somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রহস্য গল্প:তমাকমাশির পথে

২৪ শে ডিসেম্বর, ২০১৬ রাত ৯:২৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


(ফটোগ্রাফি:লিলিয়ান)


ঘটনাটা শুনেই বুকের ভিতরটা কেমন করে উঠলো । হোক্কাইডো আসার কয়েক মাস পরের কথা । একটু একটু করে এই জায়গার মানুষ এবং পরিবেশের সাথে পরিচিত হচ্ছি ।হঠাৎ যেন নতুন পৃথিবী । সব কিছু নতুন । আমার স্বামী সারাক্ষণ তার গবেষণা নিয়ে তাঁর কর্মস্থলে প্রচণ্ড ব্যস্ত । আমি নিজের মতো করে নিজের জীবনটা উপভোগ করার চেষ্টা করছি । প্রশান্ত মহাসাগর আর জাপান সাগরের অদ্ভুত রহস্যময় মায়ায় গড়ে উঠা হোক্কাইডো দ্বীপটা নিজেই যেন এক রহস্য । স্থানীয় জাপানিজদের কাছে জানা যায় হোক্কাইডোর ইতিহাস বেশি দিনের নয় । আমার আবার ইতিহাস এবং সংস্কৃতি দুটোই খুব আনন্দ দেয় । এই শহরটার নাম সাপ্পরো ।

খুব সুন্দর এবং পরিকল্পিত নগর । হোক্কাইডো বিশ্ববিদ্যালয় কে কেন্দ্র করেই অনেক বিদেশির প্রবেশ এই সাপ্পরো শহরে । তাই বিদেশিদের জন্য সিটি সাপ্পরো ও অনেক আয়োজন রাখে । গ্রীষ্মকালের কিছু আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে গিয়ে অনেক গুলো স্বেচ্ছা সেবক দলের সাথে পরিচয় হল । এখানে বৃদ্ধ মানুষ অনেক । স্বেচ্ছা সেবক দল গুলো বেশির ভাগ বৃদ্ধ দিয়ে পরিচালিত হয় । এই রকম স্বেচ্ছা সেবক দলেরই একজন বৃদ্ধা । উচিদা শেই । তিনি এক সময় কলেজ শিক্ষক ছিলেন । উচিদা নামটা তার নিজের পরিবার থেকে পাওয়া । শেই নামটা তার স্বামীর পদবি ।এটা এখানকার জাপানিজ সংস্কৃতি । বিয়ের পর সবাই স্বামীর পদবি গ্রহন করে । অল্প কিছু দিনের মধ্যে তার সাথে কেমন করে যেন আমার খুব ভাল সম্পর্ক হয়ে গেল । সে আমাকে তার নাতনির মতো দেখে । সে শেখাতে আর আমি শিখতে ভালবাসি । স্বেচ্ছা সেবক দলের সবাই খুব খুশি হয় আমি যখন তাদের সাথে কাজে অংশ গ্রহন করি । কারন এখানে তরুন তরুণীরা নিজেদের জীবন নিয়ে ব্যস্ত । বয়স্কদের সাথে আমার মতো একজন তরুণী আন্তরিকতার সাথে মিশে গেছি । এই ব্যপারটা ওদের খুব আনন্দ দিত । সেই অবসর সময় গুলোতে সেচ্ছা সেবক দলের সাথে অনেক নতুন নতুন জায়গা ঘুরার সুযোগ হল । সেই সাথে বিচিত্র সব জাপানিজ ইতিহাস আর সংস্কৃতি । এই জায়গাটার নাম তমাকমাশি । সাপ্পরো শহর থেকে বেশ দূরে । সেখানে নিদম হোটেলে প্রতি বছর প্যাসিফিক মিউজিক ফেস্টিভ্যাল হয় । অনেক দেশের মানুষ এই বিখ্যাত সঙ্গীত উৎসব উপভোগ করতে আসে ।আর নিদম হোটেল বিখ্যাত ছেলে মেয়েদের বিয়ের জন্য । সে এক বিশাল আয়োজন । কোন এক শীতের সকাল । আমাকে উচিদা শেই নিতে এলো । আমার বাসা থেকে তাঁর গাড়িতেই সাপ্পরো ষ্টেশন । সেখানে সে গাড়ি নির্ধারিত জায়গায় রাখল। তারপর আমাকে নিয়ে সাব ওয়ে দিয়ে অন্য আরেক ষ্টেশন এ নামল । নামার পর দেখলাম অনেক গুলো বড় বাস সবার জন্য অপেক্ষা করছে । সেই বাসে এক মাত্র আমিই ছিলাম তরুন কেউ বাকি সবাই পঞ্চাশের উপর বয়স । আমাকে পেয়ে সবার খুব কৌতূহল আর জিজ্ঞাসা। ঘণ্টার কাঁটা ঘুরতে ঘুরতে নিয়ে এলো নিদম হোটেল । আস্পারাগাসের আইস্ক্রিম , স্পাগেটি , আর ট্র্যাডিশনাল জাপানিজ খাবারে মধ্যাহ্ন ভোজ । পিয়ানোর অদ্ভুত সুরের মূর্ছনায় সময়টা সংগীতময় হয়ে উঠে ছিল । ফিরে আসার সময় । আমরা গাড়িতে উঠবো যে জায়গা থেকে তার কাছেই অনেক পুলিশ । আমি দেখলাম সেখানে ছোট বাচ্চাদের স্কুল । স্কুলের সামনের জায়গাটায় মনে হচ্ছে কোন দুর্ঘটনা । রাস্তায় রক্তের দাগ দেখা যাচ্ছিলো । সবাই বিচলিত হয়ে গেল । আমি যেন ভয় না পাই আমাকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছিল কয়েক জন বৃদ্ধা । কেউ বুঝতে পারছে না কি ঘটেছে । এমন সময় একজন বৃদ্ধ আসল খবর নিয়ে এলো ।

