কান কথায় শোনা। একান্ত ব্যক্তিগত আলাপনে এক ব্লগার আমার মূল্যায়ন করেছিলেন এভাবে, 'ওকে আমার একদমই মেধাহীন বলে মনে হয়েছে।' খুব একটা ভুল বলেননি। একাডেমিক শিক্ষা আমার বেশি নয়, যেটুকু বিদ্যের দৌড় সেটা মেধাবী সনদের জন্য যথেষ্ট নয় কোনোমতেই। তবে আমি পাঠক। লেখক যতটা নয়, তারও বেশি পাঠক। প্রচুর পড়ি বলেই হয়তো ঘাটতিটা খানিকটা মেটাতে পেরেছি। তো পড়তে পড়তে কী পড়ব তার একটা বেঞ্চ মার্ক আমার মধ্যে আপনা-আপনি তৈরি হয়ে গেছে। পেশার কারণেও সেটা আরোপিত অনেকখানিই। সামহোয়ারে প্রচুর সময় কাটে । পড়ি। অনেক লেখাই পড়ি। কতগুলো চোখ বুলাই। মন্তব্য করার ইচ্ছে হলে করি। কিছু লেখা এড়িয়ে যাই। যা এড়িয়ে যাই, সেক্ষেত্রে অবশ্যই একটা বড় কারণ হতে পারে এর লেখক। হয়তো আমার মননে একটা মূল্যায়ন তার হয়ে গেছে। সুবাদেই পোস্টটা পড়া সময়ের অপচয় ভেবেই scroll করে যাই অন্যটায়।
উল্টোটাও সত্যি। এবং এই লেখার মূল বিষয় সেটাই। আমি কাদের লেখা পড়ি। কেন পড়ি? আমি সামহোয়ারে ঢুকেছি ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি। তখন এমন জোয়ার ছিল না। তবে শান্ত টলটলে দিঘীর মতোই ছিল এই ব্লগ। অসাধারণ মেধাবী একদল লেখকের মাঝে এসে পড়েছিলাম। লেখায় তুখোড়, সমালোচনাতেও। মোটের ওপর মনে হচ্ছিল দারুণ এক আড্ডায় এলাম তো! বারোয়ারি পোস্টের তোড়ে সেই লেখকদের পোস্ট একদম কোনঠাসা। কিন্তু তারা লেখেন। মাঝেমধ্যেই লেখেন। আমি ঠায় বসে থাকি তাদের পোস্টের জন্য। যদি মিস করে যাই, তাহলেও নামে click করে দেখি সর্বশেষ কী লিখলেন।
তালিকায় একদম ওপরের নামটা নিয়ে আমার সঙ্গে কারো দ্বিমত হওয়ার কথা নয়। শোহেইল মোতাহির চৌধুরিকে আমি এসে পেয়েছিলাম হীরক লস্কর নামে। অভিমানে ব্লগ ছাড়ার মতো নাটকীয় একটা ট্রেন্ড সৃষ্টি করার জনকও বলা যেতে পারে। আবার সেই ভাওয়াল সন্নাসীর মতোই নাটকীয় আগমন। সব্যসাচী লেখক। যাই লেখেন গোগ্রাসে গেলার পরও মনে হয় চেটেপুটে খাওয়ার জন্য কিছু রইল না কেন!
