somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

যাদের রক্তে মুক্ত এদেশ (ধারাবাহিক)

২৮ শে মার্চ, ২০০৬ বিকাল ৪:২৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ঢাকায় গনহত্যা :

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় :
25 মার্চ রাতে হানাদার বাহিনী অধ্যাপকদের বাসস্থান ঘেরাও করে। তারা ডঃ জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার ফাটে ঢুকে তাকে ধরে নিয়ে যায়। একই সময় ওপরের ফাট থেকে ডঃ মনিরুজ্জামান, তার ছেলে, তার ভাগ্নে ও একজন প্রতিবেশি যুবককে ধরে আনে_ সিড়ির নিচে নিয়ে পরপর আটটি গুলি করে। জ্যোর্তিময় গুহঠাকুরতা গুলি খেয়েও বেচে ছিলেন! তিনি জ্ঞান হারাননি। পরে ধরাধরি করে তাকে ঘরে নিয়ে যাওয়া হয়। 27 মার্চ সকাল পর্যন্ত তার রক্তক্ষরণ হচিছল। তাকে তখন নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, কিন্তু সেখানে কোনো ডাক্তার ছিলেন না। বিনা চিকিৎসায় 30 মার্চ মৃতু্যবরণ করেন তিনি। 26 মার্চ পাক বাহিনী ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয় স্টাফ কোয়ার্টারের 12 নম্বর ফাটের ডঃ মোকতাদির ও কয়েকজন ছাত্রকে গুলি করে মারে। পরে 11 নং ফাটের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ল্যাবরেটরি স্কুলের শিক্ষক মোহাম্মদ সাদেককে হত্যা করে।

ইকবাল হল :
আধুনিক স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রে সজ্জিত হানাদার বাহিনী রাত দেড়টায় ইকবাল হল ঘিরে প্রচণ্ড আক্রমণ শুরু করে। কামান, মর্টার, রকেট, গ্রেনেড, আগুন বোমা, চাইনিজ আটোমেটিক রাইফেল, মেশিনগান কিছুই বাদ যায়নি। ইকবাল হলের তরুণরাও প্রতিরোধ দিয়ে যাচেছ বীর বিক্রমে। দাউ দাউ করে জ্বলছে এসেম্বলি হল (পুরাতন), পাঠাগার ও পাশের বস্তি। প্রতিরোধের মুখে সহজে হলে প্রবেশ করতে না পেরে ট্যাঙ্ক আনে হানাদাররা। শুরু হয় গোলাবর্ষণ। হলের দক্ষিণ পশ্চিমে রেল সড়কের বস্তিবাসীরা ভয়ে হলের নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য দলে দলে পাচিল ডিঙিয়ে ভেতরে এল। মুহূর্তের মধ্যে তারা সবাই হানাদারদের বুলেটের আঘাতে মুখ থুবড়ে পড়ল। ভোর হলে এলাকায় গোলাগুলি থামল, কিন্তু কারফিউ থাকল সারাদিন। ইকবাল হলের চারদিকে তখন লাশের স্তুপ।
জগন্নাথ হল :
25 মার্চ রাত সাড়ে বারোটায় হানাদাররা আক্রমণ করে জগন্নাথ হল। মেশিন গান, মর্টার শেলিং ও ট্যাঙ্কের প্রচণ্ড শব্দের মধ্যে তারা হলে ঢুকে প্রতিটি রুম তন্নতন্ন করে তল্লাশি শুরু করে। আক্রমণের আগে হলের বিদু্যৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। সমপূর্ণ অন্ধকারের মধ্যে হানাদাররা ছাত্রদের ধরে এনে কাউকে বেদম পেটালো, কাউকে সরাসরি গুলি করল। 26 মার্চের সকাল গুলির শব্দকে ছাপিয়ে শোনা গেল মানুষের কান্না আর্তনাদ।
হলের 29 নং রুমের বাসিন্দা হরিহর ও সুনীল দাস। ওই দিন সুনীলের এক অতিথি এসেছিলেন। হানাদাররা রুমে ঢুকে তিনজনকে দাঁড় করিয়ে ব্রাশ ফায়ার করে, এরপর রুমে একটা গ্রেনেড ছুড়ে বেরিয়ে যায়-মুহূর্তে সবশেষ। সুনীল ও তার অতিথি মারা গেলেও হরিহর আহত অবস্থায় এই নৃশংসতার স্বাক্ষী হয়ে অলৌকিক ভাবে বেঁচে যান। শেষ রাতে হরিহর হোস্টেলের রেইনপাইপ বেয়ে নিচে নেমে হামাগুড়ি দিয়ে নিকটস্থ পুকুর পাড়ে গিয়ে পানির কাছাকাছি লম্বা ঘাসের মধ্যে আশ্রয় নেন। 26 মার্চ সারাদিনরাত এভাবেই পড়ে থাকেন তিনি। তার পা দিয়ে তখনও রক্ত ঝরছে। 27 মার্চ সকালে কারফিউ তুলে নেয়া হলে এক সহৃদয় দোকানদার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান তাকে।

