somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন দার্শনিক, মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বুদ্ধিজীবী ডক্টর গোবিন্দ চন্দ্র দেব এর ৪৯তম মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি

২৬ শে মার্চ, ২০২০ সকাল ১০:২৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


চিন্তাচেতনায় মহান দার্শনিক সক্রেটিসের ভাবশিষ্য ডক্টর গোবিন্দ চন্দ্র দেব। যিনি ডক্টর জিসি দেব নামে সমধিক পরিচিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনবিদ্যার অধ্যাপক ডক্টর গোবিন্দ চন্দ্র দেব ছিলেন সহজ-সরল, আত্মভোলা ও ভীষণ সাদাসিধে একজন মানুষ। শিক্ষকতাকালীন সময়ে তাঁর আশ-পাশের সবাই তাঁকে নিয়ে মুগ্ধ ছিল। ইংরেজি বা বাংলায় সমানে স্বতঃস্ফূর্ত বক্তৃতা দিতেন। কখনো এক ভাষার সঙ্গে অন্য ভাষা মেশাতেন না। তিনি বুদ্ধের জন্মবার্ষিকীতে যেমন অনর্গল বক্তৃতায় পারদর্শী ছিলেন। তেমনি পারদর্শী ছিলেন মুহম্মদ (স) এর জন্মবার্ষীকি তেও । তিনি মনে করতেন যে কোন ধর্মীয় স্থানে যাওয়ার অধিকার যে কারো আছে। নিজেকে মানুষ হিসেবেই তিনি মেলে ধরেছিলেন, কোন ধর্মের ডালে আটকা পরেন নি তিনি। তাঁর এরকম উদার মানসিকতা সত্যিই প্রশংসনীয়। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন চিরকুমার। চিরকুমার হলেও, দু'টি ছেলে-মেয়ে কে দত্তক নিয়ে তিনি পালন করেছেন। পোষ্যদের দুজন দু' ধর্মের হলেও, তিনি তাঁদেরকে শিখিয়েছেন তাঁর ভেতরে পুষে রাখা অমর সে বাণী 'সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই'। এ মানুষটি সর্বাগ্রে নিজেকে মনে করতেন তিনি একজন মানুষ। নিজের ভেতর পোষণ করতেন এ মতবাদ। আজ নির্লোভ, সাদাসিধে আ্ত্মভোলা এই মানুষটির মৃত্যুবার্ষিকীঅ ১৯৭১ সালে বাংলাদেশী বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়কে ধবংস করার একটি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে পাকিস্তানী সৈন্যরা ক্ষণজন্মা মনিষী , আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন দার্শনিক ডক্টর গোবিন্দ চন্দ্র দেবকে ১৯৭১ সালের ২৬ শে মার্চের প্রথম প্রহরে হত্যা করেছিল। আজ তার ৪৯তম মৃত্যুবার্ষিক।স্বাধীনতা দিবসের প্রথম প্রহরের শহীদ ডক্টর গোবিন্দ চন্দ্র দেব এর মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি।


গোবিন্দ চন্দ্র দেব ১৯০৭ সালের ১ ফেব্রুয়ারি তদানিন্তন ব্রিটিশ ভারতের আসাম প্রদেশের পঞ্চখণ্ড পরগনার (বর্তমানে বাংলাদেশের সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলা) গ্রাম লাউতাতে জন্মগ্রহণ করেন। তার প্রকৃত নাম গোবিন্দচন্দ্র দেব পুরকায়স্থ। দেবের পূর্বপুরুষ ছিলেন ভারতের গুজরাটের বাসিন্দা এবং কুলীন। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় উত্থান পতনের কারণে তাঁর জনৈক পূর্বপুরুষ পঞ্চম শতকে গুজরাটের আদিনিবাস ত্যাগ করে সিলেটে চলে আসেন এবং এখানেই স্থায়িভাবে বসবাস শুরু করেন। পিতার মৃত্যুর পর জি,সি দেব স্থানীয় মিশনারীদের তত্ত্বাবধানে বড় হন। জি,সি দেব তার শৈশবেই মেধাবী ছাত্র হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি ১৯২৫ সালে বিয়ানীবাজার উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সাথে প্রথম বিভাগে এন্ট্রাস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। কোলকাতার রিপন কলেজ থেকে তিনি ১৯২৭ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তিনি ১৯২৯ সালে সংস্কৃত কলেজ থেকে ব্যাচেলর অব আর্টস এবং ১৯৩১ সালে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শন শাস্ত্রে মার্স্টাস সম্পন্ন করেন। জিসি দেব ১৯৪৪ সালে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তার পিএইচডি ডিগ্রী অর্জন করেন।


