
নবাব খান বাহাদুর খাজা আহসানুল্লাহ। ঢাকার ঐতিহাসিক স্থাপনা আহসান মঞ্জিলের নামকরণ হয়েছে যার নামে। ঢাকার জনগণের শিক্ষাদীক্ষা ও সার্বিক উন্নয়নের পিছনে যাদের অবদান উল্লেখযোগ্য, খাজা আহসানুল্লাহ তাদের অন্যতম। দুঃখজনকভাবে আমরা অনেকেই এইসব ব্যক্তিদের কথা জানিনা। নিজেদের অস্তিত্বকে সম্মান জানাতেই এইসব ইতিহাস আমাদের জানা জরুরী। আসুন জেনে নিই সেই নবাব খাজা আহসানুল্লাহ সম্পর্কে। পলাশীর আম্রকানে ইংরেজদের বিরুদ্ধে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার সেনাপতি মীরজাফর বিশ্বাসঘাতকতার কারনে ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর যুদ্ধে পরাজিত হবার পর রবার্ট ক্লাইভের নেতৃত্বে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার শাসনভার গ্রহন করে। সুবিশাল এই ভারতবর্ষকে ইংরেজরা বেশ কৌশলে শাসন করেছে। প্রধান শাসনকর্তার আগমন সরাসরি ব্রিটেন থেকে হলেও ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র এলাকাভিত্তিক শাসক হিসেবে তারা বেছে নিত স্থানীয়দেরকে। ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র সেইসব শাসকরা ইংরেজদের কেন্দ্রীয় শাসন মেনে নিজ-নিজ এলাকা পরিচালনা করতেন। একেক এলাকার শাসকরা একেক রকম নাম ধারণ করতেন। যার মধ্যে বহুল প্রচলিত উপাধি ছিল জমিদার। তবে, ঢাকার শাসকদেরকে বলা হত নবাব। খাজা আহসানুল্লাহ ছিলেন ঢাকা নবাব। তিনি ১৮৭১ সালে খান বাহাদুর, ১৮৭৫ সালে নওয়াব, ১৮৯১ সালে সিআইই, ১৮৯২ সালে নওয়াব বাহাদুর এবং ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দে কেসিআইই উপাধি লাভ করেন। তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তিনি মুসলিম রাজনৈতিক ধারার সমর্থক ও পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দে প্রথমবার এবং ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দে দ্বিতীয়বার ব্রিটিশ বড়লাটের আইনসভার সদস্য মনোনীত হয়েছিলেন। নবাব খাজা আহসানুল্লাহ একজন দানবীর নবাব ছিলেন। সম্পদশালী যেমন ছিলেন, তেমনি জনগণের কল্যাণে সেই সম্পদ ব্যয় করেছেন অকুণ্ঠচিত্তে। পরবর্তীতে হিসেব করে দেখা গেছে, বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কাজে অন্তত: তখনকার মূল্যে ৫০ লক্ষাধিক টাকা তিনি দান করেছিলেন। উদাহরণত তার দানের কিছু ক্ষেত্র ও পরিমাণ উল্লেখ করা হচ্ছে। যেমন, ঢাকার হোসেনী দালান পুনর্নির্মাণে এক লক্ষ টাকা, ঢাকায় মহামারী আকারে ছড়ানো প্লেগ নিবারণে এক লক্ষ টাকা (১৮৯৮খ্রিঃ), কুমিল্লা শহর উন্নয়নে (১৮৯৮) ৮০ হাজার টাকা, বড়লাটের দুর্ভিক্ষ তহবিলে ৫০ হাজার টাকা, মিটফোর্ড হাসপাতালে বিভিন্ন সময়ে দান প্রায় এক লক্ষ টাকা, ঢাকায় লেডি ডাফরিন মহিলা হাসপাতাল নির্মাণে (১৮৮৮ খ্রিঃ) ৫০ হাজার টাকা ইত্যাদি। এছাড়া প্রতিবছর ৩০-৪০ জন দরিদ্র মুসলমানের হজে যাওয়ার প্রয়োজনীয় ব্যয় তিনি বহন করতেন। পবিত্র মক্কায় নহরে জুবায়দা নামে খাল সংস্কারে তিনি ৬০ হাজার টাকা দান করেছিলেন । এছাড়াও খাজা আহসানুল্লাহ ঢাকার সার্ভে স্কুলটিকে ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুলে উন্নীত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের স্বার্থে এক লক্ষ ১২ হাজার টাকা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। জীবদ্দশায় তা সম্ভব হয়নি। