
মানুষ একা বাস করতে পারে না বলেই সমাজের সৃষ্টি। সৃষ্টিকর্তা আমাদেরকে পৃথিবীতে একা রাখেননি। পৃথিবীর প্রথম মানবের জন্য তিনি সঙ্গী সৃষ্টি করে পাঠিয়েছেন একাকীত্ব বা নিঃসঙ্গতা ঘোচানোর জন্য। শুধু মানুষ নয়; সৃষ্টি জগতের কোনো সৃষ্টিই একা নয়। তবুও মানুষমাত্রই নিঃসঙ্গ-হাজারো কোলাহল, চেনা অচেনা লোকের ভিড়ে, উৎসবে আনন্দে, কর্মব্যস্ততায় থাকলেও, মানুষ কিন্তু মনের দিকে একাকী-পৃথিবীতে আসে একা এবং বিদায়ও নেয়, সেভাবেই। নিঃসঙ্গতা কী বা কেন বা কোথায় এর উৎস, এর সঠিক ব্যাখা নেই, যদিও বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে মনের। নিঃসঙ্গতা এমন একটি আবেগ যা বিভিন্ন ব্যক্তি পৃথকভাবে উপলব্ধি করে। হতাশাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তাদের জন্য এটি নীরব ঘাতক হতে পারে, যার ফলে তারা শূন্য এবং হতাশায় পড়ে যায়। অন্যদিকে, যাদের কাছে আশাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে, তাদের একা থাকা তাদের প্রশান্তি এবং শান্তির মতো ইতিবাচক আবেগ অনুভব করতে সহায়তা করতে পারে।একথা অনস্বীকার্য যে একা না হলে নিজেকে আবিষ্কার করা যায় না, এটি জীবনের উন্নতির জন্যও অন্তরায় নয়, বরং সহায়ক। যতদিন এই পৃথিবী থাকবে, সৃষ্টিসমূহ থাকবে, মনুষ্য সমাজ থাকবে, ততদিনই এই একাকীত্ব বোধও থাকবে। মানুষ মাত্রই ভয়-ভীতি, উত্তেজনা, দুশ্চিন্তা, বেদনা, মর্মপীড়া ইত্যাদি দোষ-গুণ সম্পন্ন। আমাদের জীবনে চলার পথে আমরা নানা সমস্যার সম্মুখীন হই। সমস্যার সমাধান যখন করতে পারি না, তখন নিজেকে একা মনে হয়, তুচ্ছ মনে হয় নিজের কাছে নিজেকে। বাঁচার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। আর এভাবেই জমতে জমতে গড়ে ওঠে মনের মধ্যে একাকীত্বের পাহাড়। একাকীত্ব যখন গ্রাস করে তখন আমাদের কর্মক্ষমতা কমে যায়। মনোযোগ কমে যায়। কোনো কাজ সুন্দর করে করা হয় না। আত্মবিশ্বাস কমতে কমতে আমাদের জীবনের আনন্দগুলোও ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে থাকে। এরপর একসময় এটি মানসিক সমস্যায় পরিণত হয়। ধীরে ধীরে সমস্যাটি অনেক বড় রূপ ধারণ করে। এটি তখনই আশংকার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। মানুষের জীবনে বিচিত্র চড়াই-উৎরাই রয়েছে। এগুলো অনেকটা পৃথিবীর বুকে সংঘটিত খরার মতো। কিংবা এই উত্থান পতন প্রকৃতিতে বিদ্যমান গভীর উপত্যকা অথবা উঁচু উঁচু পাহাড়ের মতো। মানুষের মনের ভেতর কখনো উচ্ছ্বসিত আনন্দ বয়ে যায়। কখনও আবার মানুষ আড়ষ্ট বা বিষন্ন হয়ে পড়ে। অবসাদগ্রস্ততা, অধৈর্য কিংবা অজানা কোনো দুশ্চিন্তায় মানুষ আক্রান্ত হয়ে পড়ে। এইসব নেতিবাচক মানসিক অবস্থা মানুষের ভেতরে বিচিত্র অস্বাভাবিকতার জন্ম দেয়, মানুষ বিরক্ত হয়ে পড়ে। মানব জীবনে এই উত্তেজনা জন্মের পর থেকে বাসা বাঁধে এবং জীবনে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। আমাদের সামাজিক সম্পর্ক ও অভিজ্ঞতাগুলো এইসব বিচিত্র অনুভূতি ও উত্তেজনাপূর্ণ মানসিক অবস্থা থেকেই উঠে আসে। অনুভূতি যদি ইতিবাচক হয় তাহলে ব্যক্তির জীবন আনন্দ, প্রেম ইত্যাদিতে সমৃদ্ধি পায়। আর যদি অনুভূতি হয় নেতিবাচক তাহলে বিপরীতটা হয় মানে দুশ্চিন্তা, বিষণ্ণতা, ভয়-ভীতি ইত্যাদি এসে ভর করে মনের ভেতর। নিঃসঙ্গতা ও একাকীত্ব দু’টো কিছু হলেও ভিন্ন, একটি অনুভূত বোধ আর একটি অবস্থা কিন্তু দু’জনে ভীষণ সম্পর্কিত। মার্ক টোয়েন বলেছিলেন, “সবচেয়ে খারাপ একাকীত্ব হলো নিজেকেও ভালো না লাগা”। কেউ বলেছেন, একাকীত্ব এমন অবস্থা যা দিয়ে ব্যক্তি নিজেকে পরিশুদ্ধ করতে পারে। কেউ বলছেন, একা থাকার ক্ষমতা আসলে স্বাধীনতার অন্য মাত্রা।

