somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বাঙালি নাট্যকার ও নাট্য অভিনেতা রসরাজ অমৃতলাল বসুর ৯১তম মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি

০২ রা জুলাই, ২০২০ রাত ১১:৫৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


প্রখ্যাত বাঙালি নাট্যকার ও নাট্য অভিনেতা অমৃতলাল বসু। কলিকাতায় সাধারণ রঙ্গমঞ্চ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সংযুক্ত নাট্যকার হিসাবে গিরিশচন্দ্র ঘোষের পরই উল্লেখযোগ্য অমৃতলাল বসু। নাটক রচনা এবং নাট্যাভিনয়ে সাফল্যের জন্য তিনি জনসাধারণের কাছে রসরাজ নামে খ্যাত ছিলেন। রসরাজ মানে রসের রাজা। ব্যঙ্গ হাস্যাত্মক নাটক রচনা ও অভিনয়ের জন্য তিনি সুধী সমাজে রসরাজ উপাধিতে ভূষিত হন। তার প্রহসন ও নাটকে এত বেশি হাস্যরস থাকতো যে, তার নাটক দেখার জন্য লোকজন উপচে পড়তো। বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত নাটক্যকার অমৃতলাল বসু নাটক ও গান রচনা এবং অভিনয়ের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যের ধারায় অনবদ্য এক রসঘন-আনন্দ ভুবন উপহার দিয়েছেন। গিরিশচন্দ্র ঘোষ ও অর্ধেন্দুশেখর মুস্তফীর উৎসাহে তিনি ন্যাশনাল, গ্রেট ন্যাশনাল, গ্রেট ন্যাশনাল অপেরা কোম্পানি, বেঙ্গল, স্টার, মিনার্ভা ইত্যাদি রঙ্গমঞ্চে সুনামের সাথে অভিনয় করেন। রসরাজ অমৃতলাল বসু উনিশ শতকের পেশাদারী রঙ্গালয়ে এবং নাট্যসাহিত্যে তাঁর মৌলিক নাটক নিয়েই যা খ্যাতি পেয়েছিলেন তারপর নাট্যরূপের দায়িত্ব নেওয়ার প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু মীরকাসিম চরিত্রটির ইংরাজ বিরোধীতা তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে মুগ্ধ করত। তাঁর এই নাট্যরূপায়ণ সরকারকে ক্ষুব্ধ করে এবং নাটকটির অভিনয় বন্ধ করে দেওয়া হয়। সু অভিনয়ের জন্য তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক 'জগত্তারিণী পদক' লাভ করেন। ১৯২৯ সালের আজকের দিনে তিনি ভারতের কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন। আজ তার ৯১তম মৃত্যুবার্ষিকী। বাংলা প্রহসনের দিকপাল অমৃতলাল বসুর মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি।


