
সৌদি আরবে আবির্ভূত হয়েছে ইসলাম ধর্ম। সেখানকার শাসন ব্যবস্থাও চালিত হয় ইসলামের শরিয়া আইন মোতাবেক। সুতরাং সেখানকার নারীদের উপর যে বিধি-নিষেধ অর্পিত, তা গোটা মুসলিম নারী জাতির জন্য ইসলামের বিধি-নিষেধ হিসেবেই পরিগণিত হওয়া উচিত। কিন্তু আমরা যদি সৌদি আরব সহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের নারীদের প্রাত্যহিক কর্মকান্ড এবং তাদের মেনে চলা রীতি-রেওয়াজের দিকে তাকাই এবং তা তুলনা করি পৃথিবীর অন্যান দেশে বসবাসরত লক্ষ ধার্মিক মুসলিম নারীদের সাথে তাহলে আমরা ধাঁধার মধ্যে পরে যাই! স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন আসে, কাদের চালচলন সঠিক? সৌদি মুসলিম নারীদের নাকি সৌদি আরবের বাইরে বসবাসরত ইসলাম ধর্ম মেনে চলা নারীদের?
১. মুসলিম নারীরা কি গাড়ি চালানোর অধিকার রাখে? দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবে মহিলাদের গাড়ি চালানো নিষিদ্ধ! ২০১৩ এর অক্টোবরে প্রাক্তন সৌদি সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের প্রধান এবং উলামা কমিশনের সদস্য সেইখ সালেহ আল-লুহায়দান ফতওয়া দিলেন যে কোরান এবং হাদিস সম্পূর্ণ ভাবে মহিলাদের গাড়ি চালানো নিষিদ্ধ করেছে (Middle East Online, 29-09-2013)! তিনি মহিলাদের হুঁশিয়ার করে আরো বললেন যে বৈজ্ঞানিক ভাবে এটা প্রমানিত হয়েছে, “যে সব মহিলা গাড়ি চালায় তাদের ওভারী বা ডিম্বাশয় ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং তাদের পেলভিস উপরে দিকে উঠে যায়, যার কারণে ঐসব মহিলাদের বাচ্চা বিকলাঙ্গ হয়!” তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে সৌদি আরবের বাইরে, বিশেষ করে পাশ্চাত্যের দেশ গুলোতে যেখানে মুসলিম মহিলারা ইসলাম ধর্ম পালন করছে আবার নিয়মিত গাড়িও চালাচ্ছে তারা কি ইসলামের বিধি নিষেধ লঙ্ঘন করছে?
২. মুসলিম মহিলাদের কি ভোটাধিকার রয়েছে? এখন পর্যন্ত সৌদি মহিলাদের কোনো ভোটাধিকার নেই! তবে সম্প্রতি ২০১১ তে সৌদি বাদশা আবদুল্লাহ ঘোষণা করেছেন যে ২০১৫ থেকে মহিলারাও আঞ্চলিক নির্বাচনগুলোতে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবে। মহিলাদের জোরদার আন্দোলনের জের হিসেবে সৌদি বাদশা বাধ্য হয়েছে এই আইন করতে (PBS News Hour, 11-09-2011)। তবে সৌদি আরব ব্যতিত অন্যান সব দেশে, এমন কি ইরানেও দীর্ঘদিন ধরে মহিলারা আঞ্চলিক এবং জাতীয় পর্যায়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করে আসছে।
৩. মুসলিম মহিলারা কি একা ঘর থেকে বাইরে বের হতে পারে? হ্যা পারে। বাংলাদেশ, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা সব খানেই মুসলিম মহিলারা নিয়মিত একা একাই বাইরে যাচ্ছে কাজ করতে, শপিং করতে। কিন্তু সৌদি মহিলাদের একা ঘরের বাইরে বের হওয়া সম্পূর্ণ নিষেধ! কোনো কাজে বাইরে যেতে হলে তাকে অবশ্যই সাথে নিতে হবে তার স্বামীকে, অথবা পিতা বা ভাই কে। কাওকে না পেলে স্বামীর কাছে থেকে 'লিখিত অনুমতি' নিয়ে বাইরে বের হতে হবে। - এ এক নিদারুন পরাধীনতা। আসলে 'কাম-কাতুরে' সৌদি পুরুষেরা তাদের স্ত্রীদের বিশ্বাস করতে পারে না। ওদের ধারণা, ওদের স্ত্রীরা একা বাইরে গেলেই অন্য কোনো পর পুরুষের সাথে শুয়ে পরবে! কামাতুর সৌদি পুরুষ গোষ্ঠী অবশ্য বলে ওরা মহিলাদের জন্য এ আইন করেছে কারণ মহিলারা একা বাড়ির বের হলে অন্য পরুষ একা পেয়ে তাদের ধর্ষণ করতে পারে!
