এইদিন মওলানা মুফতি মাহমুদের সভাপতিত্বে পশ্চিম পাকিস্তানের নির্বাচিত সংখ্যালঘু দলগুলোর প্রতিনিধিরা এক সভায় মিলিত হন। তারা শেখ মুজিবের 4 দফা দাবির প্রতি সমর্থন জানান এবং সরকার গঠন ও সংবিধান প্রণয়নের দায়িত্ব সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে অর্পণের প্রস্তাব করেন। তারা ইয়াহিয়া-মুজিব সরাসরি বৈঠকেরও দাবি জানান।
15 মার্চ '71 জুলফিকার আলী ভুট্টো এক সংবাদ সম্মেলনে বললেন, 'পিপলস পার্টি পশ্চিম পাকিস্তানের সংখ্যা গুরু। তাই কেন্দ্রের মতা পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লিগের কাছে আর পশ্চিম পাকিস্তানে পিপলস পার্টির কাছেই হস্তান্তর করতে হবে।' ভুট্টোর এই দুই পাকিস্তানের প্রস্তাবে পশ্চিম পাকিস্তানের নেতৃবৃন্দ ভুট্টোর উক্তির তীব্র প্রতিবাদ করেন। 15 মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান কঠোর সামরিক নিরাপত্তার মধ্যে ঢাকায় আসেন। এবং 18 পাঞ্জাব ইনফেনট্রি ব্যাটেলিয়নের কড়া প্রহরায় স্থানীয় প্রেসিডেন্ট হাউজে উপস্থিত হন। আর সঙ্গে ছিলেন জেনারেল হামিদ খান, খাদেম হোসেন রাজা, মিঠঠা খান, পীরজাদা ওমর, খোদাদাদ খান প্রমুখ জেনারেলগণ।
কোনো সহযোগী ছাড়াই প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ও শেখ মুজিবুর রহমান 16 মার্চ '71 প্রথম দফা বৈঠকে মিলিত হন। পরে এ আলোচনা মুলতবী হয়ে যায়। পরে এ আলোচনা মুলতবী হয়ে যায়। 17 মার্চ দ্বিতীয় দফা বৈঠকে দুপরে পরামর্শদাতারাও যোগ দিলেন। প্রেসিডেন্ট ভবনে রাতে ইয়াহিয়া ও টিক্কা খানের সংপ্তি বৈঠক হয়। রাত 10টায় গভর্নর টিক্কা খান জিওসি মেজর জেনারেল খাদেম হোসেন রাজাকে ফোনে বাঙালী নিধনযজ্ঞের নীল নকশা 'অপারেশন সার্চলাইট' বাস্তবায়নের নির্দেশ দেন। 5 পৃষ্ঠার এই নীল নকশায় গণহত্যার বিস্তারিত নির্দেশ লিপিবদ্ধ ছিল।
এদিকে ইয়াহিয়া-মুজিব তৃতীয় বৈঠকে মিলিত হন। ইয়াহিয়া এই বৈঠকে ফলপ্রসু আলোচনার ভান করলেও আলোচনা দীর্ঘায়িত হওয়ায় আওয়ামী লিগ চূড়ান্ত সংগ্রামের প্রস্তুতি নেয়। শুরু হলো প্রতিরোধ আন্দোলন। 19 মার্চ ব্রিগেডিয়ার জাহান জেব আরবাব খান পুরো এক ব্যাটেলিয়নের 72টি এলএমপি নিয়ে গঠিত পাঞ্জাব রেজিমেন্টের এক স্কোয়াডকে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রে সজ্জিত করে জয়দেবপুরে এল। উদ্দেশ্য জয়দেবপুরে দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে নিরস্ত্র করা, সেইসঙ্গে অর্ডিনেন্স ফ্যাক্টরি থেকে সমপূর্ণ গোলাবারুদ নিয়ে যাওয়া।
জয়দেবপুরের জনগন সামরিক বাহিনীর এই চক্রান্ত বুঝতে পেরে জয়দেবপুর-ঢাকা রাস্তায় প্রথম ব্যারিকেড দিয়ে প্রথম প্রতিরোধ সংগ্রাম শুরু করেন। এই ব্যারিকেড সরানোর সময় সামরিক বাহিনীর সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়। হানাদাররা গুলি চালালে দুজন জয়দেবপুরবাসী শহীদ ও দুজন আহত হন। জয়দেবপুরে দ্বিতীয় ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড ইন কমান্ড মেজর শফিউল্লাহ এই প্রতিরোধ সংগ্রামে জনগনকে পরো সমর্থন দিয়েছিলেন।
জয়দেবপুরে সামরিক বাহিনীর গুলি বর্ষণের তীব্র নিন্দা করে শেখ মুজিব তার বিবৃতিতে বলেন, 'তারা (সামরিক জান্তা) যদি মনে করে থাকে বুলেট দিয়ে জনগনের সংগ্রাম বন্ধ করা যাবে, তাহলে তারা আহম্মকের স্বর্গে বাস করছে।' 19 মার্চের ইয়াহিয়া-মুজিব বৈঠক প্রায় 90 মিনিট স্থায়ী হয়, পরে সন্ধ্যায় তাদের পরামর্শদাতারা আলাদা বৈঠকে বসেন। 20 মার্চ বসে মুজিব-ইয়াহিয়া চতুর্থ বৈঠক, যার শেষ দিকে দুপরে পরামর্শদাতারাও নানা ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনায় বসেন।
অন্যদিকে এ অঞ্চলের গণহত্যার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলে ফ্যাগস্টাফ হাউজে। জেনারেল আব্দুল হামিদ খান এই বৈঠকে জেনারেল টিক্কা খানকে গনহত্যার নীল নকশা 'অপারেশন সার্চলাইট' বাস্তবায়নের সবুজ সংকেত দেন।
21 মার্চ জুলফিকার আলি ভুট্টো ঢাকায় এসে ইয়াহিয়া-মুজিব বৈঠকে সমঝোতার সমালোচনা করলেন। তিনি বললেন, সমস্যা সমাধানে ত্রি-পীয় সমঝোতা হতে হবে। এই মর্মে 25 মার্চ পর্যন্ত ইয়াহিয়া, শেখ মুজিব ও ভুট্টোর মধ্যে আলোচনা চলে। কিন্তু পুরো ব্যাপারটাই ছিল আলোচনার নামে প্রহসন। এই দীর্ঘ আলোচনা পশ্চিমি সামরিক বাহিনীকে জাহাজ ও বিমান যোগে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব বাংলায় প্রচুর অস্ত্র ও সৈন্য আনার সুযোগ করে দেয়। (চলবে)
ছবি : আলোচনার নামে চলে প্রহসন (মুজিব-ভুট্টো বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলন)
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে অক্টোবর, ২০০৮ সকাল ৭:৩৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