অনেকে মনে করেন দু:খ, বেদনা, বিষাদ-এগুলোর মূল উৎস হলো আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব অর্থাৎ কাছের মানুষদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হওয়া। যখনই কাছের মানুষদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয় তখনই নি:সঙ্গতার আশ্রয় নিতে হয় অনেক সময় এবং কোনঠাসা ও একাকী জীবন যাপন করতে হয় মানুষকে। তবে এটাই একমাত্র কারণ এবং সঠিক কারণ মনে করার সুযোগ নেই। কেননা স্বজন পরিজন বেষ্টিত থাকার পরেও মানুষ একাকীত্ব বোধ করে এবং বিষাদগ্রস্ত হয়। মানসিক বিষাদ ও নি:সঙ্গতার কারণ একেবারে প্রকাশ্য। যেমন আত্মীয়-স্বজন কিংবা ঘনিষ্ঠ কোনো বন্ধুর মৃত্যু মনকে বেদনাহত, বিষাদগ্রস্ত করে তোলে। আবার কখনও কোনো কাজে সফলতা না পাওয়া কিংবা পড়াশোনায় ব্যর্থ হওয়া, পেশাগত সাফল্যহীনতা, পারিবারিক কোনো বিষয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে পড়ে যাওয়া ইত্যাদিও মানুষকে বিষণ্ণ করে তোলে। এসবের বাইরেও নেতিবাচক কোনো আচরণ যেমন কুদৃষ্টির মতো নেতিবাচক মানসিকতা, অহমিকাবোধ, বলদর্পিতা, কোনো ইচ্ছা পূরণ না হওয়া, আর্থিক সংকট ইত্যাদি সমস্যাও মানুষকে বিষন্ন, উত্তেজিত, বিরক্ত করে তোলার ক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। আবার এরকম অবস্থাও হয় যে কোনোরকমের উল্লেখযোগ্য কারণ ছাড়াই মনে বিষন্নতা, অবসাদগ্রস্ততা কাজ করে। আপনার জীবনে তেমন কোনো বিশেষ সমস্যা নেই। তবু আপনার কিছু ভালো লাগে না। আপনি বিষন্নতায় আক্রান্ত। আপনিও নিশ্চয়ই এ ধরনের অভিজ্ঞতার সম্মুখিন হয়ে থাকবেন যে অকারণেই আপনার মন খারাপ। অকারণেই অবসাদ এসে আপনার মনকে বিরক্ত করে তুলছে। এ ক্ষেত্রে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে যে মানুষের ভেতরকার সকল প্রকার উত্তেজনা বা শিহরণই জীবনের জন্য প্রয়োজনীয়, মানসিক কোনো অবস্থাই অপ্রয়োজনীয় নয়। দুশ্চিন্তা, উত্তেজনা, ভয়-ভীতি, দু:খ-বেদনা, রাগ, ভালোবাসা, ঘৃণা এগুলো মানুষের স্বভাব-প্রকৃতি ও পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রক্ষার জন্য জরুরি বলে মনে করা হয়। এগুলোকে মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা বলে ধরে নেয়া হয়। কিন্তু সমস্যা হলো এই স্বাভাবিক প্রবণতাই অনেক সময় অস্বাভাবিক উত্তেজনার দিকে ধাবিত হয়। তবে ভুলে গেলে চলবেনা যে, সম্পর্ক জীবনের বৈচিত্র্যময় আনন্দকে চিনতে সাহায্য করে। প্রিয় কারো সঙ্গে সময় কাটানো নিশ্চয় স্মৃতিকে পরিপূর্ণ করে। কিন্তু তার মানে এই নয়, জীবন সবার একইরকম কাটবে বা সবসময় একইরকম যাবে। কখনো কখনো একাকীত্ব অপরিহার্য হয়ে উঠে। এ একাকীত্ব নিজেকে বোঝাপড়ার জন্য খুবই দরকারী। একাকীত্ব মানুষকে এমন অভিজ্ঞতা দেয়, যা অন্য কোনোভাবে অনুবাধন করা সম্ভব নয়।