৪. চোখ সুন্দর তো তা ঢেকে রাখুন! এমনিতেই সৌদি মহিলাদের 'চোখ' এবং 'হস্ত যুকল' ছাড়া শরীরে বাকি অংশ সম্পূর্ণ ভাবে বোরকা অথবা নিকাব দিয়ে ঢেকে রাখার কঠিন বিধান রয়েছে। নারীরা এই বিধান পুন্খানুপুন্খ ভাবে মেনে চলছে কিনা তা দেখভাল করার জন্য সৌদি শাসক নিয়গ করেছে 'মুতাবিন' নামক বিশেষ পুলিশ! তবে কাম-কাতুরে সৌদি পুরুষের যৌনাকাংখা থেকে সুন্দর চোখের নারী সম্প্রদায়কে রক্ষা করার জন্য সম্প্রতি এক নতুন বিধান করা হয়েছে। তা হলো যে সব সৌদি নারীর চোখ সুন্দর বা আকর্ষনীয় তাদেরকে শরীরের সাথে সাথে চোখ ও ঢেকে রাখতে হবে, পাছে কোনো সৌদি পুরুষ তাকে ধর্ষণ করে বসে!
৫. নারীর অন্তর্বাস বিক্রি করতে হবে শুধু পুরুষকেই! এ এক আজব নিয়ম! সৌদি আরবে মহিলাদের অন্তর্বাস বা lingeries এর দোকানে কোনো মহিলা ‘সেলস ওম্যান’ হিসেবে কাজ করতে পারবে না। মহিলাদের অন্তর্বাস বিক্রির অধিকার শুধু পুরুষদেরই!
৬. কাঁটাচামচ মুসলিম নারীর জন্য নয়! সত্যি তাই। ১৯৩২ সাল থেকে সৌদি আরবে মহিলাদের জন্য কাঁটাচামচ দিয়ে খাদ্য গ্রহণ নিষিদ্ধ করা আছে! তবে পুরুষদের ক্ষেত্রে এতে কোনো বাধা নিষেধ নেই। এ বিষয়ে এক মোল্লার ফতওয়া এই রকম, "যখন একজন পুরুষ একজন মহিলাকে ওই রকম আকৃতির একটা ধাতব দন্ড তার পবিত্র মুখগহব্বরে প্রবেশ করাতে দেখে, তখন পুরুষটির মনে এক অস্বাভাবিক চিন্তার উদ্ব্রেগ হয়। আর এ কারনেই নারী-পুরুষের মধ্যে সংঘটিত যৌন সংঘর্ষ রোধে নারীদের কাঁটাচামচ ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে।"
এই রকম আরও অনেক উদ্ভট বিধি-নিষেধ চালু আছে সৌদি নারীদের উপর। আমি কয়েকটি উল্লেখ করলাম মাত্র। ইসলামের দোহাই দিয়ে যৌন বিকার গ্রস্থ সৌদি পুরুষ শাসক গোষ্ঠী বিভিন্ন ভাবে দমিয়ে রেখেছে নারীদের। আজ যেখানে নারীরা যাচ্ছে মহাশুন্যে সেখানে সৌদি নারীরা আন্দোলন করছে তাদের গাড়ি চালানোর অধিকারের আদায়ের জন্য। ছোটো এই পৃথিবীতে সৌদি নারীরা কোনঠাসা হয়ে আছে এক বিচিত্র 'স্টেরিওটাইপ' মুসলিম নারী হয়ে।
খোন্দকার মেহেদী আকরাম,
শেফিল্ড,
১৮ নভেম্বর ২০১৪
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই নভেম্বর, ২০১৪ বিকাল ৪:৩৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




