somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

প্রবীণ সাংবাদিক, সঙ্গীতজ্ঞ, ছায়ানটের প্রতিষ্ঠাতা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ওয়াহিদুল হকের দ্বাদশ মৃত্যুবার্ষিকেতে গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি

২৭ শে জানুয়ারি, ২০১৯ রাত ৯:৪৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


বাঙালি সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব, সঙ্গীত বিশেষজ্ঞ, লেখক-সাংবাদিক ওয়াহিদুল হক। তিনি ছিলেন একাধারে মেধাবী সাংবাদিক, রবীন্দ্র সংগীতের তত্ত্বজ্ঞ, শিক্ষক, সংগঠক ও বাঙালি সংস্কৃতির একনিষ্ঠ প্রচারক। রবীন্দ্র সংগীত ছিল তাঁর বিচরণ ক্ষেত্র। দেশে রবীন্দ্রসঙ্গীত ও রবীন্দ্র-গবেষণায়ও অন্যতম পুরোধা পুরুষ ছিলেন তিনি। ওয়াহিদুল হক ১৯৬১ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত ‘ছায়ানট’-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং ১৯৯৯ থেকে আমৃত্যু সহ-সভাপতি ছিলেন। সাহিত্যের শুদ্ধ চর্চা ও প্রসার প্রতিষ্ঠান কণ্ঠশীলন -এর প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হিসেবে আমৃত্যু দায়িত্ব পালন করেছেন। অদম্য প্রাণশক্তি নিয়ে এই গুণী ব্যক্তি বাঙালি সংস্কৃতির শক্তিতে জাগিয়ে রেখেছেন দেশের মানুষকে। মুক্তিযুদ্ধে সাংস্কৃতিক দলের সংগঠনসহ ছায়ানট, জাতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ, কণ্ঠশীলন, আনন্দধ্বনি, নালন্দা, ব্রতচারী সমিতি, সরোজ প্রভৃতি সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা তিনি। মহান যুদ্ধে মুক্তিকামী সাংস্কৃতিক দল নিয়ে জাগ্রত রেখেছেন মুক্তিসেনাদের। সংস্কৃতিপ্রেম আর দেশ ও মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসায় ওয়াহিদুল হক ছিলেন সবার প্রিয়। সংগীতে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৮ সালে তাকে একুশে পদক (মরণোত্তর) ২০০৮ প্রদান করা হয়। তার লেখা উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘চেতনাধারায় এসো’, ‘গানের ভেতর দিয়ে’, ‘সংস্কৃতি জাগরণের প্রথম সূর্য’ ও ‘সংস্কৃতির ভুবন’। জীবনের শেষ দিকে “অভয় বাজে হৃদয় মাঝে” ও “এখনও গেল না আঁধার” শিরোনামে নিয়মিত কলাম লিখেছেন দৈনিক জনকণ্ঠ ও দৈনিক ভোরের কাগজে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগে ১০ বছরেরও বেশী সময় খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবেও তিনি কাজ করেছেন। ২০০৭ সালের আজকের দিনে ঢাকার বারডেম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। বিশিষ্ট সাংবাদিক, সঙ্গীতজ্ঞ ও সংগঠক ওয়াহিদুল হকের দ্বাদশ মৃত্যুবার্ষিকী আজ। প্রবীণ সাংবাদিক, সঙ্গীতজ্ঞ, ছায়ানটের প্রতিষ্ঠাতা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ওয়াহিদুল হকের মৃত্যুবার্ষিকেতে গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।