তবে কোনো মনোবিজ্ঞানীই মানুষের এই বিষাদ, বেদনা, দু:খ ইত্যাদিকে অপ্রয়োজনীয় কিংবা ক্ষতিকর বলে মনে করেন না। তবে অনেক সময় বিরক্তিকর বলে উল্লেখ করেছেন। যদিও এই বিরক্তিকর উপসর্গ বা মানসিক প্রবণতা ব্যক্তিকে অনেক ক্ষেত্রে উদ্দীপনা দেয়। যেই উদ্দীপনা উত্তেজনাপূর্ণ বিরূপ পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠার লক্ষ্যে যথোপযুক্ত আচরণ করতে প্রেরণা জোগায়। সুতরাং একথা বলা যায় যে, দু:খ বিষাদের নিজস্ব কোনো মূল্য নেই। এই দু:খ বিষাদ যদি হিংসার কারণে হয়ে থাকে তবে তা অনুকূল নয়। আসলে একাকীত্বকে দুঃখ হিসেবে না দেখে বরং এটাকে উপলব্ধি করা উচিত। আমরা আমাদের একাকীত্ব দূর করতে পারি যদি স্বদিচ্ছা থাকে এবং নিজের জীবনটাকে খানিকটা হলেও ভালোবেসে থাকি। যখন আমরা ভালোকাজে নিজেদেরকে ব্যস্ত রাখতে সক্ষম হবো, একাকীত্ব বোধ তখন আমাদের মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারবে না। এজন্য আমরা নিজের কিছু কিছু শখ পূরণ করার চেষ্টা করতে পারি। প্রকৃতির সাথে সময় কাটাতে পারি বাগান করার মাধ্যমে। একঘেয়েমি কাটানোর জন্য আমরা ভ্রমণ করতে পারি নতুন নতুন জায়গায়। ভ্রমণ করার ফলে আমাদের মানসিক প্রশান্তি মেলে এবং আমাদের জ্ঞানের ভাণ্ডার প্রশস্ত হয়। নিজেকে চেনা যায়। এ জন্যই হয়ত ডাক্তার রোগীকে ঘুরে আসতে বলে। ভ্রমণ তাই একাকীত্ব দূর করার উপায়গুলোর মধ্যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। একা থাকা মানেই একাকিনী নয়। একা থাকলে ক্ষমা করতে পারার মতো মহৎ গুনটি চলে আসে। যখন একাকী নিজের ভুল-ত্রুটি নিয়ে ভাবা হয়, দেখা যায় তখন অন্যের জন্য আমাদের মনে একটা সফট কর্নার তৈরি হয়। ক্ষমা করে দিতে পারি আমরা তখন। আমাদের কষ্টগুলো সহজ হয়ে যায় তখন। একা থাকার এটাই সবচেয়ে বড় অর্জন। একাকী হয়ে যাবার ভালো দিকের আরও একটি ভালো দিক- আমরা প্রকৃত বন্ধু চিনে নিতে পারি। একা হয়ে গেলে আমরা যেটা করি- নিজেকে একদম আলাদা করে ফেলি। কোনো সমস্যা হলে আমরা নিজেকে টেনে তুলতে একা একা অনবরত চেষ্টা করে যাই যা একদমই ভুল। এটি না করে সমস্যা কেন সৃষ্টি হয়েছে তা বের করার চেষ্টা করা আর সমাধানের জন্য সাহায্য চাওয়া। এই অন্যের কাছ থেকে পাওয়া সহযোগিতায় নিজেদেরকে আর একা মনে হয় না। ক্ষুধা লাগলে খাবার খাই, তৃষ্ণা পেলে পানি পান করি তেমনি একাকীত্ব বোধ হলেও তা মেটানোর প্রতি মনোযোগী হওয়া বিশেষ প্রয়োজন। গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, যেদিন একা থাকার মুহূর্তগুলোকে ভালোবাসতে পারা যাবে, সেদিন আর একাকীত্ব আমাদেরকে স্পর্শ করতে পারবে না। শেষ করবো "প্রতিবাদী রোমান্টিক" হিসাবে খ্যাত প্রয়াত বাংলাদেশী কবি ও গীতিকার রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর একটি স্মরণীয় বানী দিয়ে "একা থাকার এই ভালো লাগায় হারিয়ে গিয়েছি, নিঃসঙ্গতা আমাকে আর পাবেনা"।
সূত্রঃ ব্রেকিং নিউজ২৪.কম
নূর মোহাম্মদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী
ব্রেকিং নিউজ২৪.কম
[email protected]
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে মে, ২০২১ দুপুর ২:৩৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