একজন বাবা তার দুই শিশু বাচ্চাকে নিয়ে এই পাহাড়ি পথ দিয়ে যাচ্ছিলো । ধারনা করা হচ্ছে বাচ্চা দুটো ওই স্কুলের । হঠাৎ কোন এক অদ্ভুত মানুষ একটি প্রাইভেট কার দিয়ে প্রথমে বাবা কে ধাক্কা দেয় এবং পরে বাচ্চাদের । বাচ্চারা ভয় পায় । বাচ্চাদের বাবা সে অদ্ভুত মানুষ এর উপর রেগে যায় ।তাদের মধ্যে মারামারি শুরু হয় । তখন এক পর্যায়ে স্কুলের এক শিক্ষিকা স্কুল থেকে বের হয়ে আসে । বাচ্চা দুটো কে বাঁচায় । কিন্তু এদিকে বাচ্চার বাবাকে অদ্ভুত লোক ছুরি মেরে কার নিয়ে পালিয়ে যায় । স্কুল শিক্ষিকা পুলিশকে খবর দেয় । পুলিশ বাচ্চাদের উদ্ধার করে । এক পর্যায়ে অপরাধীকে ধরে ও ফেলে । আমরা সেদিন খুব দ্রুত সে জায়গা থেকে চলে আসি । আমি একটু মানসিক ভাবে চিন্তিত হই । ভয় যে পেয়েছি তা আমি আমার নিজের ভিতরের অনুভুতিতে টের পাই । দুই মাস পরের কথা । আমার উচিদা শেই এর সাথে দেখা । অনেক কথা বলার পর আমি তাকে সেই অপরাধীর কি শাস্তি হয়েছিল জানতে চাইলাম । সে জানাল আরেক অদ্ভুত ঘটনা । যা কি না যে কোন মানুষকে আতংকিত এবং চিন্তিত করে তুলবে । অপরাধী স্বীকার করেছে যে ওই শিশুদের বাবা এবং বাচ্চাদের সে চিনেনা । আমি অবাক হয়ে গেলাম । তাহলে সে তাদের মেরেছে কেন?

উচিদা শেই খুব গম্ভীর ভাবে বলল, অপরাধী জানিয়েছে যে বাচ্চারা তার বাবার সাথে অনেক হাসি খুশি ভাবে যাচ্ছিল । সে দৃশ্য সে তার মস্তিস্কে ধারন করতে পারেনি । তাই আঘাত করেছে কিন্তু তাদের সে চিনে না।
আমি বললাম , এটা কি হিংসা না মানসিক রোগ?

উচিদা শেই বলল , অপরাধী বলেছে অনেক বছর আগে সে ওই নিদম হোটেলে তার প্রিয় বান্ধবীকে বিয়ে করেছিল এবং তাদের দুইটা বাচ্চা ছিল । কিন্তু সে অনেক বেশি মদ পান করত তাই তার বউ তাকে ছেড়ে চলে যায় এবং তাদের ছোট ছোট বাচ্চারাও তাকে ছেড়ে যায় । বাবার সাথে বাচ্চাদের সুখ দৃশ্য তাকে পাগল করে তুলেছিল । সে তার নিয়ন্ত্রন হারিয়ে খুনের নেশায় উম্মাদ হয়ে গিয়েছিলো।

আমি কথা গুলো শুনছিলাম কিন্তু আমার ভিতরে মারাত্মক ভয় কাজ করছিল । মানুষের বিচিত্রতা আমাকে ভাবিয়ে তুলল । কোন রকম কারন ছাড়াই একটা মানুষের প্রান গেছে । কি অদ্ভুত নিয়তি । এই জীবনের রহস্য!
আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম , এখন ওই অদ্ভুত লোকটার কি মৃত্যুদণ্ড হয়েছে?