ওয়াহিদুল হক ১৯৩৩ সালের ১৬ মার্চ কেরানীগঞ্জের তারানগর ইউনিয়নের ভাওয়াল মনোহরীয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ওয়াহিদুল হকের পুরো নাম আবুল ফারাহ মোহাম্মদ ওয়াহিদুল হক। তার পিতার নাম আবু তৈয়ব মাজহারুল হক এবং মাতার নাম মেওয়া বেগম। ওয়াহিদুল হক আরমানিটোলা গভর্ণমেন্ট হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ঢাকা কলেজে ভর্তি হন। সেখান থেকে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়ে উত্তীর্ণ হন। পরে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন৷ ওয়াহিদুল হক স্কুল জীবন থেকেই কম্যুনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৭১ এ তিনি ‘স্বাধীন বাংলা শিল্পী সংস্থা’ গড়ে তোলার মাধ্যমে স্বাধীনতা যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭৩ সালে তিনি ন্যাপের হয়ে কেরানীগঞ্জ থেকে এমপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। কর্মজীবনে ওয়াহিদুল হক ছিলেন ওয়াহিদুল হকের পেশা ছিল সাংবাদিকতা। তিনি ছিলেন মেধাবী সাংবাদিক। ছাত্রাবস্থা থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি প্রায় ৫৪ বছর সাংবাদিকতা পেশায় ছিলেন। ষাটের দশকে দি অবজারভারের শিফট্‌-ইন চার্জ ছিলেন। পরে মর্নিং নিউজ ও দ্যা ডেইলি স্টারের যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন৷ এক সময় ছিলেন দ্যা পিপলস্‌ পত্রিকার সম্পাদক। জীবনের শেষ দিকে “অভয় বাজে হৃদয় মাঝে” ও “এখনও গেল না আঁধার” শিরোনামে নিয়মিত কলাম লিখেছেন দৈনিক জনকন্ঠ ও দৈনিক ভোরের কাগজ পত্রিকায়। পেশা হিসেবে সাংবাদিক হলেও তার আসল কর্মক্ষেত্র ছিল সংস্কৃতি অঙ্গন। রবীন্দ্র সংগীতের তত্ত্বজ্ঞ, শিক্ষক, সংগঠক ও বাঙালি সংস্কৃতির একনিষ্ঠ প্রচারক। তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান দেশে সংস্কৃতির ক্ষেত্র প্রস্তুত করা। বাঙালি হয়ে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার জন্য তিনি আজীবন মানুষ গড়েছেন, সংঘবদ্ধ করেছেন, পথ দেখিয়েছেন। তিনি বাংলার মানুষ, শিক্ষা-সংস্কৃতি আর মননের আজীবন সঙ্গী। ষাটের দশকের গোড়াতে ছায়ানট আন্দোলন ও একে স্থায়ী প্রতিষ্ঠানে রূপদানকারী ব্যক্তিদের মধ্যে তিনি অন্যতম। এছাড়াও আবৃত্তি প্রতিষ্ঠান 'কণ্ঠশীলন', মৃত্যুর কিছুদিন আগে গড়ে তোলা 'নালন্দা' প্রভৃতি প্রতিষ্ঠা এবং এগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ওপর প্রতিষ্ঠা করা ওয়াহিদুল হকের সবচেয়ে বড় অবদান। পাশাপাশি তিনি রবীন্দ্র সঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ গঠন করে সারা দেশে রবীন্দ্র সঙ্গীত চর্চায় মানুষকে আগ্রহী করে তোলার ক্ষেত্রে যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। এছাড়াও তাঁর অনুপ্রেরণায় গড়ে ওঠেছে আনন্দধ্বনি, বাংলাদেশ ব্রতচারী সমিতি, সরোজ সংস্কৃতিবৃত্ত প্রভৃতি সংগঠন। বাংলাদেশের সংস্কৃতির পথ নির্মাণের অগ্রপথিক ওয়াহিদুল হক বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগে ১০ বছরেরও বেশি সময় খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবেও তিনি কাজ করেছেন।


