

শাফী ইমাম রুমী ১৯৫২ সালের ২৯ মার্চ উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা শরীফ ইমাম ও মাতা জাহানারা ইমাম। প্রিয় কবি জালালুদ্দিন রুমীর মতো জ্ঞানী ও দার্শনিক হবে এই চিন্তা করেই শিশুটির ডাকনাম রাখা হয়েছিল রুমী। পিতামাতা ও পরিবার পরিজনের স্নেহছায়ায় ক্রমশই শৈশব, কৈশোর পেরিয়ে তারুণ্যে উপনীত হয়েছিলেন। পড়াশুনা ও খেলাধুলায় অসম্ভব প্রতিভাবান ও চৌকস সেই তরুণ ছিলেন স্পষ্টভাষী, সাহসী, ও দৃঢ় চিত্তের অধিকারী। ঢাকার আজিম পুরের একটি কিন্ডার গার্টেন স্কুলে রুমীর লেখা পড়ার হাতে খড়ি। ১৯৬৮ সালে তিনি পাকিস্তান শিক্ষা বোর্ডের অধীন আদমজী ক্যান্টনমেন্ট ইস্কুল এ্যান্ড কলেজ থেতে ম্যট্রিকুলেশন পরীক্ষায় ৩য় স্থান অধিকার করে উর্ত্তীন হন। কলেজে পড়ার সময় রুমী তার কিছু বন্ধুর সাথে ইউনিভার্সিটি অফিসার্স ট্রেনিং কোর এ ভর্তি হন। এই ট্রেনিংএ তিনি সার্জেন্ট পদবী লাভ করেন। এর পর আই.এস.সি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার পর ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে রুমী ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে (বর্তমানের বুয়েট) ভর্তি হন। এর পর আমেরিকার ইলিনয় ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজিতে সুযোগ পড়াশুনা করে স্বচ্ছল ও নির্ঝন্ঝাট জীবন গড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু সে সময় বাংলাদেশরে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে আদর্শগত কারণে দেশকে যুদ্ধের মধ্যে রেখে বিদেশে নিরাপদ আশ্রয়ে নিজের ক্যারিয়ারের জন্য পড়তে যাননি। একাত্তরের ২৫মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অতর্কিত হামলায় যেদিন ঘুমন্ত বাংলা ক্ষতবিক্ষত হয়, সেদিনের সেই কালোরাতকে চিরতরে দূর করে প্রিয় দেশকে উজ্জ্বল আলোর মুখ দেখাবে বলে যাঁরা মনে মনে দৃঢ় সংকল্প করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে তরুণ রুমী ছিলেন অন্যতম। কুড়িতে পা রাখা অসম্ভব প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর সেই তরুণ তাঁর প্রাণপ্রিয় পিতামাতার মতই ছিলেন রাজনীতি সচেতন। তাই আমেরিকার উজ্জ্বল ক্যারিয়ারের হাতছানি উপেক্ষা করে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে তরুণ রুমী মায়ের কাছে অনুমতি চেয়েছিলেন যুদ্ধে যাবার। দেশের মানুষকে বর্বর পাকিস্তানিদের হাত থেকে মুক্ত করে এক টুকরো মানচিত্র উপহার দেবেন জন্য মায়ের কাছে আকুতি জানিয়েছিলেন।

যুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ে, রুমী ধারাবাহিকভাবে তার মা ও বাবাকে নিজের যুদ্ধে যাবার ব্যাপারে রাজি করানোর চেষ্টা করেন। কাতরভাবে বলেছিলেন, ‘আম্মা, দেশের এ রকম অবস্থায় তুমি যদি আমাকে জোর করে আমেরিকায় পাঠিয়ে দাও, আমি হয়তো যাব শেষ পর্যন্ত। কিন্তু তাহলে আমার বিবেক চিরকালের মতো অপরাধী করে রাখবে আমাকে। আমেরিকা থেকে হয়তো বড় ডিগ্রি নিয়ে এসে বড় ইঞ্জিনিয়ার হব; কিন্তু বিবেকের ভ্রুকুটির সামনে কোনো দিনও মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারব না। তুমি কি তাই চাও, আম্মা? না, ছেলের এই আকুতি ফিরিয়ে দেবার মত মা তিনি ছিলেন না। ১৯৭১ সালের ১৯ এপ্রিল মাকে অবশেষে রাজি করিয়ে ২ মে রুমী সীমান্ত অতিক্রমের প্রথম প্রয়াস চালান। কিন্তু প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে তাঁকে ফেরত আসতে হয় এবং দ্বিতীয় প্রচেষ্টায় সফল হন।


এই অ্যাকশনের পর ১৯৭১ সালের ২৯ আগস্ট তিনি তাঁর নিজের বাড়িতে কাটান। এদিন রুমী তার মায়ের সঙ্গে দেখা করতে তাঁদের বাসায় গিয়েছিলেন। পাকিস্তান হানাদার বাহিনী একটি অজ্ঞাত উৎস থেকে তথ্য নিয়ে রাত আনুমানিক ১২টার দিকে তাদের বাসভবন থেকে বেশ কিছুসংখ্যক গেরিলা যোদ্ধার সাথে রুমীকে পাকিস্তানি আর্মিরা গ্রেফতার করেন। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে ছিলেন আলতাফ মাহমুদ, আবুল বারাক, আজাদ ও জুয়েল, রুমীর বাবা শরীফ ইমাম, ছোট ভাই জামী, বন্ধু হাফিজ, চাচাতো ভাই মাসুম প্রমুখ। কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে পাক আর্মির অমানুষিক অত্যাচার, নির্যাতন সহ্য করেও তিনি তাঁর সহযোদ্ধাদের নাম-অবস্থান প্রকাশ করেননি। ২০ বছরের টগবগে তরুণ সাহসী বীর রুমী অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হয়েও তাঁর পরিবারের অন্য সদস্যদের কোনো কিছু স্বীকার করতে নিষেধ করে দিয়েছিলেন। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন যে, পাক বাহিনী তার কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সচেতন এবং এর সব দায়-দায়িত্ব তিনি নিজেই নিতে চান। সকল দায়ভার নিজের ওপর নিয়ে রুমী তাঁর পরিবারের অন্য সদস্যদের ছেড়ে দেবার জন্য হানাদারদের সম্মত করতে পেরেছিলেন। তাইতো ধরা পড়ার দুই দিন পর হানাদার বাহিনী সবাইকে ছেড়ে দিলেও তরুণ রুমীকে আর ফিরিয়ে দেয়নি। ১৯৭১ সালের ৩০ আগস্ট সহযোদ্ধাদের সাথে রুমীর সমস্ত যোগাযোগ বন্ধ হয় যায়। এদিনের পর রুমী ও তার সহযোদ্ধা বদী এবং চুল্লুকে আর দেখা যায়নি। তাঁর সহযোদ্ধাদের বিভিন্ন লেখায় জানা যায়- ত্রিশ আগস্টের পর আর তাঁরা রুমীর দেখা পাননি। তবে কি এই দিনটিই রুমীর চলে যাবার দিন?

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের বীর মুক্তি যোদ্ধা শাফী ইমামর রুমীর ৬৮তম জন্মবার্ষিকী আজ। গেরিলা যোদ্ধা বীর বিক্রম শাফী ইমাম রুমীর জন্মদিনে ফুলেল শুভেচ্ছা।
নূর মোহাম্মদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী
নিউজ চ্যানেল
[email protected]
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে মার্চ, ২০২০ রাত ১২:০৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




