somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

নূর মোহাম্মদ নূরু
নূর মোহাম্মদ নূরু (পেশাঃ সংবাদ কর্মী), জন্ম ২৯ সেপ্টেম্বর প্রাচ্যের ভেনিস খ্যাত বরিশালের উজিরপুর উপজেলাধীন সাপলা ফুলের স্বর্গ সাতলা গ্রামে

বাংলাদেশী লিজেন্ড গানের রাজা সঙ্গীত শিল্পী মাহমুদুন্নবীর ২৯তম মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি

২০ শে ডিসেম্বর, ২০১৯ বিকাল ৫:০৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


ষাট এর দশককের বাংলা গানের স্বর্ণ যুগের শ্রেষ্ঠতম প্রতিনিধি অমর কণ্ঠশিল্পী মাহমুদুন্নবী। আমাদের আধুনিক গান গুলো যারা অনেক বেশি সমৃদ্ধ করেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম কণ্ঠ শিল্পী প্রয়াত মাহমুদুন্নবী। মাহমুদুন্নবী ছিলেন সহজ-সরল, মিষ্টভাষী এবং গানপাগল অভিমানী এক মানুষ। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি কেবল গানই লালন করেছেন তার হৃদয়ে। বাংলাদেশী সঙ্গীতে শিল্পী মাহমুদুন্নবির নাম টি শোনেন নি এমন লোক পাওয়া সত্যি বিরল। অসংখ্য আধুনিক ও চলচ্চিত্রের গানে কণ্ঠ দিয়ে আজও তিনি বেঁচে আছেন আমাদের মনের মণিকোঠায়। সুরের ভুবনে আমি আজও পথচারী, ক্ষমা করে দিও যদি না তোমায় মনের মত গান শুনাতে পারি”। ৭০ এর দশকে গাজী মাজহারুল আনোয়ার এর লেখা আর সত্য সাহার সুরে কালজয়ী এ গানের শিল্পী বাংলাদেশী লিজেন্ড মাহমুদুন্নবী। একটা শিল্পীর কণ্ঠে কত দরদ আর কতটা আবেগ থাকলে এমন একটি গান গাওয়া সম্ভব তা সহজেই অনুমেয়। পরিষ্কার উচ্চারণ, আবেগ আর মেলোডি এই তিনের মিশেলে একজন শিল্পী যে জাত শিল্পীতে রূপান্তরিত হয়ে যান সেটি সুবল দাসের সুরে গাজী মাজহারুল আনোয়ারের লেখায় “ গানের খাতায় স্বরলিপি লিখে বল কি হবে?”- গানটি শুনলে স্পষ্ট অনুধাবন করা সম্ভব যে মাহমুদুন্নবী কতটা লিজেন্ড ছিলেন। আমাদের দেশে মূলত ৭০ এর দশকে বাংলা ব্যান্ডের যে গন জোয়ার শুরু হয়েছিল তার অনেক আগ থেকেই আধুনিক গান তার নিজ স্বকীয়তায় আপন মহিমায় ভাস্বর ছিল। আধুনিক আর চলচ্চিত্রের সেই সব কালজয়ী গানগুলো আজও আমাদের নস্টালজিক করে তোলে। গান ভালোবাসেন না এমন মানব মানবী হয়তো খুঁজে পাওয়া যেতেও পারে। তবে আমাদের বাংলাদেশী সঙ্গীতে শিল্পী মাহমুদুন্নবির নাম টি শোনেন নি এমন লোক পাওয়া সত্যি বিরল। অসংখ্য আধুনিক ও চলচ্চিত্রের গানে কণ্ঠ দিয়ে আজও তিনি বেঁচে আছেন আমাদের মনের মণিকোঠায়। কালজয়ী এই সঙ্গীত শিল্পী বিজয়ের মাসে জন্মগ্রহণ করেন মৃত্যুবরণও করেন ১৯৯০ সালের ডিসেম্বর মাসের আজকের দিনে। আজ তার ২৯তম প্রয়াণ দিবস। বাংলাদেশী লিজেণ্ড সংগীতশিল্পী মাহমুদুন্নবীর মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি।


