
ভারত এমনই বৈচিত্র্যপূর্ণ দেশ, যেখানে প্রতি দিনই কোনও না কোন উৎসব পালন করা হয়। বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী, এবং মতাবলম্বী মানুষ তাঁদের নিজস্ব উৎসব উদযাপন করেন। কিন্তু ২৬ জানুয়ারি এমন একটি দিন যা এই দেশের জাতীয় উদযাপন। দেশের সব ধর্ম ও বর্ণের মানুষ এই দিন আরও একবার অন্তস্থ দেশপ্রেমকে স্মরণ করে নেন। ভারতে সাধারণতন্ত্র দিবস বা প্রজাতন্ত্র দিবস পালিত হয়ে আসছে ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি থেকে। স্বাধীনতা লাভের প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ হয় যুক্তরাজ্যের সংসদে ভারতীয় স্বাধীনতা আইন পাশ হওয়ার মাধ্যমে। এর ফলে ব্রিটিশ ভারত ভেঙে গিয়ে কমনওয়েলথ অফ নেশনসের অন্তর্গত অধিরাজ্য হিসেবে দু'টি স্বাধীন রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তানের জন্ম হয়। আজ ভারতের ৭১তম প্রজাতন্ত্র দিবস। ভারতের সংবিধান প্রবর্তনের স্মৃতিতে প্রতি বছর ২৬ জানুয়ারি তারিখটি প্রজাতন্ত্র দিবস হিসেবে উদযাপন করা হয়। ভারতে সাধারণতন্ত্র দিবস বা প্রজাতন্ত্র দিবস পালিত হয়। এই দিনটি ভারতের তিনটি জাতীয় দিবসের অন্যতম। অন্য দু'টি জাতীয় দিবস যথাক্রমে স্বাধীনতা দিবস ও গান্ধী জয়ন্তী। এই দিন সারা ভারতেই নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। কেন্দ্রীয় কুচকাওয়াজের অনুষ্ঠানটি হয় নতুন দিল্লির রাজপথে। ভারতের রাষ্ট্রপতি এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকেন।ভারতে সাধারণতন্ত্র দিবস বা প্রজাতন্ত্র দিবস পালিত হয় ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি তারিখে ভারত শাসনের জন্য ১৯৩৫ সালের ভারত সরকার আইনের পরিবর্তে ভারতীয় সংবিধান কার্যকরী হওয়ার ঘটনাকে স্মরণ করে। এটি ভারতের একটি জাতীয় দিবস। ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি ভারতীয় গণপরিষদ সংবিধান কার্যকরী হলে ভারত একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হয়। কার্যকরী হওয়ার ঠিক দুই মাস আগে, ১৯৪৯ খ্রিঃ ২৬ নভেম্বর গণপরিষদ কর্তৃক ভারতের সংবিধান অনুমোদিত হয়। ২৬ জানুয়ারি দিনটিকে সংবিধান কার্যকর করার জন্য বেছে নেওয়া হয়েছিল কারণ ১৯৩০ খ্রিঃ ঐ একই দিনে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস কর্তৃক পূর্ণ স্বরাজের সংকল্প ঘোষিত ও গৃহীত হয়েছিল। এবার পালিত হচ্ছে দেশটির ৭১তম প্রজাত্ন্ত্র দিবস।

এবার প্রজাতন্ত্র দিবসে প্রধান অতিথি ব্রাজিলের ট্রাম্প খ্যাত বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারো (Jair Messias Bolsonaro)। অ্যামাজনের জঙ্গলে দাবানলের জেরে সারা বিশ্ব জুড়ে সমালোচিত হয়েছিলেন ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট জাইর মেসিয়াস বলসোনারো। বলসোনারো কে স্বৈরাচারী শাসক হিসাবে দাগিয়ে দিয়েছিলো সারা বিশ্ব। এবারের ৭১ তম প্রজাতন্ত্র দিবসে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ আমন্ত্রণে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত থাকছেন এই প্রেসিডেন্ট। ক্ষমতা গ্রহণের পর বলসোনারো প্রথম পা রাখতে চলেছেন ভারতের মাটিতে। এর