বাদামতলী থেকে শ্যামবাজার ঘাট পর্যন্ত নদীর পাড়ে শবের মিছিল। সদরঘাট টার্মিনালে শুধু রক্ত আর রক্ত। 25 মার্চ রাতে এটা ছিল জল্লাদখানা। বহু মানুষকে এখানে ধরে এনে রীতিমতো জবাই করে হানাদাররা। বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে পানিতে ফেলে দিয়েছে। নদীর পাড়ের সমস্ত বাড়িঘর পুড়ে ছাই। এসব ঘরবাড়িতে তখনো প্রচুর লাশ পড়ে আছে। এদের মধ্যে বহু যুবতী মেয়ের ক্ষতবিক্ষত লাশও ছিল। খৃষ্টান মিশনারী অফিসের সামনে, সদরঘাট বাসস্ট্যান্ডের চারদিকে কলেজিয়েট হাইস্কুল, জগন্নাথ কলেজ, পগোজ হাইস্কুল, ঢাকা জর্জকোর্ট, পুরনো স্টেটসব্যাঙ্ক বিল্ডিং, সদরঘাট গির্জা, নওয়াবপুর রোডের সর্বত্র, ক্যাথলিক মিশনের ভিতরে ও বাইরে, আদালত প্রাঙ্গনে শুধু লাশ আর লাশ। রাস্তায় রাস্তায় পুলিশের খাকি পোষাক পড়া বহু মৃতদেহ।
নওয়াবপুরে বিহারীদের উল্লাসধ্বনী শোনা যাচিছল, ওরা বহু মানুষের লাশ মাড়িয়ে পাকিস্তানের নামে জিন্দাবাদ ধ্বনী দিয়ে মিছিল বের করেছে। নির্বিচার বাঙালী হত্যার পর রাস্তায় পড়ে থাকা নিরীহ লাশের গায়ে লাথি মারছে। কেউ প্রস্রাব করছে লাশের মুখে। বিহারী এলাকায় সরু বাঁশের মাথায় বাঙালী শিশু ও কিশোরদের লাশ বিদ্ধ করে খাড়া করে রাখা হয়েছে। কোথাও বা উন্মত্ত বিহারী জনতা রাস্তায় পড়ে থাকা লাশগুলোকে বটি দিয়ে কুটি কুটি করে পাশবিক আনন্দ উপভোগে মত্ত। রাস্তার দুপাশের ঘর বাড়িতে আগুন তখনো দাউদাউ জ্বলছে। ঠাটারি বাজারের ট্রাফিক ক্রসিংয়ে এক বাঙালী যুবকের লাশের পেট চিড়ে বাশের লাঠি খাড়া করা, লাঠির মাথায় স্বাধীন বাংলার ছেড়া ও মলিন একটা পতাকা ঝুলিয়ে আনন্দ করছে তারা।
বিজয় নগর থেকে শান্তিবাগের চারপাশের রাস্তার বাড়িঘরগুলোরও একই দশা- আগুনে পুড়ে ছাই। রাজারবাগ পুলিশ লাইনে জাহাঙ্গীর ও আবদুস সালামের অগি্নদগ্ধ বিভৎস লাশ পাওয়া যায় তিন নম্বর ব্যারাকে। 4 এপ্রিল রাজারবাগ থেকে হানাদাররা স্টোর ইনচার্জ সার্জেন্ট মুর্তজা হোসেন, সুবেদার আবুল হোসেন খান ও সুবেদার মোস্তফাকে ঢাকা সেনানিবাসে নিয়ে যায়। সেখানে লাঠি, বেত, সুই, বুট ও বেয়নেট দিয়ে তাদের শরীর রক্তাক্ত ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ থেতলে দেওয়া হয়। পরে বর্বররা লাইন করে ওদের ঘেরাও করে ফুটবল খেলতে থাকে। তারপর চাকচাক করে কেটে নেওয়া হয় শরীরের মাংস। ওদের দেহ রক্তক্ষরণে অচল ও অবশ হয়ে পড়লে গুলি করে হত্যার নির্দেশ দেওয়া হয়। যাকে নির্দেশ দেয়া হয়, তিনি একজন পাঠান। দয়াপরবশ হয়ে এই মহানুভব পাঠান সৈনিক তিন বাঙ্গালী পুলিশকে তিনটি ফাঁকা গুলি করে ছেড়ে দেন। প্রতিদিন বহু বাঙালী যুবককে চোখ বাধা অবস্থায় রাজারবাগ পুলিশ লাইনে আনা হতো। হেডকোয়ার্টার বিল্ডিংয়ের ওপর তলায় তাদের ওপর চলত অকথ্য নির্যাতন।
26 মার্চ সকালে মীরপুর ইপিআর ক্যামপ থেকে সমস্ত বাঙালী ইপিআরদের নিরস্ত্র ও বন্দী করে মীরপুর থানায় আটক করা হয়। বিহারীরা এসময় কপালে সাদা কাপড় বেধে সকল বাঙালী বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয় ও লুট করে। তারা প্রতিটি বাঙালী বাড়ি থেকে শিশু, যুবতী ও বৃদ্ধাদের টেনে বের করে রাস্তায় ছোরা দিয়ে জবাই করে। রমনীদের রাস্তায় উলঙ্গ করে উপর্যপুরি ধর্ষণ ও নির্যাতন চালায়, তারপর ধারালো ছুরি দিয়ে স্তন ও নিতম্বের মাংস কেটে নৃশংস ভাবে হত্যা করে। কাউকে কেটে কুটিকুটি করে ফেলে। কারো গুপ্ত স্থানে লোহার রড, কারো গায়ে আগুন ধরিয়ে উল্লাসে মাতে তারা।
একট্রাক ভর্তি মহিলা ও শিশু মীরপুর দিয়ে পালিয়ে যাচ্ছিল, হানাদাররা ওই ট্রাকে আগুন ধরিয়ে দেয় আর দুটি যুবতী মেয়েকে উঠিয়ে নিয়ে যায় জিপে তুলে। মেয়ে দুটোর করুণ আর্তনাদে প্রকমপিত ঢাকার আকাশ বাতাস।(চলবে)
ছবি : 1. গুলি করার আগে সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড় করানো হয়েছে বাঙালীদের
2. বুড়িগঙার পাড়ে লাশ
3. বিহারীদের নির্বিচার হত্যার শিকার শাখারীপট্টির একটি পরিবার
4. 26 মার্চের ঢাকা
5. বিহারীদের নৃশংসতার শিকার যারা
6. শিশুও রেহাই পায়নি
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে অক্টোবর, ২০০৮ সকাল ৭:৪৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