মেধাবী, প্রচণ্ড মেধাবী, প্রচণ্ড জানা ব্লগারদের মধ্যে আমার হিসেবে একটা টাই হয়ে যায়। এখানে রাসেল, হিমু, কৌশিক, শমিত, শরত এবং সুমন চৌধুরীর মধ্যে কাকে রেখে কাকে ছাড়ি অবস্থা আমার। প্রত্যেকেই আমার অতিপ্রিয় ব্লগার। মুগ্ধ হয়েই প্রত্যেকের সঙ্গে আমি ব্যক্তিগত যোগাযোগ করেছি, আলাপ করেছি। এবং অনেকগুণ বেশি মুগ্ধ হয়েছি। অত্যন্ত মেধাবী কিন্তু কম লিখে বা হালকা পোস্ট দিয়ে কাজ চালায়, আবার দুর্দান্ত মন্তব্য দিয়ে নজরকাড়া একজন হচ্ছে অরূপ। বোনজামাই বলে একটা পক্ষপাত থাকার কথা এমনিতেও। কিন্তু সেই সম্পর্কটা তৈরির আগে থেকেই সে আমার প্রিয় তার মেধার বহুমুখিতার কারণেই। মাশীদ সম্পর্কে কী বলব? বললে সত্যি সত্যি পার্শিয়ালটির দায় চাপবে।
বিদেশে তাদের যাপন নিয়ে অনেকেই লেখেন। ধুসর গোধূলী এদের একজন। সেও মেধায় ওপরের ব্লগারদের সারিতেই পড়ে। লেখনী অসাধারণ। তবে ফাজলেমি একটু বেশি করেই বলে বুঝি তাকে পাত্তা একটু কম দিতে চায় অনেকে। শোনেন বলি। ধুসরের নেক নজরে পড়তে হলে অনেক সাধনা করতে হবে। অনেক। যাকে তাকে সে আপন করে না। হাসান মোরশেদ আরেকজন। ভদ্রলোকের ওপর আমি খুবই বিরক্ত। উনি দারুণ লেখার ক্ষমতা নিয়ে জন্মেও তা থেকে নিয়ত বঞ্চিত করে যান আমাদের। এসএম মাহবুব মোর্শেদ এবং সাদিক মোহাম্মদ আলম অবশ্যই অসাধারণ লেখক। তারা একটি নির্দিষ্ট ট্রেইটে থাকেন, গণ্ডি থেকে খুব একটা বেরোতে চান না। কনফুসিয়াসের কী হয়েছে জানি না, শিগগিরি দেশে ফিরবে বলেই হয়তো গোছগাছে ব্যস্ত। তার পোস্ট পাই না। হযবরল মন্তব্য এবং পোস্ট পরেই ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন মনে হয় ইদানিং। গোপাল ভাঁড় কখন ঢোকেন কখন বেরোন তার হদিশ আমি পাই না। ঝড়াপাতা, উৎস, ফ্রুলিংস হঠাৎ ব্লগান। দূরের কন্ঠস্বর স্তব্ধ কেন জানি না।
কালপুরুষ বহুদিন পর ফিরেছেন। আমার শুরুর দিকে ভালো লাগা লেখকদের একজন। ব্যক্তিগত পরিচয়ের পর আলাপ করে যা বুঝলাম, ভদ্রলোক যতটা জানেন তার চেয়ে শেয়ার করেন অনেক কম। নিজেকে কেমন যেন গুটিয়ে রাখার একটা প্রবণতা তার মধ্যে। শুভকে নিয়ে একটি কথাই বলব। কিছু মানুষ ভুল জায়গায় থাকেন। তার পারিপাশ্বর্িকতা তার জন্য একটা শেকল। কিন্তু লেখা নিয়ে প্রচণ্ড অবসেসড একজন মানুষ। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমার সঙ্গে এই একজন লেখকই নিয়মিত পোস্টান। তীব্র তার আবেগ, যা খুব ঘনিষ্ঠভাবে না মিশলে বোঝা যাবে না কখনোই। মুক্তিযুদ্ধের লেখনী নিয়ে কথা বললে আড্ডাবাজকেই রাখতে হবে সবার ওপর। এই ব্লগে শুরু থেকেই একলা লড়ে আসছেন ভদ্রলোক। আমি ও শুভ আসায় এখন অনেক বেশি নির্ভার এবং স্বচ্ছন্দ তিনি। তার অন্য পোস্টগুলোও হেলার নয় মোটেই। আইটি নিয়ে অসাধারণ লেখত জুয়েল, সে কোথায় লাপাত্তা তার হদিস কেউ দিতে পারেন? খুশী হয়েছি তীর্থককে ফিরে পেয়ে। আমার প্রথম দিকের ফ্যান।
