প্রচন্ড ব্যস্ত শ্বাসরুদ্ধকর ডিউটির মাঝে অধীর হয়ে অপেক্ষা করছিলাম একটু অবকাশের। অবশেষে আজ শুরু হল কমিউনিটি প্লেসমেন্ট নামক এক প্রহসনের। যেহেতু নতুন ডাক্তার তাই সবকিছুতেই একটু বাড়াবাড়ি উত্তেজনা ও আগ্রহ দুইটাই কাজ করছিল। সুবিধার জন্যে বেছে নিলাম বাড়ির পাশের উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্স। বন্ধুদের কাছ থেকে মোটামুটি ধারণা নিলেও প্রথম দিনেই এত চমক অপেক্ষা করছিল আমার জন্যে কে জানত! প্রচন্ড বিরক্তিকর দীর্ঘ যাত্রার পর সব ফর্মালিটি শেষ করে বহির্বিভাগে বসলাম। রোগী দেখা শুরু করার আগেই হাতে ধরিয়ে দেয়া হল একটা ঔষধের লিস্ট। লিস্টের খুব সীমিত কিছু ঔষধের মাঝেও কয়েকটার পাশে দেখলাম ক্রস দেয়া মানে এই ঔষধগুলোরও সাপ্লাই নেই। বলে দেয়া হল একান্ত প্রয়োজনে বাইরে থেকে কেনার জন্যে ঔষধ দিতে। সেই আশায় রোগী দেখা শুরু করলাম আমি আর আমার বান্ধবী। প্রায় শ’দুয়েক রোগীর মধ্যে ৮০% জটিল সব অসুখ নিয়ে এসেছে এবং যাদের জন্যে সরকারী ঔষধের তালিকা পর্যাপ্ত নয়। বাইরের ঔষধ প্রেসক্রাইব করতে গিয়ে দেখলাম অধিকাংশ রোগীর সেই ঔষধ কেনার সামর্থ্য নেই। নিজের সমস্ত অর্জিত বিদ্যা তন্নতন্ন করে যথাসম্ভব স্বল্পদামের ঔষধ লেখার চেষ্টা করলাম। কিন্তু প্রচন্ড খারাপ লাগায় আক্রান্ত হলাম যখন দেখলাম ছোট ছোট বাচ্চাগুলোকে দেবার মত কোন সিরাপ ডিসপেন্সারীতে নেই। হতদরিদ্র বাবা-মাগুলোকে কী স্বান্তনা দেব! নিজেকে স্বান্তনা দেবার কোন উপায় খুঁজে পাচ্ছিলাম না! যতদূর জানি সরকারী হাসপাতালে অতি প্রয়োজনীয় ঔষধের পর্যাপ্ত যোগান থাকে। তবে এগুলো যায় কোথায়? যেখানে একজন রোগীকে ফুলডোজ ঔষধ দেবার কথা সেখানে কেন গুনে গুনে ঔষধ সাপ্লাই দেয়া হয়? যে মানুষগুলো ফ্রী চিকিৎসার আশায় সরকারী হাসপাতালে এসে ধরণা দেয়, যাদের টাকা খরচ করে ঔষধ কেনার কোন সামর্থ্য নেই তাদের কেন নাম কা ওয়াস্তে কিছু ঔষধ হাতে ধরিয়ে দেয়া হয়? Multi Drug Resistance কেসগুলোতে আমরা সব দোষ রোগীর ঘাড়ে চাপিয়ে দিচ্ছি অথচ আমরা নিজেরাই অ্যান্টিবায়োটিকের মত ঔষধগুলো নামেমাত্র কয়েকটা রোগীর হাতে তুলে দিচ্ছি যার সেই সামর্থ্য নেই কোর্স পুরো করার। আমাদের হাতেই তৈরি হচ্ছে এসব Multi Drug Resistance!
আমি খুব নীতিবাগীশ কোন ডাক্তার নই, খুব সচেতন কোন নাগরিক নই। আজ প্রথম দিন বলেই এতটা ধাক্কা খেলাম। দ্বিতীয় দিনে খারাপ লাগা নিয়েই চিরায়ত নিয়মেই ঔষধ লিখে যাব। তার দুইদিন পরে এই খারাপ লাগাটাও চলে যাবে। এভাবেই শেষ হয়ে যাবে আমার কমিউনিটি ট্রিটমেন্ট(চিটমেন্ট)! শহরে ফিরে আধুনিক প্রাইভেট হাসপাতালের ওয়ার্ডে বসে মানসম্পন্ন ও সময়োপযোগী ঔষধ প্রেসক্রাইব করে যাব। আমার সামর্থ্যবান রোগীরাও খুশি, ঔষধ কোম্পানীওয়ালারাও খুশি। একসময় ভুলেই যাব কোন এক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কিছু মানুষের দুরবস্থা দেখে খুব কষ্ট পেয়েছিলাম! ৩৩তম বিসিএস প্রিলিতে টিকে যাওয়ার দরুণ পরিবার, বন্ধু-বান্ধব সবার মাথায় সরকারী চাকরী সিন্দাবাদের ভূতের মত চেপে বসেছে। লিখিত পরীক্ষার আগেই মারাত্মক হতাশ হলাম সরকারী চাকরীতে এমন দুরবস্থা ও বিবেকের অবনতি দেখে। যে দেশে সিভিল সার্জনের অফিসের কেরানী থেকে শুরু করে উপরওয়ালা পর্যন্ত ঘুষের রাজত্ব, যেখানে চাকরী পাওয়া থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্র নির্ধারণ ও পরিবর্তন সবক্ষেত্রে ঘুষ আর রাজনৈতিক কলকাঠি অত্যাবশ্যকীয় সেখানে সরকারী হাসপাতালে পর্যাপ্ত প্রয়োজনীয় ঔষধের যোগান থাকাটাই অবাস্তব! এইসব টাকাখেকোদের ভীড়ে সামান্য দিনমজুরে, হতদরিদ্র কৃষক আর তাদের পরিবারের চিকিৎসা নিশ্চিত করাই দুরূহ, সুচিকিৎসা তো বহুত দূর কি বাত! বছর চল্লিশেক আগে ভাল চিকিৎসার অভাবে আমার দাদী খুব অল্পবয়সে মারা যান। বাবা সবসময় বলতেন ডাক্তার হয়ে দাদীর নামে একটা হাসপাতাল দিতে যেখানে ঐ অঞ্চলের সব দরিদ্র মানুষজন চিকিৎসা পাবে বিনামূল্যে। হায়! আমার বাবা যদি আজ দেখতেন চল্লিশ বছর পরেও এইসব মানুষের ভাগ্য এক জায়গাতেই দাঁড়িয়ে আছে! অন্ধকার আঁতুড় ঘরে দাইয়ের হাতে এদের জন্ম, অসুখের সাথেই এদের বসবাস এবং বিনা চিকিৎসাতেই এদের মৃত্যু। সরকারের জরিপেই শুধু বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নতি হয় কিন্তু জানিনা এসব জরিপ আসলে কোন জনগোষ্ঠীর উপর চালানো হয়! কোন উপজেলা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র না এপোলো হাসপাতালে!
আজ বুঝতে পারলাম মুগ্ধ ভাইয়ার মত মানুষ কেন সরকারী চাকরী পেয়েও ছেড়ে দিয়েছিল! কেন বারবার বলত এইসব আমাদের জন্যে না! স্বচ্ছ চিন্তাধারার কোন মানুষ কেন আজ সরকারী চাকরীর পেছনে ঘুরেনা! কপালগুণে(!) চাকরী হয়ে গেলেও কেনইবা ছেড়ে দেয়! কারণ একটাই, তারা মেনে নিতে পারেনা মেধার ধর্ষণ আর বিবেকের আত্মবিসর্জন!
আলোচিত ব্লগ
আওয়ামী লীগ ও আমরা কেনো ক্ষমা চাইবো‼️আমরা’তো বিচার করে শাস্তি নিশ্চিত করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ॥