সংগীতশিল্পী মাহমুদুন্নবী ১৯৩৬ সালের ১৬ ডিসেম্বর ভারতেরর বর্ধমান জেলার কেতু নামক এক অজ পাড়া গায়ে জন্মগ্রহণ করেন। দেশবিভাগের পর সপরিবারে তাঁরা তদানীন্তন পূর্ব বাংলায় চলে আসেন এবং খুলনায় স্থায়ী হন। তবে বাবার কর্মক্ষেত্র ফরিদপুরেই কেটেছে মাহমুদুন্নবীর শৈশব ও কৈশোর। ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকের পাঠ অসমাপ্ত রেখেই তিনি বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন। প্রথমে কিছুকাল চট্টগ্রামে, পরে ঢাকায় চলে যান। তাঁর চেতনা আর শিল্পী সত্তা চালিত হয়েছিল সুরের টানে। ঢাকার ইসলামপুরে একজন ওস্তাদের কাছে কিছুকাল গানের তালিম নেন তিনি। এরপর চলে যান করাচি। করাচি বেতার কেন্দ্র থেকেই প্রচারিত হয় তাঁর প্রথম গান ‘পথে যেতে দেখি আমি যারে’। প্রখ্যাত সাহিত্যিক আবু হেনা মোস্তফা কামালের লেখা এই গানটির মাধ্যমেই আধুনিক বাংলা গানের ভুবনে উজ্জ্বল প্রবেশ মাহমুদুন্নবীর। এর অব্যবহিত পরে শিল্পীর আটটি গান নিয়ে আধুনিক গানের একটি লং প্লে রেকর্ড প্রকাশিত হয়। ষাটের দশকের শুরুতে মাহমুদুন্নবী ঢাকায় স্থায়ী হন। এ সময় থেকে ঢাকা বেতারের নিয়মিত শিল্পী হিসেবে তাঁর আত্মপ্রকাশ ঘটে। শিল্পের প্রতি যেমন, তেমনি সমাজের প্রতিও দায়বদ্ধ ছিলেন শিল্পী মাহমুদুন্নবী। ষাটের দশকে পূর্ব বাংলার জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সাথে ছিল তাঁর সম্পৃক্ততা। এ সময় তাঁর গাওয়া গণজাগরণমূলক বেশ কিছু গান মুক্তিকামী মানুষকে স্বাধীনতার স্বপ্নে উদ্বুদ্ধ করে। মেলোডিয়াস গানের কণ্ঠ শিল্পী মাহামুদুন্নবী জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি কেবল গান ই লালন করতেন তার হৃদয়ে।


(পুত্র কন্যার সাথে কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী মাহমুদুন্নবীর)
মাহমুদুন্নবী ছিলেন গানের রাজা। সেই রাজার ছিলো তিন কন্যা নুমা (ফাহমিদা নবী), নোভা (সামিনা চৌধুরী) ও অন্তরা (তানজিদা নবী)। আর ছিলো এক পুত্র পঞ্চম (রেদয়ান চৌধুরী)। তাদের প্রাসাদ ছিলো ঢাকার এলিফ্যান্ট রোডে। মাহমুদুন্নবীর দুই কন্যাই (ফাহমিদা নবী ও তার ছোট বোন সামিনা চৌধুরি) এখন খ্যতিমান শিল্পী। তার উল্লেখযোগ্য গান গুলোর মধ্যে তুমি যে আমার কবিতা, আমারও বাঁশি রাগিণী, তুমি কখন এসে দাড়িয়ে আছো আমার অজান্তে, ও গো মোর মধুমিতা, গীতিময় সেই দিন চিরদিন, সালাম পৃথিবী তোমাকে সালাম দুনিয়া কে করেছো টাকার গোলাম, খোলা জানালার পাশে একা বসে আছি, আমি সাত সাগর পাড়ি দিয়ে কেন সৈকতে পড়ে আছিসহ অসংখ্য জনপ্রিয় গান। ১৯৭৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত রোমান্টিক চলচ্চিত্র দি রেইন-এ "আমি তো আজ ভুলে গেছি সবই" গানটির জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ পুরুষ কণ্ঠশিল্পী হিসেবে ১৯৭৭ সালে ২য় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। বাংলার এই মেলোডি কিং ছিলেন সহজ-সরল, মিষ্টভাষী এবং চরম অভিমানী এক মানুষ। খুব চাপা স্বভাবের এবং সংসারের প্রতি উদাসীন ছিলেন। কথা কম বলতেন। তবে ভোজনের ব্যাপারে, বিশেষ করে তার স্তীর রান্না খাওয়ার ব্যাপারে তাঁর ঔদাসীন্য বা কম কথা ছিলোনা কখনো। ভীষণ ভোজনবিলাসী ছিলেন তিনি। খেতে এবং খাওয়াতে ভালোবাসতেন।কিংবদন্তি এই শিল্পিকে এক সময় গানের জগত থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সত্য সাহার সুরে গাজী মাজহারুল আনোয়ার এর লেখায় তার কণ্ঠে গীত" আমি সাত সাগর পাড়ি দিয়ে কেন সৈকতে পড়ে আছি" গানটির জন্য একুশে পদক ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে সেই পুরস্কার দেওয়া হয়নি। আর এই অভিমানে তিনি বাকি জীবন গান থেকে নির্বাসনে ছিলেন মাহহমুদুন্নবী। গানের জগতে রাজনীতির শিকার হয়ে তিনি তখন সাংঘাতিকভাবে হতাশ একজন শিল্পী। কেন তাকে ২১ শে পদক দেওয়া হবে এই ঘোষণা দিয়ে এবং লিস্ট করেও দেওয়া হলনা তা এখনো রহস্যাবৃত। হয়তো গানের রাজনীতির শিকার হয়েছিলেন তিনি। তার সরলতাকে দুর্বলতায় রূপান্তর করে গানের জগৎ থেকে মোটামুটি দূরে সরিয়ে দিল গানের জগতেরই কিছু মানুষ।