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র নবাব সলিমুল্লাহ ১৯০২ খ্রিস্টাব্দে এই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছিলেন। সেই সার্ভে স্কুলটিই বর্তমানে বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় বা বুয়েট। আজ দানবীর নবাব খাজা আহসানুল্লাহর ১১৮তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯০১ খ্রিস্টাব্দের আজকের দিনে তিনি ঢাকায় ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর পরে তাকে বেগমবাজারের পারিবারিক গোরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। দানবীর নবাব খাজা আহসানউল্লাহ'র মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।

খাজা আহসানউল্লাহ ১৮৪৬ খ্রিস্টাব্দের ২২শে ডিসেম্বর নবাব খাজা আব্দুল গণির ঔরসে মাতা ইসমতুন্নেসার গর্ভে জন্মলাভ করেন। শৈশবে তিনি মাতৃভাষা বাংলা ছাড়াও আরবি, উর্দূ ও ফার্সি ভাষা শিক্ষালাভ করেন। তিনি বাল্যকালেই কোরআন এ হাফেজ হন। ২২বছর বয়সে তিনি তার পারিবারিক সম্পত্তির দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। খাজা আহসানুল্লাহ ছিলেন উর্দূভাষার একজন কবি ও সাহিত্যিক। খাজা আহসানুল্লাহ কবিতা লিখতেন ছদ্মনামে। তার কবিনাম ছিল ‘শাহীন।’ যার অর্থ রাজকীয় পাখি। তিনি উর্দু ও ফার্সি ভাষায় কবিতা রচনা করতেন।এছাড়াও একাধারে গীতিকার, নাট্যকার ও কণ্ঠশিল্পী ছিলেন। তিনি বেশ কিছু ঠুমরী ঢংয়ের গীত রচনা করেন। তাঁর রচিত উর্দূ নাটকগুলো নবাববাড়িতে মঞ্চস্থ হত। কুল্লিয়াতে শাহীন নামে তাঁর উর্দু-ফার্সি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল। তার নির্দেশনায় ঢাকা থেকে ১৮৮৪ সালে আহসানুল কাসাস নামে একটি উর্দূ পত্রিকা প্রকাশিত হয়। তিনি নিয়মিত রোজনামচা লিখতেন। তাঁর লেখা তারিখে খান্দানে কাশ্মীরিয়াহ (কাশ্মীরি বংশের ইতিহাস)-এর অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত আছে। শৌখিন ফটোগ্রাফার হিসেবে কলকাতার ফটোগ্রাফি সোসাইটিরও সদস্য হয়েছিলেন। ১৯০১ খ্রিস্টাব্দের ৭ ডিসেম্বর ঢাকা শহরে প্রথম বৈদ্যুতিক বাতির ব্যবস্থা করা হয়। এই ব্যাপারে তিনি ছিলেন অন্যতম উদ্যোক্তা। কেবল তাই নয়, এই পরিকল্পনার বাস্তবায়নের স্বার্থে তিনি সাড়ে চার লক্ষ টাকা দান করেছিলেন। তিনি ১৮৯৯ সালে ঢাকা মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব প্রতিষ্ঠায় পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছেন। কলকাতার সেন্ট্রাল ন্যাশনাল মোহামেডান অ্যাসোসিয়েশন ও এশিয়াটিক সোসাইটির সদস্য ছিলেন। ঢাকায় তিনি মোহামেডান লিটারারি সোসাইটির শাখা প্রতিষ্ঠা করেন।'

বাংলার মুসলিম নবাবদের সূতিকাগার ঢাকার ঐতিহাসিক স্থাপনা আহসান মঞ্জিল। আহসান মঞ্জিল এমন একটি স্থাপত্য যার সঙ্গে বাংলার ইতিহাসের বেশ কিছু অধ্যায় জড়িত। আহসান মঞ্জিলের নামকরণ হয়েছে নবাব খাজা আহসানুল্লাহ'র নামে। এটি ঢাকার ইসলামপুরের কুমারটুলী এলাকায় বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত। এটি পূর্বে ছিল ঢাকার নবাবদের আবাসিক প্রাসাদ এবং জমিদারীর সদর কাচারি। অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে জালালপুর পরগনার জমিদার শেখ ইনায়েতউল্লাহ আহসান মঞ্জিলের বর্তমান স্থান রংমহল নামে একটি প্রমোদভবন তৈরি করেন। পরবর্তীতে তাঁর পুত্র শেখ মতিউল্লাহ রংমহলটি ফরাসি বণিকদের কাছে বিক্রি করে দেন। বাণিজ্য কুঠি হিসাবে এটি দীর্ঘদিন পরিচিত ছিল। এরপরে ১৮৩০-এ বেগমবাজারে বসবাসকারী নওয়াব আবদুল গনির পিতা খাজা আলীমুল্লাহ এটি ক্রয় করে বসবাস শুরু করেন। এই বাসভবনকে কেন্দ্র করে খাজা আবদুল গনি মার্টিন অ্যান্ড কোম্পানী নামক একটি ইউরোপীয় নির্মাণ ও প্রকৌশল-প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে একটি মাস্টারপ্ল্যান তৈরী করান, যার প্রধান ইমারত ছিল আহসান মঞ্জিল। ১৮৫৯ সালে নওয়াব আবদুল গনি প্রাসাদটি নির্মাণ শুরু করেন যা ১৮৭২ সালে সমাপ্ত হয়। তিনি তাঁর প্রিয় পুত্র খাজা আহসানুল্লাহর নামানুসারে এর নামকরণ করেন ‘আহসান মঞ্জিল’। ওই যুগে নবনির্মিত প্রাসাদ ভবনটি রংমহল ও পুরাতন ভবনটি অন্দরমহল নামে পরিচিত ছিল। ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে এখানে এক অনুষ্ঠিত বৈঠকে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত হয়। আহসান মঞ্জিল এর মধ্য কয়েকবার সংস্কার করা হয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর অযত্ন ও অপব্যবহারে আহসান মঞ্জিল ধ্বংসপ্রাপ্তির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে। এমতাবস্থায় ১৯৭৪ সালে ঢাকা নওয়াব পরিবারের উত্তরসূরিরা আহসান মঞ্জিল প্রাসাদ নিলামে বিক্রির পরিকল্পনা করেন। সরকারের ভূমি প্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পক্ষে নিলাম বিক্রির প্রস্তাবটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবের কাছে পেশ করা হয়। কিন্তু শেখ মুজিব আহসান মঞ্জিলের স্থাপত্য সৌন্দর্য ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব উপলব্ধি করে ১৯৭৪ সালের ২রা নভেম্বর এটি নিলামে বিক্রির প্রস্তাব নাকচ করে দেন। ১৯৯২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর আহসান মঞ্জিল জাদুঘরের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ও জনসাধারণের পরিদর্শনের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। বর্তমানে এটি একটি জাদুঘর হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর কর্তৃক রয়েছেন এর পরিচালনায়।

(নবাব খাজা আহসানউল্লাহ ও তার স্ত্রী বেগম শামসুন্নাহার আহসানউল্লাহ)
নবাব খাজা আহসানউল্লাহ ১৯০১ খ্রিস্টাব্দের ১৬ ডিসেম্বর ইন্তেকাল করেন। বেগমবাজারে পারিবারিক গোরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। আজ দানবীর নবাব খাজা আহসানউল্লাহর ১১৮তম মৃত্যুবার্ষিকী। নবাব খাজা আহসানউল্লাহ'র মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।
নূর মোহাম্মদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী
[email protected]

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