আগে ২০১৬ সালে ব্রাজিলের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট মিচেল টিমার ব্রিকসের অষ্টম অন্তর্জাতিক সম্মেলন হিসাবে ভারত সফরে এসেছিলেন। একাদশ ব্রিকস্ সম্মেলনে গত নভেম্বরেই ব্রাজিল গেছিলেন মোদী। এবারের প্রজাতন্ত্র দিবসের প্যারেডে সভাপতিত্ব করবেন রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ, যিনি ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর সর্বোচ্চ কমান্ডার। প্যারেড শুরু হবে ভারতের জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে। রাষ্ট্রপতি ছাড়াও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, কেন্দ্রীয় সরকারের অন্য মন্ত্রী এবং রাজনৈতিক দলের নেতা-নেত্রীরা এই প্যারেডে উপস্থিত থাকবেন। সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, পুলিশ এবং আধাসামরিক বাহিনীর রেজিমেন্টগুলি রাজপথে প্যারেড করবে। ভারতের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম-যেমন মিসাইল, যুদ্ধবিমান এবং অন্য অস্ত্র প্রদর্শন করা হবে। তিন সেনা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন রাজ্য এবং কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রক ও বিভাগের ট্যাবলো অংশ নেয় প্যারেডে। ২৬ জানুয়ারি শুরু হয়ে প্রজাতন্ত্র দিবসের প্যারেড ২৯ জানুয়ারি বিজয় চকে অনুষ্ঠিত বিটিং রিট্রিট (Beating Retreat) অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শেষ হয়। প্রজাতন্ত্র দিবসের মূল আকর্ষণ দিল্লির রাজপথে প্যারেড (Republic Day Parade)। প্যারেড দেখতে ভারতের দূর-দূরান্ত থেকে লোকজন আসেন।

তবে মজার ব্যাপার প্রজাতন্ত্র দিবস কী, অনেক ভারতীয়রাই তা জানেই না। বছরে ৩৬৫ দিন থাকলেও কেন শুধু ২৬ ই জানুয়ারী প্রজাতন্ত্র দিবস পালিত হয় সেটাও একটু জানা দরকার। ১৯২৯ সালের ৩১ সে ডিসেম্বর নেহরুজী লাহোরে প্রথমবার তিরঙ্গা উত্তোলন করেন এবং ১৯৩০ সালের ২৬ সে জানুয়ারী স্বাধীনতা দিবস হিসাবে ধার্য করেন। ওই দিনটাকে তারপর থেকে পরবর্তী ১৭ বছর ধরে “পূর্ণ স্বরাজ ” দিবস হিসাবে পালন করা হয়. কিন্তু স্বাধীনতা আসে ১৫ ই অগাস্ট, তাই ২৬ ই জানুয়ারী দিবসটিকে পালন করা হয় পরাধীন ভারতবর্ষ থেকে আধুনিক গণতন্ত্রে রূপান্তরিত হওয়ার দিন অর্থাৎ প্রজাতন্ত্র দিবস হিসাবে।“গণ” যার অর্থ সাধারণ অর্থাৎ আপামর ভারতবাসী যাদের জন্যই গণতন্ত্র দিবস । গণতন্ত্র মানে তাই জনসাধারণের জন্য আর জনসাধারণের দ্বারা । প্রজাতন্ত্র অনেকটা গণতন্ত্রের মতো কিন্তু শেষে একটা রাজা বা শাসক থাকে, যেমন ইংল্যান্ডের শাসন ব্যবস্থা হলো প্রজাতান্ত্রিক আর আমেরিকার শাসন ব্যবস্থা হলো গণতান্ত্রিক । ১৫ই আগস্ট ১৯৪৭ এ দীর্ঘ স্বাধীনতা আন্দোলনের ফলে ভারত ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্তি পায়। এই স্বাধীনতা আন্দোলনের বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে পরিচালিত, প্রায় সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ অহিংস অসহযোগ আন্দোলন ও আইন অমান্য আন্দোলন। স্বাধীনতা লাভের প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ হয় যুক্তরাজ্যের সংসদে ভারতীয় স্বাধীনতা