হানাদারদের ভয়ে সুরেশ দাস, রবিন ও সত্যদাসসহ প্রায় 25 জন ছাত্র হলের ছাদে আশ্রয় নিয়েছিলেন। হানাদার পশুরা তাদের সবাইকে গুলি করে। সুরেশ বেটে হওয়ায় তার বুকে গুলি লাগেনি, লাগে ডান কাঁধে। তার ক্ষতস্থান থেকে অবিরাম রক্ত ঝরে যাচেছ, চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে 24 জন সঙ্গীর লাশ। ছাদের ওপর পানির ট্যাঙ্ক, তাতে ঢুকে পড়লেন সুরেশ। 26 মার্চ গোটা দিনরাত সেখানেই ছিলেন। 27 মার্চ ভয়ে ভয়ে নামলেন। রাস্তায় পরিমল গুহ তাকে দেখতে পেয়ে হাসপাতালে দিয়ে আসেন।
26 মার্চ সকাল 11টায় হানাদাররা 5 জনকে ধরে নিয়ে এল। তাদের দিয়ে হলের বিভিন্ন কক্ষ, ছাদ, বারান্দা ও সিড়ি থেকে বিক্ষিপ্ত লাশগুলো সংগ্রহ করে ট্রাকে তুলল। এরপর মাঠের মাঝখানে বিশাল এক গর্ত খোড়ানো হল ওই 5 জনকে দিয়ে লাশ চাপা দেওয়ার জন্য, পরে গর্তের পাড়ে দাঁড় করিয়ে গুলি করা হলো তাদেরকেও। গুলির সঙ্গে সবাই লুটিয়ে পড়ে গর্তে। হানাদাররা ট্রাকে চেপে চলে গেল। হঠাৎ এই লাশের স্তুপ থেকে একজন উঠে দৌড়ে পালালেন। ভাগ্যবানটির নাম কালীরঞ্জন শীল- গুলি তার গলা ভেদ করে চলে যায়।
হানাদাররা 26 মার্চ ভোরে হাউজ টিউটর অধ্যাপক অনুচেছপায়ন ভট্টাচার্য, ছাত্র বিধান রায় ও অন্য একজনকে এনে বেদম প্রহারের পর গুলি করে হত্যা করে। জগন্নাথ হলের শহীদ মিনার গোলার আঘাতে চূর্ণ হয়ে গেল। শহীদ মিনারের পেছনে 100 ফুট বধ্যভূমির গর্তের মাটি ভেদ করে হাতের পাঞ্জা ও পায়ের আঙুল দেখা যাচেছ।
হলের কোয়ার্টারে থাকতেন জি,কে নাথ, রবীন্দ্রনাথ ঘোষঠাকুর এবং পরেশ বল। এনাদের কোয়ার্টারের দরজা জানালা সব খোলা। জনমানব শূন্য দোতলা থেকে পচা দুর্গন্ধ ভেসে আসছে। সিড়ির ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত চাপ চাপ রক্ত জমাট বাধা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য হলগুলোতেও লক্ষ লক্ষ গুলির আওয়াজ আর কামানের কানফাটা গর্জন শোনা গেল সেই কালরাতে। রাত 12টার দিকে জনপথ ও বস্তি এলাকায় আগুন আর আগুন, সঙ্গে বৃষ্টির মতো গুলি। খৃষ্টানদের গির্জার সামনে সামরিক যান ও ট্যাঙ্কের ঘড়ঘড় আওয়াজ। হাজারো কণ্ঠের আর্তনাদ। সদরঘাট টার্মিনালে গুলির শব্দ। রাত 2টায় কারফিউ দেয়া হলো। ইংলিশ রোড ও ফ্রেঞ্চ রোডের দুপাশের কোটি কোটি টাকার কাঠের কারখানা ও মেশিনপত্র দেখতে দেখতে ছাই হয়ে গেল। দুপাশের বানিজ্য এলাকারও অসংখ্য দোকানপাট ও বানিজ্যকেন্দ্রের কোনো চিহ্ন রইল না। ঢাকা শহর ততক্ষণে নিস্তব্ধ এক প্রেতপুরী। এর মধ্যে ঢাকার অবাঙালী ও বিহারিরা মালিটোলা, বাবুবাজার, শাখারি পট্টি, তাঁতিবাজার, সুতার নগর, গোপাল নগর প্রভৃতি এলাকায় হানাদারদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চালাল লুটপাট ও হত্যাকাণ্ড। (চলবে)
ছবি : 1. 25 মার্চ রাতে বিধ্বস্ত ঢাকা
2. ধংসস্তুপ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাংশ
3. তবুও জীবিতের খোঁজ
4. শহীদ শিক্ষকরা : (ঘড়ির কাঁটার দিকে) গোবিন্দ্র চন্দ্র দেব, মুনীর চৌধুরী, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, রাশীদুল হাসান, সন্তোষচন্দ্র ভট্টাচার্য, এএনএম মুনিরুজ্জামান, গিয়াসউদ্দিন আহমেদ, আনোয়ার পাশা, আবুল খায়ের
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে অক্টোবর, ২০০৮ সকাল ৭:৪৩
১০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