লাল বদরদের আমরা কেন কোনোদিন বিশ্বাস করবো না, পছন্দ করতে পারবো না, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রচন্ড ঘৃণা করবো, তার একটা ভালো উদাহরণ এই স্ক্রীনশটটা।
সব মানুষ একই রাজনৈতিক আদর্শে... ...বাকিটুকু পড়ুন
তুরস্ক-কেন্দ্রিক ভূরাজনৈতিক প্রভাব ও কাদের মোল্লাদের প্রেতাত্মার পুনরুত্থান

বিএনপির মহাসচিব ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, "বাংলাদেশ থেকে জামাতকে রাজনৈতিকভাবে নির্মূল করতে কাজ করতে হবে"। "নির্মূল" শব্দটি সম্পূর্ণভাবে দূর করার অর্থে ব্যবহৃত হয়। যেমন, কলেরা বা ম্যালেরিয়া নির্মূল করা, কিংবা... ...বাকিটুকু পড়ুন
বিপদ

বিপদ নাকি একা আসে না—দলবল নিয়ে চারদিক থেকে ঘিরে ধরে। প্রবাদটির বাস্তব এবং কদর্যরূপ যেন এখন মৃণালের জীবনেই ফুটে উঠেছে। মাত্র মাসখানেক আগে বাবাহারা হলো। পিতৃশোক কাটার আগেই আবার নতুন... ...বাকিটুকু পড়ুন
নগর দর্পন

১. মিরপুর ডিওএইচএস থেকে কুড়িল বিশ্বরোড যাওয়ার পথে ফ্লাইওভারের ওপর এক অনাকাঙ্ক্ষিত দৃশ্য। এক ভদ্রলোকের প্রায় ৪৮ লাখ টাকার ঝকঝকে সেডান হাইব্রিড গাড়ির পেছনে এক বাইক রাইডার ধাক্কা দিয়ে স্ক্র্যাচ... ...বাকিটুকু পড়ুন
গোলামি চুক্তির কারণে বোয়িং কিনতে বাধ্য হলো সরকার?

বাসই চলে না , কিন্তু আকাশে ওড়ার বিলাসিতা থেমে নেই। কালের কণ্ঠের এই শিরোনামটা পড়ে মুহূর্তের জন্য থমকে যেতে হয়। কথাটায় একটা তিক্ততা আছে, একটা ক্ষোভ আছে, যেটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।