পুলিশ অফিসার অমৃতলাল বসু ১৮৫৩ সালের ১৭ এপ্রিল ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বসিরহাটে জন্মগ্রহণ করেন। আংশিক মাস্টার, ডাক্তার ও সর্বোপরি নট আর নাট্যকার অমৃতলাল বসু একেবারে খাস কলকাতার বাসিন্দা, কম্বুলিয়াটোলার লোক। হুতোম থেকে পরশুরাম, বহু রসিকের স্মৃতিকথাতেই উঠে এসেছে সে কালের কলকাতা৷ তবু রসবিবেচনায় একদম পৃথক অমৃতলাল বসু৷ তার পরিবার এই শহরেই প্রপিতামহের কাল থেকে বাস করছেন৷ ১৮৬৯ সালে কলকাতার জেনারেল অ্যাসেমব্লিজ ইনস্টিটিউশন থেকে এন্ট্রাস পাস করে মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হন। দুই বছর ডাক্তারি পড়ার পর কাশি গিয়ে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় অধ্যয়ন শুরু করেন। এরপর কলকাতা এসে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা শুরু করেন। কিছুদিন পর চিকিৎসা ছেড়ে দিয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। শিক্ষকতা ভালো না লাগায় তা ছেড়ে দিয়ে পোর্টব্লেয়ারে সরকারি চিকিৎসক রূপে কিছুদিন দায়িত্ব পালন করেন। এটিও কিছুদিন পর ছেড়ে দিয়ে পুলিশ বিভাগে যোগ দেন। কিন্তু থিয়েটারের প্রতি প্রবল আকর্ষণের কারণে চাকরি ছেড়ে দিয়ে নাটক রচনা ও অভিনয়ে মনোনিবেশ করেন। এভাবে আস্তে আস্তে নাটক রচনা ও থিয়েটারে অভিনয় তার একমাত্র ধ্যানজ্ঞান ও নেশা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে অল্প সময়ের মধ্যে অখ্যাত পুলিশ অফিসার অমৃতলাল বসু সেরা অভিনেতা, কুশলী মঞ্চাধ্যক্ষ, রসময় নাট্যকার ও আকর্ষণীয় সংগীত রচয়িতা হিসেবে দেশজোড়া ঈর্ষণীয় খ্যাতি অর্জন করতে সক্ষম হন। পুলিশের চাকরি ছেড়ে না দিলে বাংলা সাহিত্য হারাতো রসরাজকে আর অমৃতলাল হারাতেন যশরাজ। অমৃতলাল বসু নাটক লিখতেন এবং ফরমায়েসি গানেরও জোগান দিতেন৷ বটতলা থেকে ছাপা বইয়ের পাঁড় ভক্ত ছিলেন অমৃতলাল, তাঁর ব্যক্তিগত লাইব্রেরির জন্য তিনি পথপুস্তিকার খোঁজ করতেন, বেশি দামে পুস্তিকাগুলি কিনতেও রাজি ছিলেন তিনি৷ অমৃতলাল বসুর রচিত গ্রন্থের সংখ্যা চল্লিশ এবং তার মধ্যে নাটক চৌত্রিশ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য নাটকঃ ১। তরুবালা, ২। বিমাতা বা বিজয়বসন্ত, ৩। হরিশচন্দ্র, ৪। আদর্শ বন্ধু ইত্যাদি। প্রহসন রচনায় অত্যন্ত পারদর্শী ছিলেন। তার কয়েকটি প্রহসনের নামঃ ১। তাজ্জব ব্যাপার, ২। কালাপানি, ৩। বাবু, ৪। একাকার, ৫। চোরের উপর বাটপারি, ৬। তিলতর্পণ, ৭। ডিসমিশ, ৮। চাটুজ্যে ও বাঁড়ুজ্যে , ৯। সম্মতি সঙ্কট, ১০। বৌমা, ১১। গ্রাম্য বিভ্রাট, ১২। বাহবা বাতিক, ১৩। খাস দখল, ১৪। কৃপনের ধন উল্লেখযোগ্য। নাটক ছাড়াও তিনি আত্মজীবনী, কবিতা, উপন্যাস ও গল্প লেখিয়ে হিসেবেও বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। পুরাতন প্রসঙ্গ, পুরাতন পঞ্জিকা ও ভুবনমোহন নিয়োগী অমৃতলাল বসুর লেখা আত্মস্মৃতিমূলক রচনা।


বাংলা নাট্য সাহিত্যে অমৃতলাল বসু নানা কারণে একজন অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। শান্তি পত্রিকার ভাষায়, “ নাট্যসাহিত্যে অমৃতলালই যুগান্তর আনিয়াছেন। তাঁহারই লেখনী মুখে বাংলার রঙ্গালয়গুলি হাসির জীবন্তপ্রবাহে ভাসিয়া গিয়াছে। অভিনেতা হিসাবে বাংলায় তাহার সমকক্ষ কেহ আছেন কিনা সন্দেহ। চলচ্চিত্রে ‘কৃষ্ণকান্তের উইলে’ কৃষ্ণকান্তের ভূমিকায় তাঁহার অভিনয় বাঙ্গালীর স্মৃতিপটে চিরদিন জাগিয়া থাকিবে।” নাটক ও প্রহসন রচনায় তার মত বিচক্ষণ সাহিত্যিক বাংলা সাহিত্যে খুব বেশি জন্মায়নি। তবে ব্যঙ্গাত্মক ও হাসির নাটক রচনায় তিনি ছিলেন যেমন অসাধারণ তেমনি অতুলনীয়। তার প্রহসনগুলো হাস্যরসের উৎক্ষিপ্ত তরঙ্গপ্রবাহের অপ্রতিরোধ্য এবং আবাল-বৃদ্ধ-বণিতার রসানুভূতির অধিগম্য। তবে স্ত্রী-শিক্ষা ও স্ত্রী স্বাধীনতা, সমাজ-সংস্কার, রাজনীতি প্রভৃতি বিষয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গী ছিল কিছুটভ প্রতিক্রিয়াশীল এবং পশ্চাদগামী। প্রগতিশীলতার মন্দের দিকটা তিনি দেখেছেন কিন্তু ভালো দিকটা দেখতে পাননি। এটি অনেক সমালোচক তার সঙ্কীর্ণতার পরিচায়ক মনে করেন। তবে অনেক সমালোচকের মতে তিনি ছিলেন সত্যিকারের দেশপ্রেমিক তাই দেশীয় উপায়ে প্রগতির পথে যেতে চেয়েছেন। ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দের ২ জুলাইএ মহান নাট্যকার ভারতের পশ্চিম বঙ্গের কলকাতায় তার নিজ বাসভবন শ্যামবাজার ভবনে মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যু সংবাদ বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। এ হতভাগ্য দেশে মরণোম্মুখ জাতিকে অনাবিল হাস্যরসে অভিসঞ্চিত করেছেন- রসরাজ অমৃতলাল। বাংলা সাহিত্যে তার দানের পরিমাপ করার সময় এখনও আসেনি। মৃত্যুর দুদিন আগে অসুস্থ শরীরেরও তিনি চলচ্চিত্রে ‘বিবাহ বিভ্রাট’ নাটকে অভিনয় করেছেন; দুঃখের বিষয় তিনি তা শেষ করতে পারেননি। অভিনেতারূপে অমৃতলাল বাঙ্গালীকে অফুরন্ত আনন্দ রসের সন্ধান দিলেও আমরা তাঁহাকে উপযুক্ত শ্রদ্ধাঞ্জলি দেই নই। আজ তার ৯১তম মৃত্যুবার্ষিকী। বাংলা প্রহসনের দিকপাল অমৃতলাল বসুর মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি।

