফিরে তুমি সুখের প্রভায়
জীবন রাঙ্গিয়ে দিতে? অপেক্ষার হাত
তোমার পরশ... ...বাকিটুকু পড়ুন

অন্ধের হাতি দেখা ও আধুনিক ব্লগারির এক করুণ রম্যকাব্য

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১৪ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ১:২১


মানুষের জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে একটি প্রাচীন উপকথা যুগে যুগে নতুন অর্থে ফিরে এসেছে অন্ধের হাতি দেখা। কয়েকজন অন্ধ মানুষ হাতির ভিন্ন ভিন্ন অঙ্গ স্পর্শ করে প্রত্যেকে নিজেকে সত্যের একমাত্র অধিকারী... ...বাকিটুকু পড়ুন

চাঁদগাজীর বয়ানে সত্যিকারের দেশপ্রেমিক!

লিখেছেন মাথা পাগলা, ১৪ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ২:৩৭



গাজী সাহেব বলেছেন, এই ছবির একদম পেছনে যাকে দেখছেন, তিনি ৭১-এর যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। একই পরিবারের আত্নীয়সহ আরও পাঁচজন ৭১-এর যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। পরিবারের যিনি কোনোভাবে বেঁচে আছেন, তাঁর... ...বাকিটুকু পড়ুন

×