
ছবিঃগুগল
হঠাৎ করেই আমার মাঝে মাঝে নানা রকম ভাব মাথায় উকি দেয় । এই ধরেন ভাল লাগছে না । মনটা আউলা ঝাউলা । তখন একা একা রেস্তরায় খেতে চলে যাওয়া ,শপিং মলে ঘুরে বেড়ানো অথবা খামাখা রিক্সা নিয়ে এদিক সেদিক যাওয়া । আর রিক্সা ওয়ালার মুড চেহারা ভাল হলে তার জীবন কাহিনি শোনা ।এছাড়া ও চুপচাপ কোন একটা রেস্তরাঁয় বসে নিজের পছন্দ মতো মেন্যু অর্ডার করে আশেপাশের চিত্র দেখা । আড় চোখে পাশের টেবিলের ভুঁড়ি ওয়ালা লোকটি হাত ডুবিয়ে খাচ্ছে তা দেখা , আরেক টেবিলে অশান্তিতে টুঁই টুম্বুর মহিলা মোবাইলে কাউকে ইচ্ছে মতো ঝাড়ি দিচ্ছে তা দেখা , হাঁটুর সমান ছোট শিশুটি রেস্তরায় এসে মহা খুশিতে মায়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে একবার রেস্তরাঁর টয়লেটের দিকে যায় অথবা মেইন গেটের দিকে যায় । । কোন ভাবেই তাকে বেবি কর্নারে পাঠানো যায় না ।এদিকে মা রেস্তরাঁর সোফায় পা উঠিয়ে পাশের ভাবির সাথে দিব্বি সুখের আলাপনে মত্ত । আসলে এই শহরের একটা রেস্তরাঁয় ও অনেক ধরনের মুড নিয়ে মানুষ ঢুকে । সবার পেটের ক্ষুধা এক রকম থাকে না । হঠাৎ করেই দেখা যাবে কেউ কেউ আমার মতো একদম চুপচাপ ভীষণ মনোযোগ দিয়ে খেয়ে উঠছে । আমি অবাক হয়ে দেখি মানুষের পেটের ক্ষুধা । পকেটে বা পার্সে যার যতো টাকাই থাকুক । খাওয়ার পর একটা তৃপ্তি প্রায় সব মানুষের এক । ক্ষুধা নিবারনের তৃপ্তি । পেট পূর্ণ হওয়ার তৃপ্তি । দিন শেষে এই পেটের ক্ষুধার জন্যই সবাই দৌড়ায় । এক মুঠো অন্ন । আর এই অন্ন জোগাড়ে হাজারও পেশায় ,ভুমিকায় মানুষ ঘুরে বেড়াচ্ছে । জীবনটা উপভোগের সাথে গভীর ভাবে অনুভব করার ও আছে ।
কিছু দিন আগে ঢাকা শহর বেশ গরম হল । অনেক গরম হওয়ার পরের কিছু দিন একটু শান্ত ছিল । এই সুযোগে আমি রিক্সা নিয়ে গেলাম শিশু একাডেমী ফুলের চারা কিনতে । চারা কেনা শেষে রিক্সা খুঁজে পাই না । কোন রিক্সা ওয়ালাই আমাকে নিতে চাচ্ছে না । আমি রাস্তা ঘাটে খুব বেশি দর কষাকষি করি না । পরিস্থিতি বুঝে এক দামেই উঠে পড়ি । অনেক রিক্সা যাওয়ার পর একটা ফুরফুরে মেজাজের রিক্সা ওয়ালা নিজ থেকেই এগিয়ে এল । আমার চারা গুলো রিক্সায় তুলে নিল । আমাদের কোয়াটারে ঢুকার পর একদম তিন তলায় আমার বারান্দায় দিয়ে গেল ।
রিক্সা ওয়ালা শিক্ষিত লোক । শাহবাগ আসার পর লোকটাকে জিজ্ঞেস করে ছিলাম বাড়ি কই মামা ।
-- মাইমেনসিং মামা
--ঢাকায় কতো দিন মামা?
--মেলা বছর মামা!
আমি হেসে দিলাম তার মামা বলার ধরন দেখে । আর ও একটা বিষয় তার বার বার কল এলে ও সে ধরেনি । হাতের মোবাইলটা ও বেশ দামি ।এপোল আই ফোন সিক্স । লোকটা বেশ পরিপাটি । আমার কৌতূহল বাড়াল ।
মামা ফোন কেটে দিচ্ছেন যে ...মামি রাগ করব তো
--না । মামা,মামি না । আমার ছেলে মালয়েশিয়া থিকা ইমুতে কল দিতাছে । ছেলে চায় না আমি রিক্সা চালাই ।
--ছেলে বিদেশে । তারপর ও কষ্ট করতে ভাল লাগে ।
--নাহ ! মামা! রিক্সাটায় আমার ইতিহাস আছে । আমি স্কুলের শিক্ষক আছিলাম । গ্রামের পলিটিক্সের শিকার হইয়া চাকরি যায় । ছেলের মায়ের অসুখ হয় । চোরা জ্বরে মারা যায় । সেই সময় দূরে গিয়া রিক্সা চালাইয়া পেট সংসার চালাইছি । রিক্সাটা ইচ্ছা করলেই ছাড়তে পারি না ।
আমি দেখলাম লোক বেশ ইমোশনাল হয়ে গেছে । এক্সিডেন্ট করতে পারে । তাই অন্য দিকে মনোযোগ নিতে বললাম ,"মামা সামনে স্পীড বেকার ধিরে চালান । বাম দিকে মোড় দিয়ে কফি হাউজের গলি ।"
একটা দীর্ঘশ্বাস দিয়ে ভাবলাম আজকাল প্রকৃত জ্ঞান স্কুল কলেজে পাওয়া যায় না । কারন জ্ঞান যারা দেয় তাদের বিবেক , চরিত্র জীবন ক্রমশ প্রশ্ন বিদ্ধ । বরং জীবন মুখী জ্ঞান রাস্তা ঘাঁটে পাওয়া যায় । মানুষের মুখে , চোখে আর জীবনের দিকে তাকালেই পাওয়া যায় । কিছু কিছু মানুষের জীবনে মনের ক্ষুধাটা হাহাকারটা পেটের ক্ষুধার চেয়ে কম না । একটা ক্ষুধা সব মানুষের পেটে থাকে । একটা ক্ষুধা সব মানুষের মনে থাকে । মানুষ দিন রাত সেই ক্ষুধাটার পেছনেই ছুটে । অবিরাম ছুটে চলে ।
#পথে পাওয়া জ্ঞান
#নুরুন নাহার লিলিয়ান
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৮ রাত ৯:১১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