নূর মোহাম্মদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী
নিউজ চ্যানেল :-& ফেসবুক
[email protected]
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা জুলাই, ২০২০ রাত ১১:৫৬
৪টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

তারেক রহমানের প্রথম সফর কেন ভারতেই হওয়া উচিত ছিল?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ৩:৩৯


দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী বিমানবন্দরে আড়াই ঘণ্টা বসিয়ে রাখার পর প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান কলম্বোর পথ ধরে দেশে ফিরে আসেন । তিনি ভারতে ঢোকার অনুমতি পেয়েছিলেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

২০২৪শের শহীদ নাকি প্রতারক ⁉️

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ১৮ ই জুন, ২০২৬ ভোর ৫:৪৭



'বায়বীয় গুলিতে আহত হয়ে নিহত' এক শহীদের উপাখ্যান।

ইনুস বাটপারের ভূয়া শহীদের বিতর্কিত 'জুলাই শহীদ গেজেট' যে অসংখ্য মিথ্যা, প্রতারনা, জালিয়াতিতে ভর্তি একটা বড় রকমের মিথ্যাচার, বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম... ...বাকিটুকু পড়ুন

গল্পঃ প্রত্যাবর্তন

লিখেছেন ইসিয়াক, ১৮ ই জুন, ২০২৬ ভোর ৬:৪৪


চন্দ্রা পশ্চিমের বারান্দায় উদাস হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।আকাশে ছড়ানো ছেটানো  মেঘ, সেই মেঘের মতই তার মনটা আজ  বিক্ষিপ্ত ।
ইদানীং মা কি সব সন্দেহ করে তাকে।অকারণই মনে হয় তার কাছে। তারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

ষো-ল-ব-ছ-রঃ আর কি বর্ষপূর্তি পোস্ট লেখা হবে?

লিখেছেন আমি তুমি আমরা, ১৮ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:০৬



অবাক হয়েই চেয়ে দেখি
কখন এমন হলো?
এইতো আমার ব্লগবাড়ীটার
বয়স হল ষোল।

দুরুদুরু বুকে তখন
খুলেছিলাম ‘নিক’।
ফেলতে পলক, পেরিয়ে গেল
ষোল বছর ঠিক।

ফেসবুক আর ইউটিউবের
আছড়ে পরে ঢেউ।
সামুপাড়ায় এখন কি আর
উঁকি মারে... ...বাকিটুকু পড়ুন

জীবন পর্ব -১

লিখেছেন মায়াস্পর্শ, ১৮ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৫২



(শালবন ভ্রমণ)
২০১২ সাল। সদ্য পাশ করে বের হয়েছি। কঠিন সময় পার করছিলাম। এদিক-সেদিক স্টেজ শো করে যে পেমেন্ট পেতাম, বাড়িতে ফিরতে ফিরতেই প্রায় শেষ হয়ে যেত। সকালে মায়ের হাতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×