আইন পাশ হওয়ার মাধ্যমে। এর ফলে ব্রিটিশ ভারত ভেঙে গিয়ে কমনওয়েলথ অফ নেশনস-এর অন্তর্গত অধিরাজ্য হিসেবে দু'টি স্বাধীন রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তানের জন্ম হয়। ১৫ই আগস্ট ১৯৪৭ এ ভারত স্বাধীন হলেও দেশের প্রধান হিসেবে তখনও বহাল ছিলেন ষষ্ঠ জর্জ এবং লর্ড লুই মাউন্টব্যাটেন ছিলেন এর গভর্ণর জেনারেল। তখনও দেশে কোনো স্থায়ী সংবিধান ছিল না; ঔপনিবেশিক ভারত শাসন আইনে কিছু রদবদল ঘটিয়েই দেশ শাসনের কাজ চলছিল। ১৯৪৭ খ্রিঃ ২৮শে আগস্ট একটি স্থায়ী সংবিধান রচনার জন্য ড্রাফটিং কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন ভীমরাও রামজি আম্বেডকর। ৪ঠা নভেম্বর ১৯৪৭ তারিখে কমিটি একটি খসড়া সংবিধান প্রস্তুত করে গণপরিষদে জমা দেয়। চূড়ান্তভাবে সংবিধান গৃহীত হওয়ার আগে ২ বছর, ১১ মাস, ১৮ দিন ব্যাপী সময়ে গণপরিষদ এই খসড়া সংবিধান আলোচনার জন্য ১৬৬ বার অধিবেশন ডাকে। এই সমস্ত অধিবেশনে জনসাধারণের প্রবেশের অধিকার ছিল। বহু বিতর্ক ও কিছু সংশোধনের পর ২৪ শে জানুয়ারি ১৯৫০ এ গণপরিষদের ৩০৮ জন সদস্য চূড়ান্ত সংবিধানের হাতে-লেখা দু'টি নথিতে (একটি ইংরেজি ও অপরটি হিন্দি) স্বাক্ষর করেন। এর দু'দিন পর সারা দেশব্যাপী এই সংবিধান কার্যকর হয়। ১৯৫০ সালে দেশের সংবিধান তৈরি হওয়ার পর, তা কার্যকর করতে একটি দিনের প্রয়োজন ছিল। আর তখনই ঐতিহাসিক মাহাত্ম্যের বিচারে বেছে নেওয়া হয় ২৬ জানুয়ারিকেই। এই কারণেই ২৬ জানুয়ারি পরিচিত হতে শুরু করল ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবস হিসেবে। সাধারণতন্ত্র দিবস উদ্যাপনের প্রধান কর্মসূচী পালিত হয় ভারতের রাষ্ট্রপতির সামনে, জাতীয় রাজধানী নয়াদিল্লীতে। এই দিন রাজপথে আড়ম্বরপূর্ণ কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হয় যা ভারত রাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হয়।

৭১তম প্রজাতন্ত্র দিবসে সাজ সাজ রব দিল্লিতে। সাজিয়ে তোলা হয়েছে ইন্ডিয়া গেট। এ বছর কুচকাওয়াজে অংশগ্রহণ করবে হেলিকপ্টার অ্যাপাচে, চপার চিনুক। কুচকাওয়াজে থাকবে বায়ুসেনার রাফাল বিমান, তেজস, লাইট কমব্যাট হেলিকপ্টার। কুচকাওয়াজে রাজপথে থাকবে সিআরপিএফ-এর মহিলা বাইক চালকদের দল। বিশেষ স্টান্টও প্রদর্শন করবেন তাঁরা। এবার ইন্ডিয়া গেটের অমর জওয়ান জ্যোতিতে নয়, দিল্লির ন্যাশনাল ওয়ার মেমোরিয়ালে যাবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখান থেকেই নিহত জওয়ানদের শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করবেন মোদী। থাকবেন চিফ অফ ডিফেন্স স্টাফ এবং তিন সেনাবাহিনীর প্রধানেরা। প্রজাতন্ত্র দিবস উপলক্ষে দিল্লি জুড়ে কড়া নিরাপত্তা। নিরাপত্তা কাশ্মীর উপত্যকাতেও। তাছাড়া অনুষ্ঠান ঘিরে গোটা দিল্লিতে থাকছে কড়া নিরাপত্তা। মোতায়েন থাকছেন প্রায় ২৫ হাজার পুলিশ কর্মী। ভারতের ৭১তম প্রজাতন্ত্র দিবসে সকল বন্ধুপ্রতিম ভারতীয়দের জন্য আন্তরিক শুভেচ্ছা।
নূর মোহাম্মদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী
নিউজ চ্যানেল
ফেসবুক লিংক
[email protected]

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।