ব্লগারদের মধ্যে লিঙ্গবিভেদ আনাতে আমি বিশ্বাসী নই। তারপরও হয়ে গেল। ধারাল লেখা, সাবলীল লেখা, এবং মেধাবী মননের জন্য আমার ভোটটা আমি আস্তমেয়েকে নির্দ্বিধায় দেব। তার লেখা বিতর্ক তোলে। উনিও ক্লান্তিহীন তর্কে মাতেন। উপভোগ্য। হাল ছাড়েন না। জীবন থেকে নেওয়া পোস্টের তালিকায় শাহানা এবং সারিয়া যুগ্মভাবে আমার প্রিয় তালিকায়। দুজনেই তাদের লেখা পড়িয়েই ছাড়ে। শাহানা শুরু থেকেই। সারিয়া কদিন হলো শুরু করেছে। এখানে একটা গোপন কথা ফাঁস করে দিই। কালপুরুষ মাঝে মাঝে কম্পোজার হিসেবে সারিয়াকে নিয়োগ দেন। আমার ধারণা, সেই চাকুরি করতে গিয়েই সারিয়ার একসময় উপলব্ধি হয়েছে আমি নিজেই তো পারি! আমার অনুমান মিথ্যে হোক, সত্যি হচ্ছে সারিয়া খুব ভালো লেখে। আছেন রাগ ইমন। অনেক শক্তিশালী ছন্দজ্ঞান তার। প্রচণ্ড expressive তার গদ্য ভারচুয়াল এবং বাস্তবতার মধ্যে এক বিভ্রান্তি তৈরি করে। পাঠক কনফিউজড কিন্তু আকৃষ্ট হয়। বলতে পারেন ম্যাজিশিয়ান। মহুয়া মঞ্জরি ছিলেন এমনই। তবে সেদিন জানালেন কাকে নাকি কথা দিয়েছেন এই ব্লগে আর ঢুকবেন না। তার সেই প্রতিজ্ঞাকে সম্মাণ জানাই। স্বরহীন অনিয়মিত। তবে সবদিক সামলে আমাদের যখন তার লেখনী সুধা পান করান, সোয়াদে অতুলনীয়।
টিনেজ রাইটার আছে আমাদের কয়েকজন। তাদেরও লেখা অনেকটা জীবনধর্মী। বয়ঃসন্ধি থেকে বেরিয়ে এসে বড় হওয়ার প্রবণতায় যে যুযুধান তাদের মন ও মনন, তার অনেকখানি অাঁচ পাওয়া যায় লেখায়। শাওন অবশ্যই এদের মধ্যে একনম্বর। দ্বিতীয় সাকিব। সাকিব আগে ফ্লাডিং করত বড়াই করে। এখন সবার আদরের ওর মজার সব কমেন্টের জন্য। সাববিরকে ঠিক কোন তালিকায় রাখব বুঝি না। এদের চেয়ে বড়ই হবে সে। তবে তার পোস্ট কম, মন্তব্য বেশি।
অল্টার ইগো আছেন অনেক। এদের মধ্যে অপ বাক, দীক্ষক দ্রাবিড় একটু বিতর্কিত লেখা লেখেন। শীর্ষে আছেন মুখফোড়। ওয়াও! তার লেখা পরে এটাই মনে হয়। মন্তব্যকারীদের আমি সমঝদার হিসেবেই মূল্যায়ন করি। সে তালিকায় চোর আমার সবচেয়ে প্রিয়। এই মেধাবীটাও কেনো পোস্টায় না এনিয়ে আমি বিরক্ত আছি। কোনোদিন পেলে হয় ব্যাটাকে। এমন ধোলাই দেব!
অপছন্দ হতে পারে কিন্তু উপেক্ষা করা যায় না এমন ব্লগার আছেন অনেক। ত্রিভুজ এদের একজন। বয়সের তুলনায় ভারি ব্যক্তিত্ব প্রকাশ করতে গিয়ে মাঝে মাঝেই হাস্যকর হয়ে পড়ে। তার প্রথমদিকের যে কোনো মন্তব্য আমার বিমলানন্দের উপকরণ ছিল। কিন্তু তার একটা বড় ফ্যান ক্লাব আছে। হয়তো জেনারেশন গ্যাপের কারণেই আামি তাকে ঠিক মতো বুঝতে পারি না।
নতুনদের অনেকেই ভালো লেখেন। পদ্য লেখেন। সুনীল সমুদ্র ও শেখ জলিলের কবিতা আমি আগ্রহ নিয়েই পড়ি। কখনো উচ্ছ্বসিত কখনোবা তীব্র হতাশায় পুড়ি। দিপুর কবিতা আমি পড়ে দেখেছি। তার শব্দ চয়ন এবং আবেগ অনেক সময়ই আমার কাছে তীব্র দ্রোহের বলে মনে হয়েছে। সেই সম্মাণটুকু তার কবিতা আমার কাছে বরাবরই পেয়েছে। কয়েকজনের প্রতি আমার আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তাদের মূল্যায়ন করার সময় আসেনি এখনো। তবে লিখে গেলে সামহোয়ারে একটা অবস্থান তৈরি করা সম্ভব এদেক পক্ষে। মোর্শেদ এদের একজন। তবে তার ফ্লাডিংটাই বড্ড দৃষ্টি কটু হয়ে যাচ্ছে। রাকিব হাসনাত সুমন- ভাই লেখেন আরো লেখেন। জিকো শুরুতে শুরু করেও থেমে আছে। চিত্রনির্মাণেই সময় কাটে তার। পোস্ট তাই চোখে পড়ে না।
ব্রাত্য রাইসুর ছবির ভক্ত ছিলাম। আছি এখনো। কবিতারও। উনি লিখছেন না। বরং অতীতচারিতায় এতটাই মগ্ন যে খেরোখাতার স্ক্যান দিচ্ছেন। তার মানে হয়তো 'আমি একসময় একটা কিছু ছিলাম' বোঝাতেই চাইছেন, এখন সেটা নেই বোধহয়। জামাল ভাস্কর দুয়েকটা পোস্ট করেই আমার ফেবারিট তালিকায় ঢুকে পড়েছিলেন। বিয়ে এবং চাকুরির ব্যস্ততায় হয়তো তার সময় হয় না। তবে লিখলেই আমি পড়ব।
এইবার একটা প্রশ্ন উঠতে পারে। যাদের কথা বললাম তাদের বেশিরভাগের সঙ্গেই আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক আছে। টেলিফোন এবং ম্যাসেঞ্জারে যোগাযোগ। মন্তব্যে পিঠ চাপড়াচাপড়ির একটা ব্যাপারও স্বীকৃত। কিন্তু বিভাজনের প্রশ্ন যদি তোলেই কেউ, আমি বলব সম্পূর্ণ নিজের যোগ্যতাতেই এরা প্রত্যেকে সামহোয়ারে জায়গা করে নিয়েছে। দলবাজি হয় না তা কেন বলব। অবশ্যই হয়। ভালো ব্লগাররা নিজেদের একটা দল করে নিয়েছে। তাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ভালো লিখে কেউ দেখাক না। আর কেউ না দিক আমি স্বীকৃতি দেব।
এখন যদি বলেন আমি স্বীকৃতি দেওয়ার কে? আমি বলব আমিও একজন ভালো ব্লগার। বেশ ভালো ব্লগার। ঝানু জহুরিই যদি না হই, তাহলে সাগর সেচে এতগুলো মানিক আলাদা করলাম কীভাবে?
পাদটীকা : এ আমার একান্তই ব্যক্তিগত মূল্যায়ন। কেউ আহত হলে বা অতিরিক্ত ফুলে গেলে তার দায় নেব না। এবং কোনো ব্যাখ্যা চাইলেও দেব না।
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৯ ভোর ৫:৫৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