(চিরকুমার জিসি দত্তের দু' ধর্মের দত্তক নেওয়া দু'টি পুত্র-কন্যা)
ডক্টর গোবিন্দ চন্দ্র দেব কোলকাতা রিপন কলেজের শিক্ষক হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু করেন। ২য় মহাযুদ্ধকালীন সময়ে রিপন কলেজ কোলকাতা থেকে দিনাজপুর স্থানান্তরিত হলে তিনিও কর্মসূত্রে দিনাজপুর আসেন। কিন্তু যুদ্ধ শেষে রিপন কলেজ পুনরায় কোলকাতায় স্থানান্তরের সময় তিনি দিনাজপুরে থেকে যাবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন এবং সুরেন্দ্রনাথ কলেজের (বর্তমানে দিনাজপুর সরকারি কলেজ) প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হিসেব যোগদান করেন। পরবর্তীতে ১৯৫৩ সালের জুলাইয়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। তিনি পূর্বতন ঢাকা হলের (বর্তমান- শহীদুল্লাহ হল) হাউস টিউটর হিসেবে ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত দ্বায়িত্ব পালন করেন, পরবর্তীতে একই বছর তিনি জগন্নাথ হলের প্রভোস্টের দ্বায়িত্ব পান। এর পরে ১৯৬৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের চেয়্যায়ম্যানের দ্বায়িত্বভার গ্রহণ করেন এবং ১৯৬৭ সালে প্রফেসর পদে পদান্নতি লাভ করেন। ড. দেব ১৯৬০ থেকে আমৃত্যু পাকিস্তান দর্শন সমিতির নির্বাচিত সম্পাদকের দ্বায়িত্ব পালন করে গেছেন। উল্লেখ্য ১৯৬৫ সালের পাকভারত যুদ্ধের সময় তাঁকে গ্রেফতার করে কারাগারে প্রেরণ করা হয়। ষাটের দশকের শেষের দিকে ড. দেব পেনসেলভেনিয়ার wilkes-Barre কলেজে শিক্ষকতা করেন। স্বল্প সময়ের মধ্যেই তিনি সেখানে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন এবং সেখানে তার গুণমুগ্ধরা তার মানবিক দর্শন প্রচারের লক্ষ্যে The Govinda Dev Foundation for World Brotherhood প্রতিষ্ঠা করে।


ডক্টর গোবিন্দ চন্দ্র দেবের প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা মোট নয়টি, যার মধ্যে দুইটি বাংলায় এবং সাতটি ইংরেজিতে ৷জীবদ্দশায় প্রকাশিত বইগুলো হচ্ছেঃ আইডিয়ালিজম অ্যান্ড প্রগ্রেস (১৯৫২), আইডিয়ালিজম: এ নিউ ডিফেন্স অ্যান্ড এ নিউ এ্যাপলিকেশন (১৯৫৮), আমার জীবনদর্শন (১৩৬৭), এ্যাসপিরেশন অব দি কমন ম্যান (১৯৬৩), দি ফিলোসফি অব বিবেকানন্দ অ্যান্ড দি ফিউচার অব ম্যান (১৯৬৩), তত্ত্ববিদ্যাসার (১৯৬৬), বুদ্ধ: দি হিউম্যানিস্ট (১৯৬৯)।. গ্রন্থগুলো তাঁর জীবিতকালেই প্রকাশিত হয়। দি প্যারাবুলস অব দি ইস্ট (১৯৮৪) এবং মাই আমেরিকান এক্সপিরিয়েন্স (১৯৯৩) নামক গ্রন্থদুটি তাঁর মরণোত্তর প্রকাশনা।এছাড়া দেশি-বিদেশি পত্রিকায় ইংরেজি ও বাংলায় দেবের প্রায় শতাধিক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। দর্শনে বিশিষ্ট অবদানের জন্য ১৯৬৭ সালে দেবকে সম্মানসূচক ‘দর্শন সাগর’ উপাধিতে ভূষিত করে। একই বছর তাঁর মানবতাবাদী দর্শন প্রচারের জন্য আমেরিকায় ‘দি গোবিন্দ দেব ফাউন্ডেশন ফর ওয়ার্ল্ড ব্রাদারহুড’ প্রতিষ্ঠা করা হয়। মানবকল্যাণ সাধনায়, সত্য, সুন্দর ও ন্যায় প্রতিষ্ঠায়, মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে, সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের জন্য এবং অসাম্প্রদায়িক ও মানবতাবাদী দর্শন প্রচারের জন্য চিরকুমার ডক্টর গোবিন্দ চন্দ্র দেব তাঁর সব সম্পত্তি ও অর্থ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে দান করেন। যা দ্বারা পরবর্তীতে ১৯৮০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন কেন্দ্র (DCPS) প্রতিষ্ঠিত হয়।