উচিদা শেই চুপ করে রইল । সে কোন উত্তর দেয় না । অনেকটা সময় যাওয়ার পর সে নিজ থেকেই বলল , পুলিশ তাকে ধরে জেলে রেখে ছিল । কিন্তু তার বিচার করার আগেই জেল থেকে সে উধাও হয়ে যায় । শুধু তা নয় তার সাথে রাখা আরও একজন কয়েদির লাশ পাওয়া যায় । জেলের তালা সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় সে পালায় । কেউ কেউ ধারনা করছে সেটা কোন অভিশপ্ত অশরীরী ছিল । পুলিশ এবং মিডিয়া এই খবর বাইরে প্রকাশ করেনি । কারন জনগনের ভিতর বিভ্রান্ত এবং ভয় তৈরি হবে । সেই সাথে প্রশাসন কে অশ্রদ্ধা করবে। সেখান থেকে স্কুল সরিয়ে নেওয়া হয় । লোক মুখে শোনা যায় প্রায়ই নাকি প্রাইভেট কারের অদ্ভুত মানুষ দেখা যায় আর এমন সব সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষ ও মারা যায় কিন্তু কোন অস্তিত্ব খুজে পাওয়া যায় না । পুলিশ প্রশাসন এবং মানুষ খুব সচেতন । কিন্তু রহস্যের কাছে জীবন খুব অসহায় । পরিচিত পৃথিবী আর যাপিত জীবনে রহস্য স্বীকৃতি পায়না । তারপরও গভীর এক ভয়ংকর অস্তিত্ব নিয়ে রহস্য নিজেই মানুষের মনে আর জীবনে জায়গা করে নিয়েছে । যা অস্বীকার করার ও কোন পথ নেই মানুষের।

সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে ডিসেম্বর, ২০১৬ রাত ১২:০৭
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বিকাশ নূরা এবং হিরো আলমকে যারা প্রধানমন্ত্রী ভাবতেন ;)

লিখেছেন জ্যাক স্মিথ, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ২:৩২



একজন মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি, শিক্ষা-দীক্ষা থাকার চাইতেও জরুরী বিষয় হচ্ছে তার অন্তর্দৃষ্টি থাকা। অন্তর্দৃষ্টি, অন্তরচক্ষু বা জ্ঞানচক্ষু সম্পন্ন একজন ব্যক্তিকে কখনোই ধোঁকা দেওয়া বা ধোঁকায় ফেলানো সম্ভব নয় কারণ এরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাঙ্গালী কেন মুসলমান হতে পারে না?

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৫

অনারব টার্কিশ, কুর্দি আর ইরানিয়ানরা তাদের নিজ নিজ ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষন করে ও তা ধারন করেও তারা মুসলিম, পাকিস্তানের পাঞ্জাবীরাও যখন নিজেদের পাঞ্জাবী জাতি হিসেবে অহংকার করে, তখনও তারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

গল্পঃ মোহাম্মদপুরে কখনও বিচ্ছেদ হয় না

লিখেছেন রাজসোহান, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৪





আমার দোকানের নাম নিউ শাপলা কম্পিউটার ও ফটোস্ট্যাট। সাইনবোর্ডের শাপলা ফুলটা এঁকে দিয়েছিলো তাজমহল রোডের এক সাইনম্যান, দেখতে হয়েছিলো কচুরিপানার মতো। চৌদ্দ বছর ধরে ঝুলে আছে। রোদে রঙ উঠে... ...বাকিটুকু পড়ুন

২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা তার সাথে কিছু রুঢ় সত্য যা বদলে দিয়েছিলো দেশের রাজনীতি।

লিখেছেন অন্তর্জাল পরিব্রাজক, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:৩৪





২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা সম্পর্কে আমরা সবাই মোটামুটি জানি। এই হামলায় কারা জড়িত ছিল সেটাও আজকের দিনে অজানা নয় একমাত্র নিতান্ত দলকানা ছাড়া। তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধানমন্ডি ৩২ যারা ভেঙেছিল, আর যারা বিচার চাওয়ার পথ বন্ধ করে দিল- তারা কি একই?

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:৪৪



ধানমন্ডি ৩২ যারা ভেঙেছিল, আর যারা বিচার চাওয়ার পথ বন্ধ করে দিল- তারা কি একই?

ধানমন্ডি ৩২ ভাঙা হয়েছিল- কে দেখেনি, কে জানে না, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই।,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×