ব্যক্তিগত জীবনে ওয়াহিদুল হক রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী ও লেখিকা সনজিদা খাতুনকে বিবাহ করেন। শেষ জীবনে তিনি কলাম লিখতেন। এমন কোন বিষয় ছিল না যে বিষয়ের উপর তিনি লিখতে পারতেন না। শব্দের উৎপত্তি ও ব্যবহার তিনি অভিধান না দেখেই বলে দিতে পারতেন। অসাধারণ সুন্দর মানসিকতার মানুষ হয়েও তিনি সাধারণ জীবনযাপন করতেন। আনুষ্ঠানিক পুরস্কার বা অবদানের ক্ষেত্রে বরাবরই অনীহা ছিল তার। দেশি-বিদেশি অসংখ্য সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের ঐকান্তিক চেষ্টা সত্ত্বেও তাকে এসব পুরস্কার নিতে আগ্রহী করাতে পারেনি কেউ। এরপরও সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য তার 'জসীম উদ্‌দীন পুরস্কার' ও 'কাজী মাহবুব উল্লাহ পুরস্কার' প্রাপ্তির কথা জানা গেছে। সংগীতে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৮ সালে একুশে পদক (মরণোত্তর) ২০০৮ প্রদান করা হয়। তিনি কাজী মাহবুবউল্লাহ ট্রাস্ট স্বর্ণ পদক লাভ করেন। এছাড়াও তিনি ২০০০ সালে বাংলা একাডেমী সম্মানসূচক ফেলোশীপ পান। শিল্পকলায় অসাধারণ অবদানের জন্য ২০১০ সালে বাংলাদেশের “সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার”হিসাবে পরিচিত “স্বাধীনতা পুরস্কার” প্রদান করা হয় তাকে।এছাড়াও ২০০০-২০০১ সালে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ থেকে গুণী বাঙালি হিসেবে দু’জনকে পুরস্কৃত করা হয়; ওয়াহিদুল হক ছিলেন তাদের একজন।ওয়াহিদুল হক ২০০৭ সালের ২৭ শে জানুয়ারি বিকাল ৫টায় বারডেম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর পূর্বে তিনি তাঁর মরদেহ চিকিৎসা বিজ্ঞানের গবেষণার জন্য দান করে যান। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ, দেশের সবধরনের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে ওয়াহিদুল হক ছিলেন এক নিরন্তর যোদ্ধা। ওয়াহিদুল হকের আদর্শে পথ চললে জীবনের পথগুলো অনেক বেশি সুন্দর হবে। ওয়াহিদুল হককে অনুসরণ করলে আমরা অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক হতে পারবো এবং মানুষের জন্য কাজ করতে পারবো। বিশিষ্ট সাংবাদিক, সঙ্গীতজ্ঞ ও সংগঠক ওয়াহিদুল হকের দ্বাদশ মৃত্যুবার্ষিকী আজ। প্রবীণ সাংবাদিক, সঙ্গীতজ্ঞ, ছায়ানটের প্রতিষ্ঠাতা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ওয়াহিদুল হকের মৃত্যুবার্ষিকেতে গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।

নূর মোহাম্মদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী
[email protected]
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে জানুয়ারি, ২০১৯ রাত ৯:৪৪
১টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

রসায়ন পরীক্ষায় রসটাই আসল :D

লিখেছেন জ্যাক স্মিথ, ১২ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ৩:০৩

রসায়ন পরীক্ষায় রসটাই আসল। না দেখলে মিস!! =p~


সালোকসংশ্লেষণ B-)

...বাকিটুকু পড়ুন

নক্ষত্রের বিদায়!

লিখেছেন এম টি উল্লাহ, ১২ ই জুলাই, ২০২৬ ভোর ৬:৫২


দেশবরেণ্য জ্যেষ্ঠ আইনজীবী, বাংলাদেশের ১৯তম রাষ্ট্রপতি, সাবেক স্পীকার, সাবেক মন্ত্রী, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এর স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য, ব্যারিস্টার মুহম্মদ জমির উদ্দিন সরকার স্যার রাত ৪ টা ১০ ঘটিকায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে ফেরার ঘোষণা আলোচনায় থাকারই কৌশল মাত্র

লিখেছেন ওয়াসিম ফারুক হ্যাভেন, ১২ ই জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১:০৮

চব্বিশের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ ছেড়ে প্রতিবেশী ভারতে পালিয়ে আশ্রয় নেওয়া সাবেক স্বৈরশাসক ও বর্তমানে বাংলাদেশে রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনার আগামী... ...বাকিটুকু পড়ুন

জন্মান্তরের ক্ষুধা

লিখেছেন ইসিয়াক, ১২ ই জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৪:০৮




ঝিরিঝিরি বৃষ্টি, সেই সাথে গুমোট আকাশ। মেঘাচ্ছন্ন  আবহ । একটানা টুপটাপ আওয়াজ ছাড়া চারদিক সুনসান।বৃষ্টি তার ক্লান্তি কাটাতে  যেই একটু থমকে দাঁড়িয়েছে অমনি বুনো শালিকেরা নেমে এলো খাবারের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনা খাদক ছিলেন ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১২ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ১১:৪৮


আজকে সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু একটা এমন তথ্য দিলেন যেটা শুনে বাংলাদেশের আমজনতা রীতিমতো ক্যালকুলেটর হাতে বসে গেল। কথা হচ্ছে শেখ হাসিনার খাবার খরচ নিয়ে। কোন সালে কত টাকার... ...বাকিটুকু পড়ুন

×