মানবতাবাদী ব্যক্তিত্ব ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব দেশের স্বার্থে, দেশের মানুষের স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রে নিরাপদ জীবন ছেড়ে ১৯৭১ সালে দেশে ফিরে আসেন। পাকিস্তানে নিজ জীবন বিপন্ন হতে পারে জেনেও তিনি দেশত্যাগ করেননি; এমনকি ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গেও তিনি একাত্মতা ঘোষণা করেন এবং জীবন উৎসর্গ করেন দেশ মাতৃকার জন্য। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ পাকবাহিনী বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক ভবনে তাঁকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের গণকবরে তাঁর মরদেহ সমাহিত করা হয়। ১৯৮৬ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার তাঁকে মরণোত্তর ‘একুশে পদক’ এবং ২০০৮ সালে 'স্বাধীনতা পুরস্কার ২০০৮' (মরণোত্তর) প্রদান করে। আজ শহীদ বুদ্ধিজীবী ডক্টর গোবিন্দ চন্দ্র দেব এর ৪৯তম মৃত্যুবার্ষিকী। আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন মানবতাবাদী দার্শনিক শহীদ অধ্যাপক ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেবের মৃত্যুবার্ষিকীতে আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।

নূর মোহাম্মদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী
নিউজ চ্যানেল :-& ফেসবুক লিংক
[email protected]
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে মার্চ, ২০২০ সকাল ১০:২৯
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কিছুটা আত্মকথন, কিছুটা স্মৃতিচারন আর আমার গানের ভুবন!!!

লিখেছেন ভুয়া মফিজ, ০১ লা জুন, ২০২০ সকাল ১১:৩৩




কোন একটা ক্রাইসিসে একেক মানুষ একেকভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়। কারন, ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট সবার একরকমের হয় না। মানুষ হিসাবে আমি কেমন….…..দুর্বোধ্য নাকি সহজবোধ্য? প্রশ্নটা আমার নিজের কাছেই।

গত কয়েকদিন ধরে মাথায় ঘুরছে... ...বাকিটুকু পড়ুন

» প্রকৃতির ছবি, দেশের ছবি (ক্যানন ক্যামেরায় তোলা-৭)

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০১ লা জুন, ২০২০ বিকাল ৪:০০

বিভিন্ন সময়ের তোলা কিছু ছবি ।
১। পিটুনিয়া



কেমন আছেন সবাই? কেমন ছিলেন? বন্দিত্বের দিনগুলোতে। অনেক দিন গ্যাপ হয়ে গেলো পোস্ট দিচ্ছি না। বন্দি থেকে থেকে হয়রান হইতে হইতে অফিস করছি এখন।... ...বাকিটুকু পড়ুন

খানসাব জানিলো কেমনে !!

লিখেছেন নূর মোহাম্মদ নূরু, ০১ লা জুন, ২০২০ বিকাল ৪:৩৫


খানসাব জানিলো কেমনে!!
নূর মোহাম্মদ নূরু

ও মনু তাইলে তুমিও ছিলা ওদের দলে
বুঝছ এখন ক্যামনে তুমি পড়াছা যাতা কলে!
বারোটা সাঙ্গাত যখন উঠলা রাতের ট্রেনে
মতি গতি ভালোনা তা বুঝলো আামার ব্রেনে।

মজা করে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমেরিকান সৌন্দর্য্য

লিখেছেন শের শায়রী, ০১ লা জুন, ২০২০ বিকাল ৫:০৩



একেই বলে আমেরিকান সৌন্দর্য্য। সব খানে জর্জ ফ্লয়েডের কারনে আমেরিকায় শুধু মারামারি, হানাহানির ছবি খবর দেখে বিরক্ত। কারন এতে আমি নতুনত্ব কিছু খুজে পাই নাই। আমাদের দেশে এসব... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশ পৃথিবীর সবচেয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ

লিখেছেন অনল চৌধুরী, ০১ লা জুন, ২০২০ রাত ১০:৪০



ইউরোপ-এ্যামেরিকায় প্রতিদিন মুসলমান-এশিয় ও আফ্রিকানদের উপর জঘন্য বর্ণবাদী আক্রমণ হয়।
এ্যমেরিকাতে এখনো কালোদের প্রায় ক্রীতদাসই ভাবা হয়।

তাদের প্রতি পুলিশের আচরণই তার প্রমাণ।পুলিশ তাদের যেকোনো সময়ে বিনা অপরাধে গ্রেফতার এমনকি হত্যাও... ...বাকিটুকু পড়ুন

×