মাহমুদুন্নবী আমাদের সঙ্গীত আকাশের এক জ্বলন্ত উজ্জ্বল নক্ষত্র। নক্ষত্র যেমন আলোকিত করে বিশ্ব ভ্রমান্ড, আলোকিত করে চার পাশ, তেমনি মাহমুদুন্নবি ও তার সুরের আকাশকে আলোকিত করেছিলেন। কালজয়ী সংগীতশিল্পী মাহমুদুন্নবী ১৯৯০ সালের ২০ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে অনেক শ্রোতাপ্রিয় গানে কণ্ঠ দিয়ে তিনি দর্শক হৃদয়ে আজও অমর হয়ে আছেন। মাহমুদুন্নবী বাংলাদেশের আধুনিক ও চলচ্চিত্রের গানে যে শুভ সূচনার উন্মেষ ঘটিয়েছিলেন সেই ধারাবাহিকতা আজ এই দেশের চলচ্চিত্রের গানে লক্ষ্য করা যায় না বললেই চলে। মাহমুদুন্নবী আমাদের সঙ্গীত আকাশের এক জ্বলন্ত উজ্জ্বল নক্ষত্র। নক্ষত্র যেমন আলোকিত করে বিশ্ব ভ্রমাণ্ড, আলোকিত করে চার পাশ, তেমনি মাহমুদুন্নবীও সুরের আকাশে আলোকিত তারকা হয়ে সঙ্গীতপ্রেমীদের অন্তরজুড়ে আছেন আজো। ১৬ ডিসেম্বর ছিলো এই কিংবদন্তির জন্মদিন আর ২০ ডিসেম্বর মৃত্যুবার্ষিকী। কালজীয় সঙ্গীত শিল্পী সুরের যাদুকর মাহমুদুন্নবীর ২৯তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। উপমহাদেশের কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী মাহমুদুন্নবীর মৃত্যুদিনে আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।

নূর মোহাম্মদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী
[email protected]
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে ডিসেম্বর, ২০১৯ বিকাল ৫:০৬
৪টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

রুবা

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০১ লা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:২৮




রুবার সাথে আমার বিয়েটা ওঠ ছেড়ি তোর বিয়ের মতোই হয়েছে । একদম সাধারন কোনরকম অনুষ্ঠান নাই । সেইদিন অফিসে অনেক কাজ ছিলো । চোখে তারা ফারা দেখছিলাম । বসের... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রথম .........।

লিখেছেন মায়াস্পর্শ, ০১ লা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:৩৪


আন্ডারগ্রাউন্ড শোতে এটাই আমার প্রথম ড্রামস বাজানোর একটা মুহূর্ত।

কিছু গল্প আসলে পরিকল্পনা করে শুরু হয় না।কিছু গল্প হঠাৎ করে একটা মুহূর্ত থেকে জন্ম নেয় আর তারপর... ...বাকিটুকু পড়ুন

সমুদ্রের নীল খাম

লিখেছেন ডি এইচ তুহিন, ০১ লা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:৪২


এই শহরে থাকি প্রায় সাতাশ-আটাশ বছর ধরে। তিন প্রেমিকার মায়া ছেড়ে যাওয়া যায় না এমন এক অদ্ভুত সুন্দর এই শহর। যার এক হাতে নদী, অন্য হাতে সমুদ্র, আর কপালে জায়গা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আওয়ামী দুঃশাসনের পতন অনিবার্য ছিল, জুলাই তো স্রেফ উছিলা মাত্র!

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ০১ লা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৮



জুলাই নিয়ে অনেক বিতর্ক, সমালোচনা আছে। কিন্তু, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে জুলাই গণঅভ্যূত্থান না হলে আমরা দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসন থেকে মুক্তি পেতাম না। জুলাই ঘিরে যত বিতর্ক, সমালোচনাই... ...বাকিটুকু পড়ুন

দুমুখোচিন্তা

লিখেছেন তানভীর রাতুল, ০২ রা জুলাই, ২০২৬ রাত ৩:১৬

সব মৃত্যু গণনায় আসে না। রাজনৈতিক সহিংসতার একটি পুরনো নিয়ম আছে। মৃত্যু সমান মৃত্যু নয়। কোনো মৃত্যু পত্রিকার প্রথম পাতায় যায়, কোনো মৃত্যু জয়পুরহাটেই থেকে যায়। এই বাছাইটা দৈবাৎ হয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×