কয়েকদিন আগের কথা । কোচিং এর ফিস দেবার জন্য মায়ের কাছে টাকা চাইলাম । মা জানালেন তাঁর হাতে টাকা নেই । এটিএম কার্ড দিয়ে মা বললেন আমি যেন বুথ থেকে টাকা তুলে নিই ।
এটিএম বুথ থেকে টাকা তোলা জটিল কোন কাজ নয় । আমি আগেও টাকা তুলেছি । কিন্তু সেদিন টাকা তুলতে গিয়ে কি ভুল করে ফেলেছিলাম কে জানে ! কার্ডটা মেশিনে আটকে গিয়ে বিকট শব্দে বাজতে শুরু করল । বাইরে থেকে দারোয়ান দৌড়ে এলো । দারোয়ান ধমকের সুরে জিজ্ঞেস করল, এটা কার কার্ড ঢুকিয়েছেন ?
আমি ভয়ে ভয়ে বললাম, আমার মায়ের কার্ড । আমার মা টাকা তুলতে দিয়েছেন ।
দারোয়ান আবার বলল, আপনার সাথে কোন আইডি আছে ?
আমি তাড়াতাড়ি আমার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আইডি বের করে দিলাম । দারোয়ান আইডিটা মনোযোগ দিয়ে চেক করতে লাগলো । এর মাঝে দারোয়ানের মোবাইল ফোনে কল চলে এসেছে ।
দারোয়ান ফোন রিসিভ করে বলল, না স্যার ঠিক আছে স্যার... চেক করে দেখেছি স্যার ...
আমি বেশ লজ্জা পেলাম, আমি কি বড় কোন ভুল করলাম ? উপর থেকে দারোয়ানের কাছে জানতে চাচ্ছে কে টাকা তুলছে ।
অতপর দারোয়ান বলল, “শোনেন, আপনার মাকে বলিয়েন টাকা তুলতে কোন পিচ্চিরে যেন না পাঠায় ।”
আমি থ হয়ে গেলাম, দারোয়ান এটা কি বলল ? আমি পিচ্চি ?
জাহান্নামে যাক দারোয়ান । দারোয়ান ফারোয়ানের কথায় আমার কিছু আসে যায় না ।
এর এক সপ্তাহের পরের ঘটনা । আমার আন্টির সাথে গায়ে হলুদের একটা অনুষ্ঠানে গেলাম । সেখানে দেখা হল আন্টির এক বান্ধবীর সাথে । আন্টির বান্ধবী কথা বলতে বলতে আমাকে বললেন, কিরে মেয়ে, বেশ তো সাজ দিয়ে এসেছ । নাগর একটা ধরিয়ে দেব নাকি । ঐ যে দেখো কত বড় লোকের ছেলে এই অনুষ্ঠানে এসে মেয়ে খুঁজছে । তাদের একটাকে পটিয়ে ফেলতে পারলে বড়লোক জামাই পেয়ে যাবে । পরিচয় করিয়ে দেব নাকি একজনের সাথে ?
আন্টি বলে উঠলেন, আরে এসব কথা থাক । ও এখনো ছোট মেয়ে । ওকে এসব কি বলছিস ?
আন্টির বান্ধবী ময়মনসিংহের আঞ্চলিক ভাষায় বললেন, “একে তুই ছোট বলছিস ? আজ বিয়ে দিলে এই মেয়ে সাত মাস পরেই বাচ্চা দেবে !”
কি আশ্চর্য ! এক দারোয়ান বলেছিল আমি পিচ্চি । আর আজ এক মহিলা বলছে আমি মা হবার যোগ্য হয়ে গেছি ! কোনটা বিশ্বাস করব ? মজার ব্যপার হল সেদিন দারোয়ানের কাছে নিজেকে পিচ্চি শুনে যেমন খারাপ লেগেছিল, আজ আবার এই মহিলার মুখে আমি মা হবার যোগ্য শুনেও খারাপ লাগছে । আমার মনটা এখন কেমন যেন হয়ে গেছে । নিজেকে ছোট মেয়ে ভাবতে পারছি না, আবার বড় ভাবতেও পারছি না ।
ভেবে চিন্তে বুঝলাম আমি বড় নই, আবার ছোটও নই । আমি এখন একটা অদ্ভুত ক্রিয়েচার হয়ে গেছি ।
আমি বড় না ছোট- এই দ্বিধা আরো বেড়ে যায় বাবা মায়ের বিপরীতমুখি আচরণ দেখলে । আমার বাবা আমাকে এখনো ছোট মেয়ে ভাবেন । অন্যদিকে মা অলটাইম ধমকের উপর রাখেন । মাঝে মাঝে মা মনে করিয়ে দেবার চেষ্টা করেন আমি এখন ছোট নেই ।
এখন আমি একটা ক্রান্তিকাল পার করছি । তবে বুঝতে পারছি এই ক্রান্তিলগ্ন বেশি দীর্ঘ হবে না । আমাকে যারা ছোট মনে করে তারা দিনদিন সংখ্যালঘু হয়ে যাচ্ছে । তাদের অনেকেই এখন আমাকে ‘বড়’ মহিলাদের মত মর্যাদা দিচ্ছে । কিছুদিন পর আমাকে ছোট ভাবার মত কেউ আর অবশিষ্ট থাকবে না । এমনকি আমার বাবাও মেনে নেবেন তাঁর মেয়ে আর ছোট নেই ।
কি আর করা, পৃথিবী প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে । আর আমরা সেই বদলে যাওয়াকে মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছি ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।