=আমার মন খারাপ, ফুল দিয়ো=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১২ ই মে, ২০২৬ দুপুর ২:৫৮



অকারণে মন ভালো না আজ
তুমি কোথায়?
এসো এক গুচ্ছ রঙ্গন নিয়ে
বাঁধো আমায় ভালোবাসার সুতায়।

অকারণে ভালো লাগে না কিছু;
তুমি কই গেলে?
রক্ত রঙ ফুল নিয়ে এসো;
উড়ো এসে মন আকাশে - প্রেমের ডানা মেলে।

কী... ...বাকিটুকু পড়ুন

সূর্যমুখী ফুলের মত দেখি তোমায় দূরে থেকে....

লিখেছেন মরুভূমির জলদস্যু, ১২ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৩:৫৫


সূর্যমুখী
অন্যান্য ও আঞ্চলিক নাম : রাধাপদ্ম, সুরজমুখী (হিন্দি)
সংস্কৃত নাম : আদিত্যভক্তা, সূর্যকান্তি, সূর্যকান্তিপুষ্প
Common Name : Sunflower, Common sunflower
Scientific Name : Helianthus annuus

সূর্যমুখী একটি বর্ষজীবী ফুলগাছ। সূর্যমুখীকে শুধু ফুলগাছ বলাটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

রাত যত গভীর হয় প্রভাত তত নিকটে আসে

লিখেছেন আরোগ্য, ১২ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৫:২১

গতবছর এই মে মাসের ১৭ তারিখেই আমার চোখের প্রশান্তি, আমার কর্মের স্পৃহা, আমার জননী এই ক্ষণস্থায়ী পৃথিবী ও আমাদের কাছ থেকে মহান রব্বের ডাকে সাড়া দিয়ে পরপারে পাড়ি জমান। আব্বু... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইচ্ছে করে

লিখেছেন বাকপ্রবাস, ১২ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৫:৩৮

ইচ্ছে করে ডিগবাজি খাই,
তিড়িং বিড়িং লাফাই।
কুমারী দীঘির কোমল জলে
ইচ্ছে মতো ঝাপাই।

রাস্তার মোড়ে সানগ্লাস পরে
সূর্যের দিকে তাকাই,
সেকান্দর স্টোর স্প্রাইট কিনে
দুই-তিনেক ঝাঁকাই।

ঝালমুড়িতে লঙ্কা ডাবল,
চোখ কচলানো ঝাঁঝে,
ছাদের কোণে যাহাই ঘটুক,
বিকেল চারটা বাজে।

ওসবে আমার... ...বাকিটুকু পড়ুন

মায়া বড় কঠিন বিষয় !

লিখেছেন মেহবুবা, ১২ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪০


মায়া এক কঠিন বিষয় ! অনেক চেষ্টা করে জয়তুন গাছ সংগ্রহ করে ছাদে লালন পালন করেছি ক'বছর।
বেশ ঝাকড়া,সতেজ,অসংখ্য পাতায় শাখা প্রশাখা আড়াল করা কেমন আদুরে গাছ !... ...বাকিটুকু পড